বিবর্তন নিয়ে কোন লেখা দেখলেই সেখানে দেখি সৃষ্টিবাদীদের জটলা তৈরি
হয়ে যায়। এটা অমূক সৃষ্টি করেছে সেটা তমুক সৃষ্টি করেছে এরকম কথার পাশাপাশি নতুন
কিছু ভ্রান্ত ধারনা ছড়াতে যুগের শিক্ষিত সমাজ সেখানে ছুটে যায়। তাদের জ্ঞানী
জ্ঞানী কথা দেখে আমি মাঝেমাঝে সেই সব লেখার মন্তব্য করার যায়গায় পা রাখতে ভয় পায়।
আগেই আমি বলেছিলাম যে বাংলাদেশের মতো এশিয়ার আরো অনেক তৃতীয় শ্রেনীর দেশগুলির
শিক্ষা ব্যবস্থা ও পাঠ্যবই গুলি থেকে একটি মহল কৌশলে এই বিবর্তনবাদ সম্পর্কে
জানাবোঝার যায়গা কমিয়ে ফেলেছে। এখন স্কুল কলেজ গুলিতে ভূগোল শিক্ষা দেওয়ার নামে হাজার
খানেক খনিজ পদার্থের নাম মুখস্ত করিয়ে মনের ভেতরে জাগ্রত হওয়া প্রশ্ন গুলিকে
ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একটা সময় বিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া শেষ করেও একটি ছেলে বিবর্তনবাদ
বিশ্বাস করতে পারছে না।কারন তার মানুষিকতা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন করেই
তৈরি করে দিয়েছে। প্রায় এই জাতীয় শিক্ষিত সৃষ্টিবাদীদের দেখা যায় তারা বলছে
বিজ্ঞান শুধুই একটি তত্ব। এটা সৃষ্টিবাদীদের করা সব চেয়ে বেশি প্রচারিত একটি
সন্দেহ। আজ এই সন্দেহ নিয়ে কয়েকটি কথা বলবো।
আমরা জানি বিভিন্ন ধর্মীয় মানুষ বিভিন্ন ধরনের সৃষ্টি তত্ত্ব বিশ্বাস
করে থাকে। কারো কারো মতে কেউ একজন সব সৃষ্টি করেছে আবার কারো কারো মতে বহুজন মিলে
সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বিজ্ঞান সবসময় যুক্তি এবং তত্ব দিয়ে প্রমান করতে চাই কিভাবে
সব সৃষ্টি হয়েছে। এই জন্যই বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপুর্ন শাখা হচ্ছে বিবর্তনবাদ।
তবে এপর্যন্ত যত বিজ্ঞানী তার তত্ব প্রকাশ করেছে কেউ বলেনি আমার তত্ব শেষ এর পরে
আর কিছু নেয়। কারন মানুষের জ্ঞান যেখানে গিয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে সেখান থেকে নতুন
প্রজন্মকে বলা হচ্ছে আবার শুরু করো। এভাবেই অনেক তত্ব ভুল প্রমানিত হচ্ছে। কিন্তু
ততক্ষন পর্যন্ত তাকে সঠিক বলা হচ্ছে যতক্ষন না কেউ সেটা ভুল প্রমান করতে পারছে।
এখন সেই হিসাবে অনেক শিক্ষিত সৃষ্টিবাদী প্রায় ভুল করে বলে থাকে যে অমুক এর তত্ব
ভুল প্রমানিত হয়েছে তমুকের তত্ব ভুল প্রমানিত হয়েছে। বিশেষ করে চার্লস রবার্ট
ডারউইন এবং রিচার্ড ডকিন্স এর কথা প্রায় বলতে শোনা যায়। কারন তারাই মানুষের মাঝে
প্রথম বিবর্তনবাদের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছিল। এখন আবার সৃষ্টিবাদীদের কথা বলি,
তারা যে বারবার বলে চার্লস রবার্ট ডারউনের বিবর্তনবাদ ভুল প্রমানিত হয়েছে তার মানে
এই না যে, বিজ্ঞানীরা সব আবার সেই সৃষ্টি তত্ব তে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।
এখন আসুন তত্ব এবং বাস্তবতা সম্পর্কে কিছু কথা বলা যাক। সকল
সৃষ্টিবাদীদের একটাই মন্তব্য হয়ে থাকে সবসময় তা হচ্ছে বিবর্তন শুধুই একটি তত্ব যার
কোন বাস্তবতা নেই। এখন তত্ব ও বাস্তবতার সংজ্ঞা দেখুন।
প্রচলিত অর্থে থিওরি বা তত্ত্ব বলতে আমরা যা বুঝি তা থেকে তত্ত্বের
বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা সম্পূ্র্ণ আলাদা। আমেরিকার জাতীয় বিজ্ঞান পরিষদের মতে, “বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হল প্রাকৃতিক কোনো
একটি ঘটনা বা বাস্তবতার (phenomenon) প্রতিপাদিত ব্যাখ্যা। তত্ত্ব, বাস্তবতা কিংবা প্রকৃতিকে যৌক্তিকভাবে বর্ণনাকরার একটি সমীকরণ ছাড়া কিছুই না।
বিজ্ঞানীরা বাস্তবে ঘটে না, এমন কোনো কিছু নিয়ে কখনও তত্ত্ব প্রদান করেন না। কোন পর্যবেক্ষণ
যখন বারংবার বিভিন্নভাবে প্রমাণিত হয় তখন তাকে আমরা বাস্তবতা বা সত্য (fact) বলে ধরে নেই।আর তত্ত্ব হচ্ছে সেই বাস্তবতাটি কিভাবে ঘটছে তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা।
নিউটনের গাছ থেকে আপেল পড়ার
ব্যাপারটাই ধরি। গাছ থেকে যে আপেল মাটিতে পড়ছে তা বাস্তবতা। আর যে তত্ত্বের
সাহায্যে এই বাস্তবতার ব্যাখ্যা দেয়া হয় তাকে আমরা বলি মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব।
বিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই কথাই প্রযোজ্য। এটি একটি বাস্তবতা যে জীবজগৎ স্থির নয়, তাদের বিবর্তন ঘটছে, এই বাস্তবতাটি বিগত দেড়শ বছর
ধরে হাজারো পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বহুরকমভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আর যে তত্ত্বের মাধ্যমে
এই বাস্তবতাটি ব্যাখ্যা করা হয় তাকে আমরা সাধারণভাবে বলি বিবর্তন তত্ত্ব।
এহাড়াও আরো অনেক তথ্য ও প্রমানের উপরে নির্ভর করে বিবর্তনবাদীরা
তাদের তত্ব দিয়ে থাকে। যেমন লক্ষ লক্ষ বছর আগের পাওয়া কোন ফসিল থেকে ডিএনএ বা
আরএনএ সংগ্রহ করে তার উপরে যুক্তি দাড় করানো হচ্ছে বিবর্তন তত্ব। তাহলে এবার একটু
ভেবে দেখবেন কোন তত্ব টি বেশি শক্তিশালী হচ্ছে। কেউ খুব সহজেই মাটি দিয়ে একটা
রেডিমেট মানুষ বানিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দিলো এইটা, না মানুষের শুধু হাতের ব্যবহার করা
শিখতেই লেগে গেলো কয়েক লক্ষ বছর এইটা। আমরা এই বিবর্তন নিয়ে খুব গভীরে গিয়ে কেন ভাবতে
চাইনা জানেন, কারন আমাদের জীবন খুবই ক্ষনস্থায়ী। যেখানে বিবর্তন হচ্ছে লক্ষ লক্ষ
বছরের ব্যবধানে সেখানে ৫০ থেকে ১০০ বছরের একটা ছোট্ট জীবন নিয়ে কেউ এতো দীর্ঘ
চিন্তায় যেতে চাই না। তাই আমাদের কাছে বিবর্তনের চাইতে কেউ একজন আমাদের বানিয়ে
ছেড়ে দিয়েছে এটাই বেশি গ্রহন যোগ্য হয়। তবে বিবর্তনবাদীদের তত্ব শুধুই একটি তত্ব
এর কোন বাস্তবতা নেই, এটা যারা বলে তাদের আমি বলবো তারা তত্ব বা থিওরির সংজ্ঞাই
জানে না।
বিবর্তনের তত্ব সবসময় পাহাড় সমান সাক্ষ্য প্রমান নিয়েই অগ্রসর হয়ে
থাকে। কিন্তু অপরদিকে সৃষ্টিবাদীদের সাক্ষ্য প্রমানের থলিতে থাকে জিরো। শুধুই
কল্পনা আর অন্ধের মতো বিশ্বাস করা ছাড়া কোন বাস্তবতা তাদের নেই যা একবারও এরা ভেবে
দেখে না বিবর্তন নিয়ে কোন লেখার নিচে মন্তব্য করতে গেলে। আমি নিজেই এই বিষয়ে
একেবারেই অজ্ঞ বলা চলে। অনেক মুক্তমনা ও বিবর্তনবাদীদের লেখার নিছে মন্তব্য করতে
পারিনা কারন মনে হয় সেখানে কথা বলার মতো মাথা আমার নেয় তাই।
প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব নিয়ে ডারউইন একদিকে যেমন
নিঃসংশয় ছিলেন অপরদিকে ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত। কারণ লক্ষ- কোটি প্রজাতির মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট একটি প্রজাতির এই তত্ত্বের বাইরে উদ্ভব হওয়া এই তত্ত্বটি বাতিল করে দিতে যথেষ্ট। দীর্ঘ বিশ বছর বিভিন্ন প্রমাণ সংগ্রহের পর
ডারউইন ১৮৫৯ সালে তত্ত্বটি প্রকাশ করেন। তারপর গত দেড়শ বছর ধরে
বিভিন্নভাবে বিবর্তন তত্ত্বকে নানাভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে, এটি কখনোই ভুল প্রমাণিত হয়নি। বরং যোগ হয়েছে তার নতুন সংযোজন। আর বিবর্তন তত্ব এর আরেকটি বড়
বৈশিষ্ঠ হচ্ছে এই পর্যবেক্ষনের দ্বারা আগাম বা ভবিষৎ কিছু কিছু সম্ভবনা বলা সম্ভব
যা সৃষ্টি তত্ব কখনই বলতে পারে না।
আরেকটি বিষয় আমাদের
মাথায় রাখতে হবে যে, বিবর্তন কিন্তু থেমে থাকে না। রিচার্ড ডকিন্স, আইজ্যাক নিউটন,
এলবার্ট আইনিস্টাইন অথবা চার্লস রবার্ট ডারউইন যেখানে তার তত্ব দিয়ে থেমে গিয়েছিলেন
আজ কিন্তু বিবর্তন সেই একই যাওগায় দাঁড়িয়ে নেই। যদি পরবর্তিতে কেউ আবার নতুন তত্ব
দিতে পারে তবে জেনে রাখবেন আরো সঠিক ব্যাখ্যা সহ প্রমান হাজির করা হয়েছে। এতে এটা
ভেবে সৃষ্টিবাদীদের আনন্দ করার কোন দরকার নেই যে, বিবর্তনবাদ শুধুই একটি ভুল তত্ব
যার কোন বাস্তবতা নেই।
---------- মৃত
কালপুরুষ
২৭/০৯/২০১৭








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন