সোমবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

ফেসবুকের কভার ফটো পরিবর্তন করে বলির পাঠা কেন হবেন ?


আমরা সবাই কমবেশি জানি বাংলাদেশ, ভারত সহ সারা বিশ্বের বাংলাভাষী মুক্তমনাদের প্রানের টানে একটি আয়োজন করা হয়েছে। আজ থেকে আমরা সকল মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী মুক্তমনারা তাদের ফেসবুক প্রফাইল পিকচার ও কভার ফটো একই রেখে ৯ দিনের জন্য বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে যারা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার প্রচার ও প্রসারের কথা বলে একশ্রেনীর মানুষের হাতে নিজেদের প্রান দিয়েছেন, বাংলাদেশের বিজয়ের এই মাসে তাদেরকে স্মরন করে এই ছবি পরিবর্তনের মাধ্যমে এই আয়োজনে সবাই অংশগ্রহন করছে। এখানে বাংলাভাষী সকল মুক্তমনাদের অংশগ্রহন থাকলেও গুটি কয়েক মুক্তমনার দ্বিমত দেখা যাচ্ছে। আর এই দ্বিমতের কারনেই অনেকেই সেই গুটিকয়েক মুক্তমনাকে একটি আলাদা দলের বা সংগঠনের বলে একেবারেই মুক্তচিন্তা বা মুক্তবুদ্ধির চর্চা থেকে আলাদা করে দিচ্ছে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে এটা সম্পর্কে কিছু বলা দরকার।

আমি এখানে বাংলাভাষী সকল মুক্তমনা ও মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসীদের প্রতি আমার অন্তরের অন্তরস্থল থেকে অনেক অনেক শ্রদ্ধা রেখে এটুকুই বলতে চাই, আসলে এমনিতেই আমাদের নামে অনেক দুর্নাম আছে। একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন দেশের সমাজে মুক্তমনাদের কোন চোখে দেখা হয় তা নিশ্চয় সবাই অবগত। এরপরেও যদি আমাদের ভেতর থেকে আমরা নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে তাদের দ্বিমত পোষন করার কারনে “মুক্তমনা” না বলে “বদ্ধমনা” বলে আলাদা করতে থাকি তাহলে সেটাকে কিভাবে মুক্তবুদ্ধির চর্চা বলা যায় ? হ্যাঁ, আমি মানছি, অনেকেই তাদের ইচ্ছা থাকা শর্তেও নির্দিষ্ট কোন সংগঠনের সাথে জড়িত থাকার কারনে বাংলাভাষী মুক্তমনাদের প্রানের এই মিলন মেলায় অংশগ্রহন করতে পারছে না বা ইচ্ছা থাকা শর্তেও তারা তাদের প্র-পিক আর কভার ফটো পরিবর্তন করছে না এটার কারণ এই জাতীয় সংগঠনের সকলেই একই চিন্তা চেতনায় বাধা হয়ে থাকেএখানেই কিন্তু মূল সমস্যা। অনেকেই মুক্তভাবে চিন্তা না করে তার সংগঠনের বাধাধরা নিয়মের ভেতরে থেকে বদ্ধ একটি চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছে। তাই আমরা যদি সে সমস্ত মুক্তমনাদের আলাদা করে ফে্লি তাহলে তাদের সাথে আমাদের অন্যায় করা হবে। এর কারণ তারা হয়তো মুক্তভাবে বা বদ্ধভাবে চিন্তা করার আসল সংজ্ঞাটাই এখনও জানে না।

আসলে আমাদের একটি বিষয় সব সময় খেয়াল রাখতে হবে, তা হচ্ছে মুক্তমনারা কিন্তু সবাইকে দ্বিমত পোষন করতেই বলে। যেমন দেখুন, যেই কভার ফটো পরিবর্তনের কথা নিয়ে এই আলোচনা সেই কভার ফটোতে কিন্তু “নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর” কবিতা “মিলিত মৃত্যু” এর প্রথম যে দুই লাইন এখানে উল্লেখ করা হয়েছে তার ভেতরেই আছে “বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখ দ্বিতীয় বিদ্যায়” এই লাইনটি। তারমানে আমরা সবাইকে দ্বিমত হতেই বলি। আমরা “সংশয়” বলে একটি শব্দের সাথেও সবাই পরিচিত আছি নিশ্চয়। এই সংশয় বিষয়টি হচ্ছে সকল জ্ঞানের উৎস বলা যায়। কারন দেখুন, যুগে যুগে মানুষ যদি সংশয় প্রকাশ না করে সেই একই মতবাদ আর একই চিন্তা মোতাবেক চলতো তাহলে কিন্তু আজকের এই সভ্যতার উন্নয়ন আমরা দেখতাম না। তাই আমাদের সব ক্ষেত্রেই দ্বিমত হতে হবে আর সব কিছুতেই সংশয় প্রকাশ করতে হবে যদি আমরা মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী হয়ে থাকি। তবে, এই সংশয় বা দ্বিমত পোষন করার আগে আমাদের জানতে হবে ভালো, মন্দ ও নৈতিকতা বা অনৈতিকতার পার্থক্য।

ভালো এবং খারাপ এর মধ্যে পার্থক্য বোঝার জন্য প্রয়োজন জ্ঞানের। আর সেই জ্ঞান অর্জনের খোলা পথকেই আমরা মুকচিন্তার চর্চা বলে থাকি। আমরা যদি মুক্তভাবে চিন্তা করতে নাই পারি তাহলে আমাদের জ্ঞানের পথে বাধা দেওয়া হচ্ছে। একজন মুক্তমনা তার পার্সে কার ছবি রাখবে আর কার ছবি রাখবে না এটা বলার অধিকার কারো থাকার কথা না এটাই হচ্ছে মুক্তচিন্তাকে উৎসাহ দেওয়া। খেয়াল রাখতে হবে কোথাও আমি মুক্তভাবে আমার মত প্রকাশে বাধাগ্রস্থ হচ্ছি কিনাআবার একদিকে স্রোত বইছে দেখে সেই দিকেই আমাকে বয়ে চলতে হবে এমনও কিন্তু না। এই জন্যই থাকতে হবে ভুল এবং সঠিক পদ্ধতি চিহ্নিত করার ক্ষমতা। আমি যদি সার্বিক পরিস্থিতি নিরাপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করে দেখি একটি যায়গায় ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সঠিক বিষয়টি এড়িয়ে যাবার কথা বলা হচ্ছে এবং সেটা করার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে তাহলে আমাদের বুঝতে হবে সেখানে কোন উদ্দেশ্য আছে। আমার উদ্দেশ্য যদি মুক্তচিন্তার চর্চাকে প্রাসারিত করাই হবে তাহলে আমি এমন মতবাদের সাথে থাকবো যেখানে আমার চিন্তা থাকবে মুক্ত।

আমার মূল উদ্দ্যেশ্য এটা বলা যে, মুক্তমনাদের ভেতরে নির্দিষ্ট বা গুটি কয়েক মুক্তমনাকে আলাদা করে দলাদলি বা কাঁদা ছোড়াছুড়ি করা ঠিক হবে না। এটা না করে আমরা তাদের এটা বোঝাবার চেষ্টা করি যে আসলে মুক্তচিন্তা কাকে বলে সেটা একটু ভেবে দেখবেন। আপনি যে প্রথাবিরোধী আন্দোলনের সাথে আছেন সেই আন্দোলনের মূলে কি আছে মুক্তচিন্তা কিন্তু আবেগ দ্বারা পরিচালিত কোন বিষয় নয় যে আমি কারো কথা না রাখলে সে মন খারাপ করবে বা অখুশি হবে বলে কথা রাখতে হবে। মুক্তচিন্তা হচ্ছে বিবেক দিয়ে করার জিনিষ যেখানে আবেগের কোন স্থান নেই। তাই আবেগ নয় বিবেক দিয়ে চিন্তা করতে শিখুন। সবাইকে একত্রে নিয়ে ভাবতে শিখুন। কেউ ভুল ব্যাখ্যা দিলে তাকে সঠিকটা ধরিয়ে দিন। নিশ্চুপ থেকে বা মন রক্ষার্থে না কে হ্যাঁ বলার চেষ্টা পরিহার করুন। ২০১৫ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারী অভিজিৎ রায় হত্যা হবার পরে ব্লগার “ওয়াশিকুর রহমান বাবু” তার ফেসবুক কভারে লিখেছিলো “ওয়ার্ড কেন নট বি কিলড” আর সে কারনেই ৩৪ দিনের মাথায় তাকেও হত্যা করা হয়েছিলো। আজ সেই “ওয়াশিকুর রহমান বাবুর”র স্মরনে না হয় নিজের মন থেকেই একটু শ্রদ্ধা জানান আপনাকে কভার ফটো পরিবর্তন করতে বলছি না। আর যদি করেও থাকেন তাহলে আপনাকে বলির পাঠা বানানো হচ্ছে এটা ভাবার কোন কারন নেই। এটা ভেবে করুন যাতে আর কোন “ওয়াশিকুর রহমান বাবু” বলির পাঠা না হয় এটা ভেবে।

ছবিঃ ইস্টিশন।

---------- মৃত কালপুরুষ
              ৩০/১১/২০১৭    

   

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন