ফেরাউন
এর লাশ বা ফেরাউন নাম নিয়ে ইসলাম ধর্মে একটি গল্প আছে যা ইসলাম ধর্মের পবিত্র
গ্রন্থ আল কোরান এর সাথে মিলে যায় বলে দাবী করা হয়। পুর্বে অনেকেই অনেক ভাবেই এর
নানান তথ্য প্রমান দিয়েছে যে, আসলে ফেরাউন বলতে ইসলাম ধর্ম কাকে বোঝাচ্ছে আর সেই গল্প
সত্য কি মিথ্যা। কিন্তু তারপরেও যারা মনে করে এসব তথ্য প্রমান সবই ভূল তাদের জন্য
এক গুচ্ছ আফসোস ছাড়া আর কি থাকতে পারে বলুন। কারন বর্তমান যুগ হচ্ছে টেকনোলজির যুগ,
হাতে হাতে আছে ইন্টারনেট, পাশাপাশি হাজার হাজার ডুকুমেন্টারি ফিল্ম আছে ইউটিউবে,
টিভিতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলে প্রতিনিয়ত দেখানো হচ্ছে মমি ও প্রাচীন মিশর
সম্পর্কিত নানান ডুকুমেন্টারি যেখানে খুব পরিষ্কার করে বলা হচ্ছে সব কিছু। পবিত্র
কোরানে উল্লেখিত ফেরাউন এর ঘটনার সাথে মিলিয়ে রামেসিস ২ নামের এক রাজা যাকে আরবি ফৌরান
বলা হয় তার মৃত দেহ নিয়ে মুসলমানেরা নানান মিথ্যাচার ছড়িয়ে লেখালেখি করে যা
একেবারেই মিথ্যা ও বানোয়াট গল্প। এই জন্য বানোয়াট যে সেই সব গল্পের কোন তথ্য সুত্র
নাই। আমি সংক্ষেপে একটু আলোচনা করবো এতে করে অনেক কিছুই বাদ পড়বে কারন ফেরাউন এর
আসল পরিচয় দিতে গেলে কিছু বিস্তর আলোচনার প্রয়োজন আছে যা অল্প কথায় এখানে তুলে ধরা
সম্ভব নয়। তবে আগেই বলে রাখি, প্রায় ৮০% মুসলিম জাতি মনে প্রানে বিশ্বাস করে যে
কোরানে বর্নিত ফেরাউন হচ্ছে এই রামেসিস ২ যার মৃত দেহ বর্তমানে ইজিপ্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত
আছে। এখানে একটু বলি, বিশ্বাস জিনিষটি আসলে অন্য জিনিষ যাকে যুক্তিবাদী সমাজ
ভাইরাসের সাথে তূলনা করে থাকেন। আর সেই বিশ্বাস মানে না কোন যুক্তি দেখে না কোন
প্রমান আর তাই বিশ্বাসের বেলায় খাটেনা কোন যুক্তি প্রমান। সকল প্রমানই অর্থহীন হয়ে
পড়ে এই বিশ্বাস এর কাছে।
মিশরীয়
সভ্যতা ছিলো এক অসীম জ্ঞানের রাজ্য যা আজও বিজ্ঞানী ও জ্ঞানীদের জ্ঞানের খোরাক
যোগায়। সেখানে নানা আবিষ্কার এর মধ্যে রাজবংশ ও উচ্চবিত্ত নাগরিকদের মৃত দেহ
সংরক্ষন করে রাখতে আবিষ্কার করা হয় একটি পদ্ধতি। তাই তারা আবিষ্কার করেছিলো মৃত
দেহ মমি করে সংরক্ষন করার পদ্ধতি। একটা সময় তারা সফল হয়েছিলো মানুষের মৃত দেহ একটি
পদ্ধতিতে সংরক্ষন করে রেখে দিলে তা হাজার হাজার বছরেও কোন প্রকার নষ্ট হবে না যেই
পদ্ধতির নাম দেওয়া হয়েছিলো মমি। এই মমি করে মৃত দেহ রেখে দেওয়ার ঘটনা আবার তখনকার
সময়ে মিশরের আশেপাশের অনেক অঞ্চলের মানুষই জানতো। লোহিত সাগরের দক্ষিন পার্শে
মক্কা শহরে যখন ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব হচ্ছে তখন এই নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত ছিলো।
এমনকি ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মের মূল গ্রন্থ ও তাওরাত এ এই ফেরাউন ও মূসা নবীর
কাহিনী কিছুটা উল্লেখ আছে। গবেষকেরা ধারনা করে থাকেন এই সব ঘটনা ও গল্প থেকে
কোরানে এই ফেরাউন এর মমি সম্পর্কিত ধারনা এসেছে। পাশাপাশি মিশরীয় এক নারীর সন্ধানও
পাওয়া যায় ইসলাম ধর্মে যার কাছ থেকেও এই ফেরাউন এর ধারনা কোরানে আসতে পারে বলে মনে
করা হয়। কারন যখন কোরান এর আবিভার্ব দেখা গেলো সেটা হচ্ছে ইসলামের প্রচারক
মুহাম্মদ এর জন্মের ৪০ বছর পরে ৬১০ খ্রিস্টাব্দে তখন আসলে বর্তমান ইজিপ্ট বা
মিশরের নাম কখনই মিশর ছিলো না।
ইসলাম
ধর্মের প্রচারক নবী মুহাম্মদ এর মক্কা বিজয়ের খবর বিশ্ববাসী জানতেনই না। তাই তিনি
আশেপাশের অনেক রাজ্যে তখন ইসলাম ধর্মের দাওয়াত দিয়ে চিঠি লেখেন বলে কথিত আছে। আর
সেই চিঠি যাদেরকে দেওয়া হয়েছিলো তাদের অনেকেই তা সংরক্ষন করে রেখেছিলেন এবং
পরবর্তীতে তা উদ্ধারও করা হয়েছে। যেই চিঠিতে উল্লেখও পাওয়া যায় এই মিশরের নাম ছিলো
(Qibt) তাছাড়াও নবী মুহাম্মদ এর অনেক স্ত্রীদের মধ্যে
একজন স্ত্রীর নাম ছিলো “মারিয়া আল কিবতিয়া” (Maria al-Qibtiyya) (উইকিপিডিয়া
দেখুন) অর্থ মারিয়া দ্যা ইজিপশিয়ান বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ নবীর স্ত্রী হবার পরও
উনার এই নাম কোন পরিবর্তন হয়নি। এইখানে al-Qibtiyya দ্বারা
উনার জাতীয়তা বোঝানো হচ্ছে। সুতরাং একটা ব্যাপার জানা গেল যে নবী মুহাম্মদ (সাঃ)
এর সময়কালে আরবরা নীল নদের দেশটিকে Qibt নামে চিনত এবং তাদের
অধিবাসীদের কে al-Qibtiyya বলা
হত। আর এই নারীর কাছ থেকে ফেরাউন এর গল্প ও ইহুদীদের তাওরাত গ্রন্থ
থেকে বাছাই করে ফেরাউনের একটি গল্প লেখা হয়েছে। আরো কিছু প্রমান দেখুন সেই চিঠিতে
যে চিঠি নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর দাওয়াত বলা হয়ে থাকে।
নবীর চিঠি দেখুন https://en.wikipedia.org/wiki/Muhammad's_letters_to_the_Heads-of-State এই লিংক এ।
আসলে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে নবীর জন্ম থেকে
৬৩২ খৃস্টাদ নবীর মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের কোন ইতিহাস পরিষ্কার না যেখান থেকে সঠিক
তথ্য পাওয়া সম্ভব। কারন ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের সাথে সাথে তার আগের সকল ইতিহাস এই
ইসলাম ধর্ম গ্রহনকারীরা ধ্বংস করেছিলেন যাতে পরবর্তীতে তা বিতর্কিত না হতে পারে।
এমনকি এই নবীজীর সময়ে লেখা যে খেজুর পাতা, হাড় আর চামড়ায় কোরান এর আয়াত লিখে রাখার
কথা বলা আছে তারও কোন নমুনা আজ পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যায় নাই যেখানে নবীর ব্যবহার
করা পাগড়ী, লাঠি, ছুরি, চাকু, তলোয়ার সহ তার দাত ও চুলের সন্ধানও পাওয়া যায় অনেক
যায়গায়।
এবার দেখুন পবিত্র কোরান এই ফেরাউন
সম্পর্কে কি বলেছেন যা নিয়ে তারা যুক্তিবাদীদের সাথে তর্কে জড়াতে থাকেন অর্থহীন সেই বিশ্বাসের কাছে।
وَجَاوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُودُهُ بَغْيًا وَعَدْوًا حَتَّى إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ قَالَ آمَنْتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ – آلْآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ – فَالْيَوْمَ نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُونَ لِمَنْ خَلْفَكَ آيَة-
(অর্থ), আর আমি বনী ইসরাইলদেরকে সমুদ্র পার করে
দিলাম। অতঃপর ফেরাউন ও তার দলবল বাড়াবাড়ি ও শত্রুতাবশতঃ তাদের পিছু নিল। অতঃপর যখন
সে ডুবতে শুরু করল সে বলল: বনী ইসরাইলগণ যে সত্ত্বার উপর ঈমান এনেছে আমিও সেই
সত্ত্বার উপর ঈমান আনলাম যিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই, আর আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলাম।
এখন(এমন কথা বলছ)! এর আগে তুমি আমার নাফরমানী করেছ এবং তুমি ছিলে ফিতনা ফাসাদ
সৃষ্টি কারীদের অন্তর্ভুক্ত। আজ আমি তোমার দেহকে উদ্ধার করব(বাঁচিয়ে দেব) যেন তুমি
তোমার পরবর্তীদের জন্যে নিদর্শন হয়ে থাক। (সুরা ইউনুস: ৯০-৯২ আয়াত)।
x
x
কিন্তু এই গল্প যে সময়ের বলে দাবী করা হয় সে সময় ইসলাম বলে কোন ধর্মের
নামও কেউ শুনে নাই। এখানে খেয়াল করুন ফেরাউনের কোন নাম কুরআনে উল্লেখ নেই।
কুরআনের ২৭টি সুরায় ৭৪ বার ‘ফেরাউন’ শব্দটি উল্লেখ করা হলেও কোথাও
মুসার পিছু নেয়া ঠিক কোন ফেরাউন পানিতে ডুবে মরেছিল তা কুরআন বলতে পারেনি। কুরআন
লেখকেরা তথা মক্কার লোকজন মিশরের বিখ্যাত রাজা রামেসিসের সম্পর্কে নানা রকম গল্প ও
কিংবদন্তির কথা জানত। আসলে তাদের তখন এই ধারনা ছিলো না যে ফেরাউন কোন একজন
ব্যাক্তির নাম না এটা আসলে তখনকার সময়ে মিশরীয় রাজবংশের সকল রাজাদেরই ফেরাউন বা
ইংরেজি রামেসিস বলা হত যা পরবর্তিতে মিশরীয় চিত্রলিপি হায়ারগ্লিফিক্স পড়ে
পাঠউদ্ধার করা হয়। অপর পক্ষে ইসলাম ধর্মের প্রচারকদের এমন কোন নমুনাই আমরা আজ খুজে
পায় না। এমনকি কোরান নাজিল হবার পরেও কোন ইতিহাস আমাদের কাছে পরিষ্কার না।
কুরআনে ফেরাউনের
লাশ সংগ্রহ করে রাখার কথা অভিনব কোন বিষয় নয়। তখনকার আরবরাও জানত মিশরের পিড়ামিডে
ফেরাউনদের লাশ সংগ্রহিত করে রাখা হয়। কিন্তু হায়ারোগ্লিফিক্স ভাষা অতি সাম্প্রতিককালে
পাঠোদ্ধার হওয়ার আগ পর্যন্ত কোন ফেরাউনের নামই জানা যায়নি। কিন্তু বর্তমানে তা
পানির মতো পরিষ্কার। ইহুদীরাও সেই ১৪০০ বছর আগে মুহাম্মদের সময় তাদের কথিত নবী
মুসার শত্রু ফেরাউনের নাম বলতে পারেনি। তারা শুধু এটাই জানত যে সেই ফেরাউনের লাশ মিশরে
এখনো রক্ষিত আছে। সেই লাশ পঁচেনি গলেনি এতটুকুই। মমিকৃত লাশ যে পঁচে না সেটা
মিশরের বাইরের লোকও জানত। বর্তমানে তা বিভিন্ন দেশের শিশুরাও জানে। সেই একই কথা
কুরআনের সুরা ইউনুসে বলা হয়েছে। সবচেয়ে বড় যে মিথটা ছিল যে মিশরে রক্ষিত ফেরাউনের
লাশটি ৬২ ফুট লম্বা যেটা এখন আর কোন মুসলমানকে বলতে শোনা যায় না। অনেক শিক্ষিত
মুসলমানরা এটাই এখনো বিশ্বাস করে। কিন্তু মিশরের জাদুঘরে রাখা মমিটি মাত্র ৬ ফুটের
কাছাকাছি। এই মমিটি ১৮১৮ সালে মিশরের পিড়ামিডের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়। মোটেই
পানির নিচ থেকে নয়। মমির গায়ে লেখা তথ্য থেকে জানা যায় রাজবংশই তাদের মৃত রাজাকে
অন্যসব রাজাদের মতই তখনকার ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে মমি করে রাখে। মমিটি কখনই সাগর
থেকে উঠানো হয়নি। এটা যারা বলে থাকে তারা হয় মিথ্যা বলে বা তারা আসলেই জানেই না
আসল ঘটনা। এখানে দেখুন রামেসিস ২ সম্পর্কে জানতে https://www.ancient.eu/Ramesses_II/ লিংক।
এখন কথা হচ্ছে
এই রামেসিস বা ফেরাউনের সম্পর্কে তো আমরা অনেক কিছুই জানতে পারি। তার নাম ঠিকানা
বাড়ি ঘরের খোজ খরর কোন কিছুই আমাদের অজানা নাই আজকে। তার নামে মিশরীয় সরকার
পাসপোর্টও বানিয়েছেন যখন গবেষনার জন্য সেই মৃত দেহ ফ্রান্স এ নিয়ে আসা হয়েছিলো।
পক্ষান্তরে কিন্তু এই ফেরাউন যার পেছনে লেগেছিলো বলা হয় সেই ব্যাক্তি মানে “মূসা
নবীর” কোন খোজ খবর নাম ঠিকানা কিছুই নাই আজকের ইতিহাসে। তাই বর্তমানে গবেষকেরা
ধারনা করেন এই নামের কোন ব্যক্তিই আসলে কোন কালে ছিলো না। ফেরাউন বা রামেসিস ২ এর
পরিচয় নিয়ে আমি অনুবাদ করছি তার ইতিহাস এপর্যন্ত যতটুকু জানা যায়। তাই পরে আরেকটা
লেখা দেবো যেখানে রামেসিস সম্পর্কে জানতে পারবেন।
---------- মৃত
কালপুরুষ
২২/১০/২০১৭





কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন