বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

ইসলামের হিজরত কি অপরাধীদের পালায়ন, না ইসলাম প্রচার ?


প্রাক ইসলামিক যুগের আরবের ইতিহাস বা মক্কা, মদীনা ও নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্মের পুর্বের ও তার ৫০ বছর বয়সে হিজরত বলে পরিচিত তার মক্কা হইতে পালায়নের সঠিক ইতিহাস বর্তমান সময়ের বাংলাদেশে ইসলামিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যা দেওয়া হয়ে থাকে তার সত্যতা কতটুকু তা কিন্তু কেউ যাচাই করে দেখে না। ইসলাম ধর্মে একটি সহজ কারণ আছে এই যাচাই না করতে চাওয়ার ক্ষেত্রে আর তা হচ্ছে ইসলাম ধর্মে সন্ধেহ করার মানে হচ্ছে ঈমান নষ্ট হবার আশঙ্কা থাকে। অর্থাৎ যারা ইসলামের প্রচলিত শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে বা সন্ধেহ প্রকাশ করবে বা যাচাই করে দেখার জন্য এই হিজরত টাইপের বিষয় গুলি একটু ক্রিটিক্যালি এনালাইসিস করে দেখতে যাবে তাদেরকে কাফের বা ইসলাম ও নবীর শত্রু আখ্যা দেওয়া হবে। আর তাইতো এই প্রচলিত ইসলামিক শিক্ষার বাইরে কেউ আসলে জানতেও চাই না বা যাচাই বাছাই করেতেও চাই না। একটা বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে অতীতে যদি মানুষ কোন বিষয়ের উপরে সন্ধেহ না করতো বা প্রচলিত কোন বিষয়ের উপরে প্রশ্ন না উঠাতো তাহলে কিন্তু সভ্যতার উন্নয়ন সম্ভব হতো না। ইসলাম ধর্মে হিজরত বলে পরিচিত নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর মক্কা হতে পালায়ন প্রসঙ্গে ইসলাম ধর্মে নানান মত আছে। তবে কোনটি আসলে সঠিক বা বেশি গ্রহনযোগ্য তা কিন্তু পরিষ্কার করে কেউ বলতে পারেনা।

ইসলামের ইতিহাসে পাওয়া যায় কুরাইশ বংশ (আরবিقريش‎‎) কুরাঈশ বা কোরায়েশ ছিল প্রাক ইসলামিক যুগের আরবের একটি শক্তিশালী বণিক বংশ যারা মূলত প্যাগান ধর্মের বিভিন্ন দেব দেবতাদের পূজা করতো এ বংশটি তখনকার সময়ে মক্কা শহরের অধিকাংশ অংশ আর তখনকার প্যাগান ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান ও দেব দেবতাদের ঘর “কাবা” যা বর্তমানে মুসলমানদের উন্নতম তীর্থস্থান “কাবা শরীফ” তারাই নিয়ন্ত্রণ করতো। পরে  ইসলাম ধর্মের প্রধান ব্যাক্তিত্ব এই নবী মুহাম্মদ ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে কুরাইশ বংশের বনু হাশিম গোত্রেই জন্মগ্রহণ করে। তারমানে কুরাইশ বংশের লোকেরা ছিলো বর্তমানে ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা নবী মুহাম্মদ এর রক্তের সাথে সম্পর্কিত একটি গোত্র বা বংশ। নিজ বংশ বা গোত্রের মানুষের সাথে কি এমন কোন্দল বা ঝগড়া থাকতে পারে যার কারনে তাকে সেই মক্কা ত্যাগ করা লাগবে ? এটাকে ঠিক মক্কা ত্যাগ করা বলা যাবে না কারন ইসলামি শিক্ষায় আমরা অনেক যায়গায় তার উল্লেখ পায় তিনি আনুমানিক তার বয়স যখন ৫০ বছরের মতো তখন অর্থাৎ ৬২২ সালের ২১শে জুন তার একজন অনুসারিকে নিয়ে মক্কা থেকে পালায়ন করেছিলেন।

অনেকেই এই হিজরত এর ব্যাখ্যা করে থাকেন নবী তার জীবন বাচাঁনোর জন্য তখন মক্কা থেকে পালায়ন করেছিলো যদি সে পালায়ন না করতো তাহলে তাকে হত্যা করা হতআমরা সাধারণত জানি একই গোত্রের মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট কোন কারণ ছাড়া একই গোত্রের মানুষকে হত্যা করা হয়না। যেমন কারণ থাকতে পারে ধন সম্পদ প্রাপ্তি, ক্ষমতা দখল করা, নারী ঘটিত ব্যাপার ইত্যাদি কারণেই সব থেকে বেশি খুন হত্যা সংগঠিত হয়ে থাকে। তাহলে কথা হচ্ছে আমরা জানি নবীর ৪০ বছর বয়স থেকে তার উপরে ওহী আকারে কোরানের বানী আসতো আর এই বানী আসার ঘটনা তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন করার কথা ছিলো নবীর প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি হবার কথা ছিলো কিন্তু তা না হয়ে কেন তার উল্টা ঘটলো যদি ইসলাম শান্তি আর সত্য বার্তা নিয়েই তখনকার আরবে আসবে ? আসলে নবীর মক্কা থেকে পালায়নের পেছনে অনেক কারণ আছে যা আমরা প্রাক ইসলামিক যুগের ইতিহাস পড়লে কিছুটা জানতে পারি। আমি এখানে তার কিছুই উল্লেখ করবো না কারণ এতে করে অনেকের অনূভূতিতে আঘাত লাগতে পারে তাই আমি শুধু প্রশ্ন রাখলাম আপনারা একটু খুজে দেখবেন হিজরত বলে চালানো কনসেপ্টটা কি পরবর্তিতে মানুষকে সুক্ষভাবে ধোকা দেওয়ার কোন কৌশল কিনা।

নবীর হিজরত গমনের ব্যাখ্যা আসলে বেশিরভাগ এসেছে ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থ থেকে। আজকের দিনে আমরা যাকে হাদীস বলে জানি সেই হাদীস গ্রন্থ গুলি কিভাবে আর কারা লিখে গিয়েছিলো বা এই হাদীস কিভাবে মুসলমানদের মাঝে আসলো তা নিয়ে একটি বিশ্লষনের চিন্তা ভাবনা আছে আগামীতে করবো। তবে এখানে একটু বলে রাখতে হয় এই হাদীস দেখে যেকোন বিষয় নিশ্চিত ভাবে বা জোর দিয়ে বলার অর্থ হচ্ছে বোকামী ছাড়া আর কিছুই না। কারণ হাদীস গ্রন্থের লেখা গুলো অর্ধ সত্য বা কোন নির্ভরযোগ্য সুত্র থেকে প্রাপ্ত কিছুই যা ইসলামের ইতিহাসে নির্ভরযোগ্য অনেক গ্রন্থেই লেখা আছে এই কথাএমনকি এমন কথাও আছে যে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর সময়ে আরবের মানুষেরা ছিলো একেবারেই অশিক্ষিত ও বোকা প্রকৃতির যারা ইতিহাস কি জিনিষ তা জানতই না। ইতিহাস বলতে তারা বুঝতো বাপ দাদার মুখে শোনা কেচ্ছা কাহীনি ও তাদের মেনে চলা কিছু নিয়ম কানুন। এমনকি বেশ কিছু কারনে তাদের নবী বলেছিলেন যে এই সব হাদীস কেউ লিখে রাখবে না এতে করে কোরানের সাথে এই হাদীস মিশে যেতে পারে (সীরাতে ইবিনে হীশাম, পৃষ্ঠা ১২)

এতো এতো প্রমান থাকা শর্তেও মুসলমানরা কেন হিজরতের নামে ভুল ব্যাখ্যা শুনে কেন বিব্রিত হন তা কিন্তু সত্যিই ভাবার বিষয়। যাই হোক একটি ছোট্ট আলোচনা করি, বাংলাদেশে কিছুদিন আগে দেলোয়ার হুসাঈন সাইদী নামের একজন ইসলামী গবেষক ও রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব ছিলো যাকে পরে আমরা একজন দেশদ্রোহী অপরাধী বলে জানতে পারিতার ভক্তরা এই টেকনোলজির যুগেও একটি চরম মিথ্যাচার দিয়ে মানুষকে ভিভ্রান্ত করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে। তারা বলেছিলো এই ব্যাক্তি “দেলোয়ার হুসাঈন সাইদী” কে নাকি চাঁদ এর মধ্যে দেখা গেছে। এটা নিয়ে কিছু লেখালেখিও হয়েছে এবং অনেক গ্রামাঞ্চলে তা ব্যাপক ভাবে প্রকাশও করা হয়েছে যা অনেকেই বিশ্বাসও করেছে। যদিও এই যুগে এরকম মিথ্যাচার আসলে কেউ মেনে নেয়না। তবে এই ঘটনাটি আজ থেকে একশো দেড়শো বছর পরে সত্য ঘটনা বলে চালানো হবে না তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে ? তখন হয়তো বোকা কিছু মানুষ এই অপরাধীকে এই জাতীয় কোন বিশেষ ব্যাক্তি ভাবতে শুরু করবে অতীতের এসমস্ত লেখা পড়ে।

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিজরতের কথা উল্লেখ আছে নবীর কোরান নাজিল হওয়া শুরু হবার ৪ থেকে ৫ বছর পরে, তবে ইসলামি সাল গননা বা হিজরী তখন থেকে গননা করা শুরু হয়নি। এটা শুরু হয়েছিলো নবীর মক্কা থেকে পালায়নের পর থেকে। প্রথম ৬১৫ খ্রিস্টাব্দে হিজরতের নামে মক্কা থেকে চারটি পরিবার (স্বামী স্ত্রী) ও ৭ জন অপরাধী পালায়ন করে লোহীত সাগর পাড়ি দিয়ে “আকসূম” রাজ্য বা “আবিসিনিয়ায়” (আরবি) রাজ্যে আস্রয় নেয় যেটা ছিলো খ্রিস্টান প্রধান একটি রাজ্য যা বর্তমানে ইথিওপিয়ার মধ্যে পড়েছে। আবিসিনিয়ার খ্রিস্টান রাজা অপরাধী হওয়া শর্তেও তাদের আস্রয় দিয়েছিলো পরে তারাই আবার খ্রিস্টানদের হত্যা করেছেএই পালায়ন পর্বে প্রথম যাদের নাম পাওয়া যায় তারা হচ্ছে ১) উসমান ইবনে আফফান ও তার স্ত্রী ২) রুকাইয়া বিনতে মুহাম্মদ, ৩) আবু হুজাইফা ইবনে উতবা ও তার স্ত্রী ৪) সাহলা বিনতে সহাইল, ৫) আবু সালামা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল আসাদ ও তার স্ত্রী ৬) উম্মে সালামা, ৭) আমির আবিন রিবলাহ, ও তার স্ত্রী ৮) লায়লা বিনতে আমির আসমা, ও ৯) সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, ১০) জাহাশ ইবনে রিয়াব, ১১) আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাব, ১২) যুবাইর ইবনুল আওয়াম, ১৩) মুসয়াব ইবনে উমাইর, ১৪) আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, ১৫) উসমান বিন মাজউফ। পরবর্তিতে যখন হাদীস লেখার প্রচলন চালু করা হয় তখন এই পালায়ন পর্বকে ইসলামিকরণ করার জন্য হিজরত নাম দেওয়া হয়। আর বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের “হেফাজতে ইসলামী সংগঠন” ঢাকা ঘেরাও বা সুন্দরবন ঘেরাও বা বল্টুর কলাবাগান ঘেরাও বলে যে আন্দোলনের ডাক দিয়ে থাকে তা মূলত হিজরতের নামে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে সন্ত্রসী কর্মকান্ডে যোগ দেওয়ার ডাক ছাড়া আর কিছুই না। 

---------- মৃত কালপুরুষ
              ০৮/১২/২০১৭



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন