সবাইকে শ্বারদীয়
শুভেচ্ছা, যেহেতু চলছে এটাই। প্রতি বছর হিন্দু ধর্মাবলম্বিদের এই বড় উৎসবটি নিয়ে
নানা কথা শোনা যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিম বঙ্গে বেশি শোনা যায়
হিন্দুদের দেব দেবীদের মূর্তি ভাঙ্গার কথা। যারা ভাঙ্গে তারাও একটি ধর্মে বিশ্বাসী
এবং তাদেরও দেবতা, ঈশ্বর বা আল্লাহ নামের একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। এর মধ্যে
মুসলিমদের বেশি দেখা যায় বাংলাদেশে এই সনাতন ধর্মীয়দের মূর্তি বেশি ভাঙ্গে। এবার
দেখলাম বিভিন্ন অঞ্চলে সরকার থেকে পাহারার ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছিলো যাতে এরা
মুর্তি না ভাঙ্গতে পারে। আমার কথা হচ্ছে ইসলাম ধর্মাবলম্বিরা কি জানে তাদের সাথে
মূর্তির একটি বড় সম্পর্ক আছে। আমার মনে হয় জানে না। সকল ধর্ম বিশ্বাসী মানুষদের
উচিৎ অন্যের ধর্ম বা অন্য ধর্মের উৎসবে বাধা দেওয়ার আগে তাদের নিজের ধর্মটি নিয়ে
আগে ক্রিটিক্যালী সেটাকে এনালাইসিস করতে শেখা। নিজের ধর্ম সম্পর্কে জানাবোঝার
যায়গা বাড়ানো। বাপ দাদার পৈত্রিক সম্পত্তি হিসেবে পাওয়া ধর্মটাকে রক্ষা করতে যাওয়ার
আগে তার ইতিহাস জানা। আজ প্রাক ইসলামিক যুগের এক দেবতা “হুবাল” দেবতার কথা বলবো,
যার প্রাক্তন মন্দির হচ্ছে মুসলিম ধর্মানুসারিদের পবিত্র শহর মক্কায় অবস্থিত কাবা
ঘর।
হুবাল হচ্ছে একটি
আরবী শব্দ এবং এটি প্রাক ইসলামিক যুগের একজন উপাস্য দেবতার
নাম। একসময় মক্কা নগরীর কাবাঘরে হুবালের মূর্তি স্থাপিত ছিলো। এবং ইসলাম ধর্ম তৈরি
হবার হাজার বছর আগে থেকেই এই হুবাল দেবতাকে পূজা করে আসা হতো। তার মূর্তিটি
মনুষ্যাকৃতির ছিলো। হুবাল অনুসারীগণ তার সামনে রক্ষিত তীরের সাহায্যে দেবতার মতামত
নিত। আর যারা এই হুবাল দেবতাকে তখন বিশ্বাস করতো তারাই পরবর্তিতে সব মুসলমান মানে
ইসলাম ধর্মের অনুসারী হয়েছিলো। হুবাল সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। উত্তর আরবে
বর্তমান সিরিয়া এবং ইরাক থেকে পাওয়া নবতাইয়া লিপিতে হুবালের কথা উল্লেখ আছে। হুবাল
বিশেষ কোন ক্ষমতার যেমন বৃষ্টির দেবতা ছিলেন। হুবালের উপাসনা এবং রক্ষনাবেক্ষণের
ভার ছিলো মক্কার কুরাইশ বংশের উপর্।
৬২৪ খিস্টাব্দে মুসলমানদের বদরের যুদ্ধে হুবাল দেবতার মূর্তিপূজারীগণ তৎকালীন ইসলাম ধর্মের নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর অনুসারী দের
সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তার প্রায় ৬ বছর পরে ৬৩০ খিস্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর মুহাম্মদ (সাঃ) এবং তার অনুসারীরা
কাবাঘরের রক্ষিত হুবাল সহ সর্বোমোট ৩৬০টি মূর্তি সরিয়ে ফেলেন বলে অনেক উল্লেখ আছে।
কিন্তু পরবর্তিতে মুসলমানদের নবী
মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপরে ইসলাম ধর্ম অনুসারীদের প্রধান ঐশরিক কিতাব পবিত্র কোরান
শরীফ নাজিল হবার যে কথা শোনা যায়, তার পরেও এই হুবাল দেবতার কিছু নিয়ম কানুন, আচার
অনুষ্ঠান ইসলাম ধর্মের মধ্যে থেকে যাওয়ার নমুনা আছে অনেক। যেমন মুসলমানেরা চাঁদ
দেখে তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব পালন করেন মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিক চাঁদ,তারা
ইত্যাদি বাদেও আরো অনেক কিছু হুবাল দেবতা থেকে প্রাপ্ত। কাবা শরিফের চারদিকে ৭ পাক
দেওয়া, শয়তান কে লক্ষ করে পাথর মারা ইত্যাদি সহ ইসলাম ধর্মানুসারীদের কাছে একটি
নাম খুবই প্রিয় আর তা হচ্ছে “আব্দুল্লাহ”। প্রায়ই দেখা যায় মুসলিম পরিবারে কোন
সন্তান জন্ম নিলে তার নাম রাখা হয় আব্দুল্লাহ নাম ব্যবহার করে। আর মুসলামানদের
অনেকের দাবী এই নামের অর্থ হচ্ছে আল্লাহর দাস, কিন্তু কোন আল্লাহর দাস সেটা কিন্তু
তারা বলতে পারে না। তারা মনে করে এটি একটি ইসলামিক নাম কারন এটি ছিলো নবী মুহাম্মদ
(সাঃ) এর পিতার নাম “আব্দুল্লাহ”। একটু ভেবে দেখবেন নবী মোহাম্মদ (সাঃ) এর পিতা
আব্দুল্লাহ কিন্তু নবীর জন্মের পুর্বেই মারা গিয়েছিলেন।
ইসলামের প্রচলন শুরু হয় ৬১০ খৃষ্টাব্দ
থেকে (নবীর বয়স যখন ৪০ বছর)। তখন নবী সহ যে সকল মানুষ জীবিত ছিল তারা
জন্মের সময় কি মুসলমান ছিল না ছিলনা চিন্তা করুন। তারা ইসলাম ধর্মে দিক্ষিত হয়ে কি
তাদের নাম পাল্টে ফেলেছিলো না সেই নামই ছিলো। তাদের জন্মের সময় তাদের যে নাম রাখা
হয়েছিলো সেই নাম সমুহ কি আদৌ ইসলামী নাম হতে পারে ? বরং যদি দাবি করা হয় যে ঐ সকল নাম
খাটি প্যাগানদের বা হুবালের অনুসারীদের নাম তাহলে তা অস্বিকার করার কোন পথ খোলা
থাকবে না। বর্তমানে বিভিন্ন মুসলিম পরিবারে সন্তুানের নাম রাখাহয় বিখ্যাত
সাহাবিদের নামে। সেইসব সাহাবাদের জন্মের সময় কি তাদের ইসলামী নাম ছিল ? অবশ্যই তাদের নাম রাখা হয়েছিলো
প্যাগান ধর্ম, ঐতিয্য
অনুসরনে। “আব্দুল্লাহ” নামটি সবথেকে বেশি সহী ইসলামী
নাম। আব্দুল্লাহ ছিলেন নবীজির পিতা যিনি নবীজির জন্মেরও আগে মারা যান। খেয়াল রাখতে
হবে, আব্দুল্লাহ পৌত্তলিক হিসেবেই মারা যান সে
কিন্তু মুসলমান ছিলেন না। আব্দুল্লাহ নামের অর্থ আল্লাহর দাস। কিন্তু কোন আল্লাহর
দাস ? তখনও
ইসলামের জন্মও হয়নি এবং ইসলামের প্রচারকেরও জন্ম হয়নি। ইসলামের পুর্ববর্তি ইহুদি
খৃষ্টান ধর্মেও আল্লাহ বলে কোন শব্দই নেই। এই আল্লাহ সেই প্যাগানদের মধ্যে প্রচলিত
আল্লাহ নামের দেবতা যে লাত, মানাত ও
উজ্জাত নামের তিন কন্যার পিতা এই হুবাল যার আরেক নাম হচ্ছে আল্লাহ।
এখন দেখুন ইসলাম ধর্ম তৈরি হবার পরে
তাদের কোরানেও এই হুবাল দেবতার মুর্তি পূজার কথা উল্লেখ করা হয়েছে পজেটিভ ভাবেই।
মানে তারা যে ছিলো তা ইসলাম ধর্মানুসারীরা কোন মতেই অস্বীকার করতে পারবেন না।
তাদের কোরান বলছে-
সূরা আল আম্বিয়া (الأنبياء), আয়াত: ৯৮
إِنَّكُمْ وَمَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ حَصَبُ جَهَنَّمَ أَنتُمْ لَهَا وَٰرِدُونَ
উচ্চারণঃ ইন্নাকুম ওয়ামা-তা‘বুদূ না মিন দূ নিল্লা-হি হাসাবুজাহান্নামা আনতুম লাহা-ওয়া-রিদূ ন।
অর্থঃ তোমরা এবং আল্লাহর
পরিবর্তে তোমরা যাদের পুজা কর, সেগুলো দোযখের ইন্ধন। তোমরাই তাতে প্রবেশ করবে।
পরিবর্তে তোমরা যাদের পুজা কর, সেগুলো দোযখের ইন্ধন। তোমরাই তাতে প্রবেশ করবে।
সূরা আয্-যুখরুফ (الزّخرف), আয়াত: ৮৬
وَلَا يَمْلِكُ ٱلَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِهِ ٱلشَّفَٰعَةَ إِلَّا مَن شَهِدَ بِٱلْحَقِّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ
উচ্চারণঃ
ওয়ালা-ইয়ামলিকুল্লাযীনা ইয়াদ‘ঊনা মিন দূনিহিশশাফা-‘আতা ইল্লা-মান শাহিদা বিলহাক্কি ওয়া হুম ইয়া‘লামূন।
ওয়ালা-ইয়ামলিকুল্লাযীনা ইয়াদ‘ঊনা মিন দূনিহিশশাফা-‘আতা ইল্লা-মান শাহিদা বিলহাক্কি ওয়া হুম ইয়া‘লামূন।
অর্থঃ তিনি ব্যতীত তারা যাদের
পুজা করে, তারা সুপারিশের অধিকারী হবে না, তবে যারা সত্য স্বীকার করত ও বিশ্বাস করত।
পুজা করে, তারা সুপারিশের অধিকারী হবে না, তবে যারা সত্য স্বীকার করত ও বিশ্বাস করত।
সূরা আল আহ্ক্বাফ (الأحقاف), আয়াত: ৫
وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّن يَدْعُوا۟ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَن لَّا يَسْتَجِيبُ لَهُۥٓ إِلَىٰ يَوْمِ ٱلْقِيَٰمَةِ وَهُمْ عَن دُعَآئِهِمْ غَٰفِلُونَ
উচ্চারণঃ ওয়ামান আদাল্লুমিম্মাইঁ
ইয়াদ‘ঊ মিন দূনিল্লা-হি মাল্লা-ইয়াছতাজীবুলাহূইলা-ইয়াওমিল কিয়া-মাতি ওয়াহুম ‘আন দু‘আইহিম গা-ফিলূন।
ইয়াদ‘ঊ মিন দূনিল্লা-হি মাল্লা-ইয়াছতাজীবুলাহূইলা-ইয়াওমিল কিয়া-মাতি ওয়াহুম ‘আন দু‘আইহিম গা-ফিলূন।
অর্থঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর
পরিবর্তে এমন বস্তুর পূজা করে, যে কেয়ামত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? তারা তো তাদের পুজা সম্পর্কেও বেখবর।
পরিবর্তে এমন বস্তুর পূজা করে, যে কেয়ামত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? তারা তো তাদের পুজা সম্পর্কেও বেখবর।
শুধু মুসলমানদের কোরান শরিফ এ যে
তার উল্লেখ আছে তা কিন্তু না। প্যাগান আরবের পুরাণ থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি থেকে
হুবালের আসল পরিচয় বা কাজ বের করা একটু কঠিন। ১৯ শতকের শিক্ষাবিদ জুলিয়াস
ওয়েলহাউসেন দাবী করেন হুবাল ছিলেন আল লাতের পুত্র এবং ওয়াদ এর ভাই। ২০ শতকের
প্রথম দিকের শিক্ষাবিদ হুগো উইংক্লার হুবালকে চন্দ্রদেবতা হিসেবে দাবী করেন। অনেক
শিক্ষাবিদ এই দাবীকে সমর্থন করেন। দক্ষিণ আরবীয়রা ট্রিনিটি তত্বে বিশ্বাস করতো।
চন্দ্র-পিতা, সূর্য-মাতা এবং সন্ধ্যা তারা(শুক্র
গ্রহ)-পুত্র হিসেবে বিশ্বাস করতো।
মিরসিয়া এলিয়েড এবং চার্লস যে.
এডামস হুবালকে বৃষ্টির দেবতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রাক ইসলামী যুগে কুরাইশগণ
এবং তাদের মিত্র কিনানা এবং তিহামা গোত্র হুবালকে আন্তঃগোত্রীয় যুদ্ধ দেবতা
হিসেবে পূজা করতো।
আল আজরাকির বর্ণনানুসারে, হুবালের মূর্তিটি মেসোপটেমিয়ার হিট অঞ্চল
থেকে মক্কা নগরীতে নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে হিট অঞ্চলটি ইরাকে অবস্থিত। ফিলিপ কে
হিট্টি হুবাল শব্দের সংগে আরামীয় শব্দের মিল খূঁজে পান যার অর্থ শক্তি। সেটার উপর
ভিত্তি করে তিনি দাবী করেন হুবালের ছবিটি উত্তর আরব সম্ভবত মোয়াব অথবা
মেসোপটেমিয়া থেকে মক্কা নগরীতে আনা হয়। হুবাল শব্দটি সম্ভবত হু এবং বাল সহযোগে
গঠিত হয়েছে। হু শব্দের অর্থ শক্তি বা দেবতা এবং বাল অর্থ প্রভু বা খোদা। বাল
ছিলেন মোয়াব ধর্মাবলম্বীদের খোদা। দক্ষিণ আরবের বাইরে শুধু মাত্র নাবাতিয় পুঁথিতে
হুবালের কথা দেবতা দুশারা এবং মানাওয়াতু (মানাত নামে সমধিক পরিচিত) এর সাথে
উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অনেক পুঁথিতে ব্যক্তি বিশেষের নাম হিসেবে হুবালের উল্লেখ
আছে যেমন, হুবালের পুত্র।
আমি জানি এই কথাগুলি শুনতে ইসলাম
ধর্মানুসারীদের একটু খারাপ লাগবে। কিন্তু জেনে রাখুন এটাই হচ্ছে প্রকৃত সত্য। এরকম
আরো হাজার হাজার মিল আছে ইসলাম ধর্মে যা প্যাগান ধর্ম ও হুবাল দেবতার সাথে মিলে
যাবে। আমি আমার পরবর্তি একটি লেখাতে এই হুবাল দেবতা কিভাবে সেই মেসোপটেমিয়া, রোমান
আর পারস্য দেবতাদের থেকে আরব্য সাংস্কৃতিতে এসেছে এবং তা থেকে পরবর্তীতে ইসলাম
ধর্মে প্রবেশ করেছিলো তা নিয়ে লিখবো। তাই ইসলাম ধর্মাবলম্বিদের কাছে অনুরোধ করবো
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানকে আপনাদের ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী পাপ মনে
করার আগে নিজেদের ধর্মেও যে মুর্তি পুজার ইতিহাস আছে সেটা আগে জানার চেষ্টা করুন।
---------- মৃত কালপুরুষ
৩০/০৯/২০১৭























