বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

সমাজব্যবস্থা ও ধর্মব্যবস্থা ( ধর্মের উৎপত্তি )


সভ্যতার যুগে পা রেখেই মানব জাতি সৃষ্টিশীল হয়ে উঠেছিলো। সভ্যতা গড়তে যেমন মানুষ যুগে যুগে বিজ্ঞান এর ব্যবহার করে এসেছেন, ঠিক তেমনই যুগে যুগে তৈরি করেছেন নানা ধর্ম। তাই মানব সভ্যতা গঠনে যেমন বিজ্ঞানের অবদান আছে তেমনি ধর্মেরও অবদান ছিলো। কিন্তু বর্তমান যুগের এই মারো কাটো টাইপের ধর্মের না। এখন ধর্ম ব্যবস্থা এমন রুপ নিয়েছে, যে ধর্ম বিশ্বাসী মানুষ তার ধর্ম সম্পর্কে পুরাপুরি জ্ঞান রাখুক আর না রাখুক সে এটুকু জানে তার ধর্মই প্রধান ধর্ম, আর এটাকে রক্ষা করতে হবে যে কোন মূল্যে। সে হোক কারো মাথা কেটে, বা এর থেকেও বড় অন্যায়পথ অবলম্বন করে। এটা আসলেই মানুষের প্রকৃত ধর্ম হওয়া উচিৎ না। মানুষ সভ্যতার শুরুতে যে ধর্ম মানব কল্যাণের জন্য বানিয়েছিলো তার কিছু কিছু ধর্মে মানব হত্যা বা অন্য ধর্মের মানুষ হত্যার কথা উল্লেখ থাকলেও মানুষ এখন মানবতাকেই সব ধর্মের উর্ধে রাখতে চাই।


মানব সভ্যতা শুরুর দিকে মানব জাতির জ্ঞান যেমন সব বিষয়ে পরিপূর্ণ ছিলো না। তেমনি ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও তারা ছিলো অজ্ঞ। বর্তমানে আমরাও ভবিষ্যৎ এর ব্যাপারে অজ্ঞভাবেই ভবিষৎ বানী দিয়ে থাকি। আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে অনেক আস্তে আস্তে মানব সভ্যতার জন্ম হয়েছে। যেমন মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য যে ভাষার ব্যবহার করে থাকে সেই ভাষা জ্ঞান ও ভাষা তৈরি হতে কয়েকশো বছর লেগে গিয়েছে। তবে সেটা শিকার যুগ এবং কৃষি যুগ এই দুই যুগের মাঝেই ঘটেছিলো। তারও অনেক অনেক পরে মানুষ দলীয়ভাবে বসবাস করতে শুরু করে। কারন আরেক গোত্র দারা আক্রমনের ভয় ছিলো তখন। যে দল যত শক্তিশালী ছিলো সেই দলের সাথে বসবাস করা ছিলো তত নিরাপদ। এভাবে কয়েকশো বছর পার করে দেবার পর যখন ধীরে ধীরে দলের মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকলো আর তখন মানুষ বুঝতে পারলো যে, কি কি বিষয় তাদের জন্য মঙ্গল আর কি কি অমঙ্গল তা বাছাই করা শিখতে হবে। বর্তমান সমাজে আমরা যাকে ট্যাবু বলে থাকি। এমন কিছু বিষয় বাদ দিয়ে বিভিন্ন গোত্র তৈরি করলো কিছু নিয়ম। আর যখন মানব সভ্যতার মধ্যে এসব নিয়ম মানতে দেখা গেলো তখনই মানুষ আবিষ্কার করলো এই সমাজের। কিন্তু সমাজ বাবস্থার সকল বাধা ধরা নিয়ম দিয়ে যখন এই সমস্ত সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে উঠছিলো, তখন মানুষ কিছু ঐশ্বরিক শক্তির কথা চিন্তা করা শুরু করলো।



এই হলো ধর্ম শুরুর পালা। সমাজ গঠন করে যখন মানুষ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হচ্ছিলো তখন কিছু দার্শনিক, চিন্তাবিদ এই ঐশ্বরিক ভয় ভীতি দেখিয়ে মানুষকে বশে রাখতে চাইছিলো। যা পরবর্তীকালে বিভিন্ন প্রকারের ধর্ম নাম পায়। এই ধর্ম গুলিতে এক জন বা একাধিক জনের প্রধানতা রাখা হতো আর তাদেরকে বলা হত ইশ্বর, দেবতা, স্রষ্টা, ভগবান, আল্লাহ, খোদা ইত্যাদি। এরা কিন্তু সব মানুষেরই সৃষ্টি। তাদের কিছু দূত বা এজেন্ট তৈরি করা হতো মানুষের ভেতরে যারা মুলত এই সৃষ্টি কর্তা ও স্রষ্টাদের কথা মানুষের কাছে প্রকাশ করতো। এই গুলিই হচ্ছে মুলত সমাজ শাসন করার জন্য তৈরি করা নিয়ম ছিলো। যা যুগে যুগে মানুষ মেনে আসছে। ধর্ম সম্পর্কে এপর্যন্ত বিভিন্ন জন যা বলেছেন তা হচ্ছে

জেমস জি. ফ্রেজার বলেন,‘ধর্ম মানুষের চেয়ে উন্নত ধরণের একটি শক্তির বিধান, যে শক্তি মানব জীবন ও প্রকৃতির ধারাকে নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্লেষণ করে।’
টেলার বলেছেন,‘ ধর্ম হচ্ছে প্রেতাত্মায় বিশ্বাস।’
নাস্তিক কার্ল মার্কস বলেন,‘ধর্ম হল আফিম এর মতো।’
ডঃ অভিজিৎ রায় বলছেন,‘ধর্ম একটি ভাইরাস।’
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন,”ধর্ম এমন একটি ভাব, যাহা পশুকে মনুষ্যত্বে ও মানুষকে দেবত্বে উন্নীত করে। ”
মোট কথা হল ধর্ম হল স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস। অন্যভাবে বলা যায় ধর্ম হল স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক। পৃথিবীতে ধর্মের কি ভাবে শুরু কিংবা উৎপত্তি হয়েছিল তার ব্যাখ্যা ও ইতিহাস বিস্তর। তবে ৩ থেকে ৫ লক্ষ বছর আগে মধ্য প্রস্তরযুগে ধর্মীয় আচার আচরনের সাক্ষ্য প্রমান পাওয়া যায়। কিন্তু মানুষ যখন মাত্র ৫০০০ বছর আগে লিখার প্রচলন শুরু করে কেবল তখনই ধর্ম লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে। ৫০০০ বছর পূর্বে ধর্ম সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ভাবে কোন জায়গায় তেমন কিছু বলা হয় নাই বলে আমি যতদূর জানি। আবার কালের আবর্তে অনেক ধর্মের উৎপত্তি,উস্থান,পতন এবং হারিয়েও গেছে।
তবে ধর্মের উৎপত্তি হিসেবে কয়েকটি তত্ত্ব আছে। যেমন-
১। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত মতবাদ
২।মানবীয় বিচার-বুদ্ধি ভিত্তিক মতবাদ
৩।মনস্তাত্ত্বিক মতবাদ
৪।নৃ-তাত্তিক মতবাদ
সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত মতবাদব মানুষকে বিশ্বাস করতে বলে যে- পৃথিবী সৃষ্টির আদিকাল থেকেই একজন ঈশ্বর আছেন এবং তিনিই ধর্মের প্রবক্তা। আর বর্তমান যুগে পৃথিবীর পিছিয়ে পড়া জাতিদের ভেতরে এই ধর্ম মেনে চলার প্রভাব বেশি পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। আর তাদের পিছিয়ে পড়ার মূল কারন হিসেবে এই ধর্মকেই দ্বায়ী করা হয়। প্রথম শ্রেনীর বা ফার্স্টক্লাস যত কান্ট্রি আজ পৃথিবীর বুকে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে সেসব দেশ অনেক আগেই এই সমস্ত ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। অবশ্য এর জন্য সেই স্ব স্ব জাতি এবং গোষ্ঠীকে পর্যাপ্ত জ্ঞান অনুসন্ধান করা লেগেছে। আমি বিভিন্ন দার্শনিক ও বিবর্তনবাদীদের লেখা পড়ে এটা বুঝতে পেরেছি যে সভ্যতার সমাজ গঠনে তৈরি হওয়া ধর্ম গুলিই আবার বর্তমানে মানব উন্নয়ন এর চরম বাধা হয়ে দাড়াচ্ছে। এখানে অভিজিৎ রায়ের কথা টেনে বলতে হচ্ছে এই ধর্মগুলি মানুষের না মানব সমাজের ভাইরাস হিসেবে কাজ করছে। আর এই ভাইরাস দারা আক্রান্ত জাতি কোন দিন কুসংস্কার থেকে বের হতে পারে না।

আসলে এই ধর্ম আর সমাজ বিষয়টি কোন সংক্ষিপ্ত আলোচনার বিষয় নই। তাই যতই বলা যাবে ততই কথা বাড়বে। ভাবছি একটি ধারাবাহিক লেখা শুরু করবো। তবে সেক্ষেত্রে আমার পাঠকদের মতামত জানার প্রয়োজন আছে। এই লেখাটিতে আমি কোন তথ্যসূত্র দিচ্ছি না। কারন দার্শনিক ও যুক্তিবাদী দের কিছু বানী যোগ করা ছাড়া এই বিষয়টি আমার নিজস্ব মনোভাব।
------------ মৃত কালপুরুষ
                  ২৫/০৮/২০১৭

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন