নারীবাদ
একটি বৃহৎ আন্দোলন যা সদূর প্রসারীও বটে। নারী পুরুষের সমান অধিকার বাস্তবায়ন যার
মূল লক্ষ্য। আমাদের সমাজে নারীরা কিছু পুরুষতান্ত্রিক ধর্ম ব্যবস্থা দ্বারা সেই
বহুকাল ধরেই অবহেলিত হয়ে আসছে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন এসব ধর্ম নারীদের চীরজীবন ছোট করে
এসেছে। শিক্ষা ও জ্ঞানের আলো থেকে দূরে রাখতে চেয়েছে নারীদের। তাদেরকে করেছে যুগ
যুগ ধরে গৃহ বন্দী। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের ভেতরে কয়েকজন সেই সামাজিক প্রথার
বিরোধিতা করে নারীদের মুক্ত করতে চেয়েছেন। আর যারা এই নারী মুক্তি সংগ্রামের সাথে
কন্ঠ মিলিয়ে সমাজের প্রথাবিরোধী কাজে আমাদের পাশে এসে দাড়িয়েছেন তাদের আমরা নারীবাদী
বলে থাকি। নারীরাই পারে এই ধর্মান্ধ সমাজে আঘাতের পর আঘাত করে তার পরিবর্তন করতে।
তবে
সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে অনেকেই আবার এই নারীবাদ আন্দোলন বলতে মনে হয় শুধু যৌনতাই
বুঝছেন। কারন দেশের একটি লজ্জাজনক সমস্যা হচ্ছে ধর্ষণ। শুধু বাংলাদেশেই ধর্ষন হয়
তা কিন্তু নই, বরং এশিয়া সহ সেই সূদুর পশ্চিমা দেশগুলোতেও এই ধটনা ঘটে থাকে। তবে
কম এবং বেশি হয়ে থাকবে। এখানে এই জাতীয় ঘটনা ঘটার পেছনে আমরা আমাদের দেশের ধর্মব্যবস্থাকে
বেশি দোষারোপ করে থাকি। কারন এই জাতীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্ম গুলা আমাদের সমাজের
যৌন শিক্ষা গুলাকে সব সময় আড়াল করে রাখতে চাই বিভিন্ন ধর্মের দোহায় দিয়ে। নারীদের
বোরাকা নামক বস্তা বন্দী করে হিজাব আর সিদুর দিয়ে তাদের আলাদা করতে চায়। প্রকৃত
যৌন শিক্ষা ও জ্ঞানের আলো থেকে নারীদের বন্দী করা হয়। এসব ধর্ম শিশুকাল থেকেই
আমাদের দেশের সমাজে বেড়েওঠা একটা পুরুষের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেয় নারী মানেই যৌন
বস্তু। আর এসব কারনেই ধর্ষনের মতো ঘটানা বেশি ঘটে সেই সমস্ত দেশের সমাজে।
নারীবাদীরা
এই সব নিয়ে অবশ্যয় লেখবে। আমি মনে করি তাদের অবশ্যয় এটা বলার অধিকার আছে “সকল
পরুষই মস্তিষ্কে ধর্ষক” হয়তো আমরা পুরুষেরা নারীদের সেই অবস্থানে গিয়ে তা সঠিকভাবে
অনুধাবন করতে পারিনা। তবে এখানে একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, এমন কোন পুরুষ যেমন
নেই যে জীবনে একটিবারের জন্যও কোন নারীর দিকে কামাতুর দৃষ্টিতে তাকায় নাই ঠিক
তেমনি এমন কোন নারীও কিন্তু নাই যে জীবনে একটি বারের জন্য কোন পুরুষের দিকে
কামাতুর দৃষ্টিতে তাকায় নাই সেক্ষেত্রে সমান সমান। বর্তমানে সোস্যাল মিডিয়া গুলার
প্রধান আলোচনার বিষয় হয়েছে এটা। বিতর্ক আলোচনা সমালোচনা সবই হচ্ছে কমেন্টস এর
থ্রেট শুধু দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতরই হয়ে যাচ্ছে তারপরেও মনে হয় এর সমাধান আসছে না।
অবশেষে ফলাফল হচ্ছে নারীবাদীরা তাদের সমমনা পুরুষদের আলাদা চোখে দেখছে বা অনেকেই
হয়তো কাউকে না কাউকে ব্লক করছে তার সোশ্যাল মিডিয়ার আইডি থেকে। আমি এটাকে বলছি
নিজেদের মধ্যেই একটা কোল্ড ওয়ার বা ঠান্ডা যুদ্ধ। আসলে একটা কথা নারীদের মনে রাখা
উচিত বলে মনে করি, একজন মুক্তমনা মানুষ (নারী,পুরুষ) সব সময় লিঙ্গ নিরাপেক্ষভাবেই
চিন্তা করে মনে রাখবেন। আর যারা লিঙ্গ নিরাপেক্ষ থেকে আমাদের সাথে এই প্রথাবিরোধী
আন্দোলনে কাজ করে যাচ্ছেন তারা সবাই মুক্তমনা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এই জাতীয়
ক্ষুদ্র স্বার্থে এসেই নারীবাদ আর আজ্ঞেয়বাদী, অনীশ্বরবাদী, নাস্তিক্যবাদ ও
সংশয়বাদীদের আলাদা করে দেখা হচ্ছে। ঠিক আস্তিক নাস্তিক এর মতো। কিন্তু খেয়াল করে
দেখবেন সকলেরই উদ্দেশ্য কিন্তু এক।
আর সকল
মুক্তমনাদের (নারী,পুরুষ) উদ্দেশ্যে বলা, আমরা যদি নিজেদের মুক্তমনা বলেই দাবী করি
তাহলে আমাদের এই ধর্মান্ধদের মতো অনুভূতি থাকাকে কি বলবেন আপনারা। এতোদিন একসাথে
থাকতে পারলেন একজন আরেকজনের প্রতিটি কথাকে সাধুবাদ জানিয়ে প্রথাবিরোধী আন্দোলনকে
আরো জোরদার করলেন কিন্তু এই কথায় এসেই নিজেকে আস্তিকের মতো অনুভূতি আছে প্রমান করে
দিলেন। এতে করে অনেকেই দেখলো সেই হেফাজতি তেতুল হুজুরের ছাত্রদের মতো আচরন করছেন
কিছু মুক্তমনা মানুষ। আর সেই সাথে সেই শ্রেনী, যারা মুক্তমনাদের সারাজীবন হত্যাই
করতে চায় তারা হাতে তালি বাজিয়ে নিলো। মনে মনে তারা বললো যে দেখ আমাদের
ধর্মানুভুতিতে আঘাত দিয়ে কথা বলার জ্বালা কত। এখন সকল পুরুষ ধর্ষক বলাতে যারা
নিজেদের দিকে এই কথা টেনে নিচ্ছেন তাদেরকে অনুরোধ করবো আপনি যদি ধর্ষক নাই হবেন
তাহলে নিজের দিকে কেন এই কথা টেনে নারীবাদীদের কটাক্ষ করে কথা বলবেন। নারীবাদীরা
যে কাজ করছে আমাদের সমাজে তারা যেভাবে আঘাত করছে তাতে আমাদের উচিত হবে তাদের
সাধুবাদ জানানো। এই একটা যায়গায় এসে যদি আমরা সেই তেতুল হজুরের মতো আচরন করি তাহলে
আমরা আর মুক্তমনা থাকি কিভাবে।
নারীবাদীদের
অনেকের ভেতরেই এই নিয়ে দ্বন্দ কারো নজর এড়াতে পারেনি মনে হয়। নারীবাদীরা বলেন কোন
ধর্ম বিশ্বাস করলে বা আস্তিকতা মেনে চললে তাকে নারীবাদী বা মানবতাবাদী কোনটাই বলা
যাবে না। আসলে এটা সঠিক হবার কথা। তবে ধর্ম বিশ্বাস না করে যদি কোন কল্পিত ঈশ্বর
বিশ্বাস করে কেউ, তাকে আস্তিক বলা যাবে এবং সেই ব্যাক্তি নারীবাদী বা মানবতাবাদী
দুইটাই হতে পারবে। কথাটা খুব জটিল মনে হচ্ছে তাই না। আর অন্য নারীবাদীরা বলছেন কোন
ধর্মে বিশ্বাস করেও তারা নিজকে নারীবাদী বলে দাবী করেন কিন্তু তারা ধর্মের কোন
প্রথা মানেন না তবে যেকোন একজন ঈশ্বর আছেন এটা বিশ্বাস করেন। সত্য কথা বলতে কি
পুরুষ তান্ত্রিক হাতে গোনা কয়েকজন নাস্তিকের সন্ধান পেয়ে সকল নারীবাদীরা এই ধর্ম
আর অধর্মের মধ্যে বা নাস্তিক্যবাদ আর আস্থিক্যবাদ এর মধ্যে পার্থক্য ও ভেদাভেদ
খুজাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছেন যেটা আগামীতে এই নারী মুক্তি আন্দোলনকে বাধাগ্রস্থ করবে
বলে মনে করি। তার থেকে একটা জিনিষ আমাদের মনে রাখা উচিত যে মুক্তমনা মানেই কিন্তু
লিঙ্গ নিরাপেক্ষ হতে হবে আর তারাই প্রকৃত নাস্তিক্যবাদের পক্ষে থাকবে। তাহলে
নাস্তিকতার নাম করে কেউ যদি পরুষতান্ত্রিক মনোভাব পোষন করে তাহলে তাকে আমরা কখনই
মুক্তমনা বলতে পারিনা আর যখনই সে মুক্তমনা হতে পারবে না তখন সে নাস্তিক হোক আর
আস্তিক তাতে কিছুই যায় আসে না। তার যদি এওমন অনুভূতি থেকেই থাকে তাকে আমরা
আস্তিকদের সাথে পার্থক্য আছে এই কথাও বলতে পারছি না।
এতো কথা
বলার কারন হচ্ছে শুধু একটি কথায় বলার চেষ্টা করা আসলেই কাঠালের আমসপ্ত কি জিনিষ
সেটা আপনারাই ভেবে দেখুন। আর যৌনতাই যে নারীবাদী নারীদের একমাত্র লেখার টপিক্স তা
কিন্তু না সেটাও মনে রাখবেন। যেই বিষয়কে মূল আলচ্য ব্যাপার বানিয়ে আজ সমমনাদের
আলাদা করা হচ্ছে তা থেকে আমাদের সকলের বিরত থাকা উচিত। নারীবাদী বা নারী মুক্তির
এই বৃহৎ আন্দোলনের সাথে লিপিস্টিকবাদী, ওড়নাবাদী, হিজাববাদী বা সিদুরবাদীদের
মিলিয়ে না ফেলার অনুরোধ রইলো। আর অনুভূতিওলা কথিত মুক্তমনাদের নাস্তিক্যবাদের
সাথেও না মিলিয়ে ফেলার অনুরোধ রইলো। সাথে যারা প্রায় বলেন থাকেন যারা অবশ্য সিনিয়র
ব্লগার বলে নিজেদের পরিচয় দিয়ে থাকেন তারও কিটিবাদী, সিপিবাদী বা সিপি গ্যাং, কিটি
গ্যাং এই জাতীয় কথা না বলার অনুরোধ রইলো। প্রথাবিরোধি আন্দোলনে অংশগ্রহন করতে হলে
আমাদের দরকার একসাথেই এগিয়ে যাওয়া সেটা কি সম্ভব ?
----------
মৃত কালপুরুষ
১৮/১০/২০১৭

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন