কিছু সৃষ্টিবাদীকে দেখা যায়
বিবর্তনবাদীদের সাথে যখন কোন যুক্তিতর্ক বা বিতর্ক করে আর পারে না, তখন ঠিক চলে যাওয়ার
আগ মূহুর্তে একটি কথা বলে যায়। সেটা হচ্ছে “তাহলে আপনি মনে করেন যে, আপনি বানর
থেকে মানুষ হয়েছেন বা আপনার পুর্বপুরুষেরা সব বানর ছিলো”। একটু যাচাই বাছাই করে
দেখুন এদের জ্ঞানের সীমা কতটুকু হতে পারে। এদের মধ্যে অনেকেই আবার বলে যে “বানর
থেকেই যদি মানুষ হবে তাহলে এখন আর বানরেরা মানুষ হয়ে যায় না কেন” এমন প্রশ্ন করতেও
শোনা যায় কিছু শিক্ষিত যুব সমাজকে। এবার ভেবে দেখুন তাহলে এরা কোন অবস্থায় আছে এখনও।
আমি কিন্তু কখনই এদেরকে দোষারপ করি না তাদের এই জাতীয় মনোভাবে। এর একমাত্র কারন
হচ্ছে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিবর্তন নিয়ে কোণ শিক্ষা দেওয়া হয় না। যারা
সুকৌশলে আমাদের দেশের মতো তৃতীয় শ্রেনীর দেশগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে এই বিবর্তন
শিক্ষা চুপিচুপি সরিয়ে ফেলেছে, নিঃসন্ধেহে তারা চাইছে না আমাদের দেশের নতুন
প্রজন্ম এই বিবর্তন নিয়ে জানুক। তার থেকে তারা বেশি চাইছে কেউ একজন আমাদের মানে
মানুষকে মাটি দিয়ে বানিয়েছে এবং আজ থেকে ৬ হাজার বছর আগে পৃথিবীতে ছেড়ে দিয়েছে এমন
মনোভাব প্রতিষ্ঠা করতে।
আচ্ছা এখন বলি যারা কথায়
কথায় বলে মানুষ বানর থেকে এসেছে তাদের জবাব। আমার প্রথম কথা হচ্ছে বানর বলতে আমরা
কি বুঝি সেটা আগে দেখতে হবে। বানর বা (Monkey ) জঙ্গলে গাছের ডালে থাকা বা চিডিয়াখানার খাচাই
বন্দী রডে ঝুলে থাকা প্রানীটি হচ্ছে বানর। যারা ভাবে এই বানর থেকেই আজকের আধুনিক
মানুষের সৃষ্টি হয়েছে তারা আসলে একদম ভুল ভাবে। কারন বানর থেকে মানুষের সৃষ্টি
হয়নি বরং বানর, গরিলা, শিম্পাঞ্জি ও আধুনিক মানুষ এরা একই গোত্রের পুর্বপুরুষ থেকে
এসেছে। শুধু তাই নই বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীরা এই পর্যন্ত এই জাতীয় প্রা্নীদের প্রায়
২০০ প্রাজাতির সন্ধান এখন পর্যন্ত পেয়েছে। মানুষ এবং বানর বা বনমানুষ জাতীয় যত
প্রানী আজ পৃথিবীর বুকে চরে বেড়াচ্ছে তারা আজ থেকে লক্ষ লক্ষ বছর আগে একই পুর্বপুরুষ
থেকে উদ্ভুত হয়েছে এবং আলাদা আলাদা ধারা বা লিনিয়েজ তৈরি করেছে। সেক্ষেত্রে আজকের
আধুনিক মানুষ ও বানর জাতীয় সকল প্রানীদের সাথে অনেকটা মিল থাকলেও আসলে আধুনিক
মানুষ সরাসরি বানরের উত্তরসরি একদমই না। আধুনিক মানুষ আসলে এসেছে কয়েক লক্ষ বছর
আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এক ধরনের সাধারন পুর্বপুরুষ হিসেবে কথিত প্রাইমেট থেকে। এই
প্রাইমেট পুর্বপুরুষেরা দেখতে বর্তমান বানর ঠিক নয় বন মানুষ বা গোরিলাদের মতো
ছিলো। আর এই প্রাইমেটরাই হচ্ছে আজকের আধুনিক মানুষ, গোরিলা, বানর, শিম্পাঞ্জি,
ওরাংওটাং জাতীয় যে ২০০ প্রাজাতি প্রানী পৃথিবীতে পাওয়া গিয়েছে তাদের সকলের পুর্বপুরুষ
হচ্ছে এই প্রাইমেট। আশা করি সৃষ্টিবাদীদের আরেক গ্রুপ যারা বলে বেড়াই “বানর থেকেই
যদি মানুষ হবে তাহলে এখন আর বানর থেকে মানুষ হয় না কেন” তাদের উওরও এখানেই আছে।
আরেকটু আলোচনা করা যাক।
এখানে কিন্তু বানর জাতীয় বলতে প্রাইমেট বোঝানো হচ্ছে সরাসরি বানর (Monkey) বা বনমানুষ (Gorila) নয় ভালো করে বুঝতে
হবে। আধুনিক মানুষ শিম্পাঞ্জি, গোরিলা, ওরাংওটাং বা বানর সবই একটি পুর্বপুরুষ থেকে
এসেছিলো মানে যাকে আমরা (Common
ancestor) বলতে পারি। আজ থেকে প্রায়
৩২ লক্ষ বছর আগে আমাদের এই পৃথিবিতে দুই পায়ে ভর দিয়ে হেটে বেড়াতো এক জাতীয় ‘অস্ট্রালোপিথেকাস
অ্যাফারেনসিস' গোত্রের প্রানী। যারা
দেখতে ছিলো কিছুটা বর্তমান যুগের গোরিলা বা বনমানুষের মতো। এদেরকেই আমরা প্রাইমেট
এর পরবর্তি প্রজন্ম বলতে পারি যাদের থেকে আজকের বর্তমান বা আধুনিক মানুষের
আবির্ভাব ঘটেছে। গোরিলা, বানর বা সিম্পাঞ্জি তারও অনেক আগে এই গোত্র থেকে আলাদা
হয়ে গিয়েছে। আহলে কিভাবে মানুষ বানর থেকে আসলো। বিজ্ঞানীরা আজ থেকে ৪০ বছর আগে
ইথিওপিয়াতে এই অস্ট্রালোপিথে্কাস আফারেনসিস গোত্রের মানুষের পুর্বপুরুষদের এক
মানবীর কঙ্গালের সন্ধান পেয়েছে যা আজ থেকে ৩২ লক্ষ বছর আগে জীবিত ছিলো এই
পৃথিবীতে। বর্তমানে আমরা অনেকেই তাকে লুসি নামে চিনি।
তারও অনেক আগে, আজ থেকে
প্রায় ১.৪ কোটি বছর আগে এদের সকলের পুর্বপুরুষ ছিলো সেই প্রাইমেট। তখন যেকোন কারনে
একটি প্রজাতি আলাদা হয়ে যায় যাকে আমরা আজকের ওরাঙ্গওটাং বলে থাকি। এরপর কিছুদিন এই
দুই প্রজাতি বসবাস করতে থাকে আলাদা আলাদা ভাবে। তাদের আলাদা আলাদা ভাবে বিবর্তন
ঘটতে শুরু করে। তারপর আজ থেকে প্রায় ৯০ লক্ষ বছর আগে সেই মূল গোত্র থেকে আরেকটি
গোত্র আলাদা হয়ে যায়। যাদের আমরা বর্তমান গোরিলা বলে থাকি তাদের একটা অংশ ছিলো
সেটা। তাই বলে আজ থেকে ৯০ লক্ষ বছর আগে কিন্তু আজকের এই গোরিলাই ছিলো না । এরা এই
৯০ লক্ষ বছর ধরে বিবর্তিত হতে হতে আজকের এই গোরিলায় এসে ঠেকেছে। এর পর আজ থেকে
প্রায় ৬০ লক্ষ বছর আগে আবার সেই মূল গোত্র থেকে একটি গোত্র আলাদা হয়ে এই দীর্ঘ সময়
ধরে বিবর্তিত হতে হতে মানুষ এবং শিম্পাঞ্জি দুটি আলাদা গোত্র তৈরি হয়েছে। তারও ৩০
লক্ষ বছর পরের যে মানুষের পুর্বপুরূষ লুসির কঙ্গাল বিজ্ঞানীরা পেয়েছে সে ছিলো এই
আজকের আধুনিক মানুষের পুর্বপুরুষদের একজন।
এখন ধর্ম বিশ্বাসীরা বলবে
ধুর ভাই আপনি এসব কি বললেন। আমাদের ঐশরিক কিতাবে লেখা আছে আজ থেকে প্রায় ৬ হাজার
বছর আগে এডাম বা আদম নামের এক মানুষকে সৃষ্টি কর্তা মাটি দিয়ে বানিয়ে তারপরে পৃথিবীতে
ছেড়ে দিছিলো আর আমরা হচ্ছি তার বংশধর। তাদেরকে সেই বিষয়ে কিছুই বলবো না কারন, এতে
করে আবার অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে। তবে এটুকু বলবো আগে আপনাদের খুজে দেখা উচিত
আপনাদের অনুভূতি এতো নরম কেন, যা সত্য কথাতেই আঘাত লাগে। আর যদি অনুভূতি এতো নরমই
হবে তাহলে বলবো আবার নতুন করে প্রাথমিক স্কুলে দেরি না করে ভর্তি হয়ে যান। কারন
সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ফেসবুক প্লাটফর্মে বা অনলাইন ব্লগ সাইটে আসলে আর অনুভুতিতে
আঘাত লাগবে না। তখন মানুষের মতো কথা বলতে পারবেন আদমের বংশধরের মতো মানুষ মারার
প্রয়োজন পড়বে না।
আর একটা কথা সৃষ্টিবাদীরা
জেনে রাখুন এটাও আপনাদের দরকার আছে বলে মনে করি। সেটা হচ্ছে চার্লস রবার্ট ডারউইন
কিন্তু নিজেই এই কথা বলে অনেক বিপদে পড়েছিলেন যে, মানুষ আসলে এই জাতীয় একটি
প্রাইমেট এর থেকে এসেছে। তাকে নিয়ে অনেকেই বানরের ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন
বানিয়েছিলেন সে সময়। কিন্তু পরে যখন তারা এর সত্যতা জানতে পারলো তখন নিজেরাই
লজ্জিত হয়েছিলেন। শুধু চার্লস ডারউইন এর সাথেই এমন হয়েছিলো তা নয়। একবার
অক্সফর্ডের একটি সভাতে বিজ্ঞানী হাক্সলি এই কথা বলাতে একজন খ্রিষ্টান পাদ্রী তাকে
কটাক্ষ করে বলেছিলেন তাহলে বলুন আপনার দাদা বা দাদীর মধ্যে কে বানর ছিলো। এই কথার
জবাব দিয়েছিলেন হাক্সলি তার বুদ্ধিদীপ্ত তীর্যক উত্তরে।
---------- মৃত কালপুরুষ
২৮/০৯/২০১৭





কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন