প্রাপ্ত ইতিহাস
অনুযায়ী ধারনা করা হয় মিশরীয়রা পৃথিবীতে সবার আগে নৌকার ব্যাবহার ও আবিষ্কার করলেও
খ্রিস্টপুর্বাব্দ ২০০০ এর দিকে প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতাতে নৌকা বাইচের মতো একটি
প্রতিযোগীতার উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতার মানুষেরা তাদের
ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রীস নদীতে একধরনের নৌকা বাইচের আয়োজন করতো। পরবর্তীতে অবশ্য
মিশরীয় সভ্যতাতে তাদের নীল নদে এই নৌকা বাইচের চল শুরু হয়েছিলো। তাই নৌকা বাইচ এর
আদি ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে মেসোপটেমীয় ও মিশরীয় সভ্যতার সাথে। প্রাচীন এই প্রতিযোগীতাকে
এখনো টিকিয়ে রাখতে অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয় আজো আয়োজন করে এই
প্রতিযোগিতার। এবং এটি একটি জনপ্রিয় প্রতিযোগীতা হিসেবেই স্বীকৃত। নৌকা বাইচ ১৯০০
সাল থেকে অলিম্পিক প্রতিযোগাতায় বিশ্বব্যাপী একটি জনপ্রিয় প্রতিযোগীতা। অলিম্পিকে
১৯০০ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মোট ১৩৫ টি ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছে যার মধ্যে ২৬
বার যুক্ত্ররাষ্ট্র, ২৫ বার জার্মানী ও ১৪ বার যুক্ত্ররাজ্য বিজয়ী হয়।
প্রাচীন ভারতবর্ষে
নৌকা বাইচ এর প্রচলন হয় ব্রিটিশদের মাধ্যমে। “বাইচ” শব্দটি একটি ফরাসি শব্দ, যার
বাংলা অর্থ হচ্ছে প্রতিযোগিতা। নৌকা বাইচ ভারতবর্ষে চালু হবার পর ধীরে ধীরে তা এই
জনপদের মানুষের মধ্যে একটি জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে এই অঞ্চলের
নদী প্রধান দেশ গুলিতে এই প্রতিযোগিতাকে সেখানকার মানুষেরা আপন করে নিতে থাকে। নদীমাতৃক
বাংলাদেশে নৌকাবাইচ লোকায়ত বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অংশ। তবে কবে এদেশে গণবিনোদন
হিসেবে নৌকাবাইচের প্রচলন হযেছির তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না।
"বাইচ" শব্দটির বুৎপত্তি বিবেচনা করে অনুমিত হয়েছে যে মধ্যযুগের
মুসলমান নবাব, সুবেদার, ভূস্বামীরা, যাদের
নৌবাহিনী দ্বারা এই প্রতিযোগিতামূলক বিনোদনের সূত্রপাত করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে
দুটি জনশ্রুতি আছে। একটি জনশ্রুতি জগন্নাথ
দেবের স্নানযাত্রাকে কেন্দ্র করে। জগন্নাথ দেবের স্নান
যাত্রার সময় স্নানার্থীদের নিয়ে বহু নৌকার ছড়াছড়ি ও দৌড়াদৌড়ি পড়ে যায়।
এতেই মাঝি-মাল্লা-যাত্রীরা প্রতিযোগিতার আনন্দ পায়। এ থেকে কালক্রমে নৌকাবাইচের
শুরু। দ্বিতীয় জনশ্রুতি পীরগাজীকে কেন্দ্র
করে। আঠার শতকের শুরুর দিকে কোন এক গাজী পীর মেঘনা নদীর এক পাড়ে দাঁড়িয়ে অন্য
পাড়ে থাকা তার ভক্তদের কাছে আসার আহ্বান করেন। কিন্তু ঘাটে কোন নৌকা ছিল না।
ভক্তরা তার কাছে আসতে একটি ডিঙ্গি নৌকা খুঁজে বের করেন। যখনই নৌকাটি মাঝ নদীতে এলো
তখনই নদীতে তোলপাড় আরম্ভ হল। নদী ফুলে ফেঁপে উঠলো। তখন চারপাশের যত নৌকা ছিল তারা
খবর পেয়ে ছুটে আসেন। তখন সারি সারি নৌকা একে অন্যের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে।
এ থেকেই নৌকা বাইচের গোড়াপত্তন হয়।
নদীমাতৃক এই বাংলাদেশে
মুসলিম যুগের নবাব-বাদশাহদের আমলে নৌকা বাইচ বেশ জনপ্রিয় ছিল। অনেকে মনে করেন, নবাব বাদশাহদের নৌ বাহিনী থেকেই নৌকা বাইচের
গোড়াপত্তন হয়। পূর্ববঙ্গের ভাটি অঞ্চলের রাজ্য জয় ও রাজ্য রক্ষার অন্যতম কৌশল
ছিল নৌ শক্তি। বাংলার বার ভূঁইয়ারা নৌ বলেই মোগলদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। মগ ও
হার্মাদ জলদস্যুদের দমনে নৌ শক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখে। এসব রণবহর বা নৌবহরে
দীর্ঘাকৃতির ছিপ জাতীয় নৌকা থাকত।
বাংলাদেশের বিভিন্ন
জেলায় নৌকার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায়। ঢাকা, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ
ইত্যাদি এলাকায় বাইচের জন্য ব্যবহৃত হয় সাধারণত কোশা ধরনের নৌকা। এর গঠন সরু এবং
এটি লম্বায় ১৫০ ফুট থেকে ২০০ ফুট হয়। এর সামনের ও পিছনের অংশ একেবারে সোজা। এটি
দেশিয় শাল, শীল কড়ই, চাম্বুল
ইত্যাদি গাছের কাঠ দ্বারা তৈরি করা হয়। টাঙ্গাইল ও পাবনা জেলায় নৌকা বাইচে সরু ও
লম্বা দ্রুতগতিসম্পন্ন ছিপ জাতীয় নৌকা ব্যবহৃত হয়। এর গঠনও সাধারণত সরু এবং এটি
লম্বায় ১৫০ ফুট থেকে ২০০ ফুট, তবে এর পিছনের দিকটা
নদীর পানি থেকে প্রায় ৫ ফুট উঁচু ও সামনের দিকটা পানির সাথে মিলানো থাকে। এর
সামনের ও পিছনের মাথায় চুমকির দ্বারা বিভিন্ন রকমের কারুকার্য করা হয়। এটিও শাল, গর্জন, শীল
কড়ই, চাম্বুল ইত্যাদি কাঠ দ্বারা তৈরি করা হয়। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আজমিরিগঞ্জ
ও সিলেট অঞ্চলে বাইচের জন্য সারেঙ্গি নৌকা ব্যবহার করা হয়। এটি সাধারণত ১৫০ ফুট
থেকে ২০০ ফুট লম্বা হয় এবং এর প্রস্থ একটু বেশি (৫ থেকে ৬ ফুট) হয়ে থাকে। এগুলির
সামনের ও পিছনের দিকটা হাঁসের মুখের মতো চ্যাপ্টা এবং পানি থেকে ২-৩ ফুট উঁচু
থাকে। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী জেলার নিম্নাঞ্চল ও সন্দ্বীপে বাইচের
জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সাম্পান। এটির গঠন জাহাজের মতো। ঢাকা ও ফরিদপুরে
ব্যবহৃত হয় গয়না নৌকা। এগুলির দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০ থেকে ১২৫ ফুট এবং মাঝখানটা ৮-৯
ফুট প্রশস্ত। গয়না নৌকার সামনের দিক পানি থেকে ৩ ফুট উঁচু এবং পিছনের দিক ৪-৫ ফুট
উঁচু।
এই লিঙ্ক এর ভিডিওটি ২০১৪
সালে গোপালগঞ্জ, বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের ফুটেজ যা প্রবাসী এক বড়
ভাই “জয়ন্ত” ড্রোন দিয়ে ভিডিও করেছিলেন। এই নদীটি গোপালগঞ্জের কালীগঙ্গা নদীর একটি
শাখা যা পুর্বে আরো অনেক বড় ছিলো। বর্তমানে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই ধরনের ছোট
বড় অনেক আয়োজনে আমরা সরাসরি অংশগ্রহন করতে পারিনা তাই আমাদের অনেকের পক্ষে এমন
দৃশ্য দেখা সম্ভব হয়না। সেই সাথে বর্তমান প্রজন্ম এই নৌকা বাইচ প্রতিযোগীতার সাথে
খুব একটা পরিচিত না তাই এই ভিডিওটি শেয়ার করা।
---------- মৃত
কালপুরুষ
০৯/১১/২০১৭




কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন