সোফিয়া নামটির সাথে
কমবেশি সবাই পরিচিত হয়ে গিয়েছেন এতোদিনে নিশ্চয়। সম্প্রতি সৌদিআরব এই সোফিয়াকে সেই
দেশের নাগরিকত্ব দিয়ে আরো অনেকের কাছে বেশি পরিচিত হয়েছে এই রোবটিক চরিত্রটি।
সোফিয়াকে নিয়ে বেশ কয়েকজন এর আগেও রিভিউ করেছেন তারপরেও এই রোবট সম্পর্কে যারা
এখনও জানতে পারেননি তাদের উদ্দেশ্য আমি আবার একটা সংক্ষিপ্ত রিভিউ করার চেষ্টা
করলাম। সোফিয়া হচ্ছে হংকং ভিত্তিক রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান “হ্যানসন রোবোটিক্স”
এর তৈরি সম্পুর্ন মানুষের আদলে একটি নারী রোবট। যে দেখতে একেবারেই একজন নারীর মতো
স্বাভাবিক মানুষ। হংকং ভিত্তিক এই রোবোটিক্স প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের
মতো রোবট তৈরি করার চেষ্টা করে আসছিলো। তাদের আবিষ্কৃত বিখ্যাত রোবটের মধ্যে আছে
বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের অনুকরণে তৈরি ছোট আকারের বিনোদনমূলক রোবট, যা বিভিন্ন গণিত এবং বিজ্ঞান বিষয়ক প্রতিযোগিতামূলক
গেম খেলতে পারে, মানুষের বিজ্ঞান
বিষয়ক বিভিন্ন প্রশ্নের দিতে পারে, এমনকি মজার মজার অঙ্গভঙ্গি করে শিশুদেরকে
বিনোদনের মাধ্যমে শিক্ষাও দিতে পারে। তাছাড়াও আরো কয়েকটি চরিত্রের রোবট আছে এই
প্রতিষ্ঠানের।
সোফিয়া হচ্ছে
হ্যানসন রোবটিক্স এর সব চেয়ে বড় বিশ্ময়। আমরা এর আগেও বিশ্বে আরো অনেককেই দেখেছি
মানুষের আদলে রোবট তৈরি করতে। কিন্তু সফিয়া তাদের সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। সোফিয়াকে
তৈরি করা হয়েছে হলিউড অভিনেত্রি “অড্রে হেপবার্ন” এর আদলে। হ্যানসন রোবটিক্স
সোফিয়াকে প্রথম বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন ২০১৫ সালের ১৯শে এপ্রিল। তবে আরো পরে
তাকে সক্রিয় করা হয় যে কারনে সোফিয়া বিভিন্ন সাক্ষাতকারে বলেছেন আমার বয়স দেড়
বছরের কাছাকাছি। সোফিয়ার চামড়া সিলিকনের তৈরি। তার চোখের পেছনে বসানো অত্যাধুনিক
ক্যামেরা ও বিভিন্ন সেন্সরের সাহায্যে সে দেখতে, বুঝতে এবং বিশ্লেষণ করতে পারে। ফেসিয়াল রিকগনিশন
বা চেহারা চেনার ক্ষমতা সম্পন্ন এই রোবটটি মানুষের চেহারা চিনতে পারে এবং মনে
রাখতে পারে। শুধু তাই নয় সোফিয়া তার চেহারাতে শতাধিক অভিব্যাক্তি ফুটিয়ে তুলতে
পারে প্রয়োজন বুঝে। সে কারোর সাথে কথা বলার সময় যখন যেমন প্রয়োজন সেই অনুযায়ী
চেহারাতে হাসি বা গাম্ভির্য তুলে ধরতে পারে। তার চোখের মনির আকার আলো এবং মুখের
অভিব্যক্তির সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। তার গলার স্বরও একেবারেই স্বাভাবিক মানুষের
মতো। সে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে মানুষের সাথে অত্যন্ত সাবলীলভাবে কথা
বলতে পার তবে আস্তে আস্তে আরো অনেক বিষয় এবং পরবর্তিতে সীমাহীন জ্ঞান ও আলোচনাও
করতে পারবে বলে তার উদ্ভাবক “ডেভিড হ্যানসন” জানিয়েছে।
সোফিয়াকে দেখে মনে
হবে এতোদিন চলচ্চিত্র পরিচালকেরা আমাদের যেই আশা দিয়ে আসছিলো আর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহীনি
লেখকেরা আমাদের যেসব গল্প শুনিয়ে আসছিলো তার অবসান হতে যাচ্ছে। আর তা খুব দূরে না
একদম আমাদের কাছাকাছি। আমরা অচিরেই সেই রোবটের দুনিয়ায় প্রবেশ করতে যাচ্ছি।
রাশিয়ার বিজ্ঞানী “দিমিত্রি ইটস্কভ” বোরট ও মানুষের সংমিশ্রনে আমাদের যে অমরত্বের
প্রজেক্টের কথা বলেছিলেন তা একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলেও এই সোফিয়ার
আত্মপ্রকাশে তা আবার সকলের ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এতদিন কল্পনার জগতে সীমাবদ্ধ থাকলেও গত ২৫শে অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে
রোবটদের মানুষের সমান মর্যাদা দেওয়ার ব্যাপারে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়, যখন সৌদি আরব প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে সোফিয়া নামক একটি নারী রোবটকে
নাগরিকত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। তাই মানুষের সেই সায়েন্সফিকশন মুভি আর
গল্প উপন্যাসের মতো বাস্তব জগত আর বেশি দূরে বলা যাবে না। এইতো কয়েক বছর আগেও
মানুষ ভাবতো এমন এক সময় আসবে, যখন রোবটরা দেখতে হবে হুবহু
মানুষের মতো। তারা কথাবার্তাও বলবে মানুষের মতো করে এবং মানুষের বেশ ধারণ করে তারা
মানুষের আশেপাশেই স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করবে আজ তা বাস্তব প্রা্মান হয়ে যাচ্ছে।
ইতিমধ্যেই সোফিয়া
আমাদের মাঝে বেশ কিছু সাড়া জাগিয়েছে। সোফিয়া এ পর্যন্ত বেশ কিছু টিভি চ্যানেলের
সাথে সাক্ষাৎকারও দিয়েছে খুব স্বাভাবিক ভাবেই। সেসব সাক্ষাৎকারে সে বিভিন্ন
প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, সেসব
উত্তরের মধ্যে মজা করতে গিয়ে হাসির মুখভঙ্গিও করেছে যা একেবারেই মানুষের মতো। সে
মানুষের সাথে মজা করে কৌতুক বলেছে। সে এমনকি একটি কনসার্টে গানও গেয়ে শুনিয়েছে। আকর্ষণীয়
চেহারা এবং সাবলীলভাবে কথাবার্তা বলতে পারার কারণে সোফিয়া ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন
করে। এখন পর্যন্ত তার সাক্ষাৎকারের ভিডিওগুলো ইউটিউবে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে আছে।
ফ্যাশন বিষয়ক একটি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদেও তার ছবি স্থান পেয়েছিল। আজ থেকে ৪ দিন আগে
সৌদি আরবে সেদেশের আয়োজন করা ভিশন ২০৩০ উপলক্ষ্যে আয়োজিত ইনভেস্ট ইনিশিয়েটিভ
কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার জন্য সোফিয়া সৌদি আরবে যায় এবং সেখানে তাকে সৌদি আরব নাগরিকত্ব
দেওয়ার ঘোষনা দেয় যা অনেকের কাছে সমালোচিত হয়।
সম্প্রতি সৌদি আরব
ভিশন ২০৩০ কে সামনে রেখে তাদের তেল নির্ভর আর হজ্ব নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে
এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যা
নিঃসন্ধেহে একটি আধুনিক ও সময়পোযোগি সিদ্ধান্ত বলতে হবে সৌদি সরকারের জন্য। কারন
এপর্যন্ত আমরা জানতাম এই সৌদি আরব হচ্ছে গোড়া ধার্মিক আর বর্বর জাতি যারা আধুনিক
সভ্যতার সাথে তাল রেখে চলার যোগ্য নয়। ইসলাম ধর্মের নামে তারা নারীকে সব থেকে ছোট
করে রেখেছিলো এতোকাল। আর তা অন্যান্য স্বল্পশিক্ষিত ও গরীব দেশগুলো অনুসরন করে আসছিলো।
তারা ধর্ম আর জিহাদের নামে মানুষ হত্যা করার জন্য অর্থায়ন করতো বিভিন্ন জিহাদী
সংগঠনে এবং কিছু কিছু গরীব দেশে। তবে সম্প্রতি তারা এটাও সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের
প্রধান প্রধান কিছু ওয়েবসাইট থেকে সকল জিহাদী হাদিস আর জিহাদী আয়াত মুছে ফেলবে।
এককথায় তারা এই সোফিয়াকে হিজাব আর বোরকা ছাড়া সেই দেশে চলার অনুমতি ও নাগরিকত্ব
দিয়ে এটাই প্রমান করছে তারা আসলে ধর্মীও কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। কারন
তেল শেষ হলেই তারা আর পৃথিবীর কোথাও আশ্রয় পাবে না এটা এখন পরিষ্কার হয়েছে তারা।
এর কিছুটা হাওয়া আমাদের বাংলাদেশেও লেগেছে বলতে হবে। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদ
মাধ্যম গুলা প্রকাশ করেছে মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড তাদের সকল বই থেকে জিহাদী হাদিস ও
আয়াত তুলে নিবে এতে করে বাংলাদেশের মাদ্রাসার জিহাদী শিক্ষক গুলার কি হবে সেটা
এখনও জানায় নাই।
আসুন একটু সৌদি আরবের
ভিশন ২০৩০ কে সামনে রেখে তারা কি কি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সে সম্পর্কে কিছু জানি।
সৌদি আরব তাদের তেল নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহ
বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যার ধারাবাহিকতায় গত ২৪শে অক্টোবর সৌদি
যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান
ঘোষণা দেন, সৌদি আরব ২৬,৫০০ বর্গ কিলোমিটারের বিশাল এলাকা জুড়ে ৫০ হাজার
কোটি ডলার ব্যায়ে একটি মেগা সিটি নির্মাণ করবে, যেই শহরটি পরিচালিত হবে সৌর এবং বায়ুশক্তির
মাধ্যমে এবং যেখানে মানুষের চেয়ে রোবটের সংখ্যা থাকবে বেশি। যুবরাজ এই ঘোষণাটি দেন
সৌদি আরবের রিয়াদে চলমান ফিউচার ইনভেস্ট ইনিশিয়েটিভ কনফারেন্সে। তার এই ঘোষণার
একদিন পরে সেই কনফারেন্সে বিভিন্ন প্রদর্শনীর এক পর্যায়ে যখন এই সোফিয়া নামের রোবট
মঞ্চে উঠে এবং তার মানুষের মতোই আচার-আচরণ এবং কথাবার্তা দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে, তখনই ঘোষণা আসে যে, তাকে সৌদি আরবের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও এই নাগরিকত্ব প্রদানের আইনী
ভিত্তি কী হবে এবং রোবটটি কী কী সুবিধা লাভ করবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি, কিন্তু কোনো রোবটকে নাগরিত্বের মর্যাদা দেওয়ার
ঘটনা এটাই প্রথম। তবে প্রবাসী শ্রমিকরা যেখানে
বছরের পর বছর সৌদি আরবে চাকরি করেও নাগরিকত্ব লাভ করতে পারে না, সেখানে একটি রোবটকে নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যাপারটিও সমালোচনার জন্ম
দিয়েছে খুব জোরালোভাবে।
----------
মৃত কালপুরুষ
২৯/১০/২০১৭






কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন