বিভিন্ন ধর্মের দোহাই দিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে মানব সভ্যতাই যে পশু হত্যা উৎসব পালন করা হয়ে থাকে তা আসলে নতুন কিছু নয়। ৩৫০০ বছর আগের মিশরীয় সভ্যতাই পাওয়া যায় ধর্মীয় উৎসবের নামে পশু হত্যার বর্ননা। চলতি মাসের শুরুতেই ছিলো ইসলাম ধর্মের একটি উৎসব ঈদুল আযহা যা অন্যান্য ধর্মের পশু হত্যা উৎসব গুলি থেকে কোন অংশে ভিন্ন নয়। মুসলিম জাতির ধারনা এই জাতীয় পশু হত্যাকে হত্যা বলা পাপ। এটাকে অনেকেই উৎসর্গ করা বলে থাকেন। তাদের উদ্দেশ্য বা এই হত্যার কারন সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা একজন মানুষের স্বপ্ন দেখার ঘটনা ছাড়া কিছুই বলতে পারে না। অনেকের ধারনা পশু হত্যা করার মাধ্যমে তাদের আত্তার শুদ্ধি হয়ে থাকে। মনের ভেতরে যে খারাপ দিক গুলি থাকে তাকে ধ্বংস করা যায় এভাবে। এ বিষয়ে কোন আলোচনায় যাবো না। আজ মিশরীয় সভ্যতার পশু হত্যা উৎসব নিয়ে কিছু কথা বলবো। দার্শনিক ও ইতিহাসবীদদের ধারনা বর্তমান এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যর বিভিন্ন দেশগুলি যেসমস্ত ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে তাদের এই জাতীয় উৎসবগুলির উৎস এসেছে এই মিশরীয় পশু হত্যা উৎসবগুলি থেকেই।
অনেকের ধারনা মিশরীয় রাজবংশ "ফারাও" ইংরেজি রামেসিস আরবি ফেরাউন বা আদী নাম ফৌরান কোন ব্যক্তির নাম। আমি আগেও এ বিষয়ে লিখেছি অনেকেই তা বিশ্বাস করতে চাননি। কারন তারা সত্য অনুসন্ধান না করেই কোন কিছু একক ভাবে বিশ্বাস করে বসে আছে। আমি তাদের উদ্দেশ্যে একজন মূফতি এবং একটি মাদ্রাসার এক্স প্রিন্সিপ্যাল এর নিকট অনুরোধ করেছি এ বিষয়ে একটি পুর্নাঙ্গ রিভিউ করার। তাকে বর্তমানে আপনারা অনেকেই চিনেন আশা করি। তার রিভিউটি করতে একটু বিলম্ব হচ্ছে কারন আরো অনেক রিভিউ এর অনুরোধ তার কাছে জমা হয়ে আছে।
এই ফারাও বা ফেরাউনদের ১২তম ফারাও, যার নাম ছিলো ফারাও মামোস। এই ফারাও মামোসের রাজত্বকালীন সময়ের একটি পশু হত্যা উৎসব নিয়ে কথা বলছি। ফারাও রাজবংশীয় ২য় ফারাও রামেসিস ২ বা মুসলিম জাতি যাকে ফেরাউন বলে মনে করে তার মৃত্যু হয়েছিলো ৮০ বছর বয়সে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে খৃস্টপূর্বাব্দ ১২২৩ সালে। তার কয়েকশ বছর পরে আর ৮ জন ফারাও এর রাজত্ব শেষে এসেছিলো এই ফারাও মামোস এর রাজত্বকাল। অর্থাৎ সেটা বর্তমান ২০১৭ সাল থেকে ৩০০০ বছর আগের ইতিহাস বলা চলে। এই সময়ে মিশরের সভ্যতা গুলি নীল নদের পাড় ঘেষেই ছিলো। নদীপথই ছিলো মিশরীয়দের প্রধান ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম। জাহাজ বা নৌকার ব্যবহারে মিশরীয়দেরকেই প্রথম দেখা যায়। নীল নদের দুই পাড়েই ছিলো ফারাও মামোস এর রাজত্ব। তখনও যে ধর্মের নামে রাজ্য দখল চলতো না তা না। তখন আরেকজন ভূয়া ফারাও যাকে লাল ফারাও বলা হতো তার রাজত্বের কথাও অনেক যায়গায় উল্লেখ পাওয়া যায়। ফারাও মামোস এর রাজ্যের কিছুদূরে উত্তর দিকেই ছিলো যার রাজ্য। এসময় ফারাও মামোস এর রাজ্যে একটিই ধর্ম পালিত হত। তা প্রাচীন মিশরীয় ধর্ম নামেই পরিচিত ছিলো। এসময় মিশরীয়দের মধ্যে অনেক সৃষ্টিকর্তা বা দেবতাদের সন্ধান পাওয়া যায়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেবতারা হলেন অসিরিস, হোরাস, শ্বেথ, আইসিস সহ আরো অনেকে। এসব দেবতাদের একেজনের একেকটি কাজ এবং একেক দেবতা পৃথিবীর একেকটি অংশ তৈরি করেছেন বলে প্রাচীন মিশরীয়দের ধারনা ছিলো।
ফারাও মামোস এর রাজত্ব ছিলো "আশয়ুন" বর্তমান মিশরের রাজধানী কায়রো থেকে শুরু করে নীল নদের শেষ মাথা কারনাক বা লুক্সর এর কুশদেশ পর্যন্ত। এর মধ্যে আশয়ূন বা বর্তমান কায়রো থেকে কিছুটা উত্তর দিকে গজদ্বীপ নামক একটি স্থানে ছিলো ফারাও রাজাদের রাজপ্রাসাদ। সেখানেই থাকতেন রাজা ফারাও মামোস। কিন্তু মিশরীয় দেবতাদের সংখ্যা অনেক হওয়ায় দেবতাদের উপাসনালয় বা মন্দির গুলা একেকটি একেক অঞ্চলে গড়ে উঠেছিলো। যেমন দেবী আইসিস ও দেবতা অসিরিস এর প্রধান মন্দির ছিলো গজদ্বীপ থেকেও আরো উত্তরে সবুজ শ্যমল সুন্দর নগরী থিবেস এ। এই থিবেসেই আবার ফারাও এর সমাধি করার জন্য নীল নদের পশ্চিম পাড়ে তৈরি হয়েছিলো একটি রাজকীয় পিরামিড। পরে অবশ্য চীনা হিকস জাতির রাজ্য দখলের কারনে সেই পিরামিডে ফারাও মামোসকে সমাধিস্থ করা সম্ভব হয়নি বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। নীল নদের পশ্চিম পাড়ের নগরী যে কারনে মিশরীয়দের আছে মৃতের নগরী নামে পরিচিত ছিলো। আর এই মৃতের নগরীর কারনে থিবেসকে বলা হতো জোড়া নগরী।
১২তম ফারাও রাজা ফারাও মামোস এর রাজত্বকালে প্রতি বছর এই থিবেসে একটি উৎসব এর আয়োজন করা হতো। যার নাম ছিলো অসিরিস এর উৎসব। অর্থাৎ দেবতা অসিরিসের স্বরনে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচী হাতে নেওয়া হতো। অসিরিস এর মন্দিরের পুরোহিতেরা মিশর বাসীদের জন্য পশুর মাংশ খাওয়ার ব্যপারে বিধিনিষেধ আরোপ করে দিত। সারা বছরে মাত্র একবার তারা পশুর মাংশ খেতে পারবে। পশু বলতে তখনকার সময়ে মিশরে হাতী, ঘোড়ার উল্লেখ পাওয়া যায় না। গবাদিপশুর মধ্যে গরু আর মরুভূমিতে প্রাকৃতিক ভাবে গ্যাজেল, একজাতীয় হরিন এর কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে সে সময়ের মিশরের নীল নদে প্রচুর পরিমানে জলহস্তীর কথা বেশ কয়েক স্থানে উল্লেখ আছে। তার মানে প্রাচীন মিশরীয়দের মাংশের তালিকায় প্রিয় ছিলো জলহস্তীর মাংশ। এই জলহস্তীর মাংশ তাদের মধ্যে আচার করে ও লবন দিয়ে দীর্ঘদিন সংরক্ষনের ইতিহাস আছে। ফারাও মামোস এর রাজত্বকাল এর পুর্বে মনে হয় ইচ্ছা খুশি মত জলহস্তী শিকার করে খাওয়ার রীতি ছিলো। কিন্তু নীল নদে জলহস্তীর পরিমান বৃদ্ধির জন্য পরবর্তীতে মনে হয় অসিরিস এর মন্দিরের পুরোহিতেরা নিয়ম বেধে দিয়েছিলো যে বছরে ফারাও এর সৈন্যদল একদিন জলহস্তী শিকার করবে আর তা সমস্ত থিবেসবাসী এবং মিশরবাসী খেতে পারবে। তা বাদে কিন্তু চালাক পুরোহিতের দল তাদের জন্য পুরা বছর জুড়েই জলহস্তী খাওয়ার স্বাধীনতা রেখেছিলো।
দেবতা অসিরিস এর উৎসব ছিলো জলহস্তী হত্যার সেই দিন। অসিরিস এর উৎসবের দিনে থিবেস থেকে মিশরীয় সৈন্য বাহিনীর জাহাজ বহর বের হতো নীল নদের যে স্থানে জলহস্তীরা বাস করতো সেই স্থানের উদ্দেশ্যে। শত শত জাহাজ শুধু জলহস্তী হত্যা করার জন্য জলহস্তী খুজে বেড়াতো নীল নদের পানিতে। এখানেও অবশ্য মন্দিরের পুরোহিতেরা জলহস্তী হত্যার মাত্রা ঠিক করে দিতো যেমন যদি কোন বছর ধারনা করা হতো যে সে বছর নীল নদে ৩০০ জলহস্তী আছে, তবে সর্বোচ্চ ৫০ টি জলহস্তী শিকারে অনুমতি দেওয়া হতো। মিশরীয় সৈন্যবাহিনী তাদের প্রধান অস্ত্র তীর ধনুক, বর্শা আর তলোয়ার এর কোপে নৃশংসভাবে জলহস্তীদের হত্যা করতো। এদের হত্যা চলাকালীন সময়ে নীল নদের পানির রং লাল হয়ে যেতো। যখন হত্যা পর্ব শেষ হয়ে যেতো তখন সেই জলহস্তীর মৃত দেহটি সংগ্রহ করে জাহাজের সাথে বেধে নিয়ে আশা হত থিবেসের তীরে। শত শত জাহাজের পেছনে যখন মিশরীয়রা দেখতে পেতো জলহস্তীর মৃত দেহ বাধা তখন তারা আনন্দে উল্লাস করতো। প্রতিটি জাহাজ তীরে ভেড়ার সাথে সাথে শুরু হয়ে যেত জলহস্তীর মৃত দেহ কাটার উৎসব।
রক্ত মাংশ মাখামাখি করে একেকজন মিশরীয় তাদের জন্য জলহস্তীর মাংস সংগ্রহ করতো নীল নদের পাড় থেকেই। আর নদীর পাড়েই সেই মাংস আগুনে পুড়িয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হতো। শিশু থেকে শুরু করে ছেলে বুড়ো, নারী, পুরুষ সকল মিশরীয় এই রক্তের উৎসবে সমান ভাবেই অংশগ্রহণ করতো। ওইদিনে রাজ্যের কোন মানুষের জন্য মাংস খাওয়াতে কোন বাধা থাকতো না। মাংস যেমন ছিলো সমস্ত মিশরীয়দের অধিকার ঠিক তেমনই ছিলো জলহস্তীর চামড়ার উপরে মিশরীয় সৈন্যবাহিনীর অধিকার যেমন ছিলো জলহস্তীর দাতের উপরে ফারাও এর অধিকার। জলহস্তীর দাত মিশরীয়দের কাছে মুল্যবান ছিলো যা একমাত্র ফারাও এর সম্পদ বলে বিবেচিত হতো। নদীর পাড়েই যেমন রক্ত আর কাদাপানিতে মাংস খাওয়ার ভোজ এর আয়োজন থাকতো, তেমনি প্রাসাদে প্রাসাদে থাকতো অসিরিস এর উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন ভোজ সভা। তিন দিন ব্যাপী চলতো এই পশুহত্যা দিবস। এই সময় সমস্ত থিবেসের রাস্তা ঘাটের বাতাসে থাকতো রক্ত আর মাংসের গন্ধ।
ধারনা করা হয় এভাবেই বছরের যে কোন একটি দিনকে পশু হত্যা করে তার মাংস খাওয়ার রীতি চালু হিয়েছিলো পরবর্তীতে তৈরি হওয়া কিছু ধর্মে। অনেকেই ধারনা করেন খ্রিষ্টান ধর্মের মত পারস্য ও রোমানদের ধর্মের সাথে হুবহু মিলে যায়। তাই খ্রিষ্টান ও ইহুদীরা পারস্য ও রোমানদের মতো বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান ও উৎসব পালন করে। কিন্তু খ্রিষ্টান ও ইহুদী ধর্মের পুরোহিত বা নবী মূসা বা মৌসী মিশরীয় সভ্যতা থেকে কিছু খোদাইকৃত পাথরের ফলক নিয়ে আশার কথা বাইবেলের কয়েক যায়গায় উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই খোদাইকৃত পাথরের ফলক গুলি পরবর্তীতে ঐশী বানী বলেও চালানো হয় এবং তা ইহুদী ও খ্রিষ্টান ধর্ম অনুসারীদের মানতে দেখা যায়। আমার জানানতে সেগুলি এখনো কোন মিউজিয়ামে বা চার্চে সংরক্ষিত আছে। আমার কাছে পরিপূর্ণ তথ্য না থাকায় আর এই বিষয়ে কিছু লেখবো না। তবে এভাবেই মিশরীয় সভ্যতার কিছু আচার অনুষ্ঠান ইহুদী ও খ্রিষ্টান ধর্ম এবং তার পরে খ্রিষ্টান ও ইহুদী ধর্ম থেকে আরো কয়েকটি ধর্মে চলে আসে। যুগে যুগে দেবতা ও সৃষ্টিকর্তাদের উদ্দেশ্যে যে শিশু বলি, নরবলি, সতীদাহ ও উৎসর্গিত প্রানীদের হত্যা করা হচ্ছে তার উৎপত্তি একমাত্র ধর্ম। মানব সভ্যতা গঠনে ভুমিকা রাখতে গিয়ে পৃথিবীর প্রচলিত হাজার হাজার ধর্ম এই জাতীয় বিভিন্ন প্রথার জন্ম দিয়েছিলো যা বর্তমানে কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই না।
---------- মৃত কালপুরুষ
০৮/০৯/২০১৭
০৮/০৯/২০১৭


