হুবাল দেবতা সম্পর্কে আমি আগের লেখাটিতে আপনাদের
হুবালের পরিচয় দিয়েছিলাম সাথে তার তিন কন্যা লাত, উজ্জা আর মানাত এর সাথেও সংখিপ্ত
পরিচয় করিয়েছি। আমার সেই লেখাটিতে এক ভাই একটি মন্তব্য করেছিলেন। তার মন্তব্য ছিলো
এরকম, যেই হুবাল বর্তমান সৌদিআরব এর মক্কা শহরের কাবা শরিফ এর প্রধান দেবতা ছিলো
সেই হুবালের মুর্তি বর্তমানে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কো তে দামাস্কাস মিউজিয়ামে
সংরক্ষিত আছে। যখন হুবালের মুর্তি সংরক্ষন করা বা স্থানান্তর করা হয় তখন মুর্তিটির
একটি হাত (ডান হাত) ভাঙ্গা ছিলো এবং সিরিয়ার বাদশা হাফিজ আল আসাদ সরকার সেই হাতটি
প্রতিস্থাপন করেন সোনা দিয়ে। এটা ছিলো তার করা মন্তব্যের মূল কথা কিন্তু সময়কাল তিনি
উল্লেখ করেনি সেখানে। তার কথায় একটু দ্বিমত আছে আমার। বিষয়টি বড় বলে মন্তব্য করে
উত্তর দেওয়া সম্ভব না তাই এই লেখার প্রথমেই তা যোগ করলাম।
আমরা হিশাম ইবনে
আল কালবি লিখিত কিতাব "আল-আসনাম" থেকে জানতে পারি, হুবালের মূর্তিটি আঁকা ছিলো যার ডান হাত
তখনই ভাঙা ছিলো এবং সেটা সোনার হাত দিয়ে প্রতিস্থাপিত। এখন আমার কথা হচ্ছে
বর্তমান সিরিয়া নামের দেশটির একটি শহর এর নাম হচ্ছে হোমস। আর এই শহরের বর্তমান বয়স
প্রায় ২০০০ বছর। কিন্তু সুলেমানি সাম্রাজ্য বা অটোমান সাম্রাজ্য শুরুর ইতিহাস
কিন্তু ১২৯৯ খ্রিষ্টপুর্ব থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯১৪-১৮ সাল
পর্যন্ত। তাহলে এই হোমস শহরে যখন মানুষ বসবাস শুরু করে তখন কিন্তু সেই যায়গার বা
সেই দেশের নাম সিরিয়া ছিলো না। আর আমরা জানি ইসলাম ধর্মানুসারীদের প্রধান নবী
মুহাম্মদ (সাঃ) তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে এই হুবাল অনুসারীদের সাথে
যুদ্ধে লিপ্ত হন যার নাম বদরের যুদ্ধ। আর তার ৬ বছর পরে তৎকালীন মক্কা শহর দখল
করার পরে বর্তমান কাবা শরিফ যা তখন ছিলো এই হুবাল দেবতার মন্দির সেই মন্দির থেকে
হুবাল সহ সর্বোমোট ৩৬০ টি মুর্তি সরিয়ে ফেলেন বা একেবারেই ধ্বংস করে ফেলেন যাতে
পরবর্তিতে মুহাম্মদ (সাঃ) এর তৈরি করা ইসলাম ধর্ম বিতর্কিত না হয়। নবী মুহাম্মদ
(সাঃ) প্যাগান ধর্মের সম্পৃক্ততা ধ্বংস করেছিলেন সাদ ইবনে যায়িদ আল আশহালি এর সাথে ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে। তাহলে বর্তমানে
যদি দামস্কাস মিউজিয়ামে কোন হুবালের মুর্তি সংরক্ষিত থাকে সেটা কি এই হুবাল। আর
হলেও নবী মুহাম্মদ (সাঃ) তখন কি ধ্বংস করেছিলেন।
আবার আমরা হুবাল
প্রসঙ্গে ফিরে যায়। ইসলাম ধর্মের প্রধান নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্মেরও অনেক আগে
মানে কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই মক্কা শহরের এই কাবা নামক মন্দিরটি বিভিন্ন ধর্মীয়
মানুষের একটি ধর্মীয় উপাশনালয় ছিলো। কাবা প্যাগান ধর্মাবলম্বীদের দেওয়া একটি নাম।
কাবা শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে চারকোনা বা বর্গাকার। প্যাগান ধর্মাবলম্বি সহ মক্কার
আদীবাসীদের বিভিন্ন দেব দেবীর মুর্তিতে কাবা পরিপুর্ন ছিলো। সেখানে একই সাথে অনেক
ধর্মের মানুষের অনেক রকম আচার অনুষ্ঠান পালন করা হত। যায়গাটি ইসলাম ধর্ম তৈরি হবার
আগ পর্যন্ত একটি সাংস্কৃতিক অঙ্গন হিসেবেও পরিচিত ছিলো সেখানে নাচ গান এর কথাও
উল্লেখ আছে অনেক যায়গায়। ছবি আকার প্রতিযোগিতা হতো কাবা সহ তার আশেপাশের অঞ্চলে।
আর বর্তমানে যে কাবা শরিফ তা ছিলো এই হুবাল দেবতার নামে উৎসর্গ করা মন্দির। আর এই
কাবা সহ মক্কার প্রধান দেবতা ছিলো এই হুবাল। সেই হুবালের তিন কন্যা, তিন প্রধান
দেবী লাত, উজ্জা ও
মানাতের মূর্তি ছিল এই কাবা শরিফে ও আরো দুইটি কাবা ঘরে যা পরে ইসলাম প্রচারক
নবী মোহাম্মদ (সাঃ) তার দলবল নিয়ে ভেঙ্গে ফেলেন।
ইসলামের আজকের দিনে আল্লাহ্ বলতে যেমন একমাত্র
ঈশ্বর বোঝায়, ইসলাম আবির্ভাবের
পুর্বে আরবে তা ছিল না। আল্লাহ শব্দটির ইতিহাস ইসলামের চেয়ে অনেক প্রাচীন এবং বহুল
প্রচলিত। ‘আল্লাহ্’ শব্দটির অর্থ নিয়ে
বিভিন্ন ধরণের মতামত পাওয়া যায়। নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর
বাবার নাম ছিল আবদ আল্লাহ্ বা আব্দুল্লাহ ইবন আবদ আল মুত্তালিব। আবদ আল্লাহ বা
আব্দুল্লাহ অর্থ ‘আল্লাহ্-এর দাস। আমরা জানি যে নবী
মোহাম্মদ এর পিতা তার জন্মের আগে মারা গিয়েছেন। আর ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু হয়েছে
মুহাম্মদ (সাঃ) এর বয়স যখন ৪০ বছর তখন থেকে। তার আগে কিন্তু ইসলাম ধর্ম বা তার প্রধান
ঈশ্বর আল্লাহ ছিলেন না। তাহলে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর পিতা কোন আল্লাহর দাস ছিলেন। প্রাক-ইসলামী খ্রিস্টান, ইহুদি ও হানাফি নামে পরিচিত
একেশ্বরবাদী আরবরা ‘বিসমিল্লাহ্’ শব্দটিও
ব্যবহার করত। আরবের শিলালিপিগুলিতে ইসলামের আবির্ভাবের কয়েক শতাব্দীর আগেও ‘আল্লাহ্’-কে সর্বোচ্চ দেবতা বা সৃষ্টিকর্তা দেবতা
হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ধারনা করা হয় এই আল্লাহ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে এই
হুবাল দেবতা থেকে। হুবালের থেকে আরেকটু কম ক্ষমতার দেবতা ছিলেন মানাফ নামের আরেক
দেবতা। মক্কাবাসীদের আরেকটি অন্যতম দেবতা ছিলেন এই মানাফ(আরবি:
مناف)। তিনি ছিলেন নারী ও ঋতুস্রাবের দেবতা। যার নামে মিল রেখে তখনকার সময়ে
শিশুদের নাম রাখা হত। যেমন, Abd Manāf al Mughirah ibn Quṣai নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্র-প্র-পিতামহ, Hashim
ibn ‘Abd Manaf al Mughirah নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রপিতামহ এবং Wahb ibn `Abd Manaf নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর মাতা আমিনার পিতার নাম ছিলো।
এহাড়াও তখন মক্কায় তিন প্রধান দেবী ছিলো এই দেবতা হুবাল এর তিন
কন্যা লাত, উজ্জা ও মানাত। এদের প্রত্যেকের বিশেষ
বিশেষ ক্ষমতা এবং কাজের ক্ষেত্র ছিল এবং মক্কা কাবা ও তাইফের কাছে মূর্তি সহ মন্দিরও
ছিল। সেই সকল মূর্তিই পরিবর্তীতে বদরের যুদ্ধে ও মক্কা দখলের পরে ধ্বংস করে ফেলা
হয়েছে যাতে ইসলাম ধর্ম বিতর্কিত না হয়।
লাত ছিলো সমস্ত আরবের দেবী যাকে চন্দ্রের দেবী বলা হত। লাত বা আল-লাত ছিল আরবের প্রাক-ইসলামী যুগের একজন দেবী। সে মক্কার তিনজন
প্রধান দেবীর একজন। মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরীফের ৫৩ নম্বর সুরা
নজমের ১৯ নম্বর আয়াত বা বাক্যে লাতের কথা বর্ণিত হয়েছে, যা
থেকে জানা যায় ইসলাম-পূর্ববর্তী সময়ে আরবের অধিবাসীগন মানাত ও উজ্জার সাথে
লাতকেও ঈশ্বরের মেয়ে হিসেবে বিবেচনা করতো। মতান্তরে, আল-লাত
(ইলাহ) থেকেই আল্লাত বা আল-ইলাহ বা আল্লাহ নামের উৎপত্তি, সে
ক্ষেত্রে আল্লাহ স্ত্রীবাচক এবং সেই পৌরাণিক দাবিই বেশি জোরালো।
এবার উজ্জা কে নিয়ে আলোচনার পালা। উজ্জা ছিলো প্রাক ইসলামিক যুগে
মক্কার কাবা ঘরে অবস্থিত তিন মুর্তি লাত ও মানাতের মাঝখানের মুর্তি। এই উজ্জাকেও
সেই সময়ের কুরাইশ বংশের লোকেরা হুবালের মতো সমৃদ্ধি ও কল্যানের আশায় পুজা করতো। মক্কা বিজয়ের পর নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর নির্দেশে
খালিদ বিন ওয়ালিদ তার একটি অভিযানের মাধ্যমে নাখলা নামক স্থানে উজ্জার প্রতি
উৎসর্গীকৃত একমাত্র মন্দির ও তার ভেতরে অবস্থিত উজ্জার দু'টি মূর্তিই ধ্বংস করে দেন।
মানাত হলো ইসলাম-পূর্ব যুগে মক্কায়
পৌত্তলিকদের তিন প্রধান দেবীর অন্যতমা আরেক দেবী। আল লাত, উজ্জা
ও মানাত এই তিন দেবীর মধ্যে মানাত সবচেয়ে প্রাচীন। মতান্তরে, মানাতকে হুবালের স্ত্রীও বিশ্বাস করে কেউ কেউ। প্রাচীন আরবগণ তাদের
সন্তানদের নামকরণ আবদ মানাত এবং যায়িদ মানাত করতো। মানাতের মূর্তি কুদায়িদ-এর
নিকটবর্তী সমুদ্র উপকূলে ছিল, যা মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী
স্থান। আরবগণ তাকে অর্চনা ও তার কাছে উৎসর্গ করতো। আউস, খাজ্রায,
মক্কা-মদিনা ও তাঁর আশেপাশের নাগরিকরা তার পূজা করতো, তার কাছে বলি দিতো এবং তাকে নৈবেদ্য প্রদান করতো। আউস, খাজ্রায এবং ইয়াশ্রিবরা তীর্থযাত্রায করতো বর্তমানে মুসলমানেরা যেমন
হজ্জ্ব পালন করে থাকে। হজ্জ্ব শব্দের পুরাতন অর্থ হচ্ছে মুর্তি দর্শন করা। তীর্থযাত্রার
পরে তারা বাড়ি ফিরতো না বরং যেখানে মানাত পূজা হয়েছিল, সেখানে
মস্তকমুণ্ডণ করতো এবং কিছু সময় অতিবাহিত করতো। মানাত দর্শন না করা পর্যন্ত তারা
তীর্থযাত্রা অসম্পূর্ণ মনে করতো। বর্তমানে হজ্বগামী হাজ্বীদের যেমন মাথামুণ্ডণ
করতে হয়।
ইসলাম ধর্মের প্রধান নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর আবির্ভাবের
পূর্ব পর্যন্ত আরবগণ মানাতের পূজা করত। মানাতের মন্দির নবী মুহাম্মদ (সাঃ) নির্দেশে
সাদ ইবনে যায়িদ আল আশহালি জানুয়ারি ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে ধ্বংস করেন।
এই লেখাটিতে
ইচ্ছা ছিলো হুবাল দেবতা কিভাবে তৎকালীন আরবের কয়েক হাজার বছর ধরে প্রচলিত প্যাগান
ও আরবের আদীবাসী ধর্মানুসারীদের মধ্যে এসেছিলো সেটা নিয়ে কথা বলার। কিন্তু হুবাল ও
তার তিন কন্যা লাত, মানাত ও উজ্জা সম্পর্কে এই তথ্য গুলোও দরকার ছিলো আগে জানার।
পরবর্তি লেখাতে বর্তমান কাবা ঘর ও ধ্বংস করে ফেলা আরো দুইটি কাবা ঘর ও হুবাল সম্পর্কে
আরো জানানোর চেষ্টা করবো।
----------
মৃত কালপুরুষ
০৪/১০/২০১৭








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন