সোমবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

প্যারাডাইস পেপার্স ও অ্যাপলবাই “ল” ফার্ম (বিশ্বনেতাদের দুর্নীতি)


গতবছর ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে “পানামা পেপার্স” কেলেঙ্কারির পরে এবার আবারও এধরনের আরেকটি ডাটাবেস প্রকাশ করেছে জার্মানীর “সুইডয়েচে জাইটং” নামের একটি নিউজ মিডিয়া যেখানে উঠে এসেছে বিশ্বের ১৮০টি দেশের সব থেকে ক্ষমতাধর ধনী ব্যাক্তি, সেলিব্রেটি, রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অর্থ কেলেঙ্কারীর নানা অজানা তথ্য। এতে আবারও প্রমান করেছে দুর্নীতি সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নিম্ন পর্যায়ের সব যায়গাতেই আছে তবে আমাদের চোখের আড়ালে। “প্যারাডাইস পেপার্স” হচ্ছে এক সেট ইলেক্ট্রনিক্স ডকুমেন্ট যেখানে আছে সর্বোমোট ১৩.৪ মিলিয়ন পৃষ্ঠার এক বিশাল গোপন নথি যাতে এসব অর্থ কেলেঙ্কারির রেকর্ড পাওয়া যাবে। বর্তমানে বিশ্বের মোট ৪৭টি দেশে ৩৮০ জন দুর্নীতি অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা এই তথ্যের সত্যতা যাচাই ও তদন্ত করছে। যারা কর থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন “ট্যাক্স হ্যাভেনে” বিনিয়োগ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন তাদের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উপর ভিত্তি করেই মূলত তৈরি করা হয়েছে এই প্যারাডাইস পেপার্স। “ট্যাক্স হ্যাভেন” হচ্ছে যেসব দেশ বা অঞ্চলে কর দিতে হয় না কিংবা খুবই নিম্ন হারে কর দেওয়া যায় এমন দেশ ও অঞ্চলকে বোঝায়।

এই ডাটাবেসের সর্বোমোট ১৩.৪ মিলিয়ন গোপন নথির মধ্যে ৬.৮ মিলিয়ন এর মতো তৈরি করেছে অফশোর আইনি সেবা সংস্থা “অ্যাপলবাই” নামের একটি “ল” ফার্ম ও কর্পোরেট সেবা সংস্থা “এস্টেরা” নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান। তবে বর্তমানে “এস্টেরা” নামের কর্পোরেট সেবা সংস্থাটি এখন আর “অ্যাপলবাই” নামের “ল” ফার্মের সাথে নেই। ২০১৬ সালে এই প্রতিষ্ঠান দুইটি আলাদা হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত একসাথেই “অ্যাপলবাই” নামে এই তথ্য সংগ্রহের কাজ করে এসেছে। বর্তমানে অ্যাপলবাই “ল” ফার্ম ও এস্টেরা দুইটি আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান। এস্টেরা আলাদা হয়ে যাবার পরে তাদের নতুন করে পরিচিতি খুব বেশি না থাকায় এখনও তাদের সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তবে আমেরিকা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটনে অবস্থিত (আইসিআইজে) বা “ইন্টারল্যাশনাল কনসর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট” এর ওয়েবসাইটে “দ্যা প্যারাডাইস পেপার” নামের তদন্ত রিপোর্টে এই প্রতিষ্ঠানের একটি সংক্ষিপ্ত রিভিউ বা পরিচিতি সহ আরো অনেক তথ্য পাওয়া যাবে এই ----লিংক---- এ  দেখতে পারেন।

(আইসিআইজে) বা “ইন্টারল্যাশনাল কনসর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট” হচ্ছে বিশ্বের ৬৫ টি দেশের মোট ১৯০ জন তথ্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের দ্বারা পরিচালিত ও প্রতিষ্ঠিত একটি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক যার মূল কাজ হচ্ছে এই ধরনের তথ্য অনুসন্ধান করে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা। অ্যাপলবাই “ল” ফার্মের তৈরি করা এই প্যারাডাইস পেপার্স যা জার্মানীর “সুইডয়েচে জাইটং” নিউজ মিডিয়া কিছুদিন আগে প্রকাশ করার পর থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি তার তদন্তে বিভিন্ন সংস্থাকে সাহায্য করে আসছে। অ্যাপলবাই “ল” ফার্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৮৯৮ সালে যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন “রিজাইনাল্ড অ্যাপলবাই” প্রথমে “অ্যাপলবাই” এর নাম ছিলো “ডুডলি স্পার্লিং অ্যাপলবাই” পরবর্তিতে “অ্যাপলবাই স্পার্লিং এন্ড কেম্প” এবং তারপরে “অ্যাপলবাই” হয় বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অফিস বারমুডার হ্যামিলটনে অবস্থিত। বর্তমানে পৃথিবীর ১০ টি দেশে তাদের দপ্তর আছে যেখান থেকে তারা বারমুডা, বৃটিষ ভার্জিন আইসল্যান্ড, সাইম্যান আইসল্যান্ড, হংকং, আইসলি অব ম্যান, জার্সি, জার্নেসিয়া, মরিসাস, স্যাইসলিস ও সাংহাইতে অফশোর ও আইন বিষয়ক সেবা দিয়ে থাকে। 

স্যার “রিজাইনাল্ড অ্যাপলবাই” ১৮৮৭ সালে ইংল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পরীক্ষায় চুড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হন এবং বার্মুডাতে এসে ১৮৯৭ ও ১৮৯৮ সালে এটর্নি জেনারেল “ডুডলি স্পার্লিং” এর সাথে “ডুডলি স্পার্লিং অ্যাপলবাই” নামের একটি “ল” ফার্ম প্রতিষ্ঠিত করে যার মূল উদ্দেশ্য ছিলো আইন বিষয়ক সেবা দেওয়া। পরবর্তিতে আরেকজন আইনজীবি “উইলিয়াম কেম্পে”র সাথে “অ্যাপলবাই স্পার্লিং এন্ড কেম্প” প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর ১৯৪৯ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি “স্পার্লিং এন্ড কেম্প থেকে আলাদা হয়ে “অ্যাপলবাই” আলাদা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে থাকে। আস্তে আস্তে অ্যাপলবাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করে। সর্বশেষ অ্যাপলবাই ২০০৮ সালের ১৫ জুন ঘোষনা দেয় তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোট ৭৩ জন আইনজীবির সাথে আইসলি অফ ম্যান ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান “ডিকিনসন ক্রুইচশঙ্ক” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হয়েছে এবং তারা বিশ্বের একটি বৃহত্তম সমবায় আইন সংস্থা হিসেবে আত্তপ্রকাশ করছে। বর্তমানে অ্যাপলবাই বিশ্বের প্রধান ১০টি আইন বিষয়ক সেবা দাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্য অন্যতম। পরবর্তিতে অ্যাপলবাই ২০১০ সালে জার্নেসিয়া ও ২০১২ সালে সাংহাইতে তাদের সর্বোশেষ অফিস দুইটি উদ্বোধন করে এবং এই অঞ্চলের অফশোর বিষয়ক আইনি সেবা দিতে থাকে। এই লিঙ্ক  https://www.applebyglobal.com/  থেকে আরো তথ্য পেতে পারেনচলতি বছরের ২৪ শে অক্টোবর তারা প্যারাডাইস পেপার্স প্রকাশ করার ঘোষনা দেয়।

এই অ্যাপলবাই বিশ্বনেতাদের দুর্নীতির অজানা কথাগুলো প্যারাডাইস পেপার্স নামে ইলেকট্রনিক্স ডকুমেন্টের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সামনে এনেছে যার ১৩.৪ মিলিয়ন পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে ১২০ জন রাজনীতিবিদের নাম। ট্যাক্স ফাকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশে বেনামে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন তারা। এতে আছে মার্কিন বানিজ্য সচিব “উইলবার রসের” নাম। “নেভিগেটর” নামক শিপিং কোম্পানীতে তার বিনিয়োগ আছে যার প্রধান গ্রাহক রাশিয়ার “ভ্লাদিমির পুতিনের” ঘনিষ্ট বন্ধুর প্রতিষ্ঠান “সিলবার”। ট্রাম্প সরকার আসার পরে মেরিকার নৌ বাহিনীর জন্য বেশ কিছু যুদ্ধ জাহাজ এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যে ক্রয় করার সিদ্ধান্ত হয়। তালিকায় আছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা “জ্যারেড কুশনার” তিনি রাশিয়ান ব্যবসায়ী “উইরি মিলনারের” সাথে বেশ কিছু ব্যবসায় জড়িত। “উইরি মিলনারের” বিনিয়োগ রয়েছে ফেসবুক ও টুইটারের মতো প্রতিষ্ঠানে। ইংল্যান্ডের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথও আছেন এই নথিতে। তার ১৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছিলো বাইরে। আছেন কানাডার প্রধান মন্ত্রী “জাস্টিন ট্রুডোর” প্রধান অর্থায়নকারী ও সিনিয়র উপদেষ্টা “স্টিফেন ব্রোনফম্যান”।

বড় ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ট্যাক্স ফাকি দেওয়ার প্রচেষ্টায় নাম এসেছে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান “নাইকি” এবং “অ্যাপল” এর। এছাড়াও এই পেপার্সে এশিয়ার মধ্যে ৭১৪ টি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাক্তির উপরে আছে ৬৬ হাজার ফাইল। নাম আছে ভারতীয় মন্ত্রি “জয়ন্ত সিনহা” এবং এমপি “আর কে সিনহার” মতো রাজনৈতিক নেত্রিবৃন্দের। অ্যাপলবাই ১৯৫০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তথ্যের উপরে এই প্যারাডাইস পেপার্স তৈরি করেছে।

---------- মৃত কালপুরুষ
               ০৪/১২/২০১৭
   



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন