সতীদাহ প্রথা একটি
জঘন্য, অমানবিক ও বর্বর প্রথা হিসেবে অনেক আগেই স্বীকৃতি পেয়েছে এবং এটা শুধু
মাত্র হিন্দু ধর্মের একটি প্রথা বলেই পরিচিত যা হিন্দু ধর্মা্বলম্বীদের কেউ
অস্বীকার করতে পারবে না। তারপরেও আমি জানতাম বর্তমান সময়ের মডারেট হিন্দুদের দেখা
যাবে এর অস্বীকার ও প্রতিবাদ করতে সবার আগে চলে আসছেন, যার কারন তাদের এই বিষয়ে
সীমিত ধারনা, যার বেশিরভাগ তাদের পরিবার আর মন্দিরের পুরোহিত ও পন্ডিতদের কাছ থেকে
পাওয়া। আমি আগেই বলে রাখছি, অন্যন্যা ধর্ম থেকে থেকে হিন্দু ধর্ম যুগে যুগে অনেক
সংস্কার হয়েছে এবং হচ্ছে আগামীতে হয়তো এখন যেটুকু যেভাবে টিকে আছে তাও আর থাকবে না।
কিন্তু কেউ যদি অস্বীকার করতে চাই তাহলে ভুল করবে যে এটা কোন একসময়ের সেই বর্বর আর
অমানবিক ধর্ম ছিলো না। এমন কোন ধর্ম পৃথিবীতে নাই যা মানব সভ্যতার জন্য হুমকি
স্বরুপ ছিলোনা। হিন্দু ধর্ম ছিলো তাদের মধ্যে অন্যতম। আজকের এই লেখাটি তাদের জন্য
যারা অন্যান্য ধর্মের সমালোচনাতে হাতে তালি দেয় আর সতীদাহ প্রথার মতো একটি জঘন্য ও
বর্বর প্রথাকে তাদের ভগবানের আদেশ বলতে অস্বীকার করে এবং বলে বেদ বা হিন্দু
শাস্ত্রের সাথে এর কোন মিল নেই তাদের জন্য।

আমি কিছু সুত্র দিচ্ছি
যেখানে ঋগবেদ, যজুর্বেদ, পুরান, ও অথর্ববেদের মাধ্যমে ভগবান হিন্দুদেরকে সতীদাহের
কথা বলেছেন মিলিয়ে দেখবেন। এখানে দেখুন ঋগবেদ বলছে, “Let these women, whose hasbands are
worthy and are living, enter the house with ghee (applied) as collyrium (to
their eyes). Let these wives first step into the pyre, tearless without any
affliction and well aborned.” এটা
লেখা আছে "ঋগবেদের ১৮ নং সূক্তের ৭ নং শ্লোক (১০/১৮/০৭)”
আরো দেখুন “আমরা মৃতের বধু হবার জন্য জীবিত নারীকে নীত হতে দেখেছি। (অথর্ববেদ
(১৮/৩/১,৩)” আরো দেখুন “পরাশয় সংহিতায়
পাই, “মানুষের শরীরে সাড়ে তিন কোটি লোম থাকে, যে নারী মৃত্যুতেও তার স্বামীকে
অনুগমন করে, সে স্বামীর সঙ্গে ৩৩ বছরই স্বর্গবাস করে” (৪;২৮)” আরো দেখুন “দক্ষ
সংহিতার ৪;১৮ নং শ্লোকে বলা হয়েছে, “A sati who dies on the funeral pyre of her husband enjoys an
eternal bliss in haven.” ( যে সতী
নারী স্বামীর মৃত্যুর পর অগ্নিতে প্রবেশ করে সে স্বর্গে পূজা পায়)। এই দক্ষ
সংহিতার পরবর্তি শ্লোকে (৫;১০৬) বলা হয়েছে, “যে নারী স্বামীর চিতায় আত্মোৎসর্গ করে
সে তার পিতৃকুল, স্বামীকুল উভয়কেই পবিত্র করে”। যেমন করে সাপুড়ে সাপকে তার গর্ত
থেকে টেনে বের করে, তেমন করে সতী নারী তার স্বামীকে নরক থেকে বের করে আর সুখে
থাকে। ব্রহ্ম পুরান বলে, “যদি স্বামীর প্রবাসে মৃত্যু হয়ে থাকে তবে স্ত্রীর
কর্তব্য স্বামীর পাদুকা বুকে ধরে অগ্নিপ্রবেশ করা” এছাড়াও হিন্দু ধর্মের আরো অনেক
যায়গাতে এই “সতীদাহ” প্রথার কথা বলা আছে যা কখনই তারা অস্বীকার করতে পারবে না।

এবার আসুন যে
প্রচলিত কিছু ইতিহাস আর তৈমুর লং ও তার ছেলে শাহ রুখ মির্জাকে আকড়ে ধরে মডারেট
হিন্দুরা লাফালাফি করে আর বলে এই প্রথা চালু হয়েছিলো হিন্দু ধর্মে অন্য কিছু কারনে।
আমি তাদের সেই গল্পও বলবো কিন্তু তার আগে আরেকটু জানুন সেই সময়ের মানে তৈমুর লং এর
কাহীনি তো এখনও টাটকা বলা যায় যা মাত্র ১৪০০ শতাব্দীর ঘটনা ছিলো, তারও হাজার বছর
আগেও মানে ৪০০ খৃষ্টাব্দতে কিন্তু এই সতীদাহ প্রথা হিন্দুরা পালন করেছে তার প্রমান
আছে। আবার তাও যদি কেউ মানতে নারাজ হন তাহলে আরো হাজার খানেক বছর আগের কিছু ইতিহাসও
কিন্তু আমাদের হাতে আছে যা প্রমান করে হিন্দুদের ভগবানের আদেশেই এই সতীদাহ প্রথা
প্রচলিত হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় রীতিতে এটি প্রচলিত ছিলো বলে অনেক অনেক প্রমাণ
পাওয়া যায়। গুপ্ত সম্রাজ্যের (খৃষ্টাব্দ ৪০০) আগে থেকেই ভারতবর্ষে সতীদাহ প্রথার
প্রচলন ছিল। প্রচীন সতীদাহ প্রথার উদাহারণ পাওয়া যায় অন্তর্লিখিত স্মারক
পাথরগুলিতে। সব চেয়ে প্রাচীন স্মারক পাথর পাওয়া যায় মধ্য প্রদেশে, কিন্তু
সব থেকে বড় আকারের সংগ্রহ পাওয়া যায় রাজস্থানে। এই স্মারক পাথরগুলিকে সতী স্মারক
পাথর বলা হতো যেগুলো পূজা করার বস্তু ছিল [Shakuntala Rao Shastri, Women in the Sacred Laws – The later
law books (1960)]। ডাইয়োডরাস সিকুলাস
(Diodorus Siculus) নামক গ্রীক ঐতিহাসিকের খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকের
পাঞ্জাব বিষয়ক লেখায়ও সতীদাহ প্রথার বিবরণ পাওয়া যায় [Doniger, Wendy (2009). The Hindus: An
Alternative History. Penguin Books. p. 611]। তাছাড়া, আলেক্সান্ডারের
সাথে ভারতে বেড়াতে আসা ক্যাসান্ড্রিয়ার ইতিহাসবিদ এরিস্টোবুলুসও সতীদাহ প্রথার
বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। খৃষ্ট পূর্বাব্দ ৩১৬ সালের দিকে একজন ভারতীয় সেনার মৃত্যুতে
তার দুই স্ত্রীই স্বপ্রণোদিত হয়ে সহমরণে যায় [Strabo 15.1.30, 62; Diodorus Siculus 19.33; “Sati Was
Started For Preserving Caste” Dr. K. Jamanadas]। এসবই আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এই
বর্বর আর অমানবিক প্রথা হিন্দু ধর্মের একক মালিকানা প্রথা ছিলো যা পরবর্তিতে তাদের
পিটিয়ে মানুষ করে শেষমেষ আইন করে ব্রিটিষরা বন্ধ করেছিলো।

এই সতীদাহ নিয়ে হিন্দুদের
মহাভারতেও লেখা আছে, যেমন মহাভারতের মৌসল পর্বে আমরা দেখতে পায়, মহাত্মা বসুদেবের
মৃত্যুর পর তার চার স্ত্রী দেবকী, রোহীনী, ভদ্রা এবং মদিরা তার চিতায় সহমৃতা
হয়েছিলেন। আর যেহেতু ঋগবেদের পরবর্তি চারটি সংস্করন তৈরি হবার পুর্বেও আমরা এর
প্রচলন দেখতে পায় তাই এই বিষয়ে আর কোন সন্দেহ থাকতে পারে না আর কোন হিন্দু ধর্মাবলম্বী
যদি অস্বীকার করে যে এটি আসলে হিন্দু ধর্মের কোন প্রথা না তাহলে আমাকে বলতেই হচ্ছে
সে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে মনে হয় আসলেই কম জানে। এই বিষয়টিকে হিন্দু ধর্মের বাইরে
দেবার জন্য যুগে যুগে ধর্মব্যবসায়ীরা অনেক চেষ্টা করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। এটা
ছিলো তাদের এমন একটি চেষ্টা যেখানে তারা প্রমান করতে চাইছিলেন যে হিন্দু ধর্ম
জঘন্য, বর্বর বা অমানবিক ধর্ম না। এই নিয়ে তারা অনেকেই ইতিহাস বিকৃত করেছেন যুগে
যুগে। সেই সাথে বানিয়েছেন নানান গল্প কিছুটা “সহমরনের” মতো। তাই আসুন একটি প্রকৃত
ইতিহাস জানি যেটাকে জড়িয়ে হিন্দুরা তাদের ধর্মকে একটু বাচাবার চেষ্টা করে থাকেন বা
যে সমস্ত কারনে মডারেট হিন্দুদের মথ্যে তালগোল পাকিয়ে যায়।

মুঘলদের সময় যেমন
দেখা যায় এই বর্বর প্রথা বন্ধ করার জন্য তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন ঠিক তেমনই
দেখা যায় খিলজী বংশের দ্বিতীয় সুলতান আলাউদ্দীন খিলজী অত্যাচারে এরকম কিছু ঘটার
নমুনা। আর এসবই বর্তমান মডারেট হিন্দুদের মাথা গুলিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। ১৩০৩
সালে দিল্লীর মসনদ দখল করেন তূর্কি বংশোদ্ভূত খিলজী বংশের দ্বিতীয় সুলতান
আলাউদ্দিন খিলজী।
১২৯০ সালে তিনি আপন চাচা এবং শ্বশুর সুলতান
জালালুদ্দিন খিলজীকে হত্যা করে এবং রাজন্যদের ঘুষ প্রদান করে হাত করে সিংহাসনে
আসীন হন। দক্ষিনের গুজরাট এবং মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের সীমানায় রাজস্থানের মেওয়ার
রাজ্যের রাজা তখন রাজপূত বংশের রাওয়াল রতন সিং। আর তাঁর রাণী পদ্মাবতী ছিলেন
অতুলনীয় সৌন্দর্যের অধিকারিণী রূপে, গুণে
অনন্যা এক রাজবধু। তাঁর রূপ গুণের কাহিনী এতটাই বিস্তৃত হয় যে, তা দিল্লীর সুলতান আলাউদ্দিন খিলজীর কানেও পৌঁছে
যায়। ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত লম্পট, মদ্যপ
আর ব্যভিচারী ছিলেন এই সুলতান। নিজের সহস্র উপপত্নী থাকা স্বত্বেও মন ভরতোনা তার।
যেখানে কোন সুন্দরী রমণীর সন্ধান পেতেন, ছলে বলে
কলে কৌশলে তাকে অধিকার না করা পর্যন্ত শান্তি পেতেননা তিনি।

এই রানী পদ্মাবতীর
আত্মহত্যাকে হিন্দুরা সতীদাহ বলে প্রচার করতে থাকে। সেটা জানতে হলে একটু গভীরে
গিয়ে ইতিহাসটা জানতে হবে। এই রাণীর রূপের বর্ণনা শুনে লম্পট খিলজী নিজেকে আর স্থির
রাখতে পারেননি। বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন মেওয়ারের রাজধানী চিতোর
অভিমুখে। ৭ম শতকে চিতোরগড়ের কেল্লা এক দূর্ভেদ্য দূর্গ, সেটা বাইরে থেকে আক্রমন করে ধ্বংস করা যে সহজ নয়
বুঝতে পেরে সুলতান আশ্রয় নিলেন এক কৌশলের। দূত মারফত রতন সিং এর কাছে খবর পাঠালেন।
“তার দূর্গ দখল কিংবা রাজ্যহরনের কোন মতলব নেই তিনি কেবল রানী পদ্মিনী্কে বোনের মত দেখেন, তাকে এক পলক দেখেই চলে যাবেন। অকারণে নিজের
সন্তানতূল্য প্রজাদের রক্তক্ষয় এড়াতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজী হন রতন সিং। তবে রানী
শর্ত দিলেন যে রাণী সরাসরি সুলতানকে দেখা দেবেন না, সুলতান
আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি দেখবেন।

কিন্তু সেই আয়নার
প্রতিচ্ছবি দেখেই আরো উন্মত্ত হয়ে পড়ে লম্পট আলাউদ্দিন খিলজী। শুধু তাই না এর পর সে
বিভিন্ন নোংরা কৌশলের আস্রয় নিয়েছিলো কেল্লার বাইরে। ক্রুদ্ধ আলাউদ্দিন এরপর
সর্বাত্মক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেল্লার ওপর। কিন্তু দূর্ভেদ্য কেল্লাটির কিছুই
করতে না পেরে কৌশল নেন চারপাশ থেকে অবরোধ করে রাখার। সুলতানের কৌশল কাজ দেয়
ভালোমতোই। কিছুদিনের মধ্যেই খাদ্যের অভাবে হাহাকার ওঠে চিতোরে। এই অবস্থায় মহিলারা
শত্রুর হাতে বেইজ্জত হবার চাইতে আত্মহনন করা শ্রেয় মনে করে বেছে নেন জওহরের বা
সতীদাহের পথ ।দূর্গের ভেতর তৈরী এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডে রাজপরিবারের সব মহিলারা রানী
পদ্মিনীর নের্তৃত্বে তাদের বিয়ের পোষাক গয়না পরে সেই অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপিয়ে আত্মহুতি
দিলেন। “সতী” হয়েই
নিলেন চিরবিদায় স্বেচ্ছায়।

আর স্বজনহারা রাজপূত
সৈনিকরা বেছে নিলেন “সাকা” বা “সংশপ্তক” প্রথা
(যুদ্ধ করতে করতে জীবন দেয়া), রণসাজে সজ্জিত হয়ে
তারা দূর্গ থেকে বের হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন আকারে তাঁদের প্রায় ১০ গুণ বিশাল সুলতানের
বাহিনীর উপরে “হর হর মহাদেব” শংখনিনাদে।
বীরের মতো জীবন দিলেন রণক্ষেত্রে। সুলতান বাহিনী কেল্লার ভেতর প্রবেশের পর তখনো
জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে মহিলাদের পোড়া হাড়গোড় দেখতে পায়। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে কেল্লায়
আশ্রয় নেওয়া ৩০ হাজার রাজপূতকে হত্যা করেন সুলতান। এটা ছিলো রানী পদ্মিনীর সেই
আত্মহত্যার ইতিহাস। এই জাতীয় আরো কিছু ইতিহাস আছে যেগুলাকে ঢাল হিসেবে ব্যাবহার
করে হিন্দু পন্ডিত ও পুরোহিতেরা এই বর্বর প্রথাকে একটু শালীন করার চেষ্টা করেন।
কিন্তু ইতিহাস তারা মুছে ফেলতে পারেন না, যা বারবার প্রমান করে হিন্দু ধর্ম অতীতে
ছিলো বর্বর ও অমানবিক একটি ধর্ম।
----------- মৃত
কালপুরুষ
২৯/১০/২০১৭