শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

রোহিঙ্গা ইস্যুর নতুন সম্ভবনা।


রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কমবেশি এতো পরিমানে লেখালেখি হয়েছে যে এই বিষয়ে এখন অনেকেই শুনতে আগ্রহী না। তার পরেও সম্প্রতি কিছু নতুন খবর পাওয়ার কারনে আবার লেখার প্রয়োজন মনে করলাম এই ইস্যুটি নিয়ে। তাই আগেই ঘাবড়িয়ে যাবেন না। রোহিঙ্গা ইস্যূ নিয়ে এটা হবে আমার ১০ম লেখা। কিছু নতুন তথ্যর উপর ভিত্তি করে পাঠক মহোদয় কে অনুরোধ করবো আমার প্রশ্ন গুলির উত্তর দেবার জন্য।
সম্প্রতি আমরা অনেকেই জানতে পেরেছি বিশ্ব নেত্রী-বৃন্দরা এই রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। সম্প্রতি বিখ্যাত বিখ্যাত মিডিয়া গুলিও এই ব্যাপারে খুব লেখালেখি শুরু করেছে। চাইলে টাইমস ম্যাগাজিনের  একটি খবর পড়ে দেখতে পারেন সবাই। রোহিঙ্গাদের দেশ ত্যাগের একটি ছবি টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ হয়েছে যা আসছে অক্টোবর মাসের ২ তারিখে প্রকাশ পাবে নিচে দেখুন। ছবিটি দেখে আমারও খুবই খারাপ লেগেছে। অন্তত এটা ফেক ছবি বা রেফারেন্স বিহীন কোন ছবি না। আরেকটি সংবাদ পড়ে ভালো লেগেছে যেটা নিয়ে এর আগে বেশ কয়েকবার লিখেছি, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে যারা এতোদিন ফেসবুকে ভুয়া কিছু ছবি ছড়িয়ে দেশের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাবার চেষ্টা করছিলো সেই সমস্ত ফেসবুক একাউন্ট গুলি ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিচ্ছে শুনে। এখন আসুন মূল কথায়।
সম্প্রতি বাংলাদেশের ঢাকাতে রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধানে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিলো। যেখানে এই রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি আর এই সমস্যা থেকে বের হবার ব্যাপারে কিছু আলোচনা করা হয়। সেখানে কয়েকজন বক্তা বাংলাদেশেকে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশ গুলির সাথে এক হয়ে মায়ানমার আক্রমনের কথা বলেছেন। আমি চিন্তা করছি কতটা মাথামোটা জাতি না হলে এই জাতীয় মনোভাব কেউ ব্যক্ত করতে পারে। আর ফেসবুক সহ অনলাইন মাধ্যম গুলিতে যে সক্রিয় গ্রুপ আছে তাদের কথা বাদই দিলাম যারা প্রতিনিয়ত সাধারন মানুষকে উস্কানি দিয়ে আসছে এধরনের কর্মকান্ডে। আগেই বলেছি এই এই রোহিঙ্গা ইস্যু কোন কালেই ধর্মীয় কোন ইস্যু ছিলোনা। এর সাথে কোন ধর্মের কোন সম্পর্ক অতীতে ছিলো না। একটি মহল একে মুসলিম রোহিঙ্গা মুসলিম রোহিঙ্গা বলে বলে ইসলাম ধর্মাবল্মীদের দৃষ্টি আকর্ষন করার চেষ্টা করছেন। কারন ধর্ম গুলি সবসময় একটি চরম সেনসেটিভ ইস্যু যা ব্যবহার করতে পারলে একটি জাতি বা একটি সম্পুর্ন গোষ্ঠির সাপোর্ট পাওয়া যাবে। রোহিঙ্গা ইস্যু বা বর্তমান বাংলাদেশ মায়ানমার এর যে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি তা সম্পুর্ন মায়ানমারের একটি অভ্যান্তরিন সমস্যা। এখানে বাংলাদেশের কোন সমস্যায় ছিলো না। অসহায় ও নির্যাতিত যে রোহিঙ্গারা আজ মায়ানমার থেকে পালিয়ে আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে তাদেরকে আশ্রয় দিলেই যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তাও কিন্তু না। এখন কথা হচ্ছে এই জাতীয় সেমিনার গুলিতে বুদ্ধীজীবি আর চিন্তাবিদেরা যদি এমন কথা বলতে পারে তবে দেশের সরকারকে নিয়েও চিন্তা হওয়া অস্বাভাবিক কিছুই না। আর সাধারন জনগনেরও জানা উচিত আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি আইনে যদি বাংলাদেশ তার নিজের পায়ের তলার মাটি অনিরাপদ করে ফেলে তাহলে কি হবে। এই ছোট্ট অখন্ড বাংলার ভূমিটি কিন্তু অনেক রক্তের বিনিময়ে পাওয়া । রোহিঙ্গা ইস্যুতে কারো সাথে তাল দিতে গিয়ে নিজেদের পায়ের তলার মাটি যেনো হারানোর মতো পরিস্থিতি না হয় খেয়াল রাখবেন।
আমরা সবাই জানতে পেরেছি চীন মায়ানমারকে অনেক আগে থেকেই বিভিন্নভাবে তাদের সাহায্য সহোযোগিতা করে আসছে। এই চীন যে মায়ানমারে তাদের বিপুল পরিমান অর্থ বিনিয়োগ করেছে সেটা কিন্তু চীনের মায়ানমারকে সাপোর্ট করার একমাত্র কারন নাও হতে পারে একটু ভেবে দেখবেন। আমি যদি বলি আসল কারনটি আরো বড় কিছু তাহলে সবার আগে আমার বাংলাদেশের সাম্রজ্যবাদীদের বিপক্ষে কথা বলা ভাই বন্ধুদের চোখে আমি সবার আগে খারাপ হয়ে যাবো। অনেক আগে থেকেই দক্ষিন এশিয়ার দেশ গুলিতে একটি কোল্ড ওয়ার বা ঠান্ডা যুদ্ধ চলে আসছে। যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ গুলিকে নিয়ন্ত্রন করার একটা আপ্রান চেষ্টা বলা চলে। তাই তো বর্তমান আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প কে দেখা যায় দক্ষিন কোরিয়ার পারমানবিক বোমা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মন্তব্য করতে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি অনেক বড় ব্যাপার, যা খুব সহজে বাংলাদেশের আওয়ামীলীগ আর বিএনপি সমর্থক আর এইসব দলের নেতা কর্মী বা মন্ত্রী মিনিষ্টারদের মাথায় নাও আসতে পারে।
এখন আমি যদি বলি গত ২৪ আগস্ট মায়ানমার এর রাখাইন রাজ্যে যে সেনা ক্যাম্প আর পুলিশ চৌকি গুলিতে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) নামের যে ধর্মীয় জঙ্গীগোষ্ঠী আক্রমন করেছিলো এবং মায়ানমার এর সেনা সদস্য ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করেছিলো যার কারনে সাধারন অসহায় রোহিঙ্গা জাতিদের উপরে মায়ানমার সরকার নির্যাতন শুরু করে দিলো আর তাদেরকে বিতাড়িত করে দেশ ছাড়া করার উদ্যোগ নিলো এসবই ছিলো এই জঙ্গীগোষ্ঠী (আরসা) এর উদ্দ্যেশ্যমূলক কর্মকান্ড তাহলে কি কিছু বুঝতে পারবেন। একটু ভেবে দেখুন বিষয়টি কি হতে পারে। পৃথিবীর ক্ষমতাধর দেশগুলি ও ধর্মীও মোড়ল দেশ গুলির একাংশ চাচ্ছে যে আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (এ আর এন ও) এবং আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) এর মতো জঙ্গীদলগুলি ধর্মীও জিহাদের নাম করে মায়ানমারের এই অংশটুকু রাখাইন রাজ্যটাকে তাদের দখলে নিয়ে নিতে। এখন আপনিই বলুন আপনি কি চাইবেন আপনার বাংলাদেশের কোন একটি অংশ কেউ রোহিঙ্গাদের মতো সশস্ত্র লড়াই বা আন্দোলন করে তাদের জন্য আলাদা রাজ্য তৈরি করুক। উত্তর হবে একজন বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে না। তাহলে এটাও ভেবে দেখুন মায়ানমারের মিত্র দেশ চীন আবার চীনের মিত্র দেশ রাশিয়া এবং তার গ্রুপের অন্যান্য শক্তিশালী দেশ গুলি এই বিষয়ে কেউ কি চাইবে যে, যেখানে তাদের স্বার্থ আছে সেই যায়গাটি অস্থিতিশীল থাকুক। নিশ্চয় চাইবে না বরং এটা করতে চাইবে মায়ানমারের মতো একটি যায়গায় চীন, রাশিয়া, আমেরিকার একটি মজবুত ঘাটি থাকুক।
এবার একটু ভেবে দেখতে হবে আমাদের, বৌদ্ধদের সন্ত্রাসী বলে আমরা কি রোহিঙ্গাদের মুসলিম বলছি কিনা আসলে রোহিঙ্গারা যে সবই মুসলিম তা কিন্তু না। । আর রোহিঙ্গা সমস্যাকে ইসলাম ধর্মের সাথে মিলিয়ে বৌদ্ধ ধর্মের সাথে কোন সংঘাত বাধিয়ে ফেলছি কিনা। এখন বিশ্বের বড় বড় সংবাদ মাধ্যম গুলোও ধুমছে সেই একই কাজটি করে যাচ্ছে। এতে কিন্তু পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে এই ঠান্ডা লড়াইটা মূলত আমেরিকার সাথে বাকী দুই দেশের। আর ঠিক রোহিঙ্গা ইস্যু সৃষ্টির এই মূহুর্তে রোহিঙ্গা মুসলামানদের নিপীড়িত হওয়া প্রমান করা খুবই জরুরী বলে মনে করছেন বিশ্বনেতাদের একংশ বিশেষ করে ধর্মীও মোড়ল দেশগুলি। এই সুযোগটি নিচ্ছে আইএস, আল-কায়েদা, বোকো হারাম, তালেবান জিহাদী দলগুলো। তারা চাচ্ছে মায়ানমারের অভ্যান্তরে থাকা আরসা এবং এআরএনও জিহাদী দলগুলোর নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নিয়ে মায়ানমার এর রাখাইন রাজ্য দখল করে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে। এতে পার্শবর্তি দেশ বাংলাদেশকে কিভাবে সাথে পাওয়া যাবে তা তারা ভালো করেই জানে।
বাংলাদেশের মাছ খেকো বাংগালী এসব আন্তর্জাতিক রাজনীতি না বুঝলেও সেই দূর দেশ তুরর্ষ্ক ঠিকই বুঝেছে যে মায়ানমারের বন্দর আসলে অনেক দূরে। যার কারনে কিছুদিন আগে এরদোগানের স্ত্রী অসহায় রোহিঙ্গাদের দেখে আবেগে যে কান্না কেদেছিলো তা বাড়ী গিয়েই ভূলে গিয়েছে। যার কারনে তুরষ্কের যুদ্ধ জাহাজ গুলো মায়ানমার এর তীর খুজে পাচ্ছে না এবং মাঝ সুমুদ্রেই ঘুরপাক খাচ্ছে। যেসব বাংগালী ভায়েরা আজ সৌদিআরবের মায়ানমার আক্রমনের রঙ্গিন স্বপ্ন দেখছেন তারা একটু ভেবে দেখবেন বিষয়গুলি। আপনাদের এখনই উচিত প্যান ইসলামিজম এবং ফান্ডামেন্টালিস্ট ইসলামিক বুদ্ধিজীবিদের চিনে নেওয়া। আর কারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে কেবল শরণার্থী শিবিরের দুর্দশাগ্রস্থ শিশু নারীদের ছবি দেখিয়ে যাচ্ছে এবং মুক্তমনা লেখক ব্লগারেরা কি বলতে চাচ্ছে। আশা করি মাছে ভাতে বাংগালী তাদের আসল বিপদটি দেখতে পাবে তবে না দেখতে পাওয়াটায় বেশি প্রত্যাশিত বলে মনে করি কারন আমরা বাংলাদেশি। মনে রাখবেন মুক্তমনারা হচ্ছে জন্ম থেকেই প্রগতিশীল। আর প্রগতিশীলতার অর্থই হচ্ছে সামনে এগিয়ে যাওয়া। আর তাইতো সবসময় ধর্মীয় বা জাতিগত জাতীয়বাদীরা আগে থাকে প্রগতির বিপরীতে। আর এটাও জেনে রাখুন বাংলাদেশের ভবিষৎ এখন তাদের হাতেই।


----------- মৃত কালপুরুষ
             ২২/০৯/২০১৭


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন