সভ্যতার শুরু থেকে
আমরা অনেক নারীর অবদানের কথা শুনে আসছি ইতিহাসের পাতায়। আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির
দার্শনিক হাইপেশিয়াকে আমরা অনেকেই চিনি। তাকে নির্মম ভাবে ধর্মের দোহায় দিয়ে
হত্যার কথা আজো আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। প্রায় ১৬০০ বছর আগে নির্মমভাবে হত্যার
শিকার হওয়া সুন্দরি নারী হাইপেশিয়া। শিল্পির তুলিতে হাইপেশিয়ার কাল্পনিক রুপের
সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে এখনও অনেকেই। আজ হাইপেশিয়া নয়, আজকে হাইপেশিয়া থেকেও প্রায়
১৩০০ বছর পুর্বের প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার আরেক সুন্দরী নারীর কথা বলবো। যে
সেসময় সমস্ত ব্যাবিলনের রাজ্যভার হাতে তুলে নিয়েছিলেন।
আজ থেকে প্রায় ৪
হাজার বছর আগের প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় মহিলা শাসক ছিলেন একজনই যার নাম ছিলো
সেমিরাস বা সাম্মু-রামত। তিনি ছিলেন একমাত্র নারী যে শক্তিশালী অশূরীয় সাম্রাজ্য শাসন করেছে, সেমিরাস রোমান যুগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত লেখক এবং চিত্রশিল্পীদেরকে অনেক ভাবিয়েছে তার রুপের কারনে।
বর্তমান যুগেও ইতিহাসবীদদের চিন্তার মধ্যমনি হয়ে আছেন এই রানী। এর কারন হচ্ছে সেই
সময়ে প্রাচীন মেসোপটেমিয়াতে মহিলা শাসক খুবই বিরিল ছিলো। কিন্তু এই রানী সেসময়ে
রাজত্ব করে ইতিহাসে এক বিরাট চিহ্ন রেখে গিয়েছেন। আধুনিক কালের ইরাক , সিরিয়া, তুরস্ক,ইরান সহ আরো কয়েকটা দেশের কিছু কিছু দেশগুলোর অংশ
নিয়ে গঠিত ইউফ্রেটিস এবং টাইগ্রীস নদীর অববাহিকা স্থল হল প্রাচীন কালের
মেসোপটেমিয়া। যার প্রধান কেন্দ্র ছিলো ব্যাবিলন। আর এই ব্যাবিলনের শুন্যু উদ্দ্যান
বা ঝুলন্ত বাগান আজ পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষের কাছে একটি আশ্চর্যের বিষয় হয়ে আছে। আর
ইতিহাসবিদদের ধারনা এই ব্যাবিলনের শুন্য উদ্দ্যান এই রানী সেমিরাস অথবা সম্রাট
নেবুচাদনেজার এর যে কোন একজন বানিয়েছিলেন। তবে সম্রাট নেবুচাদনেজার বেশি গ্রহন
যোগ্য এখন পর্যন্ত। ধারনা করা হয় খৃষ্টপুর্বাব্দ ৯০০ সালের দিকে বর্তমান এশিয়া
মাইনর থেকে আজকের সমগ্র ইরান পর্যন্ত পর্যন্ত এই নারী শাসন করেছিলো একসময়।
গ্রীক লেখক এবং ইতিহাসবিদদের
মতে রানী সেমিরাস এর রাজত্বকাল খুবই সংক্ষিপ্ত হলেও তিনি এই অল্প সময়ে অনেক অবদান
রেখেছিলেন প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়। তার রাজত্ব পাওয়া নিয়ে অনেক ইতিহাস প্রচলিত আছে,
তবে এর মধ্যে সব থেকে বেশি গ্রহনযোগ্য ইতিহাস হচ্ছে ফরাসি আলোকিত লেখক ভলতেয়ার এর
লেখা কিছু ইতিহাস। পরবর্তিতে ভলতেয়ারের একটি নাটক ১৮২৩ সালে রসিনির অপেরাতে স্থান
পায় যার ফলে এই রানী সেমিরাসের সম্পর্কে মানুষ আরো জানতে আগ্রহী হয়। সেমিরাসের
সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে আরো অনেক কবি ও সাহিত্যিক লিখছেন সেই সময়ে। এর মধ্যে
ইটালীর কবি দান্তেকে তাকে নিয়ে লিখে এবং রানী সেমিরিসের কাল্পনিক ছবি একে
সাজাপ্রাপ্ত হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে সে “কামুক বিদ্বেষ” মুলক ছবি একেছেন এই
শিল্পি। সেই ছবি বর্তমানে বৃটিষ মিউজিয়ামে স্থান পেয়েছে। কবি দান্তেকে সেমিরিসকে
কল্পনা করে তার অর্ধ নগ্ন বা নগ্ন ছবি একেছিলেন যা ছিলো অসাধারন একটি শিল্প এবং
পরবর্তিতে তার মুল্যায়ন করা হয়েছিলো।
রানী সিমিরিসের
রাজ্য পাওয়া নিয়ে বেশি প্রচলিত আছে, সে তার বিশ্বস্ত সেনা প্রধানদের দিয়ে রাজাকে
হত্যা করে রাজ্য দখল করেছিলেন এবং তার সন্তান শিশু থাকায় সে রাজ্যের ভার হাতে তুলে
নিয়েছিলেন। গ্রীক দার্শনিক হেরোডোটাস এর লেখা থেকে জানা যায় সম্রাট নেবুচাদজার ও
চেলদেনাজের রাজত্যের পরে বা এই দুইজনের রাজত্বের মাঝামাঝি সময়ে রানী সেমিরাস রাজত্ব
করেন ব্যাবিলনে। কিন্তু দার্শনিক হেরোডোটাস কোথাও ব্যাবিলনের সেই বর্তমানের সপ্তম
আশ্চর্য শুন্য উদ্দ্যানের কথা উল্লেখ করে নাই। যা এই তিন জনের ভেতরে কেউ বানিয়েছিলো।
এখানে অনেকে ইতিহাসবিদদের মতামত হচ্ছে সেসময়ে দেবতাদের মন্দির গুলা ছিলো অনেক বড়
বড় কথিত আছে যে অনেক মন্দিরের চূড়া নাকি চলে গিয়েছে আকাশের ভেতরে যেখানে দেবতারা
থাকতেন আর সেই মন্দিরগুলির ধাপে ধাপে করা ছিলো এই বাগান গুলা তাই হেরোডোটাসের লেখাতে
তা পাওয়া যায় না। রানী সেমিরিসের সাফল্য শুধু ব্যাবিলনের শুন্য উদ্দ্যানই নয় সমস্ত
ব্যাবিলন ও তৎকালীন টাইগ্রীস ও ইউফ্রেতাস নদীর তীরে যে অসাধারন সুন্দর দুটি জমজ
নগরী গড়ে উঠেছিলো তা এই রানীর রাজত্বকালেই প্রান ফিরে পেয়েছিলো।
রানী সেমিরাস তার
প্রজাদের মধ্যে বিতর্কিত ছিলো কারন অনেকেই তাকে দোষী মনে করতো রাজার মৃত্যর জন্য।
আবার অনেকেই তার রুপ আর সৌন্দর্যের কারনে দেবতা সমতুল্য একজন শাসক মনে করতো। রানী
সেমিরাস ছিলেন তৎকালীন সিরিজ প্রদেশের কোন উচ্চবংশের একজন সুন্দরী যুবতী নারী। সে
সময় সিরিজ প্রদেশে তার রুপের কারনে অসাধারন সুন্দরী এক যুবতী নারী হিসেবে অনেকেই
তার কথা জানত। ঠিক সে সময় সিরিজ প্রদেশের রাজ পরিবারের গভর্ণর ছিলেন ওনেস।
পরবর্তিতে ওনেস এর পিতা (দত্বক পিতা) তাকে টাইগ্রিস নদীর তীরে নিনেভে নামের রাজ্যের
রাজত্ব দেয়। এসময় ওনেস পার্শবর্তি প্রদেশের সুন্দরী এক যুবতী নারীর কথা শোনে যে
ছিলো রানী সেমিরিস। ওনেস সেমিরিসকে দেখার পর তার প্রেমে পড়ে যায় এবং তাকে বিয়ের
প্রস্তাব দেয়। ওনেসের দত্বক পিতা তাকে বিয়ের অনুমতি দিলে ওনেস সেমিরিসকে বিয়ে করে
এবং নিনেভে নিয়ে আসে। ঠিক এসময় নিনেভের সাথে তার পার্শ্ববর্তী রাজ্য নিনাস এর
রাজার যুদ্ধ শুরু হয়। নিনাসের রাজা ছিলেন নীনবিকে। যুদ্ধের সময় এই রাজা নীনবিকে
যেকোন ভাবে তার কন্যার বয়সী ওনেসের স্ত্রী এই রানী সেমিরিসকে দেখতে পায় এবং তার
প্রেমে পড়ে যায়। এতে করে সে আর যুদ্ধ না করে ওনেসকে প্রস্তাব দেয় সেমিরিসকে তার
হাতে তুলে দেবার জন্য এবং বিভিন্ন ভয়ভীতি প্রদান করে। কিন্তু ইতিমধ্যেই সেমিরিস
ওনেসকে ভালোবেসে ফেলে তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয় প্রান চলে গেলেও তারা আলাদা হবে না
প্রয়োজনে রাজ্য ছেড়ে পালায়ণ করবে।
এসময় রাজা ওনেস
বুঝতে পারে তারা আর পালাতে পারবে না আর রাজা নীনবিকে এর বিশাল যুদ্ধবাহিনীকে
যুদ্ধে পরাজিত করার ক্ষমতাও তার নেয় তাই নানান চাপে পড়ে সে রানী সেমিরিসকে জীবিত
রাখার জন্য নিজে আত্মহত্যা করে। রাজার মৃত্যুর পর নীনবিকে বিনা যুদ্ধেই নিনেভের
রাজত্ব ও রানী সেমিরিসের দখল পায়। রাজা নীনবিকে ছিলো রানী সেমিরিসের থেকে বয়সে
অনেক বড়। রানী সেমিরিসের মতো বেশ কয়েকটি কন্যা ছিলো এই রাজা নীনবিকের। গ্রীক
দার্শনিক ডায়োডর সিকুলাসের মতে রানী সেমিরিস রাজা ওনেসের মৃত্যুর বদলা নিতে রাজা
নীনবিকে বিয়ের জন্য রাজী হয় এবং পরবর্তিতে তার বিশ্বাস অর্জন করে তার সৈন্য
বাহিনীতে কিছু ক্ষমতা তৈরি করে। নীনবিকে রানী সেমিরিসকে বিয়ে করে টাইগ্রিস ও
ইউফ্রেতাস নদীর দুই পাড়ের সম্রাজ্য শাসন করতে থাকে। এসময় কোন একটি যুদ্ধে রানী
সেমিরিস বায়না ধরে রাজা নীনবিকের সাথে যুদ্ধে যাবে। রানী সেমিরিসের আবদার নীনবিকে
অগ্রাহ্য করতে না পেরে তাকে যুদ্ধে নিয়ে যাবার জন্য রাজী হয়। ততদিনে সেমিরিস
নীনবিকের সৈন্যবাহিনীর মধ্যেকার কয়েকজন সেনা প্রধানের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তলে
যাদের সাথে মিলে সেমিরিস রাজা নীনবিকে যুদ্ধের ময়দানে বা কোন এক দখল করা শহরে
হত্যার পরিকল্পনা করে বলে অনেকের ধারনা।
যেকোন একটি যুদ্ধে
রাজা নীনবিকের মৃত্যু হবার পর তার প্রধান স্ত্রীর মর্যাদা হিসেবে রানী সেমিরিসের
পুত্র সিংহাসনে বসার মর্যাদা পায়। কিন্তু তখন সেমিরিসের পুত্র রাজকুমার ছিলো শিশু
যার কারনে রাজ্যের সমস্ত দায়ভার রানী সেমিরিসের হাতে চলে আসে। শুরু হয় রানী
সেমিরিসের রাজত্ব। প্রাচীন মেসপোটেমিয়ার যত ইতিহাস আছে তার অনেক কিছুই তৈরি
হয়েছিলো এই রানী সেমিরিসের সময় যার মধ্যে অন্যতম ছিলো ব্যাবিলনের শুন্য উদ্দ্যান।
শুধু তাই নয় রানী সেমিরিস তখন বিজ্ঞানেও অনেক ভুমিকা রেখেছেন প্রাচীন সভ্যতার
জন্য। ধারনা করা হয় প্রাচীন গ্রিকে মিশরীয়দের পুর্বে যে ক্যালেন্ডার বা দিনপুঞ্জি
ছিল তা সেমিরিসের সময় তৈরি করা হয়েছিলো। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়নের দিকেও
সেমিরিসের নজর ছিলো যাতে অনেক অবদান আছে এই রানীর। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার চিকিৎসা
বিদ্যার বেশ কিছু সংস্কার করে সে। জ্যোতির্বিদ্যার উন্নয়নেও রানী সেমিরিসের দৃষ্টি
ছিলো। প্রাচীন মেসোপটেমিয় সভ্যতায় যত বিখ্যাত বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন
তাদের সবাইকে একত্রিত করে সব ধরনের সহোযোগিতা করেন। সেসময় ব্যাবিলনে দুইটি ভাষার
প্রচলন ছিলো বলে ধারনা করা হয়। একটি আরশীয়, অন্যটি প্রাচীন পারসীয় বলে পরিচিত।
সেমিরাস এই ভাষারও অনেক সংস্কার করেন বলে জানা যায়। এছাড়াও শিল্পকলা, ধর্ম ও
অন্যান্য অনেক বিষয়ে এই রানীর অবদানের ইতিহাস প্রচলিত আছে আজো।
সুত্রঃ সিক্রেট কুইন ও রোমান সভ্যতা, আইজ্যাক আসিমভ। ছবিঃ ORONOZ/ALBUM
সুত্রঃ সিক্রেট কুইন ও রোমান সভ্যতা, আইজ্যাক আসিমভ। ছবিঃ ORONOZ/ALBUM
---------- মৃত কালপুরুষ
৩০/১০/২০১৭







কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন