রবিবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৭

ইসলাম ও খৃস্টান ধর্মে প্যাগান ধর্মের কিছু আলামত।


কয়েকদিন আগে প্রাক ইসলামী যুগের একটি ধর্ম প্যাগান ধর্মের প্রধান দেবতা হুবাল নিয়ে দুইটি পর্ব লিখেছিলাম যেখানে কিছু মন্তব্যের উপরে ভিত্তি করে আজকের এই লেখাটি। মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের দাবী ইহুদীদের খ্রিস্টান ধর্ম থেকে সংশোধিত হয়ে আজকের এই ইসলাম ধর্ম মাথা উচু করে দাড়িয়েছে। আসলে ইসলাম এর মতো একেশ্বরবাদী চিন্তা ভাবনা তারও বহু আগেই ছিলো মিশরীও সভ্যতাতে সেটা আমরা আগে দেখার চেষ্টা করবো। মিশরে যুগে যুগে আজ থেকে ৫৫০০ বছর আগে শত শত দেব দেবীর সৃষ্টি হয়েছিলো যাদের ছিলো ভিন্ন ভিন্ন ক্ষমতা আর ভিন্ন ভিন্ন নাম রুপ আর আকৃতি। যুগে যুগে মানুষের দ্বারাই এই জাতীয় দেব দেবী ও ঈশ্বর তৈরি হয়েছিলো এতে কোন সন্ধেহ নাই। জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নতি করার সাথে সাথে মিশরের অনেক রাজারা তাদের ঈশ্বরে বিশ্বাস হারাতে থাকেন যাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন আমেন হোটেপদের একজন রাজা যে প্রথম এই মনুষ্য সৃষ্ট সকল ঈশ্বর এর চাল ধরতে পেরেছিলেন। তিনিই প্রথম নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবী করেছিলেন এবং মন্দির ও রাজ্যের সকল দেব দেবীদের মূর্তি ধ্বংশ করে তাদের পূজা করা বন্ধ করেছিলেন। কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি মানুষ গোপনে তখন তাদের পুর্বের দেব দেবীদের কাছে প্রার্থনা করতে থাকেন এবং রাজার মৃত্যুর পর আবার সেইসব দেব দেবীদের মুর্তিরা রাদের স্ব স্ব স্থানে ও মন্দির গুলিতে ফিরে গিয়েছিলেন। এটা ছিলো একেশ্বরবাদের প্রথম ধারনা।


এর অনেক পরে প্রায় ৩০০০ বছর পরে বর্তমান আরবের মক্কা নগরীতে প্যাগান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে দেখা যায় অনেক দেব দেবীদের মধ্যে একজন দেবতাকে প্রধান মনে করার প্রথা। প্যাগানদের প্রধান দেবতা ছিলো একজন এবং সহ দেবতা বা তার থেকে একটু কম শক্তিশালী দেবতা ছিলো অনেক। ইসলাম ধর্মের প্রচার শুরু হবার আগে বর্তমান মক্কার কাবা ঘরে সর্বোমোট ৩৬০ টি মুর্তির শক্ত অবস্থান ছিলো। শুধুই যে প্যাগান ধর্মাবলম্বীদের দেব দেবী এখানে ছিলো তা নয়। এখানে একত্রে বেশ কিছু ধর্মের মানুষ তাদের পূজা অর্চনা করতো। পরবর্তিতে যখন আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে ইসলামের প্রধান প্রচারক নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এই প্যাগান ধর্মাবলম্বীদের হত্যা করার মাধ্যমে একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রচার শুরু করলেন তখন খ্রস্টান বা ইহুদী ধর্মের কাহিনীর পাশাপাশি এই প্যাগান ও আরবের আদীবাসীদের ধর্মের দেবতা আর ঈশ্বরদের নাম সেই ধর্মের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।


কিন্তু এখন দেখা যায় প্রতিমা, মূর্তি, সাকার ঈশ্বর বা এই জাতীয় পৌত্তলিক বিশ্বাস এই ব্যপার গুলি ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মে সম্পুর্ণ নিষেধ করা হয়েছে কিন্তু কেন। আসলে বাস্তবতা বলে বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ৭০০ কোটি মানুষ আছে যার মধ্যে প্রায় ৫০০ কোটি মানুষ কোন না কোন ধর্মে বিশ্বাস করে এবং তা পালন করে থাকে। এর মধ্যে খ্রিস্টান, ইহুদী ও ইসলাম ধর্ম বিশ্বাসী মানুষেরা প্রায় ৩০০ কোটি যারা এই জাতীয় মূর্তি পূজা, সাকার ঈশ্বর, প্রতিমা বা পৌত্তলিকতায় কোন ভাবেই বিশ্বাস করা না এবং এর চরম পরিপন্থি তারা। কিন্তু একটু পুরাতন ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় এদের সাথে মুর্তি পূজার এক চরম মিল আছে।


ইসলাম ধর্মাবলম্বিদের প্রধান ঐশরিক কিতাব কোরানে লেখা আছে বেশ কিছু দেব দেবীর না যা শুধুই প্যাগান ধর্ম থেকেই আসেনি এসেছে অন্যন্য সভ্যতা থেকেও। এতে করে বোঝা যায় ইসলামের প্রধান প্রচারক ও নবী মুহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন এই সব দেব দেবীর ভক্ত যেমন - কোরানে বেশ কিছু সূরার নামকরন করা হয়েছে প্যাগান দেব দেবীর নামানুশারে। যেমন “তারিকা” এটা তখনকার সময়ের আরবের একজন নক্ষত্র দেবতার নাম ছিলো। “নসর” এটা আরবের প্রাচীন অধিবাসী বা আরবের আদীবাসীদের একজন দেবতার নাম যা কোরানের শেষ সূরা্র নাম। “শামস” ইসলাম ধর্মের পুর্বে আরব সহ সমস্ত মধ্যপ্রাচের একজন জনপ্রিয় সৌর দেবীর নাম এটা। পবিত্র কোরানে এদের নাম চলে আশার কারন একসময় ইসলামের পুর্বে এই সব দেব দেবীরা মানুষের দ্বারা পূজিত হয়ে আসতো আর এটা হচ্ছে তার একটি জলজ্যান্ত প্রমান।


এই সমস্ত উদাহরনের মাধ্যমে প্রমানিত হয় ইসলামের প্রধান প্রচারক নবী মুহাম্মদ (সাঃ) নিজেও এই ধরনের সাকার দেব দেবী ও পৌত্তলিকতায় প্রভাবিত হতেন এবং তার মধ্যেও পৌত্তলিকতা বিরাজমান ছিলো। এখন দেখুন মুসলিম ধর্মাবলম্বিদের যে হজ্জ্বের প্রবর্তক বলা হয় সে কে ছিলো বা কোথা থেকে এই হজ্জ্ব এসেছিলো। বর্তমান কাবা শরীফকে হজ্জ্বের সময় ৭ বার প্রদক্ষিন করা এই নিয়ম নবী মুহাম্মদ (সাঃ) করেননি বরং এটা ছিলো প্যাগান ধর্মাবলম্বিদের একটি নিয়ম যা পরবর্তীতে ইসলাম এর মধ্যে ঢোকানো হয়েছে। পাথরে চুম্মন করা ও সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তি স্থানে মিনা নামক যায়গায় কিছু স্তম্ভকে শয়তান মনে করে ৭ টি করে মোট ২১ টি পাথর মারা এগুলো সবই টোটেম প্রথার রুপান্তর হয়ে ইসলাম ধর্মের প্রথা হয়েছে। এই যে হজ্জ্বে গিয়ে মাথার চুল ফেলে দেয় মুসলিমরা এটাও এসেছে সেই প্যাগান ধর্মের দেবতা হুবালের তিন কন্যার মধ্যে এক কন্যা লাত এর পুজা থেকে যার নামেও মক্কা থেকে দুরে এই কাবা ঘরের মতো আরেকটি কাবা ছিলো যা তার নামে উৎসর্গ করা ছিলো। এইসবই খাটি পৌত্তলিক নিয়ম কানুন ও অন্য কিছু ধর্মের প্রথা যা আজ মুসলিমরা পালন করে থাকে। এখানে ইসলাম ধর্ম যা কিছু তার নিজের বলে দাবী করে তার ১০% এর মত নিজের তৈরি কোন প্রথা ইসলাম ধর্মে নাই। এগুলা যদি তখন ইসলাম ধর্ম এই সব ধর্ম থেকে নিজের বলে না চালাতো তাহলে এই ধর্ম কখনই ইসলাম নামক রাজনৌতিক দল থেকে ইসলাম নামক ধর্মে রুপান্তরিত হতে পারতো না।


এবার খ্রিস্টান ধর্মের দিকে তাকালে দেখবেন তাদের যে দশটি আজ্ঞা আছে তার মধ্যে উন্নতম আজ্ঞা হলো কোন প্রকারের প্রতিমা তৈরি করা যাবে না বা কোন প্রকারের সাকার দেবতা তৈরি করে তাকে পূজা করা সম্পুর্ণ নিষিদ্ধ। এখন দেখুন বাস্তবে আমরা কি দেখি খ্রিস্টান ধর্মে মাসে মাসে মিশরে যে ক্যাথলিক খৃষ্টানদের উপরে উগ্র আর জিহাদী মুসলামান জাতির হামলার কথা শুনি সেই ক্যথলিকরা দাবী করেন যে তারাই একমাত্র সঠিক খৃস্টান তাছাড়া কোন খৃস্টান জাতি সঠিক নয়। একেবারেই মুসলমানদের শিয়া ও সুন্নি জাতির মতো কথা। এক কথায় ক্যাথলিকদের গোড়া খৃস্টান বা মূল ধারার খ্রিস্টান বলা হয়ে থাকে। এদের মধ্যেও আবার মতোভেদ দেখা যায় যেমন অনেকে তাদের ক্যাথলিক মানতে চায় না আর অনেকে নিজেকে খৃস্টান বলতে চাই না। কিন্তু সব ক্যাথলিক গির্জা ও মন্দিরে আবার যীশু, মেরী ও জোসেফের মুর্তি থাকা বাধ্যতা মূলক। এদের মধ্যে দেখা যায় নারী ও শিশুরা গির্জার মধ্যে রাখা মা মেরির মুর্তির পায়ে চুমু খাচ্ছে বা মুর্তির গলায় মালা পরিয়ে দিচ্ছে যা মূলত এসেছে এই জাতীয় টোটেম প্রথা থেকেই। খৃস্টানদের মধ্যে যদি কেউ বলে এই জাতীয় নিয়ম কানুন এসেছে সেই প্যাগান বা টোটেম প্রথা থেকে তাহলে তাকে সেই গির্জা থেকে বহিঃষ্কার করা হয়। আসলে গির্জার ফাদারেরা অনেক নিষেধ করেও ধর্ম বিশ্বাসীদের এই মুর্তির পায়ে চুমু খাওয়া থেকে থামাতে পারেনি কারন ধর্ম বিশ্বাস মানুষকে কোন নিষেধ মানতে বাধ্য করেনা। পোকা মাকড়েরা যেমন আগুন দেখলে সেই আগুনে ঝাপিয়ে পড়ে ঠিক তেমনই বলা চলে ধর্মান্ধদের।


এই ধরনের সকল ধর্মই এসেছে এক সময়কার পৌত্তলিক কিছু ধর্ম থেকে যেখানে তাদের ঈশ্বর ছিলো সাকার এবং কোন একজন বা বহুজন। আর তাইতো তখনকার সময়ে এই সমস্ত ঈশ্বর এর মূর্তি ছিলো খুবই নরমাল ব্যাপার। তার অনেক আগেই মিশরীও সভ্যতার রাজারা নিরাকার ঈশ্বর বা একজন ঈশ্বর এর প্রচার শুরু করেছিলো যেটা পরবর্তিতে সেই রাজার মৃত্যুর পরে আর স্থায়ী থাকেনি কিন্তু তার পরে সেই ধারনা থেকে ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মে একজন ঈশ্বর বা একজন নিরাকার ঈশ্বর এর ধারনা চলে আসে। আসলে এটা ছিল পরবর্তি প্রজন্মের মানুষদের আরো সহজে ধোকা দেবার জন্য একটি দারুন পন্থা বা কৌশল। কিন্তু তার পুর্ব থেকেই মানুষের মনে যে সাকার ঈশ্বর যায়গা করে ছিলেন তা সম্পুর্ন দূর করতে পারেনি ধর্ম প্রচারকেরা। তবে এটুকু বলতে হয় এই জতীয় প্রথা গুলো পরবর্তি সকল ধর্মেই খুব কৌশল অবলম্বন করে ঢোকানো হয়েছে। এটা তখনকার সময়ে এই ধর্ম গুলির উদ্ভাবকেরা প্রভাবিত হয়ে বা তাদের ধর্ম টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে ও মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য তাদের ধর্মে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

----------- মৃত কালপুরুষ
                ০৯/১০/২০১৭     


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন