রোহিঙ্গা কারা তাদের পরিচয় যদি না জানি বা জানাই তবে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে লিখে কোন লাভ নাই। আরেকটি ব্যপার তা হচ্ছে রোহিঙ্গা নিয়ে কথা বলতে গেলেই কিন্তু ইসলাম আর মুসলমান নিয়ে কথা চলে আসবে তাই না বুঝেই ফালাফালি না করার অনুরোধ রইলো। এই যে ফেসবুক গরম করে মানবতা আর মুসলিম হত্যার কথা বলে যারা দেশের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাবার চেষ্টা করছে তাদের কথা মাথায় রেখেই বলছি জাতি, ধর্ম, ধনী, গরিব, কালো, সাদা, নারী,পুরুষ সব কিছু বাদ দিয়ে আসুন এমন কিছু ভাবি এই রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে এমন কোন চাপ তৈরি করি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যা জাতিসংঘ এবং ওআইসির কান পর্যন্ত পৌছায়। কেন এই ভার্চুয়াল জগত বা অনলাইন থেকেই তা শুরু করতে হবে তা বলছি। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর রোকেয়া হল সহ মেয়েদের থাকার হল গুলিতে কিছু তেতুল বিশ্বাসী লোক ঢুকে পড়েছে। যার কারনে মেয়েদের পোষাকের দিকে আগেই তাদের নজর গিয়েছিলো। যারা মনে করে মেয়েদের জিন্স পরার কারনে ভূমিকম্প হয় তাদের একটি আদেশ জারি করার আগেই মেয়েদের প্রতিবাদ শুরু হয়। নারীবাদী নারীরা তা নিয়ে সমালোচনা করলে দেশে বিদেশে অনেক মেয়েরাই তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে লেখা লেখি শুরু করে। এতে এই খবর দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কানে যায় এবং দ্রুত তারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। এটা ছিলো একটি নমুনা। এখন রোহিঙ্গা ইস্যুর কথা বলতে গেলে যা বলতে হয় মানবতা যদি কারো মধ্যে থাকে তবে বর্ডার খুলে দিতে বলুন তারা আমাদের দেশে এসে আশ্রয় নিক। পরে মানবাধিকার নিয়ে ভাবা যাবে। কিন্তু সেখানে আমি বলতে চাই এই ৮লক্ষ রোহিঙ্গা নারী,পুরুষ,শিশুকে যদি এই অনুমতি দেওয়াও হয় সেটা রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে না। কেন হবে না তার জন্য আপনাকে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস জানতে হবে।
তার জন্য তাদের পরিচয় জানা দরকার। বর্তমান মিয়ানমারের "রোসাং" এর অপভ্রংশ "রোহাং" (আরাকানের মধ্যযুগীয় নাম) এলাকায় এ জনগোষ্ঠীর বসবাস। আরাকানের প্রাচীন নাম রূহ্ম জনপদ। ইতিহাস ও ভূগোল বলছে, রাখাইন প্রদেশে পূর্ব ভারত হতে প্রায় খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ বছর পূর্বে অষ্ট্রিক জাতির একটি শাখা "কুরুখ" (Kurukh) নৃগোষ্ঠী প্রথম বসতি স্থাপন করে, ক্রমান্বয়ে বাঙালি হিন্দু (পরব্রতীকালে ধরমান্তরিত মুস্লিম), পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। এ সকল নৃগোষ্ঠীর শংকরজাত জনগোষ্ঠী হলো এই রোহিঙ্গা। বস্তুত রোহিঙ্গারা হল আরাকানের বা রাখাইনের একমাত্র ভুমিপুত্র জাতি। তাদের কথ্য ভাষায় চট্টগ্রামের স্থানীয় উচ্চারণের প্রভাব রয়েছে। উর্দু, হিন্দি, আরবি শব্দও রয়েছে। পক্ষান্তরে ১০৪৪ খ্রিষ্টাব্দে আরাকান রাজ্য দখলদার কট্টর বৌদ্ধ বর্মী রাজা "আনাওহতা" (Anawahta) মগদের বারমা থেকে দক্ষিণাঞ্চলে রোহিংগাদের বিতাড়িত করে বৌদ্ধ বসতি স্থাপন করান। রাখাইনে দুটি সম্প্রদায়ের বসবাস দক্ষিণে মায়ানমার এর বংশোদ্ভুত ‘মগ’ ও উত্তরে ভারতীয় বংশোদ্ভুত ‘রোহিঙ্গা’। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মগের মুল্লুক কথাটি বাংলাদেশে পরিচিত। দস্যুবৃত্তির কারণেই এমন নাম হয়েছে ‘মগ’দের। এক সময় তাদের দৌরাত্ম্য ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। মোগলরা তাদের তাড়া করে জঙ্গলে ফেরত পাঠায়।
রাখাইন শব্দটি এসেছে পালী শব্দ রাক্ষাপুরা থেকে, যার সংস্কৃত প্রতিশব্দ হলো রাক্ষসপুরা। অর্থাৎ রাক্ষসদের আবাসভুমি। প্রাচীন হিন্দু ধরমীয় শাস্ত্রাদিতে অস্ট্রিক (অষ্ট্রোলয়েড) মহাজাতিকে রাক্ষস জাতি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়াছিল। মজার ব্যাপার হলো- মগ জাতির কিন্তু অষ্ট্রোলয়েড মহাজাতির সাথে কোন সম্পরক নেই, তারা মঙ্গোলয়েড মহাজাতি অন্তর্ভুক্ত জাতি। রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে একটি প্রচলিত গল্প রয়েছে এভাবে সপ্তম শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওয়া একটি জাহাজ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন উপকূলে আশ্রয় নিয়ে বলেন, আল্লাহর রহমে বেঁচে গেছি। এই রহম থেকেই এসেছে রোহিঙ্গা।
তবে,মধ্যযুগে ওখানকার রাজসভার বাংলা সাহিত্যের লেখকরা ঐ রাজ্যকে রোসাং বা রোসাঙ্গ রাজ্য হিসাবে উল্লেখ করেছেন। রোসাঙ্গ রাজ্যের রাজভাষা ফার্সী ভাষার সাথে বাংলা ভাষাও রাজসভায় সমাদৃত ছিল। ইতিহাস এটা জানায় যে, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহাঙ্গা স্বাধীন রাজ্য ছিল। মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করার পর চরম বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয়। এক সময়ে ব্রিটিশদের দখলে আসে এ ভূখণ্ড। তখন বড় ধরনের ভুল করে তারা এবং এটা ইচ্ছাকৃত কিনা, সে প্রশ্ন জ্বলন্ত। তারা মিয়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করে। কিন্তু তার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এ ধরনের বহু ভূল করে গেছে ব্রিটিশ শাসকরা।
আরেকটু সংখিপ্ত ইতিহাস নিন। ভারত বৃটিশদের হাত থেকে স্বাধীন হবার পরের বছর ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয়। সে সময়ে পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। এ জনগোষ্ঠীর কয়েকজন পদস্থ সরকারি দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। সামরিক জান্তা তাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার করা হতে থাকে। নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া হয়। হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়। বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই। বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ। মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের অনেকের কাছেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী 'কালা' নামে পরিচিত। বাঙালিদেরও তারা 'কালা' বলে। ভারতীয়দেরও একই পরিচিতি। এ পরিচয়ে প্রকাশ পায় সীমাহীন ঘৃণা।
আর সেই ঘৃনা থেকেই আজ অনেকেই বলছে যে, এই মুসলিম জাতিগুলাই একটু বেশি বেয়াড়া। এরা অন্যান্য ধর্মের মানুষদের হত্যা করে। রাক্ষুস পূরি বা রাক্ষস এর গল্প এদের থেকেই রুপকথার গল্পে এসেছে বলে অনেকেই মনে করে। কারন তারা অন্য ধর্মের বিশেষ করে মায়ানমার এর বৌদ্ধদের যেভাবে হত্যা করে সাধারণ মানুষ মুরগিও সেভাবে জবাই করতে পারে না। এমনই কিছু ভিডিও চিত্র সম্প্রতি ফেসবুকে ঘোরাঘুরি করছে। এই জাতিকে আবার কেউ কেউ ইন্ধন দিচ্ছে নিশ্চিত। তা না হলে এদের হাতে চাইনিজ রাইফেল, ইসরাইলী উজি, এম ১৬ রাইফেল, রোকেট লাঞ্চার আর মিসাইল কোথা থেকে আসছে। অনেকেই এদের মানুষ হত্যা করার ভিডিও মানে বৌদ্ধদের হত্যা করার দৃশ্য ভুল করে মুসলিম হত্যার দৃশ্য বলে চালাচ্ছে। কারন সেখানে ক্লিয়ার শোনা যাচ্ছে আল্লাহু আকবার বলে জবাই দেওয়ার কথা। কিন্তু হুজুগে বাঙ্গালী মুসলিম গুলা কিছু না জেনেই মনে করছে বৌদ্ধরা মনে হয় মুসলিমদের এভাবেই মারছে। হ্যাঁ, আমি বলছি না যে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী কিছু মানুষ রোহিঙ্গাদের উপরে নির্যাতন করছে না তা।
এখন এতো কিছু বলার পরে আমি আশা করতেই পারি কিছু নেগেটিভ কথার। আশ্রমের সেবিকা আর মসজিদে শিশু ধর্ষনের কথা বললে যে দেশে নাস্তিক হতে হয় সে দেশে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কথা বললেই মানবতা বিরোধী বলা ছাড়া আর কি বলতে পারে এই ধর্মান্ধ মানুষগুলা। তবে দেখুন আগে আমি কি বলতে চাচ্ছি এই অনুরোধ রইলো।
চলবে.............ছবিঃ Allison Joyce (Allison Joyce/Facebook)
---------- মৃত কালপুরুষ
২৯/০৮/২০১৭
২৯/০৮/২০১৭


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন