বাংলা
ভাষায় কলুর বলদ শব্দটি আমরা প্রায় ব্যাবহার হতে দেখি বিভিন্ন কারনে। আসলে এটি ছিল
একটি বাগধারা যার অর্থ দাঁড়ায় “এক টানা খাটুনি করে যে” তাকে কলুর বলদ বলা হয়।
আমাদের বর্তমান প্রজন্ম এই কলু ও তার বলদের সাথে খুব একটা পরিচিত না। কারন কলুর
কার্যক্রম আমাদের এই দেশ থেকে অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। এখন আর এদের একেবারেই দেখা
যায় না। তবে কলু যেভাবে তার কার্য উদ্ধার করে নিত তার বলদকে ব্যাবহার করে ঠিক
তেমনই একটি পদ্ধতীর প্রয়োগ এখনও আমাদের এই পৃথিবীতে প্রচলিত আছে। মানুষ অনেকে সময়
বুঝে আবার অনেক সময় না বুঝেও এই পদ্ধতীর মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন। এর কারন হচ্ছে তার আশৈশব
মেনে চলা একটি প্রথা থেকে কিন্তু বেরিয়ে আসা সম্ভব হচ্ছে না তার প্রতিকুল পরিবেশের
কারনে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে অনেকটা বাধ্য হয়েই এই কলুর বলদের মতো মেনে
নিতে হচ্ছে। আসুন তাই আগে একটু জেনে নেই এই কলু কাকে বলা হতো এবং তার বলদের পরিচয়।
একটা সময়
ছিলো আমাদের এই বাংলায় প্রচুর তৈল বীজ ফলতো যেমন সর্ষে, তিল ইত্যাদি। এসব তৈল বীজ
থেকে তেল আলাদা করার কোন উন্নত পদ্ধতী তখন আমাদের দেশে খুব একটা ছিলো না। তখন
একধরনের দেশীয় একটি পদ্ধতীতে এই কার্য সম্পাদন করা হতো। আর সেই দেশী তেল পেশাই
যন্ত্রকে ঘানি, ঘানিযন্ত্র, ঘানিকল বা ঘানিগাছ বলা হতো। অর্থাৎ যে যন্ত্রে সর্ষে বা সেরকম কোনো তৈলবীজকে
নিষ্পেষণ করে তেল ও খোল আলাদা করা হতো তাকে ঘানি, ঘানিযন্ত্র, ঘানিকল বা ঘানিগাছ বলা হতো । "তৈল নিষ্পেষণ" একটি
প্রাচীন জীবিকা হিসেবে পরিচিত ছিলো। এই পেশার লোকেদের বলা হতো কলু। ঘানি কাজ করে ঘূর্ণন দ্বারা।
সাধারণতঃ ঘানি টানবার জন্য কলু বলদ (গরু) ব্যবহার করতো। তাই থেকে "কলুর বলদ"
বাগধারাটি এসেছে। অর্থাৎ সারাদিন একটানা ঘানি টানা যার কাজ। কলুর বলদের অনেক সময়
চোখ বাঁধা থাকতো। কারন চোখে না দেখতে পেলে সে ভাবতো যে এখনো পথ শেষ হয়নি তাই হাটতেই
থাকতো এই ভেবে যে এই পথ নিশ্চয় একসময় না এক সময় শেষ হবেই। কিন্তু সে বুঝতে পারতো
না যে সে ঘানিকলের চারপাশেই দিনভর পাক খাচ্ছে এই চোখ বাধা থাকার কারনে। ঘানি টানা
খুব পরিশ্রমের কাজ ছিলো। তাই আগেকার দিনে সশ্রম কারাদন্ডের বন্দীদের দিয়ে জেলের
মধ্যে ঘানি ঘোরানো হত। তাই থেকে জেলে যাওয়াকেই অনেক সময় জেলের ঘানি ঘোরানো বলা
হয়ে থাকে।
এখন একটু
ধর্ম বিষয়ক কিছু আলোচনা করি। আসলে ধর্ম নিয়ে কিছু লিখতে বা বলতে গেলেই প্রচন্ড ভয়
লাগে। মানে ধর্মের সাথে তো ভয় আর লোভ অনেক আগে থেকেই জড়িত ছিলো তারপরেও নতুন করে ধর্ম নামটি উচ্চারন করলেই
কেমন যেন একপ্রকারের ভয় কাজ করে। কারন এখন দেশের মানুষের ধর্মানূভূতি খবই প্রবল।
বলা তো যায়না, যে কোন সময় তাতে আঘাত লেগে যেতে পারে। আমি আসলে কারো ধর্মানুভূতিতে
আঘাত করতে চাইনা বা ধর্মনানুভূতিতে আঘাত করছি না। আসলে মানব সভ্যতাই এই ধর্মের
উৎপত্তি উত্তর পুরুষ পৃথিবীতে ধর্মের কিভাবে শুরু কিংবা উৎপত্তি হয়েছিলো তা নিয়ে
না্নান মত ও নানান ব্যাখ্যা আছে সেই সাথে আছে শত শত ইতিহাস। তবে সব থেকে বেশি
গ্রহনযোগ্য হচ্ছে আদিম যুগে মানুষ তাদের সমাজ পরিচালনা করতে এই ধর্মের প্রচলন শুরু
করেছিলো। সমাজের কিছু বুদ্ধিমান মানুষেরা তাদের নিজস্ব ধ্যান ধারনা ও কল্পনা শক্তি
দিয়ে তৈরি করেছিলো কিছু কল্পিত ঈশ্বর এবং মানুষের কাছে প্রচার করেছিলো এই ঈশ্বররাই
আমাদের এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছে, আমাদেরকেও সৃষ্টি করেছে। তাই আমাদের উচিত হবে সেই
ঈশ্বরের নামে প্রার্থনা করা এবং তাকে খুশি করা। সেই থেকেই এই ধর্মের শুরু। আর যুগে যুগে তা মানুষের জ্ঞান
বুদ্ধি বিজ্ঞানের সাথে তাল মিলিয়ে সমান ভাবে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু বর্তমানের এই
উন্নত তথ্য প্রযুক্তির যুগে এসে আর সেই ধর্মের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মানুষ মনে করছে
না।
এ
পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সংখ্যা প্রায় ৪০০০ তবে ধর্মের সন্ধান পাওয়া
গিয়েছে প্রায় ৫২০০ টি। বর্তমানে পৃথিবীতে খুব শক্তভাবে আর শীর্ষ অবস্থানে টিকে
থাকা ধর্মের মধ্যে প্রথমেই আছে খ্রিস্টান, ইসলাম, হিন্দু, ইহুদী, বৌদ্ধ ধর্মগুলি।
তবে এই সকল ধর্মের কোন ধর্মই আসলে তার ধর্মের উৎপত্তি নিয়ে খুব বেশি জানতে দিতে
চাই না। প্রতিটি ধর্মই তার উৎপত্তি ও স্ব স্ব ধর্ম নিয়ে তার অনুসারিদের বেশি
চিন্তা করতে নিষেধ করে এবং শুধু চোখ বন্ধ করে পালন করতে বলে। তাই তো সকল ধর্মই শুধু এককভাবে
চাই তাদেরকে শুধুই বিশ্বাস করতে হবে। আসলে মানুষ কখনও ভেবে দেখে না এই বিশ্বাসের
সংজ্ঞা কি। বিশ্বাস এমন কিছুকেই করতে হয় যার কোন অস্তিত্ব নেই বা যাকে কেউ প্রমান
করতে পারবে না। আর যারা এই ধর্মের অনুসারিদের স্ব স্ব ধর্মের ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগ
করিয়ে দেন তারাই হচ্ছে সেই ধর্মের ঈশ্বরের এজেন্ট। যারা এই সকল ধর্মের নিয়ম কানুন
মানুষদেরকে শেখায়, তাদের পালন করতে বলে এবং এসকল কিছুকেই ঈশ্বরের কথা বলে চালায়
তাদেরকেই আমরা মূলত ঈশ্বরের এজেন্ট হিসেবে জানি। কারন ঈশ্বর কিন্তু সরাসরি এসে
মানুষকে কোন আদেশ উপদেশ দেয় না তা দেয় এই ঈশ্বরের এজেন্টরাই।
কলুর বলদ
বাগধারাটির চলন এখন খুব একটা কম আছে বলা যাবে না। কারন দেখুন কলু যেভাবে তার বলদের
চোখ বেধে তাকে ঘানিকলের চারিপাশে দিনভর ঘুরিয়ে নিজের কার্য হাসিল করে নিতো বর্তমান
যুগের এই ধর্মীয় এজেন্ট রা কিন্তু সেই একই পদ্ধতীতে তাদের কার্য সম্পাদন করে
চলেছে। পার্থক্য শুধু এটুকুই এখানে কলু তার বলদের চোখ এক টুকরো কাপড় দিয়ে বেধে এই
কাজ করতো। কিন্তু এখানে বিভিন্ন ধর্মের এজেন্টরা কাপড়ের যায়গায় ঈশ্বরের প্রতি একটি
আজগুবি বিশ্বাস এর কথা বলে তাদেরকে সেই বিশ্বাসের প্রতি অটল রেখে তাদের এই কাজ করে
চলেছে। আর এই বিশ্বাস নামক একটুকরো কাপড়ের কারনে সেই সব ধর্মের অনুসারিরা ধর্মীয়
শিক্ষার বাইরে অনেক অজানা সত্য যার কিছুই জানতে পারছে না। জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা
থেকে দুরেই থেকে যাচ্ছে। দিনের নির্দিষ্ট একটি সময় তারা তাদের ঈশ্বরের প্রার্থনায়
ব্যয় করছে যার ফলে অন্যান্য জ্ঞানের চর্চা তারা করতে পারছে না। আর এসমস্ত ধর্মীয়
এজেন্টরা তাদেরকে এটাও শিক্ষা দিচ্ছে যে এর বাইরে আর অন্য কিছু জানা যাবে না। আর
যদি কেউ তা করতে যায় তাহলে ঈশ্বর অখুশি হবে।
সম্প্রতি
ফেসবুক ও বিভিন্ন মুক্তচিন্তা চর্চার ওয়েবসাইট গুলিতে এই “কলুর বলদ” নামে একটি
ওয়েবসাইটের কথা আমরা সবাই শুনছি। বাংলাদেশ সহ পশ্চিমবঙ্গ ও পৃথিবীর নানান দেশ থেকে
বাংলাভাষী মুক্তচিন্তক, যুক্তিবাদী এবং মানবতাবাদীদের একটি মিলন মেলা হতে যাচ্ছে
এই সাইটটি এমন কথা শোনা যাচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি প্রধান ধর্মের প্রান
কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এসে মুক্তবুদ্ধি চর্চার সাথে এগিয়ে চলা একজন সাহসী পুরুষ যার
নাম “আব্দুল্লাহ আল মাসুদ” জিনি মুলত ছিলেন একজন (একটি ধর্মের মূফতী) তাকেও এই
“কলুর বলদ” নামক সাইটের সাথে দেখা যাবে। হ্যা, তবে এখন এটা শুধুই অপেক্ষার পালা আসলেই কি
হতে যাচ্ছে সেটা দেখার। আমি যতটুকু জানি এখন পর্যন্ত এই সাইটটি তৈরি করার জন্য
অনেক মুক্তমনা মানুষ একত্রে কাজ করে চলেছেন। আমার কাছে এখন পর্যন্ত এই সাইটের কোন
লিংক নেই তাই আমি সেটা আপনাদের দিতে পারছি না। তবে আপনাদের আমি এই নামটি জানিয়ে রাখছি
“কলুর বলদ” নামে একটি মুক্তচর্চার মাধ্যম যার শ্লোগান “সংশয় দূর হোক” আগামীতে
আমাদের সামনে আসছে। আসলে আমরা সবাই চাই শতাব্দী প্রাচীন ভাববাদী দর্শনের বিপরীতে ও
আজন্ম লালিত ধর্মীয় ও সামাজিক নিবর্তনমূলক সকল অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে এমন কিছু
আলোচনা চক্র তৈরি হোক যেখানে শুধুই যুক্তি ও জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা করা হবে।
----------
মৃত কালপুরুষ
১৫/১১/২০১৭


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন