মঙ্গলবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৭

ব্যাবিলনের কিংবদন্তী রানী সেমিরাস (সাম্মু-রামত)এর সত্য গল্প।


সভ্যতার শুরু থেকে আমরা অনেক নারীর অবদানের কথা শুনে আসছি ইতিহাসের পাতায়। আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির দার্শনিক হাইপেশিয়াকে আমরা অনেকেই চিনি। তাকে নির্মম ভাবে ধর্মের দোহায় দিয়ে হত্যার কথা আজো আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। প্রায় ১৬০০ বছর আগে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হওয়া সুন্দরি নারী হাইপেশিয়া। শিল্পির তুলিতে হাইপেশিয়ার কাল্পনিক রুপের সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে এখনও অনেকেই। আজ হাইপেশিয়া নয়, আজকে হাইপেশিয়া থেকেও প্রায় ১৩০০ বছর পুর্বের প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার আরেক সুন্দরী নারীর কথা বলবো। যে সেসময় সমস্ত ব্যাবিলনের রাজ্যভার হাতে তুলে নিয়েছিলেন।


আজ থেকে প্রায় ৪ হাজার বছর আগের প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় মহিলা শাসক ছিলেন একজনই যার নাম ছিলো সেমিরাস বা সাম্মু-রামত। তিনি ছিলেন একমাত্র নারী যে শক্তিশালী অশূরীয় সাম্রাজ্য শাসন করেছে, সেমিরাস রোমান যুগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত লেখক এবং চিত্রশিল্পীদেরকে অনেক ভাবিয়েছে তার রুপের কারনে। বর্তমান যুগেও ইতিহাসবীদদের চিন্তার মধ্যমনি হয়ে আছেন এই রানী। এর কারন হচ্ছে সেই সময়ে প্রাচীন মেসোপটেমিয়াতে মহিলা শাসক খুবই বিরিল ছিলো। কিন্তু এই রানী সেসময়ে রাজত্ব করে ইতিহাসে এক বিরাট চিহ্ন রেখে গিয়েছেন। আধুনিক কালের ইরাক , সিরিয়া, তুরস্ক,ইরান সহ আরো কয়েকটা দেশের কিছু কিছু দেশগুলোর অংশ নিয়ে গঠিত ইউফ্রেটিস এবং টাইগ্রীস নদীর অববাহিকা স্থল হল প্রাচীন কালের মেসোপটেমিয়া। যার প্রধান কেন্দ্র ছিলো ব্যাবিলন। আর এই ব্যাবিলনের শুন্যু উদ্দ্যান বা ঝুলন্ত বাগান আজ পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষের কাছে একটি আশ্চর্যের বিষয় হয়ে আছে। আর ইতিহাসবিদদের ধারনা এই ব্যাবিলনের শুন্য উদ্দ্যান এই রানী সেমিরাস অথবা সম্রাট নেবুচাদনেজার এর যে কোন একজন বানিয়েছিলেন। তবে সম্রাট নেবুচাদনেজার বেশি গ্রহন যোগ্য এখন পর্যন্ত। ধারনা করা হয় খৃষ্টপুর্বাব্দ ৯০০ সালের দিকে বর্তমান এশিয়া মাইনর থেকে আজকের সমগ্র ইরান পর্যন্ত পর্যন্ত এই নারী শাসন করেছিলো একসময়।


গ্রীক লেখক এবং ইতিহাসবিদদের মতে রানী সেমিরাস এর রাজত্বকাল খুবই সংক্ষিপ্ত হলেও তিনি এই অল্প সময়ে অনেক অবদান রেখেছিলেন প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়। তার রাজত্ব পাওয়া নিয়ে অনেক ইতিহাস প্রচলিত আছে, তবে এর মধ্যে সব থেকে বেশি গ্রহনযোগ্য ইতিহাস হচ্ছে ফরাসি আলোকিত লেখক ভলতেয়ার এর লেখা কিছু ইতিহাস। পরবর্তিতে ভলতেয়ারের একটি নাটক ১৮২৩ সালে রসিনির অপেরাতে স্থান পায় যার ফলে এই রানী সেমিরাসের সম্পর্কে মানুষ আরো জানতে আগ্রহী হয়। সেমিরাসের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে আরো অনেক কবি ও সাহিত্যিক লিখছেন সেই সময়ে। এর মধ্যে ইটালীর কবি দান্তেকে তাকে নিয়ে লিখে এবং রানী সেমিরিসের কাল্পনিক ছবি একে সাজাপ্রাপ্ত হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে সে “কামুক বিদ্বেষ” মুলক ছবি একেছেন এই শিল্পি। সেই ছবি বর্তমানে বৃটিষ মিউজিয়ামে স্থান পেয়েছে। কবি দান্তেকে সেমিরিসকে কল্পনা করে তার অর্ধ নগ্ন বা নগ্ন ছবি একেছিলেন যা ছিলো অসাধারন একটি শিল্প এবং পরবর্তিতে তার মুল্যায়ন করা হয়েছিলো।


রানী সিমিরিসের রাজ্য পাওয়া নিয়ে বেশি প্রচলিত আছে, সে তার বিশ্বস্ত সেনা প্রধানদের দিয়ে রাজাকে হত্যা করে রাজ্য দখল করেছিলেন এবং তার সন্তান শিশু থাকায় সে রাজ্যের ভার হাতে তুলে নিয়েছিলেন। গ্রীক দার্শনিক হেরোডোটাস এর লেখা থেকে জানা যায় সম্রাট নেবুচাদজার ও চেলদেনাজের রাজত্যের পরে বা এই দুইজনের রাজত্বের মাঝামাঝি সময়ে রানী সেমিরাস রাজত্ব করেন ব্যাবিলনে। কিন্তু দার্শনিক হেরোডোটাস কোথাও ব্যাবিলনের সেই বর্তমানের সপ্তম আশ্চর্য শুন্য উদ্দ্যানের কথা উল্লেখ করে নাই। যা এই তিন জনের ভেতরে কেউ বানিয়েছিলো। এখানে অনেকে ইতিহাসবিদদের মতামত হচ্ছে সেসময়ে দেবতাদের মন্দির গুলা ছিলো অনেক বড় বড় কথিত আছে যে অনেক মন্দিরের চূড়া নাকি চলে গিয়েছে আকাশের ভেতরে যেখানে দেবতারা থাকতেন আর সেই মন্দিরগুলির ধাপে ধাপে করা ছিলো এই বাগান গুলা তাই হেরোডোটাসের লেখাতে তা পাওয়া যায় না। রানী সেমিরিসের সাফল্য শুধু ব্যাবিলনের শুন্য উদ্দ্যানই নয় সমস্ত ব্যাবিলন ও তৎকালীন টাইগ্রীস ও ইউফ্রেতাস নদীর তীরে যে অসাধারন সুন্দর দুটি জমজ নগরী গড়ে উঠেছিলো তা এই রানীর রাজত্বকালেই প্রান ফিরে পেয়েছিলো।


রানী সেমিরাস তার প্রজাদের মধ্যে বিতর্কিত ছিলো কারন অনেকেই তাকে দোষী মনে করতো রাজার মৃত্যর জন্য। আবার অনেকেই তার রুপ আর সৌন্দর্যের কারনে দেবতা সমতুল্য একজন শাসক মনে করতো। রানী সেমিরাস ছিলেন তৎকালীন সিরিজ প্রদেশের কোন উচ্চবংশের একজন সুন্দরী যুবতী নারী। সে সময় সিরিজ প্রদেশে তার রুপের কারনে অসাধারন সুন্দরী এক যুবতী নারী হিসেবে অনেকেই তার কথা জানত। ঠিক সে সময় সিরিজ প্রদেশের রাজ পরিবারের গভর্ণর ছিলেন ওনেস। পরবর্তিতে ওনেস এর পিতা (দত্বক পিতা) তাকে টাইগ্রিস নদীর তীরে নিনেভে নামের রাজ্যের রাজত্ব দেয়। এসময় ওনেস পার্শবর্তি প্রদেশের সুন্দরী এক যুবতী নারীর কথা শোনে যে ছিলো রানী সেমিরিস। ওনেস সেমিরিসকে দেখার পর তার প্রেমে পড়ে যায় এবং তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। ওনেসের দত্বক পিতা তাকে বিয়ের অনুমতি দিলে ওনেস সেমিরিসকে বিয়ে করে এবং নিনেভে নিয়ে আসে। ঠিক এসময় নিনেভের সাথে তার পার্শ্ববর্তী রাজ্য নিনাস এর রাজার যুদ্ধ শুরু হয়। নিনাসের রাজা ছিলেন নীনবিকে। যুদ্ধের সময় এই রাজা নীনবিকে যেকোন ভাবে তার কন্যার বয়সী ওনেসের স্ত্রী এই রানী সেমিরিসকে দেখতে পায় এবং তার প্রেমে পড়ে যায়। এতে করে সে আর যুদ্ধ না করে ওনেসকে প্রস্তাব দেয় সেমিরিসকে তার হাতে তুলে দেবার জন্য এবং বিভিন্ন ভয়ভীতি প্রদান করে। কিন্তু ইতিমধ্যেই সেমিরিস ওনেসকে ভালোবেসে ফেলে তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয় প্রান চলে গেলেও তারা আলাদা হবে না প্রয়োজনে রাজ্য ছেড়ে পালায়ণ করবে।


এসময় রাজা ওনেস বুঝতে পারে তারা আর পালাতে পারবে না আর রাজা নীনবিকে এর বিশাল যুদ্ধবাহিনীকে যুদ্ধে পরাজিত করার ক্ষমতাও তার নেয় তাই নানান চাপে পড়ে সে রানী সেমিরিসকে জীবিত রাখার জন্য নিজে আত্মহত্যা করে। রাজার মৃত্যুর পর নীনবিকে বিনা যুদ্ধেই নিনেভের রাজত্ব ও রানী সেমিরিসের দখল পায়। রাজা নীনবিকে ছিলো রানী সেমিরিসের থেকে বয়সে অনেক বড়। রানী সেমিরিসের মতো বেশ কয়েকটি কন্যা ছিলো এই রাজা নীনবিকের। গ্রীক দার্শনিক ডায়োডর সিকুলাসের মতে রানী সেমিরিস রাজা ওনেসের মৃত্যুর বদলা নিতে রাজা নীনবিকে বিয়ের জন্য রাজী হয় এবং পরবর্তিতে তার বিশ্বাস অর্জন করে তার সৈন্য বাহিনীতে কিছু ক্ষমতা তৈরি করে। নীনবিকে রানী সেমিরিসকে বিয়ে করে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেতাস নদীর দুই পাড়ের সম্রাজ্য শাসন করতে থাকে। এসময় কোন একটি যুদ্ধে রানী সেমিরিস বায়না ধরে রাজা নীনবিকের সাথে যুদ্ধে যাবে। রানী সেমিরিসের আবদার নীনবিকে অগ্রাহ্য করতে না পেরে তাকে যুদ্ধে নিয়ে যাবার জন্য রাজী হয়। ততদিনে সেমিরিস নীনবিকের সৈন্যবাহিনীর মধ্যেকার কয়েকজন সেনা প্রধানের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তলে যাদের সাথে মিলে সেমিরিস রাজা নীনবিকে যুদ্ধের ময়দানে বা কোন এক দখল করা শহরে হত্যার পরিকল্পনা করে বলে অনেকের ধারনা।


যেকোন একটি যুদ্ধে রাজা নীনবিকের মৃত্যু হবার পর তার প্রধান স্ত্রীর মর্যাদা হিসেবে রানী সেমিরিসের পুত্র সিংহাসনে বসার মর্যাদা পায়। কিন্তু তখন সেমিরিসের পুত্র রাজকুমার ছিলো শিশু যার কারনে রাজ্যের সমস্ত দায়ভার রানী সেমিরিসের হাতে চলে আসে। শুরু হয় রানী সেমিরিসের রাজত্ব। প্রাচীন মেসপোটেমিয়ার যত ইতিহাস আছে তার অনেক কিছুই তৈরি হয়েছিলো এই রানী সেমিরিসের সময় যার মধ্যে অন্যতম ছিলো ব্যাবিলনের শুন্য উদ্দ্যান। শুধু তাই নয় রানী সেমিরিস তখন বিজ্ঞানেও অনেক ভুমিকা রেখেছেন প্রাচীন সভ্যতার জন্য। ধারনা করা হয় প্রাচীন গ্রিকে মিশরীয়দের পুর্বে যে ক্যালেন্ডার বা দিনপুঞ্জি ছিল তা সেমিরিসের সময় তৈরি করা হয়েছিলো। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়নের দিকেও সেমিরিসের নজর ছিলো যাতে অনেক অবদান আছে এই রানীর। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার চিকিৎসা বিদ্যার বেশ কিছু সংস্কার করে সে। জ্যোতির্বিদ্যার উন্নয়নেও রানী সেমিরিসের দৃষ্টি ছিলো। প্রাচীন মেসোপটেমিয় সভ্যতায় যত বিখ্যাত বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন তাদের সবাইকে একত্রিত করে সব ধরনের সহোযোগিতা করেন। সেসময় ব্যাবিলনে দুইটি ভাষার প্রচলন ছিলো বলে ধারনা করা হয়। একটি আরশীয়, অন্যটি প্রাচীন পারসীয় বলে পরিচিত। সেমিরাস এই ভাষারও অনেক সংস্কার করেন বলে জানা যায়। এছাড়াও শিল্পকলা, ধর্ম ও অন্যান্য অনেক বিষয়ে এই রানীর অবদানের ইতিহাস প্রচলিত আছে আজো।

সুত্রঃ সিক্রেট কুইন ও রোমান সভ্যতা, আইজ্যাক আসিমভ। ছবিঃ ORONOZ/ALBUM  
    
---------- মৃত কালপুরুষ

               ৩০/১০/২০১৭

রবিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০১৭

সৌদি আরবের নতুন নাগরিক সোফিয়ার পরিচয়।


সোফিয়া নামটির সাথে কমবেশি সবাই পরিচিত হয়ে গিয়েছেন এতোদিনে নিশ্চয়। সম্প্রতি সৌদিআরব এই সোফিয়াকে সেই দেশের নাগরিকত্ব দিয়ে আরো অনেকের কাছে বেশি পরিচিত হয়েছে এই রোবটিক চরিত্রটি। সোফিয়াকে নিয়ে বেশ কয়েকজন এর আগেও রিভিউ করেছেন তারপরেও এই রোবট সম্পর্কে যারা এখনও জানতে পারেননি তাদের উদ্দেশ্য আমি আবার একটা সংক্ষিপ্ত রিভিউ করার চেষ্টা করলাম। সোফিয়া হচ্ছে হংকং ভিত্তিক রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান “হ্যানসন রোবোটিক্স” এর তৈরি সম্পুর্ন মানুষের আদলে একটি নারী রোবট। যে দেখতে একেবারেই একজন নারীর মতো স্বাভাবিক মানুষ। হংকং ভিত্তিক এই রোবোটিক্স প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের মতো রোবট তৈরি করার চেষ্টা করে আসছিলো। তাদের আবিষ্কৃত বিখ্যাত রোবটের মধ্যে আছে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের অনুকরণে তৈরি ছোট আকারের বিনোদনমূলক রোবট, যা বিভিন্ন গণিত এবং বিজ্ঞান বিষয়ক প্রতিযোগিতামূলক গেম খেলতে পারে, মানুষের বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন প্রশ্নের দিতে পারে, এমনকি মজার মজার অঙ্গভঙ্গি করে শিশুদেরকে বিনোদনের মাধ্যমে শিক্ষাও দিতে পারে। তাছাড়াও আরো কয়েকটি চরিত্রের রোবট আছে এই প্রতিষ্ঠানের।


সোফিয়া হচ্ছে হ্যানসন রোবটিক্স এর সব চেয়ে বড় বিশ্ময়। আমরা এর আগেও বিশ্বে আরো অনেককেই দেখেছি মানুষের আদলে রোবট তৈরি করতে। কিন্তু সফিয়া তাদের সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। সোফিয়াকে তৈরি করা হয়েছে হলিউড অভিনেত্রি “অড্রে হেপবার্ন” এর আদলে। হ্যানসন রোবটিক্স সোফিয়াকে প্রথম বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন ২০১৫ সালের ১৯শে এপ্রিল। তবে আরো পরে তাকে সক্রিয় করা হয় যে কারনে সোফিয়া বিভিন্ন সাক্ষাতকারে বলেছেন আমার বয়স দেড় বছরের কাছাকাছি। সোফিয়ার চামড়া সিলিকনের তৈরি। তার চোখের পেছনে বসানো অত্যাধুনিক ক্যামেরা ও বিভিন্ন সেন্সরের সাহায্যে সে দেখতে, বুঝতে এবং বিশ্লেষণ করতে পারে। ফেসিয়াল রিকগনিশন বা চেহারা চেনার ক্ষমতা সম্পন্ন এই রোবটটি মানুষের চেহারা চিনতে পারে এবং মনে রাখতে পারে। শুধু তাই নয় সোফিয়া তার চেহারাতে শতাধিক অভিব্যাক্তি ফুটিয়ে তুলতে পারে প্রয়োজন বুঝে। সে কারোর সাথে কথা বলার সময় যখন যেমন প্রয়োজন সেই অনুযায়ী চেহারাতে হাসি বা গাম্ভির্য তুলে ধরতে পারে। তার চোখের মনির আকার আলো এবং মুখের অভিব্যক্তির সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। তার গলার স্বরও একেবারেই স্বাভাবিক মানুষের মতো। সে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে মানুষের সাথে অত্যন্ত সাবলীলভাবে কথা বলতে পার তবে আস্তে আস্তে আরো অনেক বিষয় এবং পরবর্তিতে সীমাহীন জ্ঞান ও আলোচনাও করতে পারবে বলে তার উদ্ভাবক “ডেভিড হ্যানসন” জানিয়েছে।


সোফিয়াকে দেখে মনে হবে এতোদিন চলচ্চিত্র পরিচালকেরা আমাদের যেই আশা দিয়ে আসছিলো আর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহীনি লেখকেরা আমাদের যেসব গল্প শুনিয়ে আসছিলো তার অবসান হতে যাচ্ছে। আর তা খুব দূরে না একদম আমাদের কাছাকাছি। আমরা অচিরেই সেই রোবটের দুনিয়ায় প্রবেশ করতে যাচ্ছি। রাশিয়ার বিজ্ঞানী “দিমিত্রি ইটস্কভ” বোরট ও মানুষের সংমিশ্রনে আমাদের যে অমরত্বের প্রজেক্টের কথা বলেছিলেন তা একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলেও এই সোফিয়ার আত্মপ্রকাশে তা আবার সকলের ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এতদিন কল্পনার জগতে সীমাবদ্ধ থাকলেও গত ২৫শে অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে রোবটদের মানুষের সমান মর্যাদা দেওয়ার ব্যাপারে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়, যখন সৌদি আরব প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে সোফিয়া নামক একটি নারী রোবটকে নাগরিকত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। তাই মানুষের সেই সায়েন্সফিকশন মুভি আর গল্প উপন্যাসের মতো বাস্তব জগত আর বেশি দূরে বলা যাবে না। এইতো কয়েক বছর আগেও মানুষ ভাবতো এমন এক সময় আসবে, যখন রোবটরা দেখতে হবে হুবহু মানুষের মতো। তারা কথাবার্তাও বলবে মানুষের মতো করে এবং মানুষের বেশ ধারণ করে তারা মানুষের আশেপাশেই স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করবে আজ তা বাস্তব প্রা্মান হয়ে যাচ্ছে।


ইতিমধ্যেই সোফিয়া আমাদের মাঝে বেশ কিছু সাড়া জাগিয়েছে। সোফিয়া এ পর্যন্ত বেশ কিছু টিভি চ্যানেলের সাথে সাক্ষাৎকারও দিয়েছে খুব স্বাভাবিক ভাবেই। সেসব সাক্ষাৎকারে সে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, সেসব উত্তরের মধ্যে মজা করতে গিয়ে হাসির মুখভঙ্গিও করেছে যা একেবারেই মানুষের মতো। সে মানুষের সাথে মজা করে কৌতুক বলেছে। সে এমনকি একটি কনসার্টে গানও গেয়ে শুনিয়েছে। আকর্ষণীয় চেহারা এবং সাবলীলভাবে কথাবার্তা বলতে পারার কারণে সোফিয়া ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এখন পর্যন্ত তার সাক্ষাৎকারের ভিডিওগুলো ইউটিউবে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে আছে। ফ্যাশন বিষয়ক একটি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদেও তার ছবি স্থান পেয়েছিল। আজ থেকে ৪ দিন আগে সৌদি আরবে সেদেশের আয়োজন করা ভিশন ২০৩০ উপলক্ষ্যে আয়োজিত ইনভেস্ট ইনিশিয়েটিভ কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার জন্য সোফিয়া সৌদি আরবে যায় এবং সেখানে তাকে সৌদি আরব নাগরিকত্ব দেওয়ার ঘোষনা দেয় যা অনেকের কাছে সমালোচিত হয়।


সম্প্রতি সৌদি আরব ভিশন ২০৩০ কে সামনে রেখে তাদের তেল নির্ভর আর হজ্ব নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যা নিঃসন্ধেহে একটি আধুনিক ও সময়পোযোগি সিদ্ধান্ত বলতে হবে সৌদি সরকারের জন্য। কারন এপর্যন্ত আমরা জানতাম এই সৌদি আরব হচ্ছে গোড়া ধার্মিক আর বর্বর জাতি যারা আধুনিক সভ্যতার সাথে তাল রেখে চলার যোগ্য নয়। ইসলাম ধর্মের নামে তারা নারীকে সব থেকে ছোট করে রেখেছিলো এতোকাল। আর তা অন্যান্য স্বল্পশিক্ষিত ও গরীব দেশগুলো অনুসরন করে আসছিলো। তারা ধর্ম আর জিহাদের নামে মানুষ হত্যা করার জন্য অর্থায়ন করতো বিভিন্ন জিহাদী সংগঠনে এবং কিছু কিছু গরীব দেশে। তবে সম্প্রতি তারা এটাও সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের প্রধান প্রধান কিছু ওয়েবসাইট থেকে সকল জিহাদী হাদিস আর জিহাদী আয়াত মুছে ফেলবে। এককথায় তারা এই সোফিয়াকে হিজাব আর বোরকা ছাড়া সেই দেশে চলার অনুমতি ও নাগরিকত্ব দিয়ে এটাই প্রমান করছে তারা আসলে ধর্মীও কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। কারন তেল শেষ হলেই তারা আর পৃথিবীর কোথাও আশ্রয় পাবে না এটা এখন পরিষ্কার হয়েছে তারা। এর কিছুটা হাওয়া আমাদের বাংলাদেশেও লেগেছে বলতে হবে। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম গুলা প্রকাশ করেছে মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড তাদের সকল বই থেকে জিহাদী হাদিস ও আয়াত তুলে নিবে এতে করে বাংলাদেশের মাদ্রাসার জিহাদী শিক্ষক গুলার কি হবে সেটা এখনও জানায় নাই। 


আসুন একটু সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ কে সামনে রেখে তারা কি কি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সে সম্পর্কে কিছু জানি। সৌদি আরব তাদের তেল নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যার ধারাবাহিকতায় গত ২৪শে অক্টোবর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ঘোষণা দেন, সৌদি আরব ২৬,৫০০ বর্গ কিলোমিটারের বিশাল এলাকা জুড়ে ৫০ হাজার কোটি ডলার ব্যায়ে একটি মেগা সিটি নির্মাণ করবে, যেই শহরটি পরিচালিত হবে সৌর এবং বায়ুশক্তির মাধ্যমে এবং যেখানে মানুষের চেয়ে রোবটের সংখ্যা থাকবে বেশি। যুবরাজ এই ঘোষণাটি দেন সৌদি আরবের রিয়াদে চলমান ফিউচার ইনভেস্ট ইনিশিয়েটিভ কনফারেন্সে। তার এই ঘোষণার একদিন পরে সেই কনফারেন্সে বিভিন্ন প্রদর্শনীর এক পর্যায়ে যখন এই সোফিয়া নামের রোবট মঞ্চে উঠে এবং তার মানুষের মতোই আচার-আচরণ এবং কথাবার্তা দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে, তখনই ঘোষণা আসে যে, তাকে সৌদি আরবের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও এই নাগরিকত্ব প্রদানের আইনী ভিত্তি কী হবে এবং রোবটটি কী কী সুবিধা লাভ করবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি, কিন্তু কোনো রোবটকে নাগরিত্বের মর্যাদা দেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। তবে প্রবাসী শ্রমিকরা যেখানে বছরের পর বছর সৌদি আরবে চাকরি করেও নাগরিকত্ব লাভ করতে পারে না, সেখানে একটি রোবটকে নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যাপারটিও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে খুব জোরালোভাবে।

---------- মৃত কালপুরুষ
               ২৯/১০/২০১৭

সতীদাহ প্রথা কেন হিন্দু ধর্মের প্রথা হবে না ?


সতীদাহ প্রথা একটি জঘন্য, অমানবিক ও বর্বর প্রথা হিসেবে অনেক আগেই স্বীকৃতি পেয়েছে এবং এটা শুধু মাত্র হিন্দু ধর্মের একটি প্রথা বলেই পরিচিত যা হিন্দু ধর্মা্বলম্বীদের কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। তারপরেও আমি জানতাম বর্তমান সময়ের মডারেট হিন্দুদের দেখা যাবে এর অস্বীকার ও প্রতিবাদ করতে সবার আগে চলে আসছেন, যার কারন তাদের এই বিষয়ে সীমিত ধারনা, যার বেশিরভাগ তাদের পরিবার আর মন্দিরের পুরোহিত ও পন্ডিতদের কাছ থেকে পাওয়া। আমি আগেই বলে রাখছি, অন্যন্যা ধর্ম থেকে থেকে হিন্দু ধর্ম যুগে যুগে অনেক সংস্কার হয়েছে এবং হচ্ছে আগামীতে হয়তো এখন যেটুকু যেভাবে টিকে আছে তাও আর থাকবে না। কিন্তু কেউ যদি অস্বীকার করতে চাই তাহলে ভুল করবে যে এটা কোন একসময়ের সেই বর্বর আর অমানবিক ধর্ম ছিলো না। এমন কোন ধর্ম পৃথিবীতে নাই যা মানব সভ্যতার জন্য হুমকি স্বরুপ ছিলোনা। হিন্দু ধর্ম ছিলো তাদের মধ্যে অন্যতম। আজকের এই লেখাটি তাদের জন্য যারা অন্যান্য ধর্মের সমালোচনাতে হাতে তালি দেয় আর সতীদাহ প্রথার মতো একটি জঘন্য ও বর্বর প্রথাকে তাদের ভগবানের আদেশ বলতে অস্বীকার করে এবং বলে বেদ বা হিন্দু শাস্ত্রের সাথে এর কোন মিল নেই তাদের জন্য।


আমি কিছু সুত্র দিচ্ছি যেখানে ঋগবেদ, যজুর্বেদ, পুরান, ও অথর্ববেদের মাধ্যমে ভগবান হিন্দুদেরকে সতীদাহের কথা বলেছেন মিলিয়ে দেখবেন। এখানে দেখুন ঋগবেদ বলছে, “Let these women, whose hasbands are worthy and are living, enter the house with ghee (applied) as collyrium (to their eyes). Let these wives first step into the pyre, tearless without any affliction and well aborned.” এটা লেখা আছে "ঋগবেদের ১৮ নং সূক্তের ৭ নং শ্লোক (১০/১৮/০৭)” আরো দেখুন “আমরা মৃতের বধু হবার জন্য জীবিত নারীকে নীত হতে দেখেছি। (অথর্ববেদ (১৮/৩/১,৩)” আরো দেখুন  “পরাশয় সংহিতায় পাই, “মানুষের শরীরে সাড়ে তিন কোটি লোম থাকে, যে নারী মৃত্যুতেও তার স্বামীকে অনুগমন করে, সে স্বামীর সঙ্গে ৩৩ বছরই স্বর্গবাস করে” (৪;২৮)” আরো দেখুন “দক্ষ সংহিতার ৪;১৮ নং শ্লোকে বলা হয়েছে, “A sati who dies on the funeral pyre of her husband enjoys an eternal bliss in haven.” ( যে সতী নারী স্বামীর মৃত্যুর পর অগ্নিতে প্রবেশ করে সে স্বর্গে পূজা পায়)। এই দক্ষ সংহিতার পরবর্তি শ্লোকে (৫;১০৬) বলা হয়েছে, “যে নারী স্বামীর চিতায় আত্মোৎসর্গ করে সে তার পিতৃকুল, স্বামীকুল উভয়কেই পবিত্র করে”। যেমন করে সাপুড়ে সাপকে তার গর্ত থেকে টেনে বের করে, তেমন করে সতী নারী তার স্বামীকে নরক থেকে বের করে আর সুখে থাকে। ব্রহ্ম পুরান বলে, “যদি স্বামীর প্রবাসে মৃত্যু হয়ে থাকে তবে স্ত্রীর কর্তব্য স্বামীর পাদুকা বুকে ধরে অগ্নিপ্রবেশ করা” এছাড়াও হিন্দু ধর্মের আরো অনেক যায়গাতে এই “সতীদাহ” প্রথার কথা বলা আছে যা কখনই তারা অস্বীকার করতে পারবে না।


এবার আসুন যে প্রচলিত কিছু ইতিহাস আর তৈমুর লং ও তার ছেলে শাহ রুখ মির্জাকে আকড়ে ধরে মডারেট হিন্দুরা লাফালাফি করে আর বলে এই প্রথা চালু হয়েছিলো হিন্দু ধর্মে অন্য কিছু কারনে। আমি তাদের সেই গল্পও বলবো কিন্তু তার আগে আরেকটু জানুন সেই সময়ের মানে তৈমুর লং এর কাহীনি তো এখনও টাটকা বলা যায় যা মাত্র ১৪০০ শতাব্দীর ঘটনা ছিলো, তারও হাজার বছর আগেও মানে ৪০০ খৃষ্টাব্দতে কিন্তু এই সতীদাহ প্রথা হিন্দুরা পালন করেছে তার প্রমান আছে। আবার তাও যদি কেউ মানতে নারাজ হন তাহলে আরো হাজার খানেক বছর আগের কিছু ইতিহাসও কিন্তু আমাদের হাতে আছে যা প্রমান করে হিন্দুদের ভগবানের আদেশেই এই সতীদাহ প্রথা প্রচলিত হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় রীতিতে এটি প্রচলিত ছিলো বলে অনেক অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। গুপ্ত সম্রাজ্যের (খৃষ্টাব্দ ৪০০) আগে থেকেই ভারতবর্ষে সতীদাহ প্রথার প্রচলন ছিল। প্রচীন সতীদাহ প্রথার উদাহারণ পাওয়া যায় অন্তর্লিখিত স্মারক পাথরগুলিতে। সব চেয়ে প্রাচীন স্মারক পাথর পাওয়া যায় মধ্য প্রদেশে,  কিন্তু সব থেকে বড় আকারের সংগ্রহ পাওয়া যায় রাজস্থানে। এই স্মারক পাথরগুলিকে সতী স্মারক পাথর বলা হতো যেগুলো পূজা করার বস্তু ছিল [Shakuntala Rao Shastri, Women in the Sacred Laws – The later law books (1960)]। ডাইয়োডরাস সিকুলাস (Diodorus Siculus) নামক গ্রীক ঐতিহাসিকের খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকের পাঞ্জাব বিষয়ক লেখায়ও সতীদাহ প্রথার বিবরণ পাওয়া যায় [Doniger, Wendy (2009). The Hindus: An Alternative History. Penguin Books. p. 611]। তাছাড়া, আলেক্সান্ডারের সাথে ভারতে বেড়াতে আসা ক্যাসান্ড্রিয়ার ইতিহাসবিদ এরিস্টোবুলুসও সতীদাহ প্রথার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। খৃষ্ট পূর্বাব্দ ৩১৬ সালের দিকে একজন ভারতীয় সেনার মৃত্যুতে তার দুই স্ত্রীই স্বপ্রণোদিত হয়ে সহমরণে যায় [Strabo 15.1.30, 62; Diodorus Siculus 19.33; “Sati Was Started For Preserving Caste” Dr. K. Jamanadas]। এসবই আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এই বর্বর আর অমানবিক প্রথা হিন্দু ধর্মের একক মালিকানা প্রথা ছিলো যা পরবর্তিতে তাদের পিটিয়ে মানুষ করে শেষমেষ আইন করে ব্রিটিষরা বন্ধ করেছিলো।


এই সতীদাহ নিয়ে হিন্দুদের মহাভারতেও লেখা আছে, যেমন মহাভারতের মৌসল পর্বে আমরা দেখতে পায়, মহাত্মা বসুদেবের মৃত্যুর পর তার চার স্ত্রী দেবকী, রোহীনী, ভদ্রা এবং মদিরা তার চিতায় সহমৃতা হয়েছিলেন। আর যেহেতু ঋগবেদের পরবর্তি চারটি সংস্করন তৈরি হবার পুর্বেও আমরা এর প্রচলন দেখতে পায় তাই এই বিষয়ে আর কোন সন্দেহ থাকতে পারে না আর কোন হিন্দু ধর্মাবলম্বী যদি অস্বীকার করে যে এটি আসলে হিন্দু ধর্মের কোন প্রথা না তাহলে আমাকে বলতেই হচ্ছে সে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে মনে হয় আসলেই কম জানে। এই বিষয়টিকে হিন্দু ধর্মের বাইরে দেবার জন্য যুগে যুগে ধর্মব্যবসায়ীরা অনেক চেষ্টা করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। এটা ছিলো তাদের এমন একটি চেষ্টা যেখানে তারা প্রমান করতে চাইছিলেন যে হিন্দু ধর্ম জঘন্য, বর্বর বা অমানবিক ধর্ম না। এই নিয়ে তারা অনেকেই ইতিহাস বিকৃত করেছেন যুগে যুগে। সেই সাথে বানিয়েছেন নানান গল্প কিছুটা “সহমরনের” মতো। তাই আসুন একটি প্রকৃত ইতিহাস জানি যেটাকে জড়িয়ে হিন্দুরা তাদের ধর্মকে একটু বাচাবার চেষ্টা করে থাকেন বা যে সমস্ত কারনে মডারেট হিন্দুদের মথ্যে তালগোল পাকিয়ে যায়।


মুঘলদের সময় যেমন দেখা যায় এই বর্বর প্রথা বন্ধ করার জন্য তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন ঠিক তেমনই দেখা যায় খিলজী বংশের দ্বিতীয় সুলতান আলাউদ্দীন খিলজী অত্যাচারে এরকম কিছু ঘটার নমুনা। আর এসবই বর্তমান মডারেট হিন্দুদের মাথা গুলিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। ১৩০৩ সালে দিল্লীর মসনদ দখল করেন তূর্কি বংশোদ্ভূত খিলজী বংশের দ্বিতীয় সুলতান আলাউদ্দিন খিলজী। ১২৯০ সালে তিনি আপন চাচা এবং শ্বশুর সুলতান জালালুদ্দিন খিলজীকে হত্যা করে এবং রাজন্যদের ঘুষ প্রদান করে হাত করে সিংহাসনে আসীন হন। দক্ষিনের গুজরাট এবং মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের সীমানায় রাজস্থানের মেওয়ার রাজ্যের রাজা তখন রাজপূত বংশের রাওয়াল রতন সিং। আর তাঁর রাণী পদ্মাবতী ছিলেন অতুলনীয় সৌন্দর্যের অধিকারিণী রূপে, গুণে অনন্যা এক রাজবধু। তাঁর রূপ গুণের কাহিনী এতটাই বিস্তৃত হয় যে, তা দিল্লীর সুলতান আলাউদ্দিন খিলজীর কানেও পৌঁছে যায়। ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত লম্পট, মদ্যপ আর ব্যভিচারী ছিলেন এই সুলতান। নিজের সহস্র উপপত্নী থাকা স্বত্বেও মন ভরতোনা তার। যেখানে কোন সুন্দরী রমণীর সন্ধান পেতেন, ছলে বলে কলে কৌশলে তাকে অধিকার না করা পর্যন্ত শান্তি পেতেননা তিনি।


এই রানী পদ্মাবতীর আত্মহত্যাকে হিন্দুরা সতীদাহ বলে প্রচার করতে থাকে। সেটা জানতে হলে একটু গভীরে গিয়ে ইতিহাসটা জানতে হবে। এই রাণীর রূপের বর্ণনা শুনে লম্পট খিলজী নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেননি। বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন মেওয়ারের রাজধানী চিতোর অভিমুখে। ৭ম শতকে চিতোরগড়ের কেল্লা এক দূর্ভেদ্য দূর্গ,  সেটা বাইরে থেকে আক্রমন করে ধ্বংস করা যে সহজ নয় বুঝতে পেরে সুলতান আশ্রয় নিলেন এক কৌশলের। দূত মারফত রতন সিং এর কাছে খবর পাঠালেন। তার দূর্গ দখল কিংবা রাজ্যহরনের কোন মতলব নেই তিনি কেবল রানী পদ্মিনী্কে বোনের মত দেখেন, তাকে এক পলক দেখেই চলে যাবেন। অকারণে নিজের সন্তানতূল্য প্রজাদের রক্তক্ষয় এড়াতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজী হন রতন সিং। তবে রানী শর্ত দিলেন যে রাণী সরাসরি সুলতানকে দেখা দেবেন না, সুলতান আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি দেখবেন।


কিন্তু সেই আয়নার প্রতিচ্ছবি দেখেই আরো উন্মত্ত হয়ে পড়ে লম্পট আলাউদ্দিন খিলজী। শুধু তাই না এর পর সে বিভিন্ন নোংরা কৌশলের আস্রয় নিয়েছিলো কেল্লার বাইরে। ক্রুদ্ধ আলাউদ্দিন এরপর সর্বাত্মক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেল্লার ওপর। কিন্তু দূর্ভেদ্য কেল্লাটির কিছুই করতে না পেরে কৌশল নেন চারপাশ থেকে অবরোধ করে রাখার। সুলতানের কৌশল কাজ দেয় ভালোমতোই। কিছুদিনের মধ্যেই খাদ্যের অভাবে হাহাকার ওঠে চিতোরে। এই অবস্থায় মহিলারা শত্রুর হাতে বেইজ্জত হবার চাইতে আত্মহনন করা শ্রেয় মনে করে বেছে নেন জওহরের বা সতীদাহের পথ ।দূর্গের ভেতর তৈরী এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডে রাজপরিবারের সব মহিলারা রানী পদ্মিনীর নের্তৃত্বে তাদের বিয়ের পোষাক গয়না পরে সেই অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপিয়ে আত্মহুতি দিলেন। সতীহয়েই নিলেন চিরবিদায় স্বেচ্ছায়।


আর স্বজনহারা রাজপূত সৈনিকরা বেছে নিলেন সাকাবা সংশপ্তকপ্রথা (যুদ্ধ করতে করতে জীবন দেয়া), রণসাজে সজ্জিত হয়ে তারা দূর্গ থেকে বের হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন আকারে তাঁদের প্রায় ১০ গুণ বিশাল সুলতানের বাহিনীর উপরে হর হর মহাদেবশংখনিনাদে। বীরের মতো জীবন দিলেন রণক্ষেত্রে। সুলতান বাহিনী কেল্লার ভেতর প্রবেশের পর তখনো জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে মহিলাদের পোড়া হাড়গোড় দেখতে পায়। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে কেল্লায় আশ্রয় নেওয়া ৩০ হাজার রাজপূতকে হত্যা করেন সুলতান। এটা ছিলো রানী পদ্মিনীর সেই আত্মহত্যার ইতিহাস। এই জাতীয় আরো কিছু ইতিহাস আছে যেগুলাকে ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করে হিন্দু পন্ডিত ও পুরোহিতেরা এই বর্বর প্রথাকে একটু শালীন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইতিহাস তারা মুছে ফেলতে পারেন না, যা বারবার প্রমান করে হিন্দু ধর্ম অতীতে ছিলো বর্বর ও অমানবিক একটি ধর্ম।

----------- মৃত কালপুরুষ
                ২৯/১০/২০১৭



শনিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৭

মানবিক হিন্দু ধর্মে ভগবানের আদেশ পালন।


জিহাদী মুসলমান ও ইসলাম ধর্মের আলোচনা সমালোচনার শেষ নেই মনে হচ্ছে। সোস্যাল মিডিয়া, ব্লগ আর বিভিন্ন ওয়য়েবসাইট এর বিতর্ক ও সমালোচনা গুলা দেখলেই যে কেউ বুঝতে পারবে তার আসল চেহারা। আমরা খুব ভালো করেই জানি পৃথিবীতে যুগে যুগে যত রক্তের বন্যা বয়ে গিয়েছে আর যত মানুষ হত্যা করা হয়েছে এই ধর্মের নামে তা আর অন্য কোন কারনে দেখা যায়নি আমার ধর্ম ভালো তোমার ধর্ম খারাপ এমন মনোভাব থেকেই যার সুত্রপাত। ধর্মকে অনেকেই ব্যাবহার করে নিজে্দের ফাইদা লুটে নিতে ব্যাস্তযখন কোথাও ইসলাম ধর্মাবলম্বী জিহাদী বা জঙ্গীরা মানুষ হত্যা করে তাদের রক্ত নিয়ে রাজনীতি করে চলে যাচ্ছে, তার ঠিক পরেই আরেক দল চলে আসছে তাদের ধর্মের গুনগান করতে। সেটা হচ্ছে হিন্দু ধর্ম ও তার অনুসারিরা। অনেকের দাবী হিন্দু ধর্ম বলতে কিছুই নেই সবই আসলে সনাতন ধর্ম। হিন্দু ধর্মের যত খারপ ও ব্লাক সাইড আছে তা যদি খুব ক্রিটিক্যলি একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী যাচাই বাছাই করে আর তা নিরাপেক্ষ ভাবে পর্যালোচনা করে এবং ফলাফল সে সঠিক ভাবে বুঝে তাহলে সেই মুহুর্তে সে হিন্দু তথা এই সনাতন ধর্ম ত্যাগ করবে আমার ধারনা। আসলে বর্তমান সময়ের মডারেট হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা দাবী করে অন্য কিছু। তারা বলে (রাম রাম) আমাদের ধর্মে আসলে কোন হিংস্রতা নেই, আপনি কোথাও মানুষ হত্যা করার কথা আমাদের ধর্মে খুজে পাবেন নাএমনকি দেখা যায় তারা কোথাও কোথাও দাবী করে আমাদের ধর্ম একমাত্র সত্য ও মানবিক। তাহলে তাদের এই সত্য মানবতার ধর্ম নিয়ে আমাদের আলোচনা করতেই হয়। আর সেই চিন্তা থেকেই “আকাশ মালিকের” অনুপ্রেরনা থেকে লেখা।


এখন কোন মডারেট হিন্দু ধর্মানুসারিকে ডেকে যদি বলেন আপনার ধর্মটা আসলে কি এবং কেন ? তাহলে দেখবেন ১০ জনের মধ্যে ৮ জন গুলিয়ে ফেলবে তা বলতে গিয়ে। কারন এদের অধিকাংশ হিন্দু ধর্ম সম্পর্কিত ধারনা এসেছে প্রথমেই নিজের পরিবার, মন্দিরের পন্ডিত-পুরোহিত-ব্রাহ্মন, গীতা, ঋগবেদ, রাবনের লংঙ্কা, রামায়ন, মহাভারত, কিছু হিন্দু সাস্ত্রের বই, আর কিছু টিভি চ্যানেলের মিথ্যাচার থেকে। কিছু দিন আগে মহেঞ্জোদারো সভ্যতা নিয়ে একটি মুভিও খুব চলেছে ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশে। মুভিটির নামই ছিলো মহেঞ্জোদারো। এখানে সম্পুর্ন রুপে মহেঞ্জোদারো সভ্যতাকে বিকৃত করা হয়েছে এই মডারেট হিন্দুদের ব্রেন ওয়াশ করার জন্য। এই মহেঞ্জোদারো সভ্যতার কথা কেন বলছি ? কারন এই সভ্যতা থেকেই তৈরি হয়েছে এই হিন্দু ধর্ম। মহেঞ্জোদারো সভ্যতা আসলে প্রায় ৫ হাজার বছর পুরাতন একটি সভ্যতা যার প্রথম উদ্ভব হয় বর্তমান পাকিস্তান এর দক্ষিনাঞ্চলের কিছু এলাকা নিয়ে। এখানেই প্রথম আর্যদের সভ্যতা গড়ে উঠে। আর তখনকার যে সিন্ধু নদীর কথা আমরা জানতে পারি সেটাই ছিলো আর্যদের পবিত্র নদী। হিন্দু ধর্মের পবিত্র নদী গঙ্গার কোন নাম গন্ধ ছিলো না হিন্দু ধর্মের শুরুতে। প্রায় ৫ হাজার বছরের ব্যাবধানে সেই আর্য সভ্যতা চলে গিয়েছে বর্তমান পাকিস্তানের মধ্যে আর তাই হিন্দুরা কালে কালে গঙ্গাকে বানিয়েছে তাদের পবিত্র নদী সেই সাথে হারিয়েছে সিন্ধু নদীর নাম।


হিন্দু ধর্ম আসলে ছিলো এই আর্যদের ধর্ম। এটাকে আমরা আর্যদের বৈদিক ধর্ম বলতে পারি যার প্রধান ও আদি ধর্ম গ্রন্থের নাম “ঋগবেদ”। পরবর্তিতে আরো কিছু তার সাথে যোগ হয়েছে যেমন, ঋগবেদ, সমবেদ, যজুর্বেদ, অথর্ববেদ ইত্যাদি। প্রথমে যখন ঋগবেদ ছিলো হিন্দুদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ তখন তাদের মধ্যেও মুসলমানেদের মতো একেশ্বরবাদী একটা ধারনা ছিলো। তাই অনেকের ধারনা হিন্দু ধর্মের শুরুতে বা বেদের সূচনাকালে এটিও একটি একেশ্বরবাদী ধর্ম ছিলো। এরপর যুগে যুগে ব্রহ্মের অবতারগনেদের আগমন ঘটানো হয়েছে যার ফলে ঋগবেদের অনুশীলন করতে গিয়ে এর সাথে স্থান কাল সংযোজন ও বর্ধন করে পরবর্তিতে আরো ৪টি সংস্করন তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে এগুলোই হিন্দু ধর্মের প্রধান অনুসরনীয় কিতাব। এ গুলোতে বিশ্বাস করাকেই হিন্দু ধর্ম বলে যাকে পুর্বে আর্য ধর্ম বলা হত। হিন্ধু ধর্মের এই প্রধান গ্রন্থ গুলির ভেতরে যা আছে তা মানা না মানা সম্পুর্ন ব্যাক্তি স্বাধীন ব্যাপার বলে দাবী করে বর্তমান যুগের আধুনিক ও স্মার্ট হিন্দুরা। তাদের দাবী আপনি মানতেও পারেন আবার নাও মানতে পারেন তবে শুধু বিশ্বাস রাখলেই আপনি হিন্দু হতে পারেন এমন কিছু। আসলে আমি বলবো এসব হচ্ছে ভাওতাবাজি যা বোকা হিন্দুদের ব্রেন ও্য়াশ করতে ব্যবহার করা হয়। যারা বলে শুধু বিশ্বাস করলেই হবে মানতে হবে না বা বেদে বিশ্বাস না রেখেও হিন্দু থাকা যায় বা বেদ কি ঈশ্বরের দেওয়া অবশ্য পালনীয় বানী যে তাকে মানতেই হবে তাদের আমি বলবো তারা হিন্দু ধর্মের দলভারী রাখার জন্য বা দলবড় রাখার জন্য এমনটি প্রচার করছে যাদের আমরা সহজ ভাষায় বলে থাকি ধর্ম ব্যাবসায়ী।


এখন দেখুন এই আধুনিক যুগের হিন্দুদের কথা শুনে আপনার কেন ভালো লাগবে। তাদের দাবী চীনের কুনফুসিয়াস ধর্ম বা দর্শন এর মতো হচ্ছে এই হিন্দু ধর্ম। এটা মানা মানির কোন ধর্ম নয়, কারন এর শাস্ত্রীয় কোন বিধি বিধান নেই, কিছু মানা বাধ্যতা মূলক নয়, মানা না মানা ঐচ্ছিক ব্যাপার, এটি একটি লোকায়ত দর্শন, একটি জাতি বা একটি দেশের লোকাচার, যাপিত জীবন ও সংস্কৃতির ইতিহাস মাত্র। এসব কথা শুনতে বেশ ভালো লাগলেও আসল গন্ডগোল দেখুন কোথায় এখানে বেদ থেকে কয়েকটি উদাহরন দেখুন “হে ঈশ্বর, যারা দোষারোপ করে বেদ ও ঈশ্বরের/তাদের উপর তোমার অভিশাপ বর্ষন করো। (ঋগবেদ ২,২৩,৫)” আরো দেখুন “যে লোক ঈশ্বরের আরাধনা করেনা, এবং যার মনে ঈশ্বরের প্রতি অনুরাগ নেই, তাকে পা দিয়ে মাড়িয়ে হত্যা করতে হবে। (ঋগবেদ ১,৪৮,৮)” অনেক পুর্বে হিন্দু ধর্মের শুরুর দিকে একদল মানুষ ভারতের বিহার এলাকায় বসবাস করতো, যাদের মূলত উপজাতি বলা হয়ে থাকে এবং “কিটক্যাট” (Kitkatas) নামে ডাকা হতো যারা বেদে বিশ্বাস করতো না, তাদের নিয়ে বেদের মাধ্যমে ভগবানের আদেশ দেখুন “গবাদি পশুগুলো কি করছে এই কিটক্যাটদের (Kitkats) এলাকায়, যাদের বৈদিক রীতিতে বিশ্বাস নেয়, যারা সোমার সাথে দুধ মিলিয়ে উৎসর্গ করে না এবং গরুর ঘি প্রদান করে যজ্ঞও করেনা ? ছিনিয়ে আনো তাদের ধন সম্পদ আমাদের কাছে। (ঋগবেদ ৩,৫৩,১৪)” আরো দেখুন “যে ব্যাক্তি ব্রাহ্মনের ক্ষতি করে, ব্রাহ্মনের গরু নিজের কাছে লাগায় তাকে ধ্বংস করে দাও। (অথর্ববেদ ১২,৫,৫২)” আরো দেখুন “তাদেরকে হত্যা কর যারা বেদ ও উপাসনার বিপরীত। (অথর্ববেদ ২০,৯৩,১)” এবং “তাদের যুদ্ধের মাধ্যমে বশ্যতা মানাতে হবে। (যজুর্বেবেদ ৭/৪৪)”।


আপাতত এগুলই যথেষ্ট মডারেট হিন্দুদের জন্য, যারা দাবি করে আমাদের ধর্মে খুনা-খুনি, হত্যা, লুটপাট আর যুদ্ধ নেই। শুধু তাই না এই হিন্দুরা আজ থেকে বহু বছর আগে এমন কিছু বর্বর অমানবিক আচার ও প্রথা পালন করে আসতো যা মানব সভ্যতার জন্য হুমকি স্বরুপ ছিলো। যুগে যুগে বিজ্ঞানের আধুনিকায়ন এর ফলে এর অনেক কিছুই আজ আর হিন্দুদের পালন করতে দেখা যায় না। খুব বেশিদিন আগের কথা নয় মাত্র ২০০ বছর আগের কিছু ইতিহাস পড়লেই আপনি খুব পরিষ্কার ভাবে জানতে পারবেন হিন্দু ধর্মের কিছু অমানবিক আর বর্বর রীতিনীতি ও ধর্মীও আচার অনুষ্ঠানের কথা যা তারা ঈশ্বর বা ভগবান প্রদত্ত নিয়ম হিসাবে পালন করতো। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে “সতীদাহ” প্রথা। এটি হচ্ছে ইতিহাসের একটি বড় নজিরবিহীন মারাত্মক পাশবিক জঘন্য বর্বর রীতি ছিলো এই হিন্দু ধর্মে যা ভগবানের আদেশ বলে তারা পালন করেছে যুগ যুগ ধরে। বর্তমানে আধুনিক হিন্দুদের এই কথা বললে তারা দাবী করে এটা আসলে হত্যা না এটা ছিলো “সহমরন”। আসলে হিন্দুরা নারীকে দোষ দেয়ার লক্ষ্যে এর নাম দিয়েছেন “সহমরন”। এই হিন্দু ব্রাহ্মনদের জ্ঞানের বাহার দেখুন তারা আবার বলে এটা নাকি “ইচ্ছেমরন”। আসলে এদের এই প্রথাকে আমরা এক প্রকার গনহত্যার আওতায় ফেলতে পারি কারন একটু ইতিহাস ঘাটলে দেখতে পারবেন কি পরিমান নারীকে আজ থেকে ২০০ বছর আগে এই হিন্দুরা সতী বানাতে গিয়ে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে যা ভাবলে আপনার গায়ে কাটা দেবে।


“সতীদাহ” হচ্ছে হিন্দু ধর্মের একটি ভগবান প্রদত্ত নিয়ম কিছুদিন আগে ব্রিটিষ শাসনামলে সরকার এটি একটি অমানবিক হত্যা ও বর্বর অসভ্য নিয়ম বলে আইন করে বন্ধ করেছিলেন। এটা এরকম ছিলো যদি কোনো ব্রাহ্মনবাদীদের কোন হিন্দু স্বামী বা বিবাহিত পুরুষ মারা যায় তাহলে তাদের বিধবা স্ত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলে “সতী” বানাতে হবে। এই বীভৎস ধর্মীয় রীতিনীতির প্রতি ইঙ্গিত করে Pascal বলেছেন Men never do evil so completely and cheerfully as when they do it from religious conviction. আসলেই কি হিন্দু নারীরা তার স্বামীর মৃত্যুর পরে স্বেচ্ছায় স্বামীর চিতায় উঠে সহমরনে যেতেন ? আমার তো মনে হয় না আর সেটাই হবার কথা। তাহলে নিশ্চয় এটা ছিলো এক একটি হত্যা ও বর্বর ধর্মীয় প্রথা যা বন্ধ করতে ইংরেজ শাসনামলে আইন করে ভগবানের এই আদেশ রুখতে অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে। “ধর্মশাস্ত্রের ইতিহাস” (আট খন্ড) গ্রন্থের “সতী” বিষয়ক কয়েকটি অধ্যায়ের বেশ কিছু পরিসংখান থেকে আমরা জানতে পারি কিছু গনহত্যা টাইপের এই হিন্দুদের দ্বারা মানবতা বিপর্যয়ের কথা। এই বই এর পরিসংখ্যানে দেখা যায় আজ থেকে মাত্র ২০০ বছর আগে ১৮১৫ সাল থেকে ১৮১৮ সাল পর্যন্ত মাত্র তিন বছরে শুধুমাত্র (তৎকালীন বারাণসী পর্যন্ত বিস্তৃত) বাংলাতেই ভগবানের আদেশ পালন করতে হিন্দু ব্রাহ্মনরা নারীর সতীত্ব রক্ষার গান গেয়ে ২৩৬৬ জন নারীকে আগুনে পুড়িয়ে কাবাব করে সতী বানিয়েছে। এদের মধ্যে কলকাতাতেই সতীদাহের সংখ্যা ছিলো ১৮৪৫ নারী। আর ১৮১৫ সাল থেকে ১৮২৮ সাল পর্যন্ত শুধু বাংলাতেই ভগবানের আদেশে ৮১৩৫ জন নারীকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে সতী বানিয়েছিলেন ঠাকুর ও পুরোহিতগন। এটা কে কি বলবেন আপনি ? এটা কি জঘন্য-বর্বর ধর্মীয় রীতি নয় ? এটা কি গনহত্যা থেকে কোন অংশে কম ?


বিভিন্ন ইতিহাস থেকে আমরা যেটা জানতে পারি এবং ঐতিহাসিকগনের মত নিয়ে যেটা প্রমানিত হয়েছে সেটা হচ্ছে কোন হিন্দু নারীর স্বামী মারা গেলে তাকে বিভিন্ন উপায়ে সেই স্বামীর চিতায় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার নামই ছিলো “সতীদাহ”। এখন কোন নারীতো আর সেচ্ছায় আগুনে পুড়ে মরতে চাইতো না, তাই ঠাকুর ও পুরোহিতরা স্বামী মারা যাওয়া সেই নারীকে বিভিন্ন উত্তেজক পানীয় পান করাতেন কিংবা খুব শক্তিশালী নেশা জাতীয় দ্রব্য শুকিয়ে অজ্ঞান করে বা অর্ধচেতন অবস্থায় স্বামীর চিতায় তুলে দিতেন। এবিষয়ে ভারতের উন্নতম মানবতাবাদী লেখক ডাঃ সুকুমারী ভট্টাচার্য তার “প্রাচীন ভারতে নারী ও সমাজ” গ্রন্থে উল্লেখ করেন “সদ্য বিধবা নারী নববধুর সাজে, তার শ্রেষ্ঠ পোষাক পরে, সিদুর, কাজল, ফুলমালা, চন্দন, আলতায় সুসজ্জিত হয়ে ধীরে ধীরে সে চিতায় উঠে, তার স্বামীর পা দুটো বুকে আকড়ে ধরে বা মৃতদেহকে বাহুতে আলিঙ্গন করে, এইভাবে যতক্ষন না আগুন জ্বলে সে বিভ্রান্তির সাথে অপেক্ষা করে। যদি শেষ মুহুর্তে বিচলিত হয় এবং নীতিগত, দৃশ্যগতভাবে ছন্দপতন ঘটে তাই শুভাকাঙ্খীরা তাকে উত্তেজক পানীয় পান করান। এমনকি পরে যখন আগুনের লেলিহান শিখা অসহনীয় হয়ে ওঠে, পানীয়র নেশা কেটে যায়, তখন যদি সেই বিধবা বিচলিত হয়ে পড়ে, সতী’র মহিমা ক্ষুন্ন হবার ভয় দেখা দেয়, তখন সেই শুভাকাঙ্ক্ষীরাই তাকে বাশের লাঠি দিয়ে চেপে ধরে, যদি সে চিতা থেকে নেমে আসতে চায়, প্রতিবেশী, পুরোহিত, সমাজকর্তা সকলেই অনুষ্ঠানের সাফল্যের জন্য অতিমাত্রায় সাহায্য করতে চায়। তারা গান করে ঢাক বাজায় এতো উচ্চ স্বরে জয়ধ্বনি দেয় যে, সতী যা কিছু বলতে চায় তা সবই উচ্চনাদে ঢেকে যায়। (প্রাচীন ভারতে নারী ও সমাজ, পৃষ্ঠা ১৪৭)। পরবর্তিতে আরো জানানোর চেষ্টা করবো।

---------- মৃত কালপুরুষ
              ২৭/১০/২০১৭
           
         


বৃহস্পতিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৭

“আত্মা”র বিশ্বাস লৌকিক না অলৌকিক ?


“আত্মা” বলে কিছু আছে ? না, আত্মা বলে কিছু নেই ? এমন প্রশ্ন মানুষের মনে নতুন কিছুই না। আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে থেকেই মানব সভ্যতার সাথে মিশে আছে এই “আত্মা” শব্দটি। লিখিত মানব সভ্যতার ইতিহাস যতদুর পর্যন্ত জানা যায় সেটা ছিলো মিশরীয় সভ্যতা যার লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায় আজ থেকে প্রায় ৬ হাজার বছর পুর্বের। আর সেখানেও মানুষের মধ্যে এই “আত্মা” বিষয়ক নানান জল্পনা কল্পনা দেখা যায়। শুধু তাই নয় তার অনেক পূর্বেও “আত্মা”র বিশ্বাস মানুষের মাথায় ছিলো তার প্রমানও পাওয়া যায়। মুলত মানব সভ্যতায় ধর্মীয় অনুশাসন তৈরি হবার সাথে সাথেই ধর্ম প্রস্তুতকারীরা বিভিন্ন ভূতের গল্প তৈরি করতে থাকে মানুষের মাঝে আরো শক্ত ভাবে ঈশ্বর বিশ্বাস স্থাপন করার জন্য। আর এ থেকেই “আত্মা”র গল্প আরো শক্তভাবে মানব সভ্যতায় মিশে যায়। যুগে যুগে অনেক ধর্ম তৈরি হয়েছে, হয়েছে তার বিলুপ্তি, তারপরেও আজকের পৃথিবীতে টিকে থাকা ধর্মগুলিতে এই “আত্মা”র উপস্থিতি অনেক শক্তিশালী ভাবেই টিকে আছে যার একটিই কা্রন, আর তা হচ্ছে “বিশ্বাস”এখানে “বিশ্বাস” নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়, যেমন “বিশ্বাস” জিনিষটি আসলে কি বা এই “বিশ্বাস” কথাটির সংজ্ঞা কি ?


একটা বিষয় সবাই ভেবে দেখবেন “বিশ্বাস” কিন্তু করতে হয় যার কোন অস্তিত্ব নেই এমন জিনিষের উপরেই। কারন যার যুক্তিযুক্ত প্রমান আছে বা লজিক্যালি আমরা যাকে প্রমান করতে পারি তাকে কিন্তু বিশ্বাস করার কিছুই নেই। যেমন ধরুন চাঁদ বা সূর্যের ক্ষেত্রে আমাদের কিন্তু বিশ্বাস করতে হয় না যে, চাঁদ আছে বা “বিশ্বাস করুন সূর্য আছে যা আমাদের আলো দেয়” এমন কিছু। কারন এই চাঁদ বা সূর্যকে আমরা লজিক্যালি প্রমান করতে পারি এটার অস্তিত্ব আমাদের মাঝে আছে। এখন যেহেতু এই “আত্মা”কে আমরা লজিক্যালি কেউ প্রমান করতে পারিনা তাই এই “আত্মা”কে আমাদের “বিশ্বাস” করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে নাাই বলছিলাম আমাদের আগে জেনে নেওয়া ভালো এই “বিশ্বাস” জিনিষটি আসলে কি বা “বিশ্বাস” এর সংজ্ঞা কি। ইংরেজিতে Believe, Trust, Faith এই তিনটি শব্দের অর্থ আগে জেনে নেয়া যাক। Believe  (অনুমান, বিশ্বাস, বিশেষভাবে প্রমাণ ছাড়াই মেনে নেয়া)1. accept that (something) is true, especially without proof. 2. hold (something) as an opinion think. যেমন, আত্মা বিশ্বাস করা, ভুতে বিশ্বাস করা, এলিয়েনে বিশ্বাস করা ইত্যাদি। এবার দেখুন Trust (আস্থা)1. firm belief in the reliability, truth, or ability of someone or something. কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা বা ধারণার আলোকে কোন বিষয় সম্পর্কে ধারণা করা। যেমন আমি আমার অমুক বন্ধু সম্পর্কে আস্থাশীল যে, সে টাকা ধার নিলে আমাকে ফেরত দেবে। এবার দেখুন Faith (বিশ্বাস, ধর্মবিশ্বাস, ঈশ্বরবিশ্বাস বা  বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই পরিপূর্ণ বিশ্বাস) 1. complete trust or confidence in someone or something. 2. strong belief in the doctrines of a religion, based on spiritual conviction rather than proof. যেমন, ভূত বিশ্বাস, আত্মা বিশ্বাস, ঈশ্বর বিশ্বাস করা ইত্যাদি ইসলাম, খৃষ্টান, হিন্দু বা ক্যাথলিক ধর্মে বিশ্বাস করা। আল্লাহ, ভগবান, ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখা।


আর বিশ্বাসের সংজ্ঞা থেকে আমরা যা পায় তা হচ্ছে, বিশ্বাস বলতে সাধারণতঃ পারিপার্শ্বিক বিষয়-বস্তুরাজি  জগৎ সম্পর্কে কোনো সত্ত্বার স্থায়ী-অস্থায়ী প্রত্যক্ষণকৃত ধারণাগত উপলব্ধি বা জ্ঞান এবং তার নিশ্চয়তার উপর আস্থা বোঝানো হয় সমাজবিজ্ঞান , মনোবিজ্ঞান , জ্ঞানতত্ত্ব  ইত্যাদি বিভিন্ন আঙ্গিকে বিশ্বাস শব্দটি বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে খানিকটা আলাদা অর্থ বহন করতে পারে , তাই  জ্ঞান , সত্য , ইত্যাদির মত বিশ্বাসেরও কোনো একটি সর্বজনসম্মত  সংজ্ঞা  নেই বলে অনেকের ধারণা । কোনো বিষয় সত্য না মিথ্যা তা বিচার 'রে - সত্য মনে হলে তা "বিশ্বাস করা" অথবা মিথ্যা মনে হলে অবিশ্বাস করা আর মিথ্যা হবার সম্ভাবনা বেশী মনে হলে সন্দেহ করা হয় । বিশ্বাস মানে হতে পারে আস্থা (faith) , ভরসা(trust) বিশ্বাসের দৃঢ়তা (বিশ্বাস যত বেশি সন্দেহ তত কম) যা খুব বেশি হলে তাকে বলা যায় ভক্তি বা অন্ধবিশ্বাস আবার বিশ্বাস মানে হতে পারে আশা (hope) বা আশ্বাস (assurance) বা বিশ্বাস করার ইচ্ছা (willingness to trust) বিশ্বাস হতে পারে কোন বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ অনুভুতির সচেতন অনুধাবন বা কোনো তথ্য (information) বোধগম্য হওয়া এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে যাচাই করার পর এই বোধের নিশ্চয়তা সম্বন্ধে প্রত্যয় বা প্রতীতি জন্মালে (সত্য বলে স্থায়ী ধারণা) হলে তাকে জ্ঞান (knowledge) বলা যায়। পর্যবেক্ষণের উপর যুক্তির (ও পূর্বলব্ধ জ্ঞানের) সাহায্যে বিচার (deduction) করে কোন বিষয় সত্য বলে সিদ্ধান্ত নিলে তা থেকে নতুন জ্ঞান জন্মায়। এইভাবে মনের মধ্যে উপলব্ধ সত্যগুলিকে জুড়ে যে তত্ত্বের জাল বোনা হতে থাকে তাদের বিষয়বস্তুগুলি সামগ্রিকভাবে হল জ্ঞান আর তাদের গ্রহণযোগ্যতার সচেতন অনুমোদন হল “বিশ্বাস”তাহলে আমরা এটুকু পর্যালোচনা করলে মোটামুটি এই “বিশ্বাস” শব্দটির একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা নিশ্চয় পায়। আর এই হচ্ছে সেই বিশ্বাস যার উপরে টিকে আছে “আত্মা” নামের ধারনাটি। বিশ্বাস হচ্ছে সোজা কথায় যুক্তিহীন কোন ধারণা, অনুমান, প্রমাণ ছাড়াই কোন প্রস্তাব মেনে নেয়া। তথ্য প্রমাণ পর্যবেক্ষন এবং অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয় মানুষের বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত নয়।


এখন কথা হচ্ছে যেহেতু কোন পর্যবেক্ষন বা অভিজ্ঞতালব্ধ কোন বিষয় বা তথ্য প্রমান সহ কোন বস্তু মানুষের বিশ্বাসের মধ্যে পড়েনা তাহলে “আত্মা” মানুষের বিশ্বাসের মধ্যে পড়ে। কারন পৃথিবীতে “আত্মা”র কোন প্রমান নেই, এর কোন গবেষনালব্ধ ফলাফল নেই, “আত্মা” সম্পর্কে কারো কোন অভিজ্ঞতা নেই (চোখে দেখা বা স্পর্শ করা), “আত্মা” সম্পর্কে মানুষের তথ্য প্রমানের তালিকা জিরো। তাই নিঃসন্ধেহে এই আত্মাকে বিশ্বাস করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় থাকে না। এখন অনেক সৃষ্টিবাদী বা ক্রিয়েসনিস্টদের একটি বৈজ্ঞানিক প্রমানের কথা বলতে শোনা যায়। একজন বিজ্ঞানী একটি পরীক্ষন এর মাধ্যমে মানুষের আত্মার ওজন আছে বলে এবং তা ২১ গ্রাম বলে দাবী করেছিলো। সেই দাবিটি কি ছিলো দেখুন। ১৯০৭ সালের ১১ই মার্চ ডা: ম্যাকডুগাল নামের একজন চিকিৎসক আত্নার ওজন মেপে বের করেছেন বলে New York Times  পত্রিকা প্রকাশ করেছিলো একটি প্রতিবেদন।  এখন পর্যন্ত অনেকেই এই খবরকে আত্মার প্রমান হিসেবে ব্যবহার করে।  আসুন দেখি কেমন ছিলো সেই গবেষনা পদ্ধতি আর কতটা নির্ভর করা যায় সেই গবেষনার ফলাফলের উপরে।


ডা: ম্যাকডুগাল ১৯০১ সালে ৬ জন রোগীর উপরে এই পরীক্ষা চালিয়েছিলেন এবং পরে ১৫টি কুকুরের উপরেও একই পরীক্ষা করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে কুকুরের আত্মা নেই। কারন সেই সময় ধারনা করা হত মানুষের আত্মা আছে আর কুকুরের আত্মা নেই।  ডা: ম্যাকডুগাল মারা যেতে পারে এমন রোগীদের তার কক্ষে বিশেষ ভাবে তৌরি বিছানায় রাখতেন বিছানা বড় ওজন পরিমাপের যন্ত্রের সাথে সংযুক্ত রাখা ছিলো। এবং ডা: ম্যাকডুগাল পর্যবেক্ষন করতেন রোগী মারা যাবার পরে তার ওজনের পরিবর্তন হয়েছে কিনা। তিনি মোট ৬ জন রোগীর উপরে এই পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। যারা বৃদ্ধাআশ্রেমে ছিলো এবং যক্ষায় আক্রান্ত ছিলো। তিনি মাত্র ১ম জনের মৃত্যুর পরে ২১ গ্রাম ওজন কম পর্যবেক্ষন করেছিলেন।  ২য়/৩য় রোগীর তথ্য তিনি বাদ দেন কারিগরী সমস্যার জন্য।  বাকি ৩ জনের ক্ষেত্রেও তিনি বিভিন্ন মাপের ওজন কম দেখেন ৪র্থ জনের মৃত্যুর পরে কিছুটা ওজন হারালেও একটু পরে তা ফিরে আশে। ৫ম রোগী মৃত্যুর পরে ওজন ঠিকই থাকে কিন্তু কয়েক মিনিট পরে তার ওজন কমে।(তার মতে মৃত্যুর পরেও তার আত্মা শরিরে ছিলো)৬ষ্ঠ জন মারা যাবার পরে ওজন হারায় এবং একটু পরে আরো বেশি ওজন হারায়। তিনি পরে ১৫টি কুকুরের উপরেও এই পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কোন ওজনের পরিবর্তন তিনি দেখেন নাই। আর তাই  তিনি লিখেছিলেন যে কুকুরের কোন আত্মা নেই।  ডা: ম্যাকডুগাল পরে আত্মার ছবি তোলার জন্য গবেষনা শুরু করেছিলেন কিন্তু কোন প্রমান তিনি উপস্থাপন করতে পারেন নাই।  পরবর্তিতে তিনি ১৯২০ সালে মারা জান এবং এই বিতর্কিত গবেষনা আজ পর্যন্ত আর কেউ করেনি।


ডাঃ ম্যাকডুগাল এর এই গবেষনা যখন প্রকাশ পায় তখন তিনি বিজ্ঞানী মহলে সমালোচনার শিকার হন। যেমন, তার গবেষনার উপরে অন্যান্য গবেষকদের মতামাত ছিলো এরকম physicist Robert L. Park  বলেছিলেন ডা: ম্যাকডুগাল এর গবেষনার কোন scientific merit  নেই এবং তিনি তা ব্যাখ্যাও করে দেখিয়েছেন কিভাবে মৃত্যুর পরে একটি মৃত দেহ থেকে ২১ গ্রাম ওজন কমতে পারেpsychologist Bruce Hood  বলেছিলেন because the weight loss was not reliable or replicable, his findings were unscientific আর এই একটি মাত্র গবেষনা ছাড়া আত্মা আছে বলে প্রমান করার জন্য আর কেউ কখনও চেষ্টাও করেনি। তবে তথ্য প্রমানের দিক থেকে এই সৃষ্টিবাদীদের আরেকদল দাবী করে থাকেন অনেকেই আত্মা, ব্রহ্মা, জ্বীন, পরী বা এই জাতীয় যত অলৌকিক চরিত্র গুলা আছে তা তাদের কেউ কেউ দেখতে পায় বা দেখেছে। আর তাতেই তারা দাবী করে এই পৃথিবীতে এদের অস্তিত্ব আছে। বা মানুষ মারা গেলে তার আত্মা বা রুহু তার শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখানেও বিজ্ঞান এই সব আজগুবি ঘটনার কিছু কারন ব্যাখ্যা করেছেন। যাতে প্রমানিত হয়েছে এমন কিছু কেউ যদি দেখেই থাকে বা এমন কিছু কারো সাথে যদি কখনও ঘটেই থাকে তাহলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আরেকটি শাখা নিউরোসায়েন্স মতে তাকে মানুষিক রোগী বলা হয়ে থাকে। এই জাতীয় ঘটনা ঘটা বা আত্মা দেখার কারন হিসাবে বিজ্ঞানীরা ১০টি কারনের কথা বলে থাকেন আর তা হচ্ছে (১) ইডিওমোটর এফেক্ট (Ideomotor Effect) (২) পরিচলন (Convection) (৩) অটোম্যাটিজম (Automatism) (৪) বৈদ্যুতিক স্টিমুলেশান (Electric Stimulation) (৫) ইনফ্রাসাউন্ড (Infrasound) (৬) স্লিপ প্যারালাইসিস (Sleep Paralysis) (৭) কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়া (Carbon Monoxide Poisoning) (৮) ফসফিন (Phosphine) এবং মিথেন (Methane) (৯) গণহিস্টেরিয়া (Mass Hysteria) (১০) আয়ন (Ions) এসবের যে কোন একটির কারনে একজন মানুষ আত্মা বা অশ্বরিরী দেখতে পারে বা অনুভব করতে পারে। এছাড়াও নিউরোসায়েন্স কিছু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মানুষকে এরকম অনুভূতির কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে যেই পদ্ধতির নাম “গড হেলমেট” বলা হয়ে থাকে সেটা অন্য আলোচনা


এত কিছুর পরেও একটি মহল কোনভাবেই বিশ্বাস করতে চাই না আত্মা বা রুহু বলে কিছুই নেই, যা সম্পুর্ন একটি অলৌকিক চরিত্র বা প্যারানরমাল এক্টিভিটিতাদের একটি দাবী দেখা যায় তারা বলে যদি আত্মা বলে কিছু নাই থাকবে তাহলে বিজ্ঞানীরা তার প্রমান কেন করতে পারেনা। সাইন্টিফিক ব্যাখ্যা কই ? রেফারেন্স দিন এমন কোন লিংক/রেফারেন্স থাকলে দিন যেখানে কেউ প্রমান করেছে আত্মা বলে কিছু নাই, সাথে রেফারেন্স থাকতে হবে। এই রকম কথাকে আমি অযুক্তি/কুযুক্তি ছাড়া কিছু বলি না। কারন হচ্ছে, যে বস্তুর অস্তিত্ব আছে তাকে আছে বা নাই প্রমান করার চেষ্টা করা যায় কিন্তু যে বিষয় বা বস্তুর কোন প্রমান তো দূরে থাক অস্তিত্বই নাই তার আবার নাই প্রমান করার কি আছে। এর পরেও এমন যদি হত যে কেই এমন কোন প্রমান দেখিয়েছে যে “আত্মা” বলে কিছু আছে তাহলে সেটার পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলা যেত কিন্তু যেখানে কিছুই নাই তার আবার কিভাবে নাই প্রমান করে তাও আবার বৈজ্ঞানীক ব্যাখ্যা দিয়ে। হ্যা আগামীতে মানুষ অমরত্ব পেতে যাচ্ছে। অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক রোবট এর মতো ব্যাবস্থা করা হচ্ছে যখন মানুষের মস্তিষ্ক মৃত্যুর পরেও সচল থাকবে। সেটা হলে হইতো এই পরকাল ভাবনা সম্পর্কে বা আত্মা সম্পর্কে আমরা কিছু জানতে পারবো বা আগামীতে হইতো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাসহ প্রমান করে দেওয়া সম্ভব হবে “আত্মা” বলে কিছু নেই।


রাষ্ট্রব্যাবস্থার সাথে যেমন ধর্মব্যাবস্থা জড়িত ঠিক তেমনই ধর্মের সাথে এই আত্মা বা এই জাতীয় অলৌকিক চরিত্র গুলি জড়িত। কিন্তু দুঃখের বিষয় এদের অবস্থান মানুষের মস্তিষ্কে ছাড়া আর কোথাও নেই। মানুষ যুগে যুগে তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে এই চরিত্র গুলার ব্যাবহার করে এসেছে। ধর্মবিশ্বাসী মানুষেরা তাদের মস্তিষ্কে পুষে রেখেছে এই জাতীয় চরিত্র গুলিকে। একটি স্বল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত দেশে শিশুকাল থেকেই এই জাতীয় চরিত্রের সাথে একটি মানুষকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে যার ফলে সে তার যৌবনে গিয়েও এমনকি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই এই বিশ্বাস বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। আর এই সুযোগে ধর্ম ব্যাবসায়ীরা তাদের ফাইদা লুটে নিচ্ছে। প্রথমে মানুষকে এই জাতীয় ভূতের গল্প শুনিয়ে নিচ্ছে যেটা না থাকলে মানুষের পরকাল চিন্তা মাথার ভেতরে ঢুকানো সম্ভব না আর তার পরে শুরু হচ্ছে ভোট চাওয়ার কাজ। আমাদের দেশেও এরকম নজির অনেক দেখা যায়। আগে ধর্মের নামে ভূতের গল্প তার পর ভোটের কথা। আর এই সমস্ত কারনেই আজ খুব শক্ত ভাবে এই আত্মারা আমাদের পৃথিবীতে, আমাদের দেশে, আমাদের সমাজে এবং আমাদের পরিবারে টিকে আছে কিন্তু যার কোন অস্তিত্ব নেই।

---------- মৃত কালপুরুষ
               ২৬/১০/২০১৭