ইতিহাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইতিহাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৮

অভিজিৎ রায়’দের কোনদিন হত্যা করা সম্ভব নয়, তারা এভাবেই বেচেঁ থাকবে।



বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে সোস্যাল মিডিয়ার তূমুল আলোচনা সমালোচনার মধ্যে একটি মন ভালো করে দেবার মতো তথ্য আজ আবারও নতুন করে বাংলাভাষীদের উদ্দেশ্যে বাংলাতে প্রকাশ করলেন নতুন প্রজন্ম এবং মুক্তচিন্তকদের বহুল পঠিত বই “বিবর্তনের পথ ধরে” বইয়ের লেখিকা এবং বাংলাদেশে জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রচার এবং প্রসারে অগ্রনী ভূমিকা রাখা অভিজিৎ রায়ের প্রতিষ্ঠিত “মুক্তমনা”র বর্তমান প্রধান Bonya Ahmed আপু। তিনি বাংলাদেশের এলজিবিটিকিউ আন্দোলনের সাথে যারা আজ জড়িত এবং এই আন্দোলনের জন্য অতীতে বাংলাদেশের একশ্রেনীর মানুষের হাতে নিজেদের জীবন দিতে হয়েছিলো যাদের তাদের জন্য একটি বৃহৎ প্রাপ্তির খবর দিলেন আমাদের।
বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এলজিবিটিকিউ বা (LGBTQ - Lesbian, Gay, Bi-sexual, Transgender, Queer) সম্পর্কে চিরকাল ধরে প্রচলিত থাকা নানা কুসংস্কার এবং তাদের প্রতি ঘৃণার বিপক্ষে কথা বলার বা এই সম্পর্কে সাধারণ মানুষদের সঠিক তথ্য দেবার মতো কেউ ছিলোনা একটা সময়। যে কারণেই প্রকৃতিগতভাবেই যারা মানসিক এবং শারিরিক ভাবে Lesbian, Gay, Bi-sexual, Transgender, Queer এর অধিকারী ছিলেন তাদের কথা চাপা পড়েই থাকতো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে। তাদের প্রতি একপ্রকারের ক্ষোভ, ঘৃণা এবং সর্বপরী কিছু ধর্মীও ও কিছু সামাজিক নেতিবাচক ধ্যান ধারনার কারনে নিজেদের অধিকার আদায়ে ব্যার্থ হওয়া এবং নিজেদের অধিকারের কথা বলার কোন উপাই খুজে পেতো না তারা। এরই মধ্যে এই বিষয়ে তাদের কথা বলা এবং তাদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে দেখেছিলাম প্রথম ২০০১ সালের মে মাসে প্রকৌশলী, লেখক এবং ব্লগার অভিজিৎ রায় এর প্রতিষ্ঠিত “মুক্তমনা” নামক মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী ওয়েবসাই্টটিকে।
মুক্তমনার ওয়েবসাইটে প্রথম তাদের পক্ষে কমবেশি অনেকেই কথা বলা শুরু করেছিলো। এখান থেকেই তাদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক পরে প্রকাশিত হওয়া একটি ম্যাগাজিন এর নাম সবাই জানতে পারলো প্রথম ২০১৪ সালের জানুয়ারী মাসে। অনেকেই হয়তো ধরতে পেরেছেন আমি সেই “রুপবান” ম্যাগাজিনের কথাই বলছি। আমার জানা মতে এখন পর্যন্ত বর্তমানে বাংলাদেশে এই “রুপবান” ম্যাগাজিনই প্রথম এবং একমাত্র ম্যাগাজিন যা Lesbian, Gay, Bi-sexual, Transgender, Queer এর পক্ষে কথা বলে। এই বিষয়টিকে বাংলাদেশের গোড়া ধার্মীক এবং বিজ্ঞান সম্পর্কে যাদের জ্ঞান সীমিত তাদের পক্ষে মেনে নেওয়াটা যে একেবারেই কঠিন কাজ ছিলো সেটা সকলেরই জানা ছিলো। সমস্যাটা ঠিক তখন শুরু হয়নি হয়েছিলো তার আরো পরে যখন এই রুপবান ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং সহ-সম্পাদক দুইজন এলজিবিটি হিউম্যান রাইটস এক্টিভিস্ট কে বাংলাদেশের মৌলবাদীদের টার্গেটে ফেলা হলো।
বাংলাদেশি একজন কমিউনিটি লিডার এবং এলজিবিটি হিউম্যান রাইটস এক্টিভিস্ট জুলহাজ মান্নান এই রুপবান পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা এবং সম্পাদক ছিলেন জিনি প্রথম ২০১৪ সালের জানুয়ারীতে রুপবান নামক ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন। এরপরে ২০১৫ সালে জুলহাস মান্নান এর সাথে তার বন্ধু মাহাবুব রাব্বী তনয় এই রুপবান পত্রিকার প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসাবে যোগ দেন এবং এই এলজিবিটি আন্দোলনের পক্ষে কাজ করা শুরু করেন। কিন্তু তারা দুইজনেই খুব শীঘ্রই বাংলাদেশের মৌলবাদীদের টার্গেটে পরিনত হয় রুপবান নামক ম্যাগাজিন প্রকাশের ফলে। মাত্র ২ বছরের ব্যাবধানে ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে এই দুইজনকে একই সাথে তাদের বাসায় ঢুকে নির্মমভাবে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করে কিছু ধর্মীও উগ্রবাদী অমানুষেরা। তারপরেও থেমে থাকেনি মানুষের অধিকারের পক্ষে রুপবানের কথা বলা এবং এগিয়ে চলা।
সম্প্রতি হঠাৎ বন্যা আপুর এই পোস্ট দেখে সত্যিই খুব ভালো লাগছে যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্যে সাহসিকতার সাথে কাজ করা এবং নিজেদের জীবন দিয়ে যারা তার প্রতিদান দিয়েছেন সেই দুইজন মানুষ এবং তাদের প্রতিষ্ঠিত ম্যাগাজিন রুপবানকে মুল্যায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিকোর একটি প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম ফ্রম রিলিজিয়ন ফাউন্ডেশন (FFRF) এবং মুক্তমনা এটা শুনে। সেই সাথে আরো ভালো লাগছে এটা দেখে যে (FFRF) এবং মুক্তমনা এই বিষয়ক যে বাৎসরিক পদক বা এওয়ার্ড দেবার সীদ্ধান্ত নিয়েছেন যার নামকরণ করা হয়েছে “অভিজিৎ সাহসিকতা পুরস্কার” বা (Avijit Courage Award) নামে সেটা দেখে। বাংলাদেশের মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারীদের আলোর যাত্রী “অভিজিৎ রায়” এভাবেই আমাদের মাঝে থাকবে। যারা একদিন “অভিজিৎ রায়কে” প্রকাশ্যে হত্যা করেছিলো তারা আবারও দেখুক তারা ব্যার্থ, তারা অভিজিৎ রায়কে কখনই হত্যা করতে পারবেনা, অভিজিৎ রায়েরা এভাবেই বেচেঁ থাকবে সকলের মাঝে চিরোকাল। কৃতজ্ঞতা জানাই (FFRF) এবং মুক্তমনা কে। এবং অনেক অনেক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা রইলো রূপবান এর প্রতি।
বন্যা আপুর টাইমলাইনে প্রকাশিত এই বিষয়ক বাংলা লেখাটি এই লিংকে দেখতে পারেন। https://www.facebook.com/bonya.ahmed/posts/2058823654139417
-মৃত কালপুরুষ
০৬/১১/২০১৮

মঙ্গলবার, ২ অক্টোবর, ২০১৮

ঈশ্বর পুত্র “আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট” কি সত্যিই জিউসের পুত্র ছিলো ?


এই চিত্রকর্মটির নাম “এ ম্যান ইন আর্মর” ছবিটি মৃত্যুর ২ হাজার বছর পরে ১৬৫৫ সালে চিত্রকার “র‍্যামব্র্যান্ড ভ্যান রিজন” এর আকাঁ “আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট” এর একটি যুবক বয়সের ছবি। অবশ্য আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট জীবিত ছিলেন মাত্র ৩৩ বছর। ধারনা করা হয় আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট ছিলেন দেবতা জিউস এর সন্তান। এই দাবী আলেকজান্ডার এর শিক্ষক দার্শনিক “এরিস্টটাল” অস্বীকার করে বলেন আলেকজান্ডার এর মাতা অলিম্পিয়াস ছিলেন একজন উচ্চাকাঙ্খী নারী, তিনি আলেকজান্ডারের পিতা ফিলিপ’কে একটি গল্প বলে মানুষকে বোকা বানাবার জন্য এমন তথ্য প্রচার করেছিলেন।

দার্শনিক এরিস্টটাল আলেকজান্ডারের ১৩ বছর বয়সে তার শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পান। দীর্ঘ দুই বছর এরিস্টটাল তাকে বিভিন্ন শিক্ষা দিয়েছিলেন। আলেকজান্ডারের পিতা দ্বিতীয় ফিলিপ তাদের শ্রেনীকক্ষ হিসাবে ‘ম্যাসেডোনিয়া’ রাজ্যের ‘মিয়েজান’ নামক মন্দিরটি দিয়ে দেন। ১৬ বছর বয়সে যখন আলেকজান্ডার দার্শনিক এরিস্টটালের কাছে তার শিক্ষা শেষ করেন তখন পিতা দ্বিতীয় ফিলিপ তাকে রাজপ্রতিনিধি এবং উত্তরাধিকারী হিসাবে নিয়োগ করেন। এরপরে প্রথমেই আলেকজান্ডার বর্তমান তুরুষ্কের আনাতোলিয়া সালতানাত বা বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য আক্রমন করে নিজের দখলে নেন। একে একে আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট খেতাবে ভূষিত হন তার সমস্ত যুদ্ধ জয়ের নানান কৌশলের কারনে। একটা সময় সে রোমান সম্রাজ্য থেকে এশিয়া মহাদেশ এবং তৎকালীন ভারত উপমহাদেশ দখল করে সমস্ত পৃথিবীতে রাজত্ব করার ঘোষনা দেন।

আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট কোন ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন না তবে তার মাতা অলিম্পিয়াস প্রচার করেছিলেন আলেকজান্ডার দেবতা জিউসের পুত্র। অলিম্পিয়াস বলেন সে আলেকজান্ডারের পিতা রাজা দ্বিতীয় ফিলিপকে বিয়ে করার পরেই তার গর্ভে আকাশ থেকে বজ্রপাত হয়। আর এই বজ্রপাতের ফলেই নাকি অলিম্পিয়াস গর্ভবতী হন এবং দেবতা জিউসের সন্তান আলেকজান্ডারের জন্ম দেন। একটি শক্তিশালী রাজা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী একজন রাণীর পুত্র হওয়াতে  আলেকজান্ডারকে অনেকেই দেবতা পুত্র হিসেবেই মানত।

মাত্র ২০ বছর বয়সেই আলেকজান্ডার ম্যাসেডোনেয়ার রাজা হন এবং মাত্র ১৩ বছরের রাজত্বকালেই তিনি যে কৃতিত্ব দেখান তাতে অনেকেই তাকে দেবতাপুত্র বলেই মনে করতে থাকেন। ধর্মভীরু মানুষেরা আলেকজান্ডারের জীবনীর সাথে নাকি দেবতা একিলিসের বংশধর এবং দেবতা জিউসের পুত্রের অনেক মিল খুজে পেয়েছেন যে কারণে পার্শিয়ানদের অনেকেই তাকে দেবতার আসনে বসিয়েছিলো।

ছবিঃ https://www.akg-images.de/Browse/DE_Collections

মৃত কালপুরুষ
-০২/১০/২০১৮

x

শুক্রবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

ভীন গ্রহের প্রানী “ওন্ডজ্বীনা” (wandjina)


অস্ট্রেলিয়ার উওর পশ্চিমাঞ্চলের একেবারে উত্তরে অবস্থিত ৪২৩,৫১৭ বর্গকিমিঃ আয়তনের একটি অঞ্চল হচ্ছে ‘কিমবার্লি’ যা আমাদের বাংলাদেশের দ্বিগুন আয়তনের বলা চলে। এই অঞ্চলটির বিভিন্ন স্থান অনেক আগে থেকেই অনেকের কাছেই একটি রহস্যজনক স্থান হয়ে ছিলো নানা কারণে। সেই সাথে অস্ট্রেলিয়ার কিমবার্লি নামক অঞ্চলটির অনেক স্থানই মানুষের কাছে এখনও রহস্যজনক হয়ে আছে কিছু প্রাকৃতিক কারনেই। এখানে কিছু পাহাড় আছে যার সাথে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের পাহাড়ের কোন মিল পাওয়া যায়না। এটার অন্য কোন কারণ নেই বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে এটা প্রাকৃতিক ভাবেই এরকম আলাদা হয়ে আছে অন্যান্য অঞ্চল থেকে। তবে এই সমস্ত পাহাড় গুলির পাথরের মূল উপাদন সবই এক। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসব পাহাড়ের নাটকীয় প্রকৃতি বিজ্ঞানীদের চিন্তার কারণ হয়ে যায়। আধা শুকনো এসব পাহাড়ের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু গুহা দেখে মনে হবে এগুলো প্রকৃতিক ভাবে সম্ভব নয়।

কিমবার্লি মূলত মরু অঞ্চল বলেই পরিচিত যেখানে মানুষের বসবাস করা খুব কঠিন বলে মনে হয়। এতো বড় একটা স্টেটের লোকসংখ্যার কথা শুনলেও অনেকেই অবাক হবে মাত্র ৫০ হাজারের মতো ২০১১ সালের হিসাবে। এতেই বোঝা যায় অস্ট্রেলিয়ার উওরাঞ্চলের উওরে অবস্থিত এই অঞ্চলটি আসলে মানুষের বসবাসের জন্য নয়। এখানে বেশিরভাগই হচ্ছে বিচ্ছিন্ন কিছু উপকূলভুমি দারা আলাদা আলাদা করা যার সুনির্দিষ্ট কোন বসবাসযোগ্য স্থান নেই বলা চলে। এই বিস্তৃত অঞ্চলের অনেক যায়গায় আছে যা আজো মানুষের পদচারনার বাইরে বলা যায়। এই অঞ্চলে একটি বিশাল এলাকাকে “জর্জ পার্ক” বলা হয়ে থাকে যার আয়োতন প্রায় ৬৬০ বর্গকিমিঃ এর মতো। এই যায়গাটিতে মানুষের বসবাস আছে এবং অনেক গবেষকরা এখানেই গবেষনা করে থাকে। জর্জ ন্যাশনাল পার্ক বলে পরিচিত যায়গাটিতে প্রচুর পরিমানে চুনা পাথর, ও ক্লিফ পাওয়া যায়।  

এই এলাকাতে “এভরিগ্যানিয়ল” নামের একটি জাতি বা গোষ্ঠী আজ থেকে প্রায় ৪০০০ বছর আগে সেখানে বসবাস করতো যাদের একটি ধর্ম ছিলো যার নামও ছিলো “এভরিগ্যানিয়ল”। এই “এভরিগ্যানিয়ল” ধর্মের যে মূল গ্রন্থ ছিলো সেই গ্রন্থে একটি অপ্রচলিত চরিত্রের কথা পাওয়া যায় যা ইসলাম ধর্মের “জ্বীন জাতি” বা এরকম কিছু মনুষ্য সৃষ্ট কল্পিত চরিত্রের মতো একটি চরিত্র বলেই বিজ্ঞানীরা আগে ধারণা করেছিলো। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এই চরিত্রটি নিয়ে নানান গবেষনা করে ধারনা করেছে এই চরিত্রের ধারনা আসলে “এভরিগ্যানিয়ল” জাতি পেয়েছিলো ভীন গ্রহের মানুষের কাছ থেকে যাকে আমরা “এলিয়েন” বলে থাকি। এই এলিয়েনদেরকে এই “এভরিগ্যানিয়ল” জাতিরা “ওন্ডজ্বীনা” নামেই চিনতো। বিভিন্ন আর্কিওলজিস্ট এই এলাকাতে তাদের গবেষনা করতে গিয়ে বিভিন্ন পাহাড়ের গুহাতে প্রায় কয়েক হাজার প্রমাণ পেয়েছে যা এই “ওন্ডজ্বীনা” বা ভীন গ্রহের প্রানী এলিয়েনের অস্ত্বিতের বলে তারা দাবী করে থাকে।

“ওন্ডজ্বীনা” যে ভীন গ্রহের কোন প্রানী ছিলো এবং তারা দেখতে কেমন ছিলো তার অনেক নমূনা গবেষকেরা এই সমস্ত পাহাড়ের গুহা থেকে পেয়েছে যার সবই ৪০০০ থেকে ৩৮০০ বছর আগে “এভরিগ্যানিয়ল” জাতি এসব গুহার ভেতরে একেছিলো যা কার্বন ডেটিং এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছে। পাহাড়ের গুহায় তাদের আঁকা ছবিতে যে চরিত্রটির দেখা পাওয়া যায় তা বর্তমান সময়ের অনেক বিজ্ঞানীদের ধারনা করা বা কল্পিত এলিয়েনের সাথে মিলে যায়। বিজ্ঞানীদের ধারনা “ওন্ডজ্বীনা” সেই সময়ে “এভরিগ্যানিয়ল” জাতিদেরকে বিভিন্ন সময়ে দেখা দিত এবং তাদের কাছাকাছিই থাকতো যার কারনে “এভরিগ্যানিয়ল”রা এই “ওন্ডজ্বীনা”দের খুব স্বচ্ছ গঠনের (শারীরিক গঠন) ছবি আঁকতে পে্রেছিলো। অনেকেই ধারনা করে থাকেন এই “ওন্ডজ্বীনা”দের “এভরিগ্যানিয়ল” জাতিরা দেবতা মনে করতো এবং পূজা করতো তাই এরা এদের ছবি গুহার দেওয়ালে একেছিলো। এতো কিছু থাকতে এই “এভরিগ্যানিয়ল” জাতি কেন এই ধরনের একটি কাল্পনিক চরিত্রের ছবি আঁকতে যাবে সেই প্রশ্নের জবাব খুজতে গিয়ে আজকের বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছে এগুলা কোন কাল্পনিক চরিত্র ছিলোনা এগুলা ছিলো ভীন গ্রহের প্রানী বা এলিয়েন যার অনেক অস্তিত্ব পৃথিবীর মানুষ এর আগেও পেয়েছে।

এলিয়েন বা ভীন গ্রহের প্রানী নিয়ে অতীতে ১৯৬৮ সালে সুইডিশ একজন বিখ্যাত লেখক “এরিক ভন দানিকেন” একটি বই লিখেছিলো যার নাম ছিলো “Chariots of the Gods” যে বইতে দানিকেন দাবী করেছিলো প্রাচীন মিশরের সভ্যতায় এলিয়েন বা ভীন গ্রহের প্রানীর সন্ধান পাওয়া যায়। এমনকি সেই সময়ে মানুষের মধ্যে পিরামিড আর মানব দেহ মমি করে রাখার মতো আরো অনেক ধারনায় তারা পেয়েছিলো এই সমস্ত এলিয়েনদের কাছ থেকে। কিন্তু দানিকেন এই বই লেখার পরে অনেক সমালোচনার শিকার হয় এবং একটা সময় তার দাবী অযৌক্তিক আর অবৈজ্ঞানিক বলে অনেকেই ভুল দাবী করে প্রমান দিতে থাকে। তবে এপর্যন্ত কেউ দাবী করতে পারেনি যে এলিয়েন বা ভীন গ্রহে কোন প্রানীর অস্তিত্ব নেই বা মানুষের মতো বা কিছুটা আলাদা বা এই “ওন্ডজ্বীনা”দের মত কোন প্রানী আমাদের সৌরজগৎ বা সৌরজৎ এর বাইরে আরো বিলিয়ন বিলিয়ন সৌরজগৎতের মধ্যে কোন একটি গ্রহতে এরা নেই সেই দাবী।

---------- মৃত কালপুরুষ
               ৩০/১২/২০১৭        


সোমবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের কিংবদন্তি ক্ষুদিরামের জন্মদিন আজ।


ক্ষুদিরাম বসু ডিসেম্বর ১৮৮৯ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত মেদিনীপুর জেলা শহরের কাছাকাছি কেশপুর থানার অন্তর্গত মোহবনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ত্রৈলকানাথ বসু ছিলেন নাড়াজোল প্রদেশের শহরে আয় এজেন্ট। তার মা লক্ষীপ্রিয় দেবী। তিন কন্যার পর তিনি তার মায়ের চতুর্থ সন্তান। তার দুই পুত্র আগেই মৃত্যুবরণ করেন। অপর পূত্রের মৃত্যুর আশঙ্কায় তিনি তখনকার সমাজের নিয়ম অনুযায়ী তার পুত্রকে তার বড় বোনের কাছে তিন মুঠি খুদের (শস্যের খুদ) বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। খুদের বিনিময়ে ক্রয়কৃত শিশুটির নাম পরবর্তীকালে ক্ষুদিরাম রাখা হয়। ক্ষুদিরাম বসু পরবর্তিতে তার বড় বোনের কাছেই বড় হন। ক্ষুদিরাম বসু (৩রা ডিসেম্বর ১৮৮৯ ১১ আগস্ট ১৯০৮) ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরুর দিকের সর্বকনিষ্ঠ এক বিপ্লবী। ফাঁসি মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর ৮ মাস ৮ দিন।

ক্ষুদিরাম বসু তার প্রাপ্তবয়সে পৌঁছানোর অনেক আগেই একজন ডানপিটে, বাউণ্ডুলে, রোমাঞ্চপ্রিয় হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। ১৯০২-০৩ খ্রিস্টাব্দ কালে যখন বিপ্লবী নেতা শ্রী অরবিন্দ এবং সিস্টার-নিবেদিতা মেদিনীপুর ভ্রমণ করে জনসম্মুখে বক্তব্য রাখেন এবং বিপ্লবী দলগুলোর সাথে গোপন পরিকল্পনা করেন, তখন তরুণ ছাত্র ক্ষুদিরাম বিপ্লবে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত হন। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ক্ষুদিরাম তার বোন অপরূপার স্বামী অম্রিতার সাথে তমলুক শহর থেকে মেদিনীপুরে চলে আসেন। ক্ষুদিরাম বসু তমলুকের হ্যামিল্টন স্কুল এবং মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষালাভ করেন। মেদিনীপুরে তাঁর বিপ্লবী জীবনের অভিষেক। তিনি বিপ্লবীদের একটি নবগঠিত আখড়ায় যোগ দেন। ১৯০২ সালে জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু এবং রাজনারায়ণ বসুর প্রভাবে মেদিনীপুরে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন গড়ে উঠেছিল। সেই সংগঠনের নেতা ছিলেন হেমচন্দ্র দাস কানুনগো এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন হেমচন্দ্র দাসের সহকারী। এটি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্রিটিশবিরোধীদের দ্বারা পরিচালিত হতো। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ক্ষুদিরাম তার গুণাবলীর জন্য সবার চোখে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন। ক্ষুদিরাম সত্যেন্দ্রনাথের সাহায্যে বিপ্লবী দলভুক্ত হয়ে এখানে আশ্রয় পান। ক্ষুদিরাম তাঁরই নির্দেশে "সোনার বাংলা" শীর্ষক বিপ্লবাত্মক ইশতেহার বিলি করে গ্রেপ্তার হন। ১৯০৬ সালে কাঁসাই নদীর বন্যার সময়ে রণপার সাহায্যে ত্রাণকাজ চালান।

ক্ষুদিরাম বসু তার শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বোস এর নিকট হতে এবং শ্রীমদভগবদগীতা পড়ে ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে বিপ্লব করতে অনুপ্রাণিত হন। তিনি বিপ্লবী রাজনৈতিক দল যুগান্তরে যোগ দেন। ১৬ বছর বয়সে ক্ষুদিরাম পুলিশ স্টেশনের কাছে বোমা পুঁতে রাখেন এবং ইংরেজ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করেন। একের পর এক বোমা হামলার দায়ে ৩ বছর পর তাকে আটক করা হয়। ৩০ এপ্রিল ১৯০৮-এ মুজাফফরপুর, বিহারে রাত সাড়ে আটটায় ইওরোপিয়ান ক্লাবের সামনে বোমা ছুড়ে তিনজনকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ক্ষুদিরামের বিচার শুরু হয় ২১ মে ১৯০৮ তারিখে যা আলিপুর বোমা মামলা নামে পরিচিত হয়। বিচারক ছিলেন জনৈক বৃটিশ মি. কর্নডফ এবং দুইজন ভারতীয়, লাথুনিপ্রসাদ ও জানকিপ্রসাদ। রায় শোনার পরে ক্ষুদিরামের মুখে হাসি দেখা যায়। তার বয়স খুব কম ছিল। বিচারক কর্নডফ তাকে প্রশ্ন করেন, তাকে যে ফাসিতে মরতে হবে সেটা সে বুঝেছে কিনা?  ক্ষুদিরাম আবার মুচকে হাসলে বিচারক আবার প্রশ্নটি করেন। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ভোর ছয় টায়। ফাসির মঞ্চ ওঠার সময়ে তিনি হাসিখুশি ছিলেন। ক্ষুদিরামকে নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম কবিতা লিখেছিলেন এবং অনেক গানও তখন রচিত হয়েছিল। যেমন, একবার বিদায় দে মা। তার মৃত্যুর পর বৃটিশদের খুন করার জন্য তরুণরা উদ্বুদ্ধ হয়েছিল।

ক্ষুদিরাম বসু সম্পর্কে হেমচন্দ্র কানুনগো লিখেছেন যে ক্ষুদিরামের সহজ প্রবৃত্তি ছিলো প্রাণনাশের সম্ভাবনাকে তুচ্ছ করে দুঃসাধ্য কাজ করবার।তাঁর স্বভাবে নেশার মতো অত্যন্ত প্রবল ছিলো সৎসাহস। আর তাঁর ছিলো অন্যায় অত্যাচারের তীব্র অনুভূতি। সেই অনুভূতির পরিণতি বক্তৃতায় ছিলো না বৃথা আস্ফালনেও ছিলো না; অসহ্য দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, এমনকি মৃত্যুকে বরণ করে, প্রতিকার অসম্ভব জেনেও শুধু সেই অনুভূতির জ্বালা নিবারণের জন্য, নিজ হাতে অন্যায়ের প্রতিবিধানের উদ্দেশ্যে প্রতিবিধানের চেষ্টা করবার ঐকান্তিক প্রবৃত্তি ও সৎসাহস ক্ষুদিরাম চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

সুত্রঃ উইকিপিডিয়া। ছবিঃ কলুর বলদ।

---------- মৃত কালপুরুষ

               ০৩/১২/২০১৭

শুক্রবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৭

দীপিকা পাডুকোন ও বানসালীর মাথার মুল্য এখন পাঁচ কোটি রুপি।

সম্প্রতি ভারতে “সঞ্জয় লীলা বানসালী” পরিচালিত চলচ্চিত্র “পদ্মাবতী” বানানোর জন্য রাজস্থানের জয়পুর, যোধপুর, উদেয়পুরের রাজপরিবারের এক হিন্দু রাজপুত পরিচালক “সঞ্জয় লীলা বানসালী” ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী “দীপিকা পাডুকোন” এর মাথার দাম ধার্য করেছে ৫ কোটি রুপি। কেউ যদি এদের কাউকে শিরোচ্ছেদ করতে পারে তাহলে তাকে এই ৫ কোটি রুপি দেওয়া হবে। রাজস্থানের রাজ পরিবারের দাবী রানী পদ্মাবতীর যে ইতিহাস সমস্ত ভারতের মানুষ জানে সেই ইতিহাস নাকি এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিকৃত করা হয়েছে। আসলে আমরা এখন পর্যন্ত কেউ জানি না আসলে সঞ্জয় লীলা বানসালী আমাদের পদ্মাবতী চলচ্চিত্রে কি দেখাতে যাচ্ছে, কারন এই ছবি চলতি ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে মুক্তি পাবার কথা থাকলেও এই হিন্দু রাজপুতের আন্দোলনের কারনে শোনা যাচ্ছে আগামী বছর জানুয়ারী মাসের আগে তা মুক্তি পাবে না। রানী পদ্মাবতীর ইতিহাস ও চিতর কেল্লা ট্রাজেডি ইতিহাসে হিন্দু ও মুসলিম জাতির পরিচয় বহন করে থাকে বলে অনেকের ধারনা। হিন্দুরা বর্তমানে এটা ভেবে থাকে তাদের ধর্মের যে একটি বর্বর অধ্যায় ছিলো যা ১৮২৯ সালে ব্রিটিশরা আইন করে বন্ধ করেছিলো সেই সতীদাহ প্রথা এই রানী পদ্মাবতী ও চিতর কেল্লা থেকেই শুরু হয়েছে যদিও তারও হাজার হাজার বছর আগেও হিন্দু ধর্মে এই প্রথার সন্ধান পাওয়া গেছে। আবার অনেকেই মনে করে এই প্রথাটি হিন্দু ধর্মে অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু পরে আবার ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দের দিকে দিল্লির মুসলিম শাসক আলাউদ্দীন খিলজির অত্যাচার ও নারী লোভী মনোভাবের কারনে এই রানী পদ্মাবতী দ্বারা আবার চালু হয়েছিলো। তাই রাজস্থান সহ সমস্ত ভারতবর্ষে ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এই রানী পদ্মাবতী দেবী একটি স্পর্সকাতর চরিত্র হয়ে আছে।
ইতিহাস যাই হোক, এটা নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরি করা হয়েছে তাতে এই রাজাস্থানবাসির স্বাগত জানানো উচিত ছিলো। আর যদি সঞ্জয় লীলা বানসা্লী রানী পদ্মাবতীর ইতিহাস বিকৃত করেই থাকে তাহলে তাকে হুমকি ধামকি না দিয়ে এবং অভিনেত্রীদের মাথা না কাটতে চেয়ে উচিত ছিলো তার বিপক্ষে প্রকৃত সত্য জানিয়ে আরেকটি ছবি বানিয়ে তার জবাব দেওয়া। কিন্তু রাজপুতের এই আচরন আসলে প্রমান করে হিন্দু ধর্মের মধ্যেও মুসলিম জিহাদি মৌলবাদীদের মতো আচরন আছে যা কোন অংশেই কম নয়। মুসলিমরা যেমন তাদের নবী বা ধর্ম নিয়ে কথা বললে মানুষের মাথা কাটতে চায় হিন্দুরাও ঠিক তেমনই করতে চায়। তারাও মুক্তভাবে মত প্রকাশ করতে দিতে চায়না। তাই যদি না হতো তাহলে এই “পদ্মাবতী” চলচ্চিত্রের জের ধরে এই হত্যা হুমকি ও মাথার মুল্য ধার্য না করে সারা ভারতবর্ষের নির্যাতিত হিন্দু জাতিদের জন্য কাজ করতো। বাংলাদেশে যে প্রতিনিয়ত হিন্দুদের ওপরে নির্যাতন হচ্ছে তার বিপক্ষে কথা বলতো এই হিন্দু রাজপুতেরা। অথবা এই “পদ্মাবতী” চলচ্চিত্র বর্জন করে তার জবাব দিতে পারতো, কিন্তু সেটা না করে তারা তাদের ক্ষমতার অপব্যাবহার করছে। বিশাল রাজপুত কিংডম নামে পরিচিত বর্তমান ভারতের রাজস্থানের পুরাটায় এই রাজপুতদের দখলে থাকায় ভারতের মোদী সরকারও মনে হয় এদের কাছে কিছুটা অসহায়। আর যদি তাই হয় তাহলে জনগনের নিরাপত্তা না দিতে পারার কারনে এই সরকারের পদত্যাগ করা উচিত বলে মনে করি।
আসলে যে রানী পদ্মাবতীকে নিয়ে এতো কাহিনী তার ইতিহাস পড়লে যেমন চোখে পানি চলে আসবে ঠিক তেমনই আবার প্রমান করে দেওয়া যাবে এই রানী পদ্মাবতী বলে কেউ ছিলোই না। পদ্মাবতীর অস্তিত্ব নিয়েও অনেক প্রশ্ন আছে ইতিহাসে। তবে মুসলিম শাসক বর্বর আলাউদ্দীন খিলজীর ইতিহাস নিয়ে কোন সমস্যা নেই এখন পর্যন্ত। তবে রানী পদ্মাবতী বর্তমান ভারতবর্ষের একটি মর্মস্পর্শী ইতিহাস যা এখন পর্যন্ত টাটকা হয়ে আছে হিন্দু জাতিদের কাছে। তাইতো তাদের এই নিয়ে এতো অনুভূতি দেখা যাচ্ছে। তবে দুঃখের বিষয় এই রাজপুতেরা সেই ইতিহাস কতটুকু জানে আর সঞ্জয় লীলা বানসালীর মতো পরিচালকেরাইবা কতটুকু জানে। আমি হিন্দু ধর্মের বর্বর প্রথা সতীদাহ নিয়ে একটি লেখাতে এই এই পদ্মাবতি ট্রাজেডির কথা একবার উল্লেখ করেছিলাম। কারন এই ইতিহাসের সাথে সতীদাহ প্রথাটি জড়িত আছে। সেটা অন্য আলোচনা তবে এখানে পদ্মাবতী ট্রাজেডির কিছু ইতিহাস যেমন চিতর কেল্লা, রানী পদ্মাবতী ও আলাউদ্দীন খিলজীর কিছু সংক্ষিপ্ত পরিচয় না দিলে মনে হয় আধুরী থেকে যাবে।
প্রাপ্ত ইতিহাস অনুযায়ী আমরা জানতে পারি মুসলিম শাসক আলাউদ্দিন খিলজি তার আপন চাচা ও খিলজি বংশের প্রতিষ্ঠাতা জালালউদ্দিন খিলজিকে হত্যা করে ১২৯৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসন দখল করেন অর্থের বিনিময়ে । তিনি ১২৯৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন । ইলবেরি তুর্কি আমলে ভারতে দিল্লিতে মুসলিম সুলতানির যে ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, আলাউদ্দিন খিলজির সময় তা পরিপূর্ণ রূপ গ্রহন করেছিল । উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে সাম্রাজ্য স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে শাসনতান্ত্রিক সংস্কার চালু করে নিজ কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করতে তিনি সচেষ্ট হয়েছিলেন এই শাসক । এই দিক দিয়ে বিচার করলে তাঁকে সুলতানি আমলের শ্রেষ্ঠ সম্রাট বলা যেতে পারে । তবে প্রকৃত এই আলাউদ্দীন খিলজি ছিলো একজন মাতাল ও লম্পট টাইপের মানুষ। তার বাইসেক্সুয়ালিটি অভ্যাস ছিলো। তার বৈধ স্ত্রীর সংখ্যা ছিলো শতাধিক। তা বাদেও তার হারেমে প্রায় ৭ হাজার এর মতো নারী, শিশু ও বালক ছিলো। এই আলাউদ্দীন খিলজির তারপরেও এমন অভ্যাস ছিলো যে, যদি কোন যায়গায় কোন সুন্দরী রমনীর কথা শুনতো বা সন্ধান পেতো তাহলে তাকে নিজের বশে না আনা পর্যন্ত সে ক্ষান্ত হতো না এবং এর জন্য সে যেকোন কিছু করতে রাজি থাকতো। খিলজি রাজবংশ ছিল তুর্কি বংশোদ্ভুত মুসলিম রাজবংশ যারা পরবর্তিতে তুর্কিতে ইসলামের দোহায় দিয়ে প্রায় ১৫ লক্ষ আর্মেনীয়কে হত্যা করেছিলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১২৯০ থেকে ১৩২০ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এই রাজবংশ দক্ষিণ এশিয়ার বিরাট অংশ শাসন করে। জালালউদ্দিন ফিরোজ খিলজি এই রাজবংশের পত্তন করেন। এটি দিল্লি সালতানাত শাসনকারী দ্বিতীয় রাজবংশ। আলাউদ্দিন খিলজির সময় খিলজিরা সফলভাবে মোঙ্গল আক্রমণ ঠেকাতে সক্ষম হয়।
তার শাসনামলে দিল্লি থেকে সব থেকে কাছের রাজ্য বর্তমান রাজস্থানের চিতরের রাজা ছিলেন হিন্দু রতন সিং। আর এই রতন সিং এর স্ত্রী ছিলেন রানী পদ্মাবতী। রানী পদ্মাবতী এতই সুন্দরী ছিলেন যে আশেপাশের দশ রাজ্যে তার নাম মানুষ জানতো বলে প্রচার ছিলো। তবে অনেক ইতিহাসবিদের মতে খিলজির শাসনামলে রানী পদ্মাবতী ছিলো না। সে যাই হোক, রানী পদ্মাবতীর রুপ আর সৌন্দর্যের কথা এই আলাউদ্দীন খিলজি যে কোন ভাবে জানতে পারে। কিভাবে জানতে পারে তা নিয়েও অনেক ইতিহাস আছে তা আর এখানে তুলছি না। আলাউদ্দীন খিলজী রানী পদ্মাবতীর রুপের কথা শুনে পাগল হয়ে যায়। শোনা মাত্র সে তার বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে রাজস্থানের চিতর আক্রমনের উদ্দেশ্য ১৩০৩ সালের ২৮ জানুয়ারী বেরিয়ে পড়ে। যখন সে চিতরের কেল্লার কাছে আসে তখন দেখতে পায় চিতর কেল্লার নিরাপত্তা খুবই মুজবুত যা ভেঙ্গে ভেতরে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব। তাই সে মতলব আটে এবং রাজা রতন সিং এর কাছে তার দুত পাঠায় এই বলে যে, সে রানী পদ্মাবতীকে তার বোনের মতো জানে তাই তাকে একবার দেখে সে আবার দিল্লি চলে যাবে। তার কোন প্রকারের যুদ্ধ করার ইচ্ছা নেই। এই শুনে রানী পদ্মাবতী তার প্রজাদের দিকে তাকিয়ে লম্পট আলাউদ্দীন খিলজিকে দেখা দেবেন বলে রাজি হন। তবে শর্ত থাকে সে আয়নাতে তার চেহারা দেখতে পারবেন। এই আয়নাটি নিয়েও অনেক ইতিহাস আছে কারন এই ঘটনা যখন ঘটেছিলো তখন আমরা আয়না বলে যাকে জানি তা আসলে ছিলো না। তবে সোনা, রুপা, তামা, পিতল বা কাসার তৈরি আয়নার চল ছিলো তখন। অনেকের মতে এই আয়না আলাউদ্দীন খিলজি দিল্লি থেকেই নিয়ে এসেছিলো।
আলাউদ্দীনের আয়না সাথে নিয়ে আসার কারন ছিলো। সে জানতো যে হিন্দু রাজপরিবারের রাজরানীদের কোন বাইরের পুরুষের সামনে যাওয়ার চল তখন ছিলোনা। যখন আলাউদ্দীন রানী পদ্মাবতীকে আয়নায় দেখতে পান তখন তার মাথা আরো খারাপ হয়ে যায়। সে পদ্মাবতী সম্পর্কে যা শুনেছিলেন আর ভেবেছিলেন তার থেকেও অনেকগুন বেশি সুন্দরী ছিলো এই রানী পদ্মাবতী। সাথে সাথে তার মত পাল্টে ফেলেন লম্পট আলাউদ্দীন খিলজি এবং সুযোগ খুজতে থাকেন কিভাবে রানী পদ্মাবতীকে তার দখলে নিবেন। তার বিদায়ের সময়ে সৌজন্য রক্ষা করতে রাজা রতন সিং আলাউদ্দীনকে কে কিছুদূর এগিয়ে দেবার জন্য কেল্লার বাইরে আসেন। এই সুযোগ হাতছাড়া করেননি লম্পট আলাউদ্দীন খিলজি। রাজা রতন সিং কে বন্দি করে রাখেন কেল্লার বাইরে। আর খবর পাঠান রানী পদ্মাবতীর কাছে, যদি সে স্বইচ্ছায় তার কাছে চলে যায় তাহলে সে রাজা রতন সিং কে জীবিত ছেড়ে দেবে এবং কোন ক্ষতি না করে আবার দিল্লি ফিরে যাবে। এই কথা শুনে রানী পদ্মাবতী রাজী হয়ে আলাউদ্দীনকে জানায় যেহেতু সে রানী তাই একা যাবে না তার ৭০০ দাস দাসী তার সাথে যাবে সেবা করার জন্য। এতেও লম্পট আলাউদ্দীন খিলজি রাজী হয়ে যান। রানী পদ্মাবতী ৭০০ পালকিতে করে তার বাছাই করা সৈন্য বাহিনী পাঠান। এবং তারা কৌশলে রাজা রতন সিং কে উদ্ধার করে আবার চিতর কেল্লাতে নিয়ে আসেন।
এতে করে আলাউদ্দীন ক্ষিপ্ত হয়ে চিতর দখল করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু চিতরের কেল্লা এমন ভাবে তৈরি করা ছিল যা ভেদ করে ভেতরে যাওয়ার কোন উপায় খুজে না পেয়ে চারদিক থেকে অবরোধ করে রাখেন। তার পরিকল্পনা মতো অল্প কিছুদিনের মধ্যেই কেল্লার ভেতরে খাবারের সংকট দেখা দেয়। তখন রাজা রতন সিং বাধ্য হয়ে আলাউদ্দীন খিলজির বিশাল বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং মারা যান। এরপরেও সে কেল্লার ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। এরকম অবস্থায় রানী পদ্মাবতী সহ সকল নারীরা তাদের সতীত্ব রক্ষা করার জন্য জীবন্ত আগুনে পুড়ে আত্তহননের সীদ্ধান্ত নেন। কেল্লার ভেতরে তৈরী করা বিশাল চিতার আগুনে রানী পদ্মাবতী তার সতীত্ব রক্ষা করার জন্য হিন্দু ধর্মের সতীদাহ প্রথা অনুযায়ী নিজেকে পুড়িয়ে ফেলেন। সেই সাথে তাকে অনুসরন করে সমস্ত রাজবধু ও দাসীরা প্রায় ছয়শো থেকে সাতশো নারী একসাথে আত্তাহুতি দেন। লম্পট আলাউদ্দীন খিলজি যখন কেল্লার ভেতরে প্রবেশ করে তখন দেখতে পায় আগুনের ভেতরে শুধুই হাড়্ গোড় পড়ে আছে। এতে সে ক্ষিপ্ত হয়ে সমস্ত রাজপুত সৈন্যদের হত্যা করে এবং চিতর দখলে নেয়।
এটা ছিলো রানী পদ্মাবতী ও চিতর কেল্লার রাজপুতদের ট্রাজেডির একটি সংক্ষিপ্ত ধারনা। আসলে রানী পদ্মাবতীর ইতিহাস যে বিস্তর ভাবে ভারতবর্ষে ছড়িয়ে আছে আর কথিত আছে তা নিয়ে লিখলে ঘন্টার পর ঘন্টা লেখা যাবে তারপরও শেষ হবে না এই ইতিহাস। আমি এখানে লেখাটা সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে অনেক গুরুত্বপুর্ণ বিষয় বাদ দিয়েছে যা এই ঘটনার সাথে সুক্ষভাবে জড়িত। এই ইতিহাসকে যদি বিশ্বের দরবারে তুলে ধরে ভারতের কোন পরিচালক তা নিয়ে চলচ্চিত্র বানিয়ে থাকে তাহলে রাজস্থানের রয়েল ফ্যামিলির উচিত হবে তাদেরকে অভিবাদন জানানো তাদের মাথা কাটতে চাওয়া না। অভিনেত্রী “দীপিকা পাডুকোন” এর আগেও “রাম লীলা” ছবি করে হুমকির শিকার হয়েছিলেন। রাজস্থানের ইতিহাসের বড় অংশ জুড়ে থাকা সম্রাট আকবরের ইতিহাস নিয়ে “যোধা আকবর” চলচ্চিত্র করতে গিয়েও পরিচালক “আসুতোষ” এই রাজপুতদের বাধায় পড়ে তাদের মনগোড়া কিছু ইতিহাস ঢুকিয়েছিলেন সেই চলচ্চিত্রে। কিন্তু একই কাজ আবার এরা “সঞ্জয় লীলা বানসালি”র সাথে করতে না পেরে এখন হয়তো ক্ষিপ্ত হয়ে এই ছবি মুক্তি না দেওয়ার জন্য আন্দোলন করছেন এবং তার ও দীপিকার মাথার দাম তুলে দিয়েছেন তাদের হত্যা করার জন্য। এখন আমাদের ভেবে দেখতে হবে সেই মধ্যযুগে আলাউদ্দীন যা করেছিলো তার সাথে এই বর্তমান যুগের রাজপুতদের পার্থক্য কি থাকলো। তবে বাকি থাকলো “পদ্মাবতী” চলচ্চিত্র দেখা, দেখার পরে না হয় আরেকটা রিভিউ লেখা যাবে।

---------- মৃত কালপুরুষ
১৮/১১/২০১৭

শুক্রবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৭

শহীদ নূর হোসেন দিবস আজ।


নূর হোসেন (১৯৬১ - ১০ নভেম্বর ১৯৮৭) বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সবচেয়ে স্মরণীয় নাম। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগঠিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন। নূর হোসেনের পৈতৃক বাড়ি পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার ঝাটিবুনিয়া গ্রামে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর তার পরিবার স্থান পরিবর্তন করে ঢাকার৭৯/১ বনগ্রাম রোডে আসে। পিতা মুজিবুর রহমান ছিলেন পেশায় অটো-রিকশা চালক। তাঁর মায়ের নাম মরিয়ম বিবি। অথর্নৈতিক অসচ্ছলতার কারণে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর নূর হোসেন পড়াশোনা বন্ধ করে মোটর চালক হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। নূর হোসেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের বনগ্রাম শাখার প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।
১৯৮৭ সালের ১০ই নভেম্বর দেশের দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একত্র হয়ে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের লক্ষ্যে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা করে। এরপূর্বে এরশাদ ১৯৮২ সালে একটি সেনা উত্থানের মধ্যদিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং ১৯৮৭ সালের নির্বাচনে জয়্লাভ করেন, কিন্তু বিরোধী দলগুলো তার এই নির্বাচনকে জালিয়াতি বলে অভিযুক্ত করে। তাদের একমাত্র দাবী ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিয়ন্ত্রনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা। অবরোধ কর্মসূচীর অংশ হিসেবে ঢাকায় একটি মিছিলে নূর হোসেন অংশ নেন এবং প্রতিবাদ হিসেবে বুকে পিঠে সাদা রঙে লিখিয়ে নেন “স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক” । মিছিলটি ঢাকা জিপিও-র সামনে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি আসলে স্বৈরশাসকের মদদপুষ্ট পুলিশবাহিনীর গুলিতে নূর হোসেনসহ মোট তিনজন আন্দোলনকারী নিহত হন, এসময় বহু আন্দোলনকারী আহত হন। নিহত অপর দুই ব্যক্তি হলেন যুবলীগ নেতা নুরুল হূদা বাবুল এবং আমিনুল হূদা টিটু।
এই হত্যাকান্ডের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ বিরোধী দলগুলো ১১ ও ১২ই নভেম্বর সারা দেশে সকাল সন্ধ্যা হরতাল ঘোষনা করে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন, ফলে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন আরোও ত্বরান্বিত হয়। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে গণতন্ত্র পুণ-প্রতিষ্ঠিত হয়। এরশাদ পদত্যাগ করলে বাংলাদেশে দুটি হ্যাঁ-না ভোটের মধ্য দিয়ে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, এতে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এর এক বছর পর সরকারের পক্ষ থেকে নূর হোসেন এর মৃত্যুর দিনটি সরকারীভাবে উদযাপনে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। দিনটিকে প্রথমে ঐতিহাসিক ১০ই নভেম্বর দিবস হিসেবে ঘোষনা করা হলেও আওয়ামী লীগ এটিকে শহীদ নূর হোসেন দিবস করার জন্য সমর্থন প্রদান করে এবং এই নামটি এখন পর্যন্ত বহাল রয়েছে।পদত্যাগের পর এরশাদের জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সাথে একত্রে মহাজোট গঠন করে। ১৯৯৬ সালে এরশাদ, নূর হোসেনের মৃত্যুর জন্য জাতীয় সংসদে অফিসিয়াল ভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে। তার দল জাতীয় পার্টি এখন ১০ই নভেম্বরকে গণতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করে।
২০১২ সালে এরশাদ অভিযোগ করেন বিরোধী দলগুলো নূর হোসেনকে তার সরকার বিরধী একটি প্রতীকে রুপান্তরিত করেছে। তিনি বলেন, "আপনারা (বিরোধী দল) আমাকে সরাতে লাশ নিয়ে এসেছিলেন, কারণ আন্দোলনকে চাঙ্গা করতে এটা দরকার ছিল।" প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ই নভেম্বরের স্মৃতিচারন করে বলেন, সেদিন আমরা যখন মিছিল শুরু করছিলাম তখন নূর হোসেন আমার পাশে দাড়িয়ে ছিল। আমি তাকে কাছে ডাকলাম এবং বললাম তার গায়ের এই লেখাগুলোর কারণে তাকে পুলিশ গুলি করবে। তখন সে তার মাথা আমার গাড়ির জানালার কাছে এনে বলল, "আপা আপনি আমাকে দোয়া করুন, আমি গণতন্ত্র রক্ষায় আমার জীবন দিতে প্রস্তুত।" নূর হোসেনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার নামে স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতি বছরের ১০ই নভেম্বর বাংলাদেশে নূর হোসেন দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এছাড়া তিনি যে স্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত হন, তার নামানুসারে সেই জিরো পয়েন্টের নামকরণ করা হয়েছে নূর হোসেন স্কয়ার। ১০ই নভেম্বর তার মৃত্যুর কিছু সময় পূর্বে তোলা তার গায়ে লেখাযুক্ত আন্দোলনরত অবস্থার ছবিটি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সুত্রঃ উইকিপিডিয়া। ছবিঃ অনীশ্বরবাদী।
---------- মৃত কালপুরুষ
              ১০/১১/২০১৭

বৃহস্পতিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৭

বাংলাদেশের হারানো ঐতিহ্য “নৌকা বাইচ”



প্রাপ্ত ইতিহাস অনুযায়ী ধারনা করা হয় মিশরীয়রা পৃথিবীতে সবার আগে নৌকার ব্যাবহার ও আবিষ্কার করলেও খ্রিস্টপুর্বাব্দ ২০০০ এর দিকে প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতাতে নৌকা বাইচের মতো একটি প্রতিযোগীতার উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতার মানুষেরা তাদের ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রীস নদীতে একধরনের নৌকা বাইচের আয়োজন করতো। পরবর্তীতে অবশ্য মিশরীয় সভ্যতাতে তাদের নীল নদে এই নৌকা বাইচের চল শুরু হয়েছিলো। তাই নৌকা বাইচ এর আদি ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে মেসোপটেমীয় ও মিশরীয় সভ্যতার সাথে। প্রাচীন এই প্রতিযোগীতাকে এখনো টিকিয়ে রাখতে অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয় আজো আয়োজন করে এই প্রতিযোগিতার। এবং এটি একটি জনপ্রিয় প্রতিযোগীতা হিসেবেই স্বীকৃত। নৌকা বাইচ ১৯০০ সাল থেকে অলিম্পিক প্রতিযোগাতায় বিশ্বব্যাপী একটি জনপ্রিয় প্রতিযোগীতা। অলিম্পিকে ১৯০০ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মোট ১৩৫ টি ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছে যার মধ্যে ২৬ বার যুক্ত্ররাষ্ট্র, ২৫ বার জার্মানী ও ১৪ বার যুক্ত্ররাজ্য বিজয়ী হয়।


প্রাচীন ভারতবর্ষে নৌকা বাইচ এর প্রচলন হয় ব্রিটিশদের মাধ্যমে। “বাইচ” শব্দটি একটি ফরাসি শব্দ, যার বাংলা অর্থ হচ্ছে প্রতিযোগিতা। নৌকা বাইচ ভারতবর্ষে চালু হবার পর ধীরে ধীরে তা এই জনপদের মানুষের মধ্যে একটি জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে এই অঞ্চলের নদী প্রধান দেশ গুলিতে এই প্রতিযোগিতাকে সেখানকার মানুষেরা আপন করে নিতে থাকে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌকাবাইচ লোকায়ত বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অংশ। তবে কবে এদেশে গণবিনোদন হিসেবে নৌকাবাইচের প্রচলন হযেছির তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। "বাইচ" শব্দটির বুৎপত্তি বিবেচনা করে অনুমিত হয়েছে যে মধ্যযুগের মুসলমান নবাবসুবেদারভূস্বামীরা, যাদের নৌবাহিনী দ্বারা এই প্রতিযোগিতামূলক বিনোদনের সূত্রপাত করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে দুটি জনশ্রুতি আছে। একটি জনশ্রুতি জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রাকে কেন্দ্র করে। জগন্নাথ দেবের স্নান যাত্রার সময় স্নানার্থীদের নিয়ে বহু নৌকার ছড়াছড়ি ও দৌড়াদৌড়ি পড়ে যায়। এতেই মাঝি-মাল্লা-যাত্রীরা প্রতিযোগিতার আনন্দ পায়। এ থেকে কালক্রমে নৌকাবাইচের শুরু। দ্বিতীয় জনশ্রুতি পীরগাজীকে কেন্দ্র করে। আঠার শতকের শুরুর দিকে কোন এক গাজী পীর মেঘনা নদীর এক পাড়ে দাঁড়িয়ে অন্য পাড়ে থাকা তার ভক্তদের কাছে আসার আহ্বান করেন। কিন্তু ঘাটে কোন নৌকা ছিল না। ভক্তরা তার কাছে আসতে একটি ডিঙ্গি নৌকা খুঁজে বের করেন। যখনই নৌকাটি মাঝ নদীতে এলো তখনই নদীতে তোলপাড় আরম্ভ হল। নদী ফুলে ফেঁপে উঠলো। তখন চারপাশের যত নৌকা ছিল তারা খবর পেয়ে ছুটে আসেন। তখন সারি সারি নৌকা একে অন্যের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে। এ থেকেই নৌকা বাইচের গোড়াপত্তন হয়।


নদীমাতৃক এই বাংলাদেশে মুসলিম যুগের নবাব-বাদশাহদের আমলে নৌকা বাইচ বেশ জনপ্রিয় ছিল। অনেকে মনে করেন, নবাব বাদশাহদের নৌ বাহিনী থেকেই নৌকা বাইচের গোড়াপত্তন হয়। পূর্ববঙ্গের ভাটি অঞ্চলের রাজ্য জয় ও রাজ্য রক্ষার অন্যতম কৌশল ছিল নৌ শক্তি। বাংলার বার ভূঁইয়ারা নৌ বলেই মোগলদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। মগ ও হার্মাদ জলদস্যুদের দমনে নৌ শক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখে। এসব রণবহর বা নৌবহরে দীর্ঘাকৃতির ছিপ জাতীয় নৌকা থাকত।


বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় নৌকার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায়। ঢাকা, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ ইত্যাদি এলাকায় বাইচের জন্য ব্যবহৃত হয় সাধারণত কোশা ধরনের নৌকা। এর গঠন সরু এবং এটি লম্বায় ১৫০ ফুট থেকে ২০০ ফুট হয়। এর সামনের ও পিছনের অংশ একেবারে সোজা। এটি দেশিয় শাল, শীল কড়ই, চাম্বুল ইত্যাদি গাছের কাঠ দ্বারা তৈরি করা হয়। টাঙ্গাইল ও পাবনা জেলায় নৌকা বাইচে সরু ও লম্বা দ্রুতগতিসম্পন্ন ছিপ জাতীয় নৌকা ব্যবহৃত হয়। এর গঠনও সাধারণত সরু এবং এটি লম্বায় ১৫০ ফুট থেকে ২০০ ফুট, তবে এর পিছনের দিকটা নদীর পানি থেকে প্রায় ৫ ফুট উঁচু ও সামনের দিকটা পানির সাথে মিলানো থাকে। এর সামনের ও পিছনের মাথায় চুমকির দ্বারা বিভিন্ন রকমের কারুকার্য করা হয়। এটিও শাল, গর্জন, শীল কড়ই, চাম্বুল ইত্যাদি কাঠ দ্বারা তৈরি করা হয়। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আজমিরিগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলে বাইচের জন্য সারেঙ্গি নৌকা ব্যবহার করা হয়। এটি সাধারণত ১৫০ ফুট থেকে ২০০ ফুট লম্বা হয় এবং এর প্রস্থ একটু বেশি (৫ থেকে ৬ ফুট) হয়ে থাকে। এগুলির সামনের ও পিছনের দিকটা হাঁসের মুখের মতো চ্যাপ্টা এবং পানি থেকে ২-৩ ফুট উঁচু থাকে। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী জেলার নিম্নাঞ্চল ও সন্দ্বীপে বাইচের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সাম্পান। এটির গঠন জাহাজের মতো। ঢাকা ও ফরিদপুরে ব্যবহৃত হয় গয়না নৌকা। এগুলির দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০ থেকে ১২৫ ফুট এবং মাঝখানটা ৮-৯ ফুট প্রশস্ত। গয়না নৌকার সামনের দিক পানি থেকে ৩ ফুট উঁচু এবং পিছনের দিক ৪-৫ ফুট উঁচু।


এই লিঙ্ক এর ভিডিওটি ২০১৪ সালে গোপালগঞ্জ, বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের ফুটেজ যা প্রবাসী এক বড় ভাই “জয়ন্ত” ড্রোন দিয়ে ভিডিও করেছিলেন। এই নদীটি গোপালগঞ্জের কালীগঙ্গা নদীর একটি শাখা যা পুর্বে আরো অনেক বড় ছিলো। বর্তমানে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই ধরনের ছোট বড় অনেক আয়োজনে আমরা সরাসরি অংশগ্রহন করতে পারিনা তাই আমাদের অনেকের পক্ষে এমন দৃশ্য দেখা সম্ভব হয়না। সেই সাথে বর্তমান প্রজন্ম এই নৌকা বাইচ প্রতিযোগীতার সাথে খুব একটা পরিচিত না তাই এই ভিডিওটি শেয়ার করা।  

---------- মৃত কালপুরুষ
               ০৯/১১/২০১৭  


মঙ্গলবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৭

ব্যাবিলনের কিংবদন্তী রানী সেমিরাস (সাম্মু-রামত)এর সত্য গল্প।


সভ্যতার শুরু থেকে আমরা অনেক নারীর অবদানের কথা শুনে আসছি ইতিহাসের পাতায়। আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির দার্শনিক হাইপেশিয়াকে আমরা অনেকেই চিনি। তাকে নির্মম ভাবে ধর্মের দোহায় দিয়ে হত্যার কথা আজো আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। প্রায় ১৬০০ বছর আগে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হওয়া সুন্দরি নারী হাইপেশিয়া। শিল্পির তুলিতে হাইপেশিয়ার কাল্পনিক রুপের সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে এখনও অনেকেই। আজ হাইপেশিয়া নয়, আজকে হাইপেশিয়া থেকেও প্রায় ১৩০০ বছর পুর্বের প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার আরেক সুন্দরী নারীর কথা বলবো। যে সেসময় সমস্ত ব্যাবিলনের রাজ্যভার হাতে তুলে নিয়েছিলেন।


আজ থেকে প্রায় ৪ হাজার বছর আগের প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় মহিলা শাসক ছিলেন একজনই যার নাম ছিলো সেমিরাস বা সাম্মু-রামত। তিনি ছিলেন একমাত্র নারী যে শক্তিশালী অশূরীয় সাম্রাজ্য শাসন করেছে, সেমিরাস রোমান যুগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত লেখক এবং চিত্রশিল্পীদেরকে অনেক ভাবিয়েছে তার রুপের কারনে। বর্তমান যুগেও ইতিহাসবীদদের চিন্তার মধ্যমনি হয়ে আছেন এই রানী। এর কারন হচ্ছে সেই সময়ে প্রাচীন মেসোপটেমিয়াতে মহিলা শাসক খুবই বিরিল ছিলো। কিন্তু এই রানী সেসময়ে রাজত্ব করে ইতিহাসে এক বিরাট চিহ্ন রেখে গিয়েছেন। আধুনিক কালের ইরাক , সিরিয়া, তুরস্ক,ইরান সহ আরো কয়েকটা দেশের কিছু কিছু দেশগুলোর অংশ নিয়ে গঠিত ইউফ্রেটিস এবং টাইগ্রীস নদীর অববাহিকা স্থল হল প্রাচীন কালের মেসোপটেমিয়া। যার প্রধান কেন্দ্র ছিলো ব্যাবিলন। আর এই ব্যাবিলনের শুন্যু উদ্দ্যান বা ঝুলন্ত বাগান আজ পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষের কাছে একটি আশ্চর্যের বিষয় হয়ে আছে। আর ইতিহাসবিদদের ধারনা এই ব্যাবিলনের শুন্য উদ্দ্যান এই রানী সেমিরাস অথবা সম্রাট নেবুচাদনেজার এর যে কোন একজন বানিয়েছিলেন। তবে সম্রাট নেবুচাদনেজার বেশি গ্রহন যোগ্য এখন পর্যন্ত। ধারনা করা হয় খৃষ্টপুর্বাব্দ ৯০০ সালের দিকে বর্তমান এশিয়া মাইনর থেকে আজকের সমগ্র ইরান পর্যন্ত পর্যন্ত এই নারী শাসন করেছিলো একসময়।


গ্রীক লেখক এবং ইতিহাসবিদদের মতে রানী সেমিরাস এর রাজত্বকাল খুবই সংক্ষিপ্ত হলেও তিনি এই অল্প সময়ে অনেক অবদান রেখেছিলেন প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়। তার রাজত্ব পাওয়া নিয়ে অনেক ইতিহাস প্রচলিত আছে, তবে এর মধ্যে সব থেকে বেশি গ্রহনযোগ্য ইতিহাস হচ্ছে ফরাসি আলোকিত লেখক ভলতেয়ার এর লেখা কিছু ইতিহাস। পরবর্তিতে ভলতেয়ারের একটি নাটক ১৮২৩ সালে রসিনির অপেরাতে স্থান পায় যার ফলে এই রানী সেমিরাসের সম্পর্কে মানুষ আরো জানতে আগ্রহী হয়। সেমিরাসের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে আরো অনেক কবি ও সাহিত্যিক লিখছেন সেই সময়ে। এর মধ্যে ইটালীর কবি দান্তেকে তাকে নিয়ে লিখে এবং রানী সেমিরিসের কাল্পনিক ছবি একে সাজাপ্রাপ্ত হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে সে “কামুক বিদ্বেষ” মুলক ছবি একেছেন এই শিল্পি। সেই ছবি বর্তমানে বৃটিষ মিউজিয়ামে স্থান পেয়েছে। কবি দান্তেকে সেমিরিসকে কল্পনা করে তার অর্ধ নগ্ন বা নগ্ন ছবি একেছিলেন যা ছিলো অসাধারন একটি শিল্প এবং পরবর্তিতে তার মুল্যায়ন করা হয়েছিলো।


রানী সিমিরিসের রাজ্য পাওয়া নিয়ে বেশি প্রচলিত আছে, সে তার বিশ্বস্ত সেনা প্রধানদের দিয়ে রাজাকে হত্যা করে রাজ্য দখল করেছিলেন এবং তার সন্তান শিশু থাকায় সে রাজ্যের ভার হাতে তুলে নিয়েছিলেন। গ্রীক দার্শনিক হেরোডোটাস এর লেখা থেকে জানা যায় সম্রাট নেবুচাদজার ও চেলদেনাজের রাজত্যের পরে বা এই দুইজনের রাজত্বের মাঝামাঝি সময়ে রানী সেমিরাস রাজত্ব করেন ব্যাবিলনে। কিন্তু দার্শনিক হেরোডোটাস কোথাও ব্যাবিলনের সেই বর্তমানের সপ্তম আশ্চর্য শুন্য উদ্দ্যানের কথা উল্লেখ করে নাই। যা এই তিন জনের ভেতরে কেউ বানিয়েছিলো। এখানে অনেকে ইতিহাসবিদদের মতামত হচ্ছে সেসময়ে দেবতাদের মন্দির গুলা ছিলো অনেক বড় বড় কথিত আছে যে অনেক মন্দিরের চূড়া নাকি চলে গিয়েছে আকাশের ভেতরে যেখানে দেবতারা থাকতেন আর সেই মন্দিরগুলির ধাপে ধাপে করা ছিলো এই বাগান গুলা তাই হেরোডোটাসের লেখাতে তা পাওয়া যায় না। রানী সেমিরিসের সাফল্য শুধু ব্যাবিলনের শুন্য উদ্দ্যানই নয় সমস্ত ব্যাবিলন ও তৎকালীন টাইগ্রীস ও ইউফ্রেতাস নদীর তীরে যে অসাধারন সুন্দর দুটি জমজ নগরী গড়ে উঠেছিলো তা এই রানীর রাজত্বকালেই প্রান ফিরে পেয়েছিলো।


রানী সেমিরাস তার প্রজাদের মধ্যে বিতর্কিত ছিলো কারন অনেকেই তাকে দোষী মনে করতো রাজার মৃত্যর জন্য। আবার অনেকেই তার রুপ আর সৌন্দর্যের কারনে দেবতা সমতুল্য একজন শাসক মনে করতো। রানী সেমিরাস ছিলেন তৎকালীন সিরিজ প্রদেশের কোন উচ্চবংশের একজন সুন্দরী যুবতী নারী। সে সময় সিরিজ প্রদেশে তার রুপের কারনে অসাধারন সুন্দরী এক যুবতী নারী হিসেবে অনেকেই তার কথা জানত। ঠিক সে সময় সিরিজ প্রদেশের রাজ পরিবারের গভর্ণর ছিলেন ওনেস। পরবর্তিতে ওনেস এর পিতা (দত্বক পিতা) তাকে টাইগ্রিস নদীর তীরে নিনেভে নামের রাজ্যের রাজত্ব দেয়। এসময় ওনেস পার্শবর্তি প্রদেশের সুন্দরী এক যুবতী নারীর কথা শোনে যে ছিলো রানী সেমিরিস। ওনেস সেমিরিসকে দেখার পর তার প্রেমে পড়ে যায় এবং তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। ওনেসের দত্বক পিতা তাকে বিয়ের অনুমতি দিলে ওনেস সেমিরিসকে বিয়ে করে এবং নিনেভে নিয়ে আসে। ঠিক এসময় নিনেভের সাথে তার পার্শ্ববর্তী রাজ্য নিনাস এর রাজার যুদ্ধ শুরু হয়। নিনাসের রাজা ছিলেন নীনবিকে। যুদ্ধের সময় এই রাজা নীনবিকে যেকোন ভাবে তার কন্যার বয়সী ওনেসের স্ত্রী এই রানী সেমিরিসকে দেখতে পায় এবং তার প্রেমে পড়ে যায়। এতে করে সে আর যুদ্ধ না করে ওনেসকে প্রস্তাব দেয় সেমিরিসকে তার হাতে তুলে দেবার জন্য এবং বিভিন্ন ভয়ভীতি প্রদান করে। কিন্তু ইতিমধ্যেই সেমিরিস ওনেসকে ভালোবেসে ফেলে তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয় প্রান চলে গেলেও তারা আলাদা হবে না প্রয়োজনে রাজ্য ছেড়ে পালায়ণ করবে।


এসময় রাজা ওনেস বুঝতে পারে তারা আর পালাতে পারবে না আর রাজা নীনবিকে এর বিশাল যুদ্ধবাহিনীকে যুদ্ধে পরাজিত করার ক্ষমতাও তার নেয় তাই নানান চাপে পড়ে সে রানী সেমিরিসকে জীবিত রাখার জন্য নিজে আত্মহত্যা করে। রাজার মৃত্যুর পর নীনবিকে বিনা যুদ্ধেই নিনেভের রাজত্ব ও রানী সেমিরিসের দখল পায়। রাজা নীনবিকে ছিলো রানী সেমিরিসের থেকে বয়সে অনেক বড়। রানী সেমিরিসের মতো বেশ কয়েকটি কন্যা ছিলো এই রাজা নীনবিকের। গ্রীক দার্শনিক ডায়োডর সিকুলাসের মতে রানী সেমিরিস রাজা ওনেসের মৃত্যুর বদলা নিতে রাজা নীনবিকে বিয়ের জন্য রাজী হয় এবং পরবর্তিতে তার বিশ্বাস অর্জন করে তার সৈন্য বাহিনীতে কিছু ক্ষমতা তৈরি করে। নীনবিকে রানী সেমিরিসকে বিয়ে করে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেতাস নদীর দুই পাড়ের সম্রাজ্য শাসন করতে থাকে। এসময় কোন একটি যুদ্ধে রানী সেমিরিস বায়না ধরে রাজা নীনবিকের সাথে যুদ্ধে যাবে। রানী সেমিরিসের আবদার নীনবিকে অগ্রাহ্য করতে না পেরে তাকে যুদ্ধে নিয়ে যাবার জন্য রাজী হয়। ততদিনে সেমিরিস নীনবিকের সৈন্যবাহিনীর মধ্যেকার কয়েকজন সেনা প্রধানের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তলে যাদের সাথে মিলে সেমিরিস রাজা নীনবিকে যুদ্ধের ময়দানে বা কোন এক দখল করা শহরে হত্যার পরিকল্পনা করে বলে অনেকের ধারনা।


যেকোন একটি যুদ্ধে রাজা নীনবিকের মৃত্যু হবার পর তার প্রধান স্ত্রীর মর্যাদা হিসেবে রানী সেমিরিসের পুত্র সিংহাসনে বসার মর্যাদা পায়। কিন্তু তখন সেমিরিসের পুত্র রাজকুমার ছিলো শিশু যার কারনে রাজ্যের সমস্ত দায়ভার রানী সেমিরিসের হাতে চলে আসে। শুরু হয় রানী সেমিরিসের রাজত্ব। প্রাচীন মেসপোটেমিয়ার যত ইতিহাস আছে তার অনেক কিছুই তৈরি হয়েছিলো এই রানী সেমিরিসের সময় যার মধ্যে অন্যতম ছিলো ব্যাবিলনের শুন্য উদ্দ্যান। শুধু তাই নয় রানী সেমিরিস তখন বিজ্ঞানেও অনেক ভুমিকা রেখেছেন প্রাচীন সভ্যতার জন্য। ধারনা করা হয় প্রাচীন গ্রিকে মিশরীয়দের পুর্বে যে ক্যালেন্ডার বা দিনপুঞ্জি ছিল তা সেমিরিসের সময় তৈরি করা হয়েছিলো। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়নের দিকেও সেমিরিসের নজর ছিলো যাতে অনেক অবদান আছে এই রানীর। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার চিকিৎসা বিদ্যার বেশ কিছু সংস্কার করে সে। জ্যোতির্বিদ্যার উন্নয়নেও রানী সেমিরিসের দৃষ্টি ছিলো। প্রাচীন মেসোপটেমিয় সভ্যতায় যত বিখ্যাত বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন তাদের সবাইকে একত্রিত করে সব ধরনের সহোযোগিতা করেন। সেসময় ব্যাবিলনে দুইটি ভাষার প্রচলন ছিলো বলে ধারনা করা হয়। একটি আরশীয়, অন্যটি প্রাচীন পারসীয় বলে পরিচিত। সেমিরাস এই ভাষারও অনেক সংস্কার করেন বলে জানা যায়। এছাড়াও শিল্পকলা, ধর্ম ও অন্যান্য অনেক বিষয়ে এই রানীর অবদানের ইতিহাস প্রচলিত আছে আজো।

সুত্রঃ সিক্রেট কুইন ও রোমান সভ্যতা, আইজ্যাক আসিমভ। ছবিঃ ORONOZ/ALBUM  
    
---------- মৃত কালপুরুষ

               ৩০/১০/২০১৭

রবিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০১৭

সতীদাহ প্রথা কেন হিন্দু ধর্মের প্রথা হবে না ?


সতীদাহ প্রথা একটি জঘন্য, অমানবিক ও বর্বর প্রথা হিসেবে অনেক আগেই স্বীকৃতি পেয়েছে এবং এটা শুধু মাত্র হিন্দু ধর্মের একটি প্রথা বলেই পরিচিত যা হিন্দু ধর্মা্বলম্বীদের কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। তারপরেও আমি জানতাম বর্তমান সময়ের মডারেট হিন্দুদের দেখা যাবে এর অস্বীকার ও প্রতিবাদ করতে সবার আগে চলে আসছেন, যার কারন তাদের এই বিষয়ে সীমিত ধারনা, যার বেশিরভাগ তাদের পরিবার আর মন্দিরের পুরোহিত ও পন্ডিতদের কাছ থেকে পাওয়া। আমি আগেই বলে রাখছি, অন্যন্যা ধর্ম থেকে থেকে হিন্দু ধর্ম যুগে যুগে অনেক সংস্কার হয়েছে এবং হচ্ছে আগামীতে হয়তো এখন যেটুকু যেভাবে টিকে আছে তাও আর থাকবে না। কিন্তু কেউ যদি অস্বীকার করতে চাই তাহলে ভুল করবে যে এটা কোন একসময়ের সেই বর্বর আর অমানবিক ধর্ম ছিলো না। এমন কোন ধর্ম পৃথিবীতে নাই যা মানব সভ্যতার জন্য হুমকি স্বরুপ ছিলোনা। হিন্দু ধর্ম ছিলো তাদের মধ্যে অন্যতম। আজকের এই লেখাটি তাদের জন্য যারা অন্যান্য ধর্মের সমালোচনাতে হাতে তালি দেয় আর সতীদাহ প্রথার মতো একটি জঘন্য ও বর্বর প্রথাকে তাদের ভগবানের আদেশ বলতে অস্বীকার করে এবং বলে বেদ বা হিন্দু শাস্ত্রের সাথে এর কোন মিল নেই তাদের জন্য।


আমি কিছু সুত্র দিচ্ছি যেখানে ঋগবেদ, যজুর্বেদ, পুরান, ও অথর্ববেদের মাধ্যমে ভগবান হিন্দুদেরকে সতীদাহের কথা বলেছেন মিলিয়ে দেখবেন। এখানে দেখুন ঋগবেদ বলছে, “Let these women, whose hasbands are worthy and are living, enter the house with ghee (applied) as collyrium (to their eyes). Let these wives first step into the pyre, tearless without any affliction and well aborned.” এটা লেখা আছে "ঋগবেদের ১৮ নং সূক্তের ৭ নং শ্লোক (১০/১৮/০৭)” আরো দেখুন “আমরা মৃতের বধু হবার জন্য জীবিত নারীকে নীত হতে দেখেছি। (অথর্ববেদ (১৮/৩/১,৩)” আরো দেখুন  “পরাশয় সংহিতায় পাই, “মানুষের শরীরে সাড়ে তিন কোটি লোম থাকে, যে নারী মৃত্যুতেও তার স্বামীকে অনুগমন করে, সে স্বামীর সঙ্গে ৩৩ বছরই স্বর্গবাস করে” (৪;২৮)” আরো দেখুন “দক্ষ সংহিতার ৪;১৮ নং শ্লোকে বলা হয়েছে, “A sati who dies on the funeral pyre of her husband enjoys an eternal bliss in haven.” ( যে সতী নারী স্বামীর মৃত্যুর পর অগ্নিতে প্রবেশ করে সে স্বর্গে পূজা পায়)। এই দক্ষ সংহিতার পরবর্তি শ্লোকে (৫;১০৬) বলা হয়েছে, “যে নারী স্বামীর চিতায় আত্মোৎসর্গ করে সে তার পিতৃকুল, স্বামীকুল উভয়কেই পবিত্র করে”। যেমন করে সাপুড়ে সাপকে তার গর্ত থেকে টেনে বের করে, তেমন করে সতী নারী তার স্বামীকে নরক থেকে বের করে আর সুখে থাকে। ব্রহ্ম পুরান বলে, “যদি স্বামীর প্রবাসে মৃত্যু হয়ে থাকে তবে স্ত্রীর কর্তব্য স্বামীর পাদুকা বুকে ধরে অগ্নিপ্রবেশ করা” এছাড়াও হিন্দু ধর্মের আরো অনেক যায়গাতে এই “সতীদাহ” প্রথার কথা বলা আছে যা কখনই তারা অস্বীকার করতে পারবে না।


এবার আসুন যে প্রচলিত কিছু ইতিহাস আর তৈমুর লং ও তার ছেলে শাহ রুখ মির্জাকে আকড়ে ধরে মডারেট হিন্দুরা লাফালাফি করে আর বলে এই প্রথা চালু হয়েছিলো হিন্দু ধর্মে অন্য কিছু কারনে। আমি তাদের সেই গল্পও বলবো কিন্তু তার আগে আরেকটু জানুন সেই সময়ের মানে তৈমুর লং এর কাহীনি তো এখনও টাটকা বলা যায় যা মাত্র ১৪০০ শতাব্দীর ঘটনা ছিলো, তারও হাজার বছর আগেও মানে ৪০০ খৃষ্টাব্দতে কিন্তু এই সতীদাহ প্রথা হিন্দুরা পালন করেছে তার প্রমান আছে। আবার তাও যদি কেউ মানতে নারাজ হন তাহলে আরো হাজার খানেক বছর আগের কিছু ইতিহাসও কিন্তু আমাদের হাতে আছে যা প্রমান করে হিন্দুদের ভগবানের আদেশেই এই সতীদাহ প্রথা প্রচলিত হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় রীতিতে এটি প্রচলিত ছিলো বলে অনেক অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। গুপ্ত সম্রাজ্যের (খৃষ্টাব্দ ৪০০) আগে থেকেই ভারতবর্ষে সতীদাহ প্রথার প্রচলন ছিল। প্রচীন সতীদাহ প্রথার উদাহারণ পাওয়া যায় অন্তর্লিখিত স্মারক পাথরগুলিতে। সব চেয়ে প্রাচীন স্মারক পাথর পাওয়া যায় মধ্য প্রদেশে,  কিন্তু সব থেকে বড় আকারের সংগ্রহ পাওয়া যায় রাজস্থানে। এই স্মারক পাথরগুলিকে সতী স্মারক পাথর বলা হতো যেগুলো পূজা করার বস্তু ছিল [Shakuntala Rao Shastri, Women in the Sacred Laws – The later law books (1960)]। ডাইয়োডরাস সিকুলাস (Diodorus Siculus) নামক গ্রীক ঐতিহাসিকের খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকের পাঞ্জাব বিষয়ক লেখায়ও সতীদাহ প্রথার বিবরণ পাওয়া যায় [Doniger, Wendy (2009). The Hindus: An Alternative History. Penguin Books. p. 611]। তাছাড়া, আলেক্সান্ডারের সাথে ভারতে বেড়াতে আসা ক্যাসান্ড্রিয়ার ইতিহাসবিদ এরিস্টোবুলুসও সতীদাহ প্রথার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। খৃষ্ট পূর্বাব্দ ৩১৬ সালের দিকে একজন ভারতীয় সেনার মৃত্যুতে তার দুই স্ত্রীই স্বপ্রণোদিত হয়ে সহমরণে যায় [Strabo 15.1.30, 62; Diodorus Siculus 19.33; “Sati Was Started For Preserving Caste” Dr. K. Jamanadas]। এসবই আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এই বর্বর আর অমানবিক প্রথা হিন্দু ধর্মের একক মালিকানা প্রথা ছিলো যা পরবর্তিতে তাদের পিটিয়ে মানুষ করে শেষমেষ আইন করে ব্রিটিষরা বন্ধ করেছিলো।


এই সতীদাহ নিয়ে হিন্দুদের মহাভারতেও লেখা আছে, যেমন মহাভারতের মৌসল পর্বে আমরা দেখতে পায়, মহাত্মা বসুদেবের মৃত্যুর পর তার চার স্ত্রী দেবকী, রোহীনী, ভদ্রা এবং মদিরা তার চিতায় সহমৃতা হয়েছিলেন। আর যেহেতু ঋগবেদের পরবর্তি চারটি সংস্করন তৈরি হবার পুর্বেও আমরা এর প্রচলন দেখতে পায় তাই এই বিষয়ে আর কোন সন্দেহ থাকতে পারে না আর কোন হিন্দু ধর্মাবলম্বী যদি অস্বীকার করে যে এটি আসলে হিন্দু ধর্মের কোন প্রথা না তাহলে আমাকে বলতেই হচ্ছে সে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে মনে হয় আসলেই কম জানে। এই বিষয়টিকে হিন্দু ধর্মের বাইরে দেবার জন্য যুগে যুগে ধর্মব্যবসায়ীরা অনেক চেষ্টা করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। এটা ছিলো তাদের এমন একটি চেষ্টা যেখানে তারা প্রমান করতে চাইছিলেন যে হিন্দু ধর্ম জঘন্য, বর্বর বা অমানবিক ধর্ম না। এই নিয়ে তারা অনেকেই ইতিহাস বিকৃত করেছেন যুগে যুগে। সেই সাথে বানিয়েছেন নানান গল্প কিছুটা “সহমরনের” মতো। তাই আসুন একটি প্রকৃত ইতিহাস জানি যেটাকে জড়িয়ে হিন্দুরা তাদের ধর্মকে একটু বাচাবার চেষ্টা করে থাকেন বা যে সমস্ত কারনে মডারেট হিন্দুদের মথ্যে তালগোল পাকিয়ে যায়।


মুঘলদের সময় যেমন দেখা যায় এই বর্বর প্রথা বন্ধ করার জন্য তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন ঠিক তেমনই দেখা যায় খিলজী বংশের দ্বিতীয় সুলতান আলাউদ্দীন খিলজী অত্যাচারে এরকম কিছু ঘটার নমুনা। আর এসবই বর্তমান মডারেট হিন্দুদের মাথা গুলিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। ১৩০৩ সালে দিল্লীর মসনদ দখল করেন তূর্কি বংশোদ্ভূত খিলজী বংশের দ্বিতীয় সুলতান আলাউদ্দিন খিলজী। ১২৯০ সালে তিনি আপন চাচা এবং শ্বশুর সুলতান জালালুদ্দিন খিলজীকে হত্যা করে এবং রাজন্যদের ঘুষ প্রদান করে হাত করে সিংহাসনে আসীন হন। দক্ষিনের গুজরাট এবং মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের সীমানায় রাজস্থানের মেওয়ার রাজ্যের রাজা তখন রাজপূত বংশের রাওয়াল রতন সিং। আর তাঁর রাণী পদ্মাবতী ছিলেন অতুলনীয় সৌন্দর্যের অধিকারিণী রূপে, গুণে অনন্যা এক রাজবধু। তাঁর রূপ গুণের কাহিনী এতটাই বিস্তৃত হয় যে, তা দিল্লীর সুলতান আলাউদ্দিন খিলজীর কানেও পৌঁছে যায়। ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত লম্পট, মদ্যপ আর ব্যভিচারী ছিলেন এই সুলতান। নিজের সহস্র উপপত্নী থাকা স্বত্বেও মন ভরতোনা তার। যেখানে কোন সুন্দরী রমণীর সন্ধান পেতেন, ছলে বলে কলে কৌশলে তাকে অধিকার না করা পর্যন্ত শান্তি পেতেননা তিনি।


এই রানী পদ্মাবতীর আত্মহত্যাকে হিন্দুরা সতীদাহ বলে প্রচার করতে থাকে। সেটা জানতে হলে একটু গভীরে গিয়ে ইতিহাসটা জানতে হবে। এই রাণীর রূপের বর্ণনা শুনে লম্পট খিলজী নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেননি। বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন মেওয়ারের রাজধানী চিতোর অভিমুখে। ৭ম শতকে চিতোরগড়ের কেল্লা এক দূর্ভেদ্য দূর্গ,  সেটা বাইরে থেকে আক্রমন করে ধ্বংস করা যে সহজ নয় বুঝতে পেরে সুলতান আশ্রয় নিলেন এক কৌশলের। দূত মারফত রতন সিং এর কাছে খবর পাঠালেন। তার দূর্গ দখল কিংবা রাজ্যহরনের কোন মতলব নেই তিনি কেবল রানী পদ্মিনী্কে বোনের মত দেখেন, তাকে এক পলক দেখেই চলে যাবেন। অকারণে নিজের সন্তানতূল্য প্রজাদের রক্তক্ষয় এড়াতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজী হন রতন সিং। তবে রানী শর্ত দিলেন যে রাণী সরাসরি সুলতানকে দেখা দেবেন না, সুলতান আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি দেখবেন।


কিন্তু সেই আয়নার প্রতিচ্ছবি দেখেই আরো উন্মত্ত হয়ে পড়ে লম্পট আলাউদ্দিন খিলজী। শুধু তাই না এর পর সে বিভিন্ন নোংরা কৌশলের আস্রয় নিয়েছিলো কেল্লার বাইরে। ক্রুদ্ধ আলাউদ্দিন এরপর সর্বাত্মক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেল্লার ওপর। কিন্তু দূর্ভেদ্য কেল্লাটির কিছুই করতে না পেরে কৌশল নেন চারপাশ থেকে অবরোধ করে রাখার। সুলতানের কৌশল কাজ দেয় ভালোমতোই। কিছুদিনের মধ্যেই খাদ্যের অভাবে হাহাকার ওঠে চিতোরে। এই অবস্থায় মহিলারা শত্রুর হাতে বেইজ্জত হবার চাইতে আত্মহনন করা শ্রেয় মনে করে বেছে নেন জওহরের বা সতীদাহের পথ ।দূর্গের ভেতর তৈরী এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডে রাজপরিবারের সব মহিলারা রানী পদ্মিনীর নের্তৃত্বে তাদের বিয়ের পোষাক গয়না পরে সেই অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপিয়ে আত্মহুতি দিলেন। সতীহয়েই নিলেন চিরবিদায় স্বেচ্ছায়।


আর স্বজনহারা রাজপূত সৈনিকরা বেছে নিলেন সাকাবা সংশপ্তকপ্রথা (যুদ্ধ করতে করতে জীবন দেয়া), রণসাজে সজ্জিত হয়ে তারা দূর্গ থেকে বের হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন আকারে তাঁদের প্রায় ১০ গুণ বিশাল সুলতানের বাহিনীর উপরে হর হর মহাদেবশংখনিনাদে। বীরের মতো জীবন দিলেন রণক্ষেত্রে। সুলতান বাহিনী কেল্লার ভেতর প্রবেশের পর তখনো জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে মহিলাদের পোড়া হাড়গোড় দেখতে পায়। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে কেল্লায় আশ্রয় নেওয়া ৩০ হাজার রাজপূতকে হত্যা করেন সুলতান। এটা ছিলো রানী পদ্মিনীর সেই আত্মহত্যার ইতিহাস। এই জাতীয় আরো কিছু ইতিহাস আছে যেগুলাকে ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করে হিন্দু পন্ডিত ও পুরোহিতেরা এই বর্বর প্রথাকে একটু শালীন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইতিহাস তারা মুছে ফেলতে পারেন না, যা বারবার প্রমান করে হিন্দু ধর্ম অতীতে ছিলো বর্বর ও অমানবিক একটি ধর্ম।

----------- মৃত কালপুরুষ
                ২৯/১০/২০১৭