বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

তুর্কির মুসলিম জাতি ও অটোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস।



অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা সেই ১২৯৯ সাল থেকেই ইসলামি আইননুসারে পরিচালিত হয়ে আসতো। প্রথম দিকে ইসলামিক খলিফাদের দারা এই রাজ্য নিয়ন্ত্রিত হতো।
ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তুর্কীয় জাতিসমূহ শামানিবাদের বিভিন্ন ধর্ম চর্চা করত। মধ্য এশিয়ায় আব্বাসীয় প্রভাবে ইসলাম প্রচার সহজ হয়। সেলজুক ও উসমানীয়দের পূর্বপুরুষ অঘুজ তুর্কিরা অন্যান্য অনেক তুর্কি গোত্রের মত ইসলাম গ্রহণ করে। তারা ১১শ শতাব্দীর শুরুর দিকে আনাতোলিয়ায় ইসলাম নিয়ে আসে।



মুসলিম জিম্মি রীতি অনুযায়ী উসমানীয় সাম্রাজ্যে খ্রিষ্টানদের কিছু সীমাবদ্ধতা সহকারে ধর্মীয় স্বাধীনতা ছিল। তাদের অস্ত্রবহনের অনুমতি ছিল না এবং ধর্মীয় চর্চা মুসলিমদের মত হতে পারত না। এছাড়া আইনি আরো কিছু বাধ্যবাধকতা ছিল। এসময় অনেক খ্রিষ্টান ও কিছু ইহুদি ইসলাম গ্রহণ করে তাদের জীবন বাঁচাতে। দেভশিরমে নামক প্রথা অনুযায়ী বলকান ও আনাতোলিয়া থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক খ্রিষ্টান বালককে তাদের বয়ঃপ্রাপ্তির আগে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হত এবং মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলা হত।


মিল্লাত প্রথা অনুযায়ী অমুসলিম নাগরিকরা সাম্রাজ্যের প্রজা হিসেবে বিবেচিত হত তবে ইসলামি আইন তাদের উপর প্রযোজ্য হত না। অর্থোডক্স মিল্লাত তখনও জাস্টিনিয়ান কোডের অনুসরণ করত যা ৯০০ বছর ধরে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে প্রচলিত ছিল। সর্ববৃহৎ অমুসলিম সম্প্রদায় হওয়ায় অর্থোডক্স মিল্লাতকে রাজনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ সুবিধা দেওয়া হত বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু অনেক পরে তাদের অবস্থাও হয়েছিলো ১৯১৫ সালের আর্মেনিয়ান জাতির মতো। উসমানীয় ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য অনুরূপ মিল্লাত প্রথা চালু করা হয়। তারা হাখাম বাশি বা উসমানীয় প্রধান রেবাইয়ের নেতৃত্বে থাকত। আর্মেনিয়ান অর্থোডক্স সম্প্রদায় একজন প্রধান বিশপের অধীনে ছিল; এছাড়া কিছু অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায় ছিল। মিল্লাত প্রথা প্রাক আধুনিক সমাজে ধর্মীয় বহুত্ববাদের উদাহরণ বহন করে।



অটোমান সাম্রাজ্য বা উসমানীয় সাম্রাজ্য নিয়ে মূল নিবন্ধগুলি উসমানীয় সাম্রাজ্যে ইসলাম, উসমানীয় খিলাফত এবং উসমানীয়দের দ্বারা আলেভি নির্যাতনের কথায় পরিপুর্ন। কিছু গোষ্ঠীকে ইসলাম পরিপন্থি মনে করা হত। এদের মধ্যে ছিল দ্রুজ, ইসমাইলি, আলেভি ও আলাউয়ি সম্প্রদায়। ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের চেয়ে তাদের অবস্থান নিচে ছিল। ১২৯৯ থেকে ১৩০০ সালে সুলতান প্রথম সেলিম আনাতোলিয়ায় আলেভিদের হত্যার জন্য "ভয়ানক" নামে পরিচিত হয়ে উঠেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে নজিরবিহীনভাবে ও দ্রুততার সাথে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করেন এবং মিশরের মামলুক সালতানাতের সমগ্র অঞ্চল জয় করে নেন। উসমানীয় মুসলিম জাতি ১৪শ শতাব্দী থেকে খিলাফতের দাবি করে আসছিল। এসকল জয়ের মাধ্যমে তিনি উসমানীয়দের খিলাফতের দাবিকে আরও সংহত করেন। সাম্রাজ্যের বাকি সময় জুড়ে খিলাফত উসমানীয়দের হাতে ছিল এবং ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ গ্র্যান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলি খিলাফত বিলুপ্ত করে এবং শেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদকে ফ্রান্সে নির্বাসনে পাঠায়। তার বিভিন্ন অপকর্ম ও অপরাধের কারনে।



বিশাল আয়তনের যে অঞ্চল নিয়ে এই অটোমান সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিলো তার নেপথ্যে আছে মুসলিম জাতির অত্যাচার আর নিপীড়ন এর কথা। অটোমান সাম্রাজ্যের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলো শুধুই যুদ্ধ আর জাতিগত গণহত্যা দিয়ে গড়েতলা এক বিরাট সাম্রাজ্য। যার কিছু অংশ ছিলো আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে, কিছু অংশ ছিলো মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে অল্প কিছু অংশ এশিয়ার মধ্যে অবস্থিত। আমার আগের লেখাটিতে ( তুরস্ক কর্তৃক আর্মেনিয়ান গনহত্যা ) আমি অঞ্চল ভিত্তিক পুর্নতথ্য দেওয়ার চেষ্টা করেছি। সেখানে বর্তমানে যে সমস্ত দেশ নিয়ে গড়ে উঠেছিলো এই অটোমান সাম্রাজ্য আমি সেই দেশগুলির নাম উল্লেখ করেছি।



উসমানীয় সাম্রাজ্য বা অটোমান সাম্রাজ্য ছিল খাটি ইসলামি সাম্রাজ্য। অমুসলিম নাগরিকদের ইসলামি প্রথানুযায়ী রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও নিরাপত্তা প্রদান করা হত বলে মুসলিম জাতিরা বলে আসলেও আসলে কিন্তু ইতিহাস সেই কথার উল্টাটাই বলে। সেই খলিফা শাসকদের শুরু থেকেই মানে ১২৯৯ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত এই ৬২১ বছরের যে অতীত রেকর্ড এই সাম্রাজ্য সম্পর্কে পাওয়া যায় তাতে পাতাই পাতাই শুধুই অমুসলিম জাতিদের নিধনের কথা আর নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ ধর্মীয় কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। যতই পড়া যায় শুধুই যুদ্ধ আর এট্যাক এর কথা। আমি ভেবে ভয় পেলাম ওই সময়ই যদি এই মুসলিম জাতি নিউক্লিয়ার বোমার সূত্র আবিষ্কার করতে পারতো তাহলে না জানি এই সুন্দর পৃথিবীটার কি রুপ দেখতাম। মনে হয় পৃথিবীতে একটিও হোমোস্যাপিয়েন্স এর বংশধর থাকতো না। কারন মুসলিম জাতি মনে প্রানে বিশ্বাস করে তারা আদম (আঃ) এর বংশধর। এটা নিয়ে গতকাল আমাকে এক ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া বায়োলজির স্টুডেন্ট প্রশ্ন করলো "আপনার কি মনে হয় না যে সব মানুষই হোমোস্যাপিয়েন্স এর বংসধর ? আমি উত্তর দিলাম "বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসী মানুষেরা বাদে। যাক সে কথা এবার আসুন অটোমান সাম্রাজ্যের আদম (আঃ) এর বংশধরদের পরিমান কেমন ছিলো তা জানার চেষ্টা করি।



অনেক পুরাতন যেমন এই তুর্কি জাতিদের প্রায় ৫শ থেকে ৬শ বছর আগের সঠিক মুসলমানদের সংখ্যা বের করাটা একটু কঠিন। কারন এদের অনেকের ধর্ম ছিলো ভিন্ন । ১৫শ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের আগ পর্যন্ত সাম্রাজ্যে মুসলিম সংখ্যালঘুদের শাসনের অধীনে খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। ১৯ শতকের শেষের দিকে অমুসলিম জনসংখ্যা কমতে থাকে। অভিবাসন এর অন্যতম কারণ ছিল মুসলিম জাতি। ১৮২০ এর দশকে ৬০% মুসলিম ছিল যা ১৮৭০ এর দশকে ৬৯% এবং পরে ১৮৯০ এর দশকে ৭৬% এ পৌছায়। ১৯১৪ সাল নাগাদ, ১৯.১% জনসংখ্যা ছিল অমুসলিম। এদের অধিকাংশ ছিল খ্রিষ্টান গ্রীক, এসিরিয়ান, আর্মেনিয়ান ও ইহুদি। এর মধ্যে মুসলিমরা সবচেয়ে বেশি অন্যায় আর অবিচার করেছিলো সাধারন আর্মেনিয়ান জাতির মানুষের সাথে।



১ম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুর্কির তালাত পাশা ও কামাল পাশা কর্তৃক যে আর্মেনিয়ান গণহত্যা চালানো হয় তার মতো আরো অনেক জাতিগত গণহত্যার কথা বলা আছে এই মুসলিম অটোমান সাম্রাজ্যের ৬০০ বছরের ইতিহাসে। কিন্তু তাদের এই হত্যা আর বর্বরতার কারনে কোথাও কোন বিচারের উল্লেখ পাওয়া যায় না। এমনকি ১ম বিশ্বযুদ্ধ সময়কার আর্মেনিয়ান গনহত্যার মতো এতো বিস্তর উল্লেখও পাওয়া যায় না। বিচারের ভেতরে মুসলিম খলিফাদের শেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদকে ফ্রান্সে নির্বাসনে পাঠানোর কথা শোনা যায়। আর ১৯১৫ থেকে ১৯১৮ পর্যন্ত চালানো আর্মেনিয়ান গণহত্যাকারী তালাত পাশার জার্মান পলায়ন ও পরে ১৯২১ সালে এক আর্মেনিয়ান যুবকের হাতে খুন হওয়া ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় না।



সম্প্রতি আমি আমার লেখাতে কিছু ফেসবুকার পাচ্ছি যারা লেখার দ্বিমত পোষন না করে তাদের মত প্রতিষ্ঠা করতে উঠে পড়ে লেগেছে। তাদের অনেকেই আবার ইনবক্স এ ঝড় তুলে ফেলছেন। তাদেরকে অনুরোধ আমিতো লেখেছিই, পারলে আপনি দ্বিমত পোষণকারী হোন। আপনার মত যদি আমার কাছে সঠিক মনে হয় তবে আমাকে তার পক্ষে কিছু প্রমান দিন। আমি কথা দিচ্ছি আমি আপনার মত অনুযায়ী লেখবো। আর মতামত যদি জানাতে হয় তবে ইনবক্স এ নয় সবার সামনে মতামত জানান কমেন্টস করে।

---------- মৃত কালপুরুষ
             ১৩/০৯/২০১৭

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন