বুধবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৭

VPN ব্যবহার করে ব্লক করা ওয়য়েবসাইট কিভাবে ব্যবহার করবেন।



বাংলাদেশ থেকে নানা কারণে বিভিন্ন সময়ে অনেকেই অনেক গুরুত্বপুর্ণ ওয়েবসাইট ও অনেক নিউজ পোর্টাল ব্রাউজ করতে পারেন না বা সেটা ভিসিট করতে পারেন না। অনেক সময় দেখা যায় খুব জনপ্রিয় কিছু সোস্যাল মিডিয়া নির্দিষ্ট কিছু দেশের সরকার কর্তৃক বন্ধ করে রাখা হয় যার কারণে অনেকেই তা স্বাভাবিক বা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারেনা। ২০১৫ সালে এরকম একটি ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটেছিলো আমার মনে আছে। কয়েকদিনের জন্য বাংলাদেশ সরকার জনপ্রিয় সোস্যাল মিডিয়া ফেসবুক ব্যবহার করা বন্ধ করে রেখেছিলো। তার কিছুদিন আগে ইউটিউব বন্ধ করে রাখা হয়েছিলো। বর্তমানেও এরকম অনেক নিউজ পোর্টাল ও কিছু ওয়েবসাইট মাঝে মধ্যেই আমরা বন্ধ পেয়ে থাকি। যাদের মধ্যে অন্যতম এবং বর্তমানে বাংলাভাষী জ্ঞান-পিপাশু সাধারণ পাঠকদের কাছে সব থেকে জনপ্রিয় ওয়েবসাইট “ইস্টিশন” আছে সবার প্রথমে। এছাড়াও জনপ্রিয়তার তালিকায় থাকা বাংলা ব্লগ সাইট “সামহয়্যার ইন ব্লগ” (সামু), সচলায়তন, আমার ব্লগ, এর মতো কয়েকটি সাইটে মাঝে মধ্যে ব্রাউজ ভিত্তিক সমস্যা দেখা গেলেও তা ক্ষনস্থায়ী। তবে ইস্টিশন ব্লগ সাইট ব্যবহার করতে গিয়ে আমি নিজেও এই সমস্যায় পড়ে থাকি যা আমার ধারণা অনেকেই একই সমস্যায় পড়েন। প্রায় এই ব্লগ সাইটটির ফেসবুক পেজে দেখা যায় পাঠকদের মতামত তারা এই সাইট ব্রাউজ করতে পারছেন না।

একটি ওয়য়েবসাইট কি কি কারনে সাধারণ ভিউয়ার্সরা ব্যবহার করতে পারেনা বা ভিসিট করতে পারেনা তার অনেক ব্যাখ্যা আছে। তবে এর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু দেশের সরকার কর্তৃক সেই সাইটের পাবলিসিটি বন্ধ করে রাখা। যেহেতু বাংলাদেশ থেকে (বিটিআরসি) এই বিষয় সমূহ নিয়ন্ত্রিন করে থাকে তাই হতে পারে (বিটিআরসি) থেকেই এটা বন্ধ করে রাখার কারণে আমরা অনেক সময় এই জাতীয় সাইট গুলি আর ১০টা ওয়েবসাইটের মতো স্বাভাবিক ভাবে ব্রাউজ করতে পারিনা। তাহলে কি আমরা সরকার কর্তৃক বন্ধ করে রাখা সাইট গুলো স্বাভাবিক ভাবে ভিসিট করতে পারবো না ? অবশ্যয় আমরা এগুলা ভিসিট করতে পারবো, তবে স্বাভাবিক নিয়মে নয়। এর জন্য আমাদেরকে কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। আমি সেই পদ্ধতি কি এবং কিভাবে সেটা ব্যবহার করা যায় সেই উদ্দেশ্যেই এই লেখাটি লিখছি। এই সমস্যার সম্মুক্ষিন হলে আমাদেরকে VPN  (ভিপিএন) ব্যবহার করতে হবে। আমার মনে হয় যারা মোটামুটি একটু পুরাতন ও মধ্যম মানের ইন্টারনেট ইউসার তারা এই বিষয়টি সম্পর্কে সবাই অবগত। তবে যারা এখনও জানেন না এই VPN (ভিপিএন) কি এবং এটা কিভাবে ব্যবহার করতে হয় আর এটা ব্যবহার করে আমরা কিভাবে এই বন্ধ করে রাখা “ইস্টিশন ব্লগের মতো সাইট গুলো ভিসিট করতে পারবো তাদের জন্য কিছু তথ্য রইলো।

প্রথমত VPN শব্দটার সাথে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। তবে অনেকেই শুধু নামের সাথেই পরিচিত, কিন্তু এটা যে কি জিনিস তা অধিকাংশ মানুষই জানে না তাই এসমস্ত বিষয় সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করবো। VPN এর পূর্ণ রূপ হল- Virtual Private Network. (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) এটাকে আমরা একটি সুড়ঙ্গের সাথে তুলনা করবো। সোজা বাংলায় এর সংজ্ঞা দাড়ায়, VPN হল একটা কাল্পনিক ‘Tunnel’ যার মাধ্যমে নিরাপদে তথ্য আদান প্রদান করা যায়। এই ‘Tunnel’ বা সুড়ঙ্গের বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই, কারণ এটা ভার্চুয়াল জগতে কেউ খুজে বের করতে পারবে না। এটি দিয়ে মূলত কাল্পনিক একটা প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বোঝানো হচ্ছে যেটি দিয়ে ইন্টারনেটে নিরাপদে তথ্য আদান প্রদান করা যায়। আমরা এখন নিরাপদ’ keyword টির উপর ফোকাস করবো। ইন্টারনেট মূলত উন্মুক্ত তথ্য আদান প্রদানের জায়গা। যেহেতু এটি পাবলিক নেটওয়ার্ক অর্থাৎ, পৃথিবীর সবাই সংযুক্ত তাই এখানে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে তথ্যের গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যাবার একটা ঝুঁকি আছে। এই ঝুঁকি এড়ানোর জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করে নিজের ব্যক্তিগত বা প্রাইভেট নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হওয়ার নিরাপদ পদ্ধতিই হল VPNএই পদ্ধতিতে ব্যবহারকারী এবং প্রাইভেট নেটওয়ার্ককে সংযুক্ত করার জন্য ইন্টারনেটে একটি কাল্পনিক সুড়ঙ্গ তৈরী হয়। যেমন ধরুন আমি বর্তমানে বাংলাদেশের ঢাকাতে অবস্থান করছি কিন্তু একটি VPN (ভিপিএন) সার্ভিস ইউস করে আমি বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ইউরোপের “ফ্রান্স” এর একটি ইন্টারনেট সার্ভিস প্রভাইডার এর আইপি এড্রেস ব্যবহার করে ইন্টারনেট ব্যবহার করছি বা বিভিন্ন ওয়েবসাইট ব্রাউজ করছি। তার মানে আমি বাংলাদেশে আছি কিন্তু ভিপিএন ব্যবহার করার কারণে ফ্রন্সের একটি আইপি এড্রেসের সাথে আমার কানেকশন এর একটি সুড়ংঙ্গ তৈরি করা হয়েছে তাই এখন আমি যা করছি তা ফ্রান্স থেকেই করছি।

তার মানে বাংলাদেশ থেকে যদি (বিটিআরসি) কোন সাইট ভিসিট করা বন্ধ করে রাখে বাংলাদশি ইন্টারনেট ইউসারদের জন্য তারা এই সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে বিশ্বের যে কোন দেশের যে কোন আইপি এড্রেস ব্যবহার করে সেই সাইট বাংলাদেশে বসেই ভিসিট করতে পারবে। এহাড়াও VPN ব্যবহার করার আরো কিছু সুবিধা আছে তা হচ্ছে -
১। VPN ব্যবহার করার অর্থ হল আপনি ডাটা নিরাপদে আদান প্রদান করতে পারছেন।
২। VPN ব্যবহার করলে আপনার অবস্থান কেউ ট্র্যাক করতে পারবে না।
৩। IP address (Internet Protocol address) হাইড করে রাখে। অর্থাৎ, হ্যাকারদের কবলে পড়ার সম্ভাবনা নাই।
৪। আপনার ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী আইপিএস থেকে নেটের ফুল স্পিড পাবেন।
৫। VPN দিয়ে আপনি আইএসপি তে ব্লক করা সাইট ভিজিট করতে পারবেন। যেমন ধরেন, যদি ইউটিউব বা ফেসবুক আমাদের দেশে বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলেও আপনি VPN ব্যবহার করে এগুলাতে ঢুকতে পারবেন।
৬। এটি নিরাপদ যোগাযোগ এবং ডাটা encrypt করার একটি পদ্ধতি হিসেবে কাজে লাগে। মানে VPN আপনার মেশিনকে একটি ভার্চুয়াল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারে এবং আপনার পাঠানো সব data দ্রুততার সঙ্গে encrypt করে ফেলে অর্থাৎ public domain থেকে লুকিয়ে রাখে এবং এটা আপনার browsing history-র কোনো ট্র্যাক রাখে না। কাজেই আপনি অনলাইনে পুরোপুরি নিরাপদ।

VPN ব্যবহার করার সুবিধা আছে পাশাপাশি ব্যবহার করতে গেলে কিছু অসুবিধাও আছে, আর তা হচ্ছে বর্তমানে মোবাইল আর পিসির জন্য অনেক VPN সার্ভিস প্রভাইডার আছে যারা এটা বিনামূল্যে ব্যবহার করতে দেয়। তবে যারা এখনও এই সার্ভিসটি বিনামূল্যে ব্যবহার করতে দেয় তাদের মধ্যে ৭০% আছে যাদের সার্ভিস ব্যবহার করলে আপনার ইন্টারনেটের স্পীড একটু কমে যাবে বা প্রথমবার কানেক্ট হতে বেশ কিছু সময় নেবে। তবে এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন এর জন্য খুব সহজ পদ্ধতির কিছু VPN এপ আছে গুগল প্লে স্টোরে যা ব্যবহার করলে স্পীড খুব একটা কমে না এবং এগুলো একদম ফ্রী। এই এপস গুলো শুধু গুগল প্লে স্টোর থেকে ইন্সটল করে নিলেই হবে আর কিছুই করা লাগবে না। ইন্সটল করার পরে সেই এপস গুলা ওপেন করলেই একটি কানেক্ট অপশন পাবেন সেটাতে টাস করে কানেক্ট করে দিলেই আপনার কানেকশন একটি VPN সার্ভিসের মাধ্যমে কানেক্ট হয়ে যাবে এর পরে আপনি খুব সহজেই ব্লক করে রাখা সাইট গুলো ভিসিট করতে পারবেন আপনার ব্রাউসার দিয়ে বা যে কোন এপস দিয়ে। এতে আপনার আইপি এড্রেস প্রকাশ পাবেনা আপনি কোথা থেকে ব্রাউজ করছেন। যেহেতু যারা এন্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার করেন তাদের জন্য আমি এখানে কোন লিঙ্ক দিচ্ছি না। কারণ সবাই গুগল প্লে স্টোর এর সাথে অবশ্যয় পরিচিত আছেন। আপনাদের শুধু গুগল প্লে স্টোরে গিয়ে নাম সার্চ করলেই হবে তাই আমি এখানে কিছু ভালো VPN এপস এর নাম দিয়ে দিচ্ছি, যেমন প্রথম সারিতে থাকা এপস এর মধ্যে আছে Turbo VPN, Hola Free VPN, VPN Proxy Master-Free, Super VPN Free, VPN Master Free, Super VPN Free VPN Client, Flash VPN Free VPN Proxy, Yoga VPN Free Unlimited, Secure VPN Free, Tunnel Bear VPN আপাতত এই ১০টি সহজ VPN এপস এর যেকোন একটি ব্যবহার করে আপনি আপনার এন্ড্রয়েড মোবাইল থেকে VPN সার্ভিস খুব সহজেই ইউস করে ব্লক করে রাখা “ইস্টিশন” এর মতো সকল সাইট ভিসিট করতে পারেন।

এবার আসি যারা পিসি (ডেস্কটপ ও ল্যাপটপ) ব্যবহার করে ইন্টারনেট ইউস করেন কিন্তু এই জাতীয় ব্লক করা সাইট ব্যবহার করতে পারছেন না বা ভিসিট করতে পারছেন না। পিসির জন্য উইন্ডোস ৭ থেকে শুরু করে বর্তমানে উইন্ডোজ ১০ অপারেটিং সিস্টেমে সাপোর্ট করে এরকম বেশ কিছু সফটও্য়ার আছে কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তার প্রায় সবই পেইড সফটয়ার যা ফ্রী বা বিনামুল্যে ব্যবহার করা যায় না। তবে কিছু ফ্রি সফটওয়ার আছে যা ব্যবহার করে VPN নেটওয়ার্কের সাথে কানেক্ট হওয়া যায়। এই লিঙ্কে গেলে https://en.softonic.com/downloads/free-vpn:windows/windows-7 আপনি ১০টি এরকম সফটওয়ার পাবেন। আর এখানে Hide Me নামের একটি সফটওয়ার পাবেন সেটাও ডাউনলোড করে ইন্সটল করতে পারেন লিংক https://hide.me/en/software/windows এছাড়াও আপনি যদি আপনার পিসি দিয়ে Mozilla Firefox ব্রাউসার ব্যবহার করে থাকেন তাহলে এই লিংক https://addons.mozilla.org/en-US/firefox/addon/hoxx-vpn-proxy/ থেকে আপনার ব্রাউসারের জন্য এই এক্সটেনশন বা এডঅন টি ডাউনলোড করে ইন্সটল করে নিতে পারেন। আর যদি আপনি ক্রোম ব্রাউসার ব্যবহার করে থাকেন তাহলে এই লিংক থেকে https://zenmate.com/products/vpn-extension-for-chrome/ আপনার ক্রোম ব্রাউসারের জন্য এড অন বা এক্সটেনশন ডাউনলোড করে VPN এর সাথে কানেক্ট হতে পারেন। আর আপনি যদি অপেরা ব্রাউসার ব্যবহার করে থাকেন তাহলে আপনাকে এসব কিছুই করা লাগবে না। কারণ অপেরা ব্রাউসার এর সাথেই একটি এক্সটেনশন থাকে যা শুধু অন করে নিলেই হবে আমি আপনাদের সেই সিস্টেমটাও বলে দিচ্ছি।


প্রথমে আপনার অপেরা ব্রাউসার ওপেন করলে একদম উপরে বাম পাশের ঠিক কর্নারে যে অপেরার লোগো দেখতে পারবেন সেটাতে ক্লিক করলে অপেরা ব্রাউসার এর সেটিংস অপশন এর পেজ ওপেন হবে। তখন আপনি সেই পেজের ড্রপ ডাউন মেনু থেকে Privacy & Security মেন্যুতে ক্লিক করলে যে পেজটি ওপেন হবে শেখানে দেখতে পারবেন VPN বলে একটি অপশন আছে। সেই VPN লেখা অপশনটিতে আপনাকে Enable VPN লেখা  যায়গাতে বাম পাশের ছোট্ট বক্সে টিক চিহ্ন দিয়ে দিতে হবে তাহলেই আপনার অপেরা ব্রাউসারের VPN অন হয়ে যাবে এবং আপনি সেই ব্রাউসার দিয়ে সব ব্লক সাইড ব্রাউস করতে পারবেন অনায়াশে। এছাড়াও আরো কিছু সহজ মাধ্যমে আপনি VPN সার্ভিস আপনার যেকোন ব্রাউসার দিয়ে ব্যবহার করতে পারেন যেমন Kproxy নামের এই VPN সার্ভিসটি ব্যবহার করতে আপনাকে কোন সফটওয়ার ডাউনলোডও করা লাগবে না বা ইন্সটলও করা লাগবে না। আপনাকে যেটা করতে হবে শুধু এই লিংকে গিয়ে https://kproxy.com/ যে পেজটি আসবে সেটাতে যে এড্রেসবার আছে শেখানে আপনি যেই সাইটটি ব্রাউজ করতে চাচ্ছেন বা ভিসিট করতে চাচ্ছেন সেটার এড্রেস লিখে ডান পাশের সার্ফ (Surf ) বাটনে ক্লিক করলেই আপনি VPN এর মাধ্যমে সেই নির্দিষ্ট সাইট ভিসিট করে দেখতে পারবেন। 

যেমন আপনি যদি “ইস্টিশন” ব্লগের ওয়েবসাইট এই Kproxoy দিয়ে ব্রাউজ করতে চান তাহলে আপনাকে সেই এড্রেসবারে লিখতে হবে www.istishon.com এবং Surf বাটনে ক্লিক করতে হবে তাহলে আপনি আপনার দেশ থেকে যদি “ইস্টিশন” ব্লগ বন্ধ করা থাকে বা ব্লক করে রাখা থাকে তারপরও আপনি এই সাইট ব্যবহার করতে পারবেন। অন্যান্য সাইটের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। আর যদি কোন জিজ্ঞাসা থাকে তাহলে তো আমি আছিই কমেন্টস করে জানাতে পারেন আপনার সমস্যা। আমি না হলেও যারা এই বিষয়ে আমার থেকে বেশি এক্সপার্ট আছে তারা নিশ্চয় আপনার উওর দিবে।

---------- মৃত কালপুরুষ

                ২০/১২/২০১৭

শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭

মডারেট হিন্দুদের ভাষ্য, স্বামী বিবেকানন্দের হিন্দু ধর্ম সংস্কার।


বিবেকানন্দ কি হিন্ধু ধর্মের বিধবা বিবাহ, সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, পুরুষের বহুবিবাহ সহ এরকম আরো অনেক কুৎসিত প্রথাকে সমর্থন করেছেন না তার বিরোধিতা করেছেন তাই এখনও অনেক হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা জানে না। অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী মনে করে থাকেন বিবেকানন্দ একজন প্রথা বিরোধী মানুষ ছিলেন আসলে কিন্তু তাদের ধারণা ভুল। বিবেকানন্দকে মিডিয়া সাধারণ মানুষের সামনে সেভাবেই উপস্থাপন করেছিলেন তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এই ধারণা। প্রায় ৫০০০ বছর ধরে শত শত অমানবিক আর বর্বর প্রথা সাথে নিয়ে এই হিন্দু ধর্ম এই ধর্মে বিশ্বাসী মানুষকে নানা ভাবে জাতাকলের মধ্যে ফেলে পিষে আসছিলো। এমন সময় যদি কেউ সংস্কার এর নামে কিছু পরিবর্তন করে দেখায় তাহলে অন্ধের মতো বিশ্বাস করা ধর্ম বিশ্বাসী মানুষের এটা ভেবে ভুল না করার কোন কারণ নেই যে সেই ব্যাক্তি একজন প্রথাবিরোধী বা সমাজ সংস্কারক। আর এই স্বামী বিবেকানন্দের বেলায়ও ঘটেছে তাই। আসলে তিনি সমাজ সংস্কারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রথার অচলায়তনে বন্দী একজন মানুষ আজ আমরা সেটা নিয়ে একটু আলোচনা করবো।

হিন্দু ধর্মের একটি বর্বর ও অমানবিক প্রথা হচ্ছে একজন নারীর স্বামী মারা গেলে তাকে বিধবা আখ্যা দিয়ে এমন কিছু অমানবিক নিয়ম-কাননের মধ্যে সেই নারীকে বেধে রাখা হয় ও সমাজচ্যুত করা হয় যা হিন্দু সমাজের নারীরা খুব ভালো করেই জানে। অল্প কিছুদিন আগেও এদেরকে সেই মৃত স্বামীর চিতায় জোর করে তুলে আগুনে পুড়িয়া মেরে স্বতী বানাবার নিয়মও প্রচলিত ছিলো। এই প্রথার পরিবর্তনে নারীদের এগিয়ে আসতে অনেক দেরি হবার একটা মুল কারণ হচ্ছে হিন্দু সহ অন্যান্য আরো কয়েকটি ধর্মে নারীদের শিক্ষা বিষয়ক অনেক বাধা প্রচলিত ছিলো ধর্মীয় কিছু বাধা ধরা নিয়মের কাছে। এরকম সময় স্বামী বিবেকান্দ নামের একজন সচেতন ব্যাক্তি সমাজ সংস্কার এর নামে সেই সব বিধবাদের পুনরায় বিয়ে করার বা বিয়ে দেবার জন্য বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে প্রচার করা শুরু করেন এবং হয়তো কিছু কিছু ক্ষেত্রে তখন সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু যেহেতু এই জাতীয় অনেক বিষয় হিন্দু ধর্মের প্রধান প্রধান কিছু ধর্মীয় গ্রন্থে অনেক আগে থেকেই আদেশ-উপদেশ দেওয়া ছিলো তাই হিন্দু সমাজ থেকে এই বিষয় গুলি (কুসংস্কার গোড়ামী) সম্পুর্ণরুপে বিলুপ্ত করা সম্ভব হয়নি। যেমনটা সম্ভব হয়নি হিন্দু ধর্মের কয়েকডজন জাতপাতের বৈষম্য এই ধর্মটি থেকে দূর করা যা আজ অবধি বিভিন্ন হিন্দু সমাজে বিদ্যমান।

এই বিধবা নারীদের পূণঃ বিবাহের চল চালু করে তখন বিবেকানন্দ সাধারণ হিন্দু ধর্মের মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে। বিভিন্ন মিডিয়াও তাকে নিয়ে অনেক প্রচার প্রচারণা চালায়। কিন্তু আসলেই কি বিবেকানন্দ একজন সমাজ সংস্কার ছিলেন ? তার বিভিন্ন ভাষ্য মতে আমরা তার কিছুই দেখতে পায় না যেমন ধরুন, তিনি আসলে বিধবা বিবাহের বিরোধিতা করেছিলেন, শুধু তাই নয় সেই সাথে তিনি সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, পুরুষের বহুবিবাহ সহ আরো অনেক প্রথাকে একাধারে তিনি সমর্থন করে গিয়েছেন এই অমানবিক আর বর্বর হিন্দু ধর্মের সাফাই গেয়ে। তার ইসলামী জিহাদী সন্ত্রাসীদের মতো অনেক ডায়ালগ এর মধ্যে একটি ডায়ালগ হচ্ছে “এ দেশে সেই বুড়ো শিব ডমরু বাজাবেন, মা কালী পাঁঠা খাবেন আর কৃষ্ণ বাঁশি বাজাবেন চিরকাল। যদি না পছন্দ হয় সরে পড় না কেন ?” এই জাতীয় ভাষ্যর মধ্যে সেই মোল্লাদের প্রথমে মুখে বলো, তারপর হাতে বলো টাইপের একটি হুমকি দেওয়া হচ্ছে ভারতবর্ষের হিন্দু ধর্ম বাদে অন্য ধর্মের অনুসারীদের যাদের মধ্যে পড়ছে যারা আসলে কোন ধর্মই বিশ্বাস করেনা তারাও। আরো দেখুন, মডারেট হিন্দুরা যতই বলে আমরা আমাদের ধর্মের অনেক সংস্কার করেছি আর এখনও করছি তাদের এই কথার উলটা বলেছেন এই স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি বলেছেন “যতোই বায়োবৃদ্ধি হইতেছে, ততই এই প্রাচীন প্রথাগুলো আমার ভালো বলিয়া মনে হইতেছে” এই কথাই কি তার স্বতীদাহ প্রথা, বিধবা বিবাহের বিরোধিতা, কৃষ্ণের ন্যায় পুরুষের বহু বিবাহ প্রথা, রুক্মীনির মতো বাল্য বিবাহ প্রথা, সব একসাথে সমর্থন করা হয় না ?

শুধু তাই নয় হিন্দু ধর্মের সব থেকে মূল যে সমস্যা সেটা হচ্ছে বিভিন্ন জাতপাতের সমস্যা যা মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তৈরি করে আসছে আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে থেকেই। সেই প্রথাকে বর্তমান সময়ের মডারেট হিন্দুরা যতই বলুক আমরা আর এখন এই নিয়ম মানি না বা আমাদের কোন ধর্মীয় কিতাবে এই জাতীয় কোন আদেশ উপদেশ নেই। তার পরেও এই হিন্দু ধর্মের সাধারণ মানুষেরা খুব ভালো বলতে পারবেন তাদের সমাজের মধ্যে এখনও কি চলে। যদিও আমাদের মতো সাধারণ পাঠকদের এই বিষয়ে কোন প্র্যকটিক্যাল ধারনা নেই তার পরেও এই ধর্মটি থেকে বেরিয়ে আসা অনেক সচেতন মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারা জ্ঞানী মানুষের কাছে শুনেছি তাদের ধর্মের মধ্যে এই জাতপাত নিয়ে এখনও কি ভাবে সাধারণ মানুষকে ছোট করা হয়ে থাকে সেসব কথা না হয় এখানে নাই তুলছি। এখন দেখুন এই স্বামী বিবেকানন্দ কিভাবে এই জাতপাত বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন মানুষে মানুষে এই বিভেদ সৃষ্টি করে রাখার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন “তুই বামুন, অপর জাতের অন্ন নাই খেলি” এই কথার মাধ্যমে সে এই অমানবিক হিন্দু ধর্মের নিম্নবর্ণ আর উচ্চবর্ণ বা ব্রাহ্মন আর তার নিচের অন্যান্য সকল জাতের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে রাখতে বলেছেন। সে জাতিভেদ সমর্থন করে আরো বলেছেন “জাতি ভেদ আছে বলেই ৩০ কোটি মানুষ এখনও খাবার জন্য এক টুকরো রুটি পাচ্ছে” এখন আমার সেই সব ফেসবুকার্সদের কাছে খুব জানতে ইচ্ছে করছে তারা যে মোল্লাদের মতো গলার জোর বাড়িয়ে হাতের মুষ্টি শক্ত করে আমার হিন্দু ধর্মের সমালোচনা দেখে না্না ভাবে প্রমাণ করতে চলে আসে আমার ধর্ম ভালো আমার ধর্ম ভালো তাদের মতামত।

আসলে একটি কথা মনে রাখতে হবে শিক্ষিত আর অশিক্ষিত সকল অন্ধবিশ্বাসী ধর্মান্ধদের। আসলে ধর্মান্ধ নামটি খারাপ শোনালেও এর ব্যাতিক্রম কিছু আপাতত হাতের কাছে পেলাম না, তবে পশ্চিমা দেশ গুলা সহ বহিঃবিশ্বের সকল দেশে এদেরকে সুন্দর একটি নামে ডাকা হয়, আর তা হচ্ছে “ফ্যানাটিক”। যেহেতু এই ফ্যানাটিকদের মধ্যে শিক্ষিত আর অশিক্ষিতদের কোন পার্থক্য নেই, তাই তাদের উদ্দেশ্যেই বলা, ধরুন হিন্দু ধর্ম একটি কালকেউটা সাপ যেটা বর্তমান যুগে তার খোলশ পালটিয়ে এখন গোখরা সাপে পরিনত হয়েছে কিন্তু এই দুইটা সাপই বিষধর এবং যা কামড় দিলে মানুষের মৃত্য পর্যন্ত হতে পারে। শুধু তাই নয়, যদি এই সাপ যাকে কামড় দিচ্ছে সে একাই অসুস্থ হয়ে মারা যেত তাহলে এই ধর্মের বর্বরতা আর অমানবিকতা তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার প্রয়োজন খুব একটা ছিলোনা। কিন্তু এই সাপে কামড় দিলে সে তো নিজে অসুস্থ হয়ে ধীরে ধীরে মারা পড়ছেই সাথে যখন বেশি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে তখন অন্যান্য ধর্মের বা সাধারণ মানুষকেও কামড় দিচ্ছে যাতে করে সেই মানুষটিও আবার মারা যাচ্ছে। যেমন কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের মালদাতে ঘটে যাওয়া লাভ জিহাদের নামে একজন মানুষকে আরেকজন মানুষের হত্যা করার নৃশংস ঘটনা তারই একটি কারণ। এরা যে ধর্মের অনুসারী হবার আগে একেকজন একেকটা মানুষ তা তারা এই সাপের কামড়ের বিষের কারনেই ভুলে যাচ্ছে।

---------- মৃত কালপুরুষ
               ১৬/১২/২০১৭    


শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭

মূর্তি পূজা কি হিন্দু ধর্মের বেদ বা পুরাণ স্বীকৃত ?


দেব-দেবীদের মুর্তি পূজা করার নিয়ম যদি হিন্ধু ধর্মের বেদ আর পুরাণ স্বীকৃতই হবে তাহলে তাদের এতো শতশত জাতপাতের ভেতরে প্রতিটি জাতের মধ্যেই একই নিয়ম চালু থাকার কথা ছিলো কিন্তু তা আমরা দেখিনা। কারণ হিন্দু ধর্মের ভেতরে বর্ণহিন্দু বলে একটি কথা প্রচলিত আছে অনেক আগে থেকেই যারা তাদের বিত্ত আর ঐশর্য প্রদর্শনের জন্য এই দুর্গা পূজা টাইপের হিন্দু ধর্মের প্রধান উৎসবের সৃষ্টি করেছিলো একটা সময়। এখানে উল্লেখ করতে হয় এই বর্ণহিন্দু ছাড়া তখনকার সময়ে তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে যারা একটু বিত্তশালী ছিলো তারাও একটা সময়ে এই দুর্গা পূজা টাইপের উৎসব করতো যা নিজেদের সম্মান বাড়ানোর চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। তারা (নিন্মবর্ণের হিন্দুরা) এই উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অনুকরনের চেষ্টা করতো মাত্র। আর তাদের এই চেষ্টা সেই বর্ণ হিন্দুরা বা বিশেষ করে ব্রাহ্মনেরা একদম পছন্দ করতো না। শুধু তাই নই তারা এটাও প্রচার করে বেড়াতো যে নিম্নবর্ণের বা ছোট জাতের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত দেব-দেবী বা ভগবানের মূর্তি (প্রতিমা) প্রণামও করা যাবে না। তারমানে এটাই প্রমাণিত হয় তাদের বিভিন্ন জাতের মধ্যে দেবতাও আলাদা আলাদা। আর তাই যদি না হবে তাহলে একই ভগবান তারা কেন একযায়গায় পূজা করে আরেকযায়গায় প্রণাম করতেও নিষেধ করে।

হিন্দু ধর্মের বেদ বা রামায়ন টাইপের যত পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ আছে তাদের কোনটার মধ্যেই এই পূজা বা বিশেষ করে দুর্গাপূজার অস্তিত্ব বা আদেশ-উপদেশ আমরা পায়না। এই দুর্গা পূজার নিয়ম কিছু হিন্দু ধনাঢ্য ব্যাক্তির সম্পদ ও প্রতিপত্তি প্রদর্শনের ফলস্বরুপ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের মাঝে চালু হয়। এই দুর্গাপূজা যে তাদের বেদসম্মত নয় তার অনেক প্রমাণ আছে যেটা ভালো বলতে পারে কোন বেদ আর পুরাণ জানা বোঝা ভালো হিন্দু ঠাকুর বা পুরোহিত। আর্য সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতার কিছু বৈদিক পূজার ছাপ দেওয়ার জন্য হিন্দুরা তাদের বেদের দেবী সূক্তটির ব্যবহার নানা যায়গায় করে থাকে। তবে এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করতে হবে, আর তা হচ্ছে, এই বেদে যে “হৈমবতী উমার” কথা লেখা আছে যা কখনই হিন্দুদের দেবী দুর্গা নয় বা “হৈমবতী উমার” সাথে দেবী দুর্গার কোন সম্পর্কই নেই তাহলে দুর্গাকে কেন তারা পূজা করে আর দেবী মানে। আর একটি কথা হচ্ছে “বাল্মীকির রামায়ন” বলে পরিচিত হিন্দুদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ যে সময়ে রচনা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয় সেই সময়ে তাদের “মার্কণ্ডেয় পুরাণের” জন্ম হয়নি আর তার মানে বর্তমানে হিন্দুদের বহুল পরিচিত দেবী কথিত “দুর্গার” আগমন তখনও ঘটেনি। মার্কেণ্ডেয় পুরাণ যুগের ভিত্তিতে পরবর্তিতে “শ্রীশ্রীচন্ডী” লিখিত হয়েছে। পৌরাণিক শাক্তাচারের শক্তির আদিমতম অবস্থাকে সংস্কৃতিতে বলা হয় “আদ্যাশক্তি” আর এই আদ্যশক্তির চণ্ডরুপই চণ্ড শক্তি বা “চণ্ডী” নামে পরিচিত। ধারনা করা হয় ৭০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মহাভারতে “মার্কণ্ডেয় পুরাণ” নামে পরিচিত যার সংক্ষিপ্ত নাম “চণ্ডী” প্রচলিত ছিলো তাতে এই দুর্গার নাম প্রথম খুজে পাওয়া যায় এর আগে দুর্গা বলে হিন্দু ধর্মে কোন দেবী ছিলোনা। তবে এই সময়ের সেই চণ্ডীতে দেবী “দুর্গা” আর “সুরথ” রাজার গম্প থাকলেও তাতে হিন্দুদের বহুল পরিচিত মুখ “রামের” কোন দেখা পাওয়া যায়না। সেই সাথে রাম যে দুর্গার পূজা করেছিলো বলে হিন্দু ধর্মের গল্প প্রচলিত আছে সেই গল্পও এই চণ্ডীতে ছিলো না। এসবই আসলে পরবর্তীতে যোগ করা হয়েছে নিজেদের মনগড়া ইচ্ছা অনুযায়ী।

আরো কিছু প্রমাণের ভেতরে হাজির করা যায় মোঘল যুগের কবি “তুলসী দাসের” কিছু লেখা থেকে। তুলসী দাসের “রামচিতমানস্থ” যেখানে এই রাম কর্তৃক দুর্গাকে পূজার কোন কথা উল্লেখ নেই। তাহলে এবার দেখুন এই দুর্গা পূজার প্রচলন কিভাবে চালু হলো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ভেতরে। পাঠান যুগের বাংলা আর বরেন্দ্রভুমির ইতিহাস পড়লে আমরা তখনকার একজন রাজার নাম পাই যার নাম ছিলো “কংস নারায়ণ রায়”। এই কংস নারায়ণ রায় বর্তমান বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহীর বরেন্দ্রভুমির তাহেরপুর নামক অঞ্চলের রাজা ছিলেন বলে জানা যায়। এই তাহেরপুরের নামকরণ করা হয়েছিলো তৎকালীন গৌড় রাজ্যের শাসকদের একজন জায়গীরদার “তাহের খাঁ” এর নামানুসারে যার পুর্বে এই অঞ্চলের নাম ছিলো “সাপরুল”। এই তাহের খাঁ কে কংস নারায়ণ যুদ্ধে পরাজিত করে এবং তাহেরপুর সহ আশপাশে তার যত জমিজমা ও সম্পদ ছিলো তা দখল করে নেয়। এরপর সেসময় এই অঞ্চলে এই রাজা কংস নারায়ন ব্যাপক লুটপাট চালায় ও ধীরে ধীরে অকল্পনীয় ধন সম্পদের মালিক বনে যায়। এরকম সময় কংস নারায়ণ সীদ্ধান্ত নেয় তার নিজের শক্তি ও মহিমা সর্বজনে প্রকাশ করে দেখাবে যাকে বলা হয়ে থাকে “অশ্বমেধ যজ্ঞ করার সংকল্প”। কংস নারায়ণের সময় তার আন্ডারে বেশ কিছু ব্রাহ্মন পণ্ডিত বা ঠাকুর ছিলো যারা এই রাজাকে বিভিন্ন ধর্মীয় যুক্তি দিয়ে থাকতো।

একসময় কংস নারায়ণ তার কয়েকজন ঠাকুরকে ডেকে তাদের বললো “আমি রাজসুয় কিংবা অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে চাই” এর জন্য যা কিছু করার দরকার তা করা হোক। এই অঞ্চলের মানুষ জানুক আমার কত ধন সম্পদ আছে এবং আমি আমার দুই হাত দিয়ে ছড়িয়ে দান করতে চাই। ঠিক তখন তার পন্ডিতেরা তাকে বলেছিলো এই কলি যুগে আর রাজসুয় কিংবা অশ্বমেধ যজ্ঞ হয় না বা পালন করা যাবে না। তবে আরেকটি উপায় আছে আপনার অর্থ সম্পদ আর ঐশ্বর্য মানুষের মাঝে তুলে ধরার। তখন এই ঠাকুর পন্ডিতের দল কংস নারায়ণকে দেখায় সেই “মার্কণ্ডেয় পুরাণ” থেকে বিবর্তিত “শ্রীশ্রীচণ্ডী” যাতে লেখা ছিলো দেবী দুর্গার কথা। ঠাকুর আর পন্ডিতেরা বলে এই পুরাণে যে দুর্গা পূজার কথা বলা আছে বা দুর্গাৎসবের কথা উল্লেখ আছে তাতেও অনেক খরচ করা যায় জাঁকজমক করে মানুষকে দেখানো যায় নিজের ঐশ্বর্য ও ক্ষমতা। তাই আপনাকে আমরা বলবো এই মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে এই দুর্গা পূজা করুন। তখন রাজা কংস নারায়ণ রায় সীদ্ধান্ত নেয় দুর্গা পূজা করবে আর তাই তৎকালীন সাতলক্ষ স্বর্ণমুদ্রা (বর্তমানে সাতশো কোটি টাকার উপরে) ব্যয় করে প্রথম দুর্গাপূজা করে বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। যেহেতু এটা ছিলো ধন সম্পদ আর ঐশ্বর্য প্রদর্শনের একটি উৎসব তাই আরো অনেকেই এটা পালন করার সীদ্ধান্ত নেয় তখন। এদের মধ্যে একটাকিয়ার (ধারণা করা হয় একটাকিয়া বর্তমান বাংলাদেশের রংপুর জেলার অঞ্চলটি ছিলো) রাজা জগৎবল্লভ সাড়ে আটলক্ষ স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে আরো জাঁক-জমকপুর্ণ করে এই দুর্গাপূজা করে।

রাজা কংস নারায়ণ আর রাজা জগৎবল্লভ এর এই পূজা করা দেখে সেসময়ের অন্যান্য জমিদারেরা চিন্তা করলো আমরাও বা এদের থেকে কম কিসে, আমাদেরও তো অনেক ধন সম্পদ আছে আর আমরাও তা দেখাতে পারি। যেই চিন্তা সেই কাজ তারাও প্রত্যেকে যে যার সামর্থ অনুযায়ী এই দুর্গাপূজা করা শুরু করে দিলো। আর এই থেকেই শুরু হয়ে গেল প্রতি হিন্দু জমিদার বাড়িতে দুর্গা উৎসব বা দুর্গা পূজা যার কোন বেদ বা পুরাণ স্বীকৃতি হিন্দু ধর্মে নেই। আর এটা কোন ধর্মীয় আদেশ থেকেও আসেনি। সেই সময়ে বর্তমান ভারতের (গুপ্তবৃন্দাবন) হুগলী বলাগড় থানার গুপ্তিপাড়া এলাকায় প্রথম বারোয়ারী পূজার চল শুরু হয়েছিলো। পরবর্তীতে আরো কিছু কারনে তা নাম নিয়েছিলো সার্বজনীন পূজা যা আজকের মডারেট হিন্দুরা পালন করে থাকে কিন্তু তাদের ভেতরে ৯০% এই বেদ বা গীতা সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ যার কারনে তাদের মধ্যে নানান মতোভেদ পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। লেখার দীর্ঘতার কারণে বাঙ্গালী হিন্দুদের মাঝে প্রথম কবে এই জাতীয় পূজার সুত্রপাত হলো, বারোয়ারী পূজা কিভাবে সার্বজনীন পূজা হলো আর এই ধর্মটিকে কেন মানবিক ধর্ম বলা চলেনা সেটা নিয়ে আগামীতে লিখবো।

---------- মৃত কালপুরুষ

                ১৪/১২/২০১৭   

বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

ইসলামের হিজরত কি অপরাধীদের পালায়ন, না ইসলাম প্রচার ?


প্রাক ইসলামিক যুগের আরবের ইতিহাস বা মক্কা, মদীনা ও নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্মের পুর্বের ও তার ৫০ বছর বয়সে হিজরত বলে পরিচিত তার মক্কা হইতে পালায়নের সঠিক ইতিহাস বর্তমান সময়ের বাংলাদেশে ইসলামিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যা দেওয়া হয়ে থাকে তার সত্যতা কতটুকু তা কিন্তু কেউ যাচাই করে দেখে না। ইসলাম ধর্মে একটি সহজ কারণ আছে এই যাচাই না করতে চাওয়ার ক্ষেত্রে আর তা হচ্ছে ইসলাম ধর্মে সন্ধেহ করার মানে হচ্ছে ঈমান নষ্ট হবার আশঙ্কা থাকে। অর্থাৎ যারা ইসলামের প্রচলিত শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে বা সন্ধেহ প্রকাশ করবে বা যাচাই করে দেখার জন্য এই হিজরত টাইপের বিষয় গুলি একটু ক্রিটিক্যালি এনালাইসিস করে দেখতে যাবে তাদেরকে কাফের বা ইসলাম ও নবীর শত্রু আখ্যা দেওয়া হবে। আর তাইতো এই প্রচলিত ইসলামিক শিক্ষার বাইরে কেউ আসলে জানতেও চাই না বা যাচাই বাছাই করেতেও চাই না। একটা বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে অতীতে যদি মানুষ কোন বিষয়ের উপরে সন্ধেহ না করতো বা প্রচলিত কোন বিষয়ের উপরে প্রশ্ন না উঠাতো তাহলে কিন্তু সভ্যতার উন্নয়ন সম্ভব হতো না। ইসলাম ধর্মে হিজরত বলে পরিচিত নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর মক্কা হতে পালায়ন প্রসঙ্গে ইসলাম ধর্মে নানান মত আছে। তবে কোনটি আসলে সঠিক বা বেশি গ্রহনযোগ্য তা কিন্তু পরিষ্কার করে কেউ বলতে পারেনা।

ইসলামের ইতিহাসে পাওয়া যায় কুরাইশ বংশ (আরবিقريش‎‎) কুরাঈশ বা কোরায়েশ ছিল প্রাক ইসলামিক যুগের আরবের একটি শক্তিশালী বণিক বংশ যারা মূলত প্যাগান ধর্মের বিভিন্ন দেব দেবতাদের পূজা করতো এ বংশটি তখনকার সময়ে মক্কা শহরের অধিকাংশ অংশ আর তখনকার প্যাগান ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান ও দেব দেবতাদের ঘর “কাবা” যা বর্তমানে মুসলমানদের উন্নতম তীর্থস্থান “কাবা শরীফ” তারাই নিয়ন্ত্রণ করতো। পরে  ইসলাম ধর্মের প্রধান ব্যাক্তিত্ব এই নবী মুহাম্মদ ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে কুরাইশ বংশের বনু হাশিম গোত্রেই জন্মগ্রহণ করে। তারমানে কুরাইশ বংশের লোকেরা ছিলো বর্তমানে ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা নবী মুহাম্মদ এর রক্তের সাথে সম্পর্কিত একটি গোত্র বা বংশ। নিজ বংশ বা গোত্রের মানুষের সাথে কি এমন কোন্দল বা ঝগড়া থাকতে পারে যার কারনে তাকে সেই মক্কা ত্যাগ করা লাগবে ? এটাকে ঠিক মক্কা ত্যাগ করা বলা যাবে না কারন ইসলামি শিক্ষায় আমরা অনেক যায়গায় তার উল্লেখ পায় তিনি আনুমানিক তার বয়স যখন ৫০ বছরের মতো তখন অর্থাৎ ৬২২ সালের ২১শে জুন তার একজন অনুসারিকে নিয়ে মক্কা থেকে পালায়ন করেছিলেন।

অনেকেই এই হিজরত এর ব্যাখ্যা করে থাকেন নবী তার জীবন বাচাঁনোর জন্য তখন মক্কা থেকে পালায়ন করেছিলো যদি সে পালায়ন না করতো তাহলে তাকে হত্যা করা হতআমরা সাধারণত জানি একই গোত্রের মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট কোন কারণ ছাড়া একই গোত্রের মানুষকে হত্যা করা হয়না। যেমন কারণ থাকতে পারে ধন সম্পদ প্রাপ্তি, ক্ষমতা দখল করা, নারী ঘটিত ব্যাপার ইত্যাদি কারণেই সব থেকে বেশি খুন হত্যা সংগঠিত হয়ে থাকে। তাহলে কথা হচ্ছে আমরা জানি নবীর ৪০ বছর বয়স থেকে তার উপরে ওহী আকারে কোরানের বানী আসতো আর এই বানী আসার ঘটনা তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন করার কথা ছিলো নবীর প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি হবার কথা ছিলো কিন্তু তা না হয়ে কেন তার উল্টা ঘটলো যদি ইসলাম শান্তি আর সত্য বার্তা নিয়েই তখনকার আরবে আসবে ? আসলে নবীর মক্কা থেকে পালায়নের পেছনে অনেক কারণ আছে যা আমরা প্রাক ইসলামিক যুগের ইতিহাস পড়লে কিছুটা জানতে পারি। আমি এখানে তার কিছুই উল্লেখ করবো না কারণ এতে করে অনেকের অনূভূতিতে আঘাত লাগতে পারে তাই আমি শুধু প্রশ্ন রাখলাম আপনারা একটু খুজে দেখবেন হিজরত বলে চালানো কনসেপ্টটা কি পরবর্তিতে মানুষকে সুক্ষভাবে ধোকা দেওয়ার কোন কৌশল কিনা।

নবীর হিজরত গমনের ব্যাখ্যা আসলে বেশিরভাগ এসেছে ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থ থেকে। আজকের দিনে আমরা যাকে হাদীস বলে জানি সেই হাদীস গ্রন্থ গুলি কিভাবে আর কারা লিখে গিয়েছিলো বা এই হাদীস কিভাবে মুসলমানদের মাঝে আসলো তা নিয়ে একটি বিশ্লষনের চিন্তা ভাবনা আছে আগামীতে করবো। তবে এখানে একটু বলে রাখতে হয় এই হাদীস দেখে যেকোন বিষয় নিশ্চিত ভাবে বা জোর দিয়ে বলার অর্থ হচ্ছে বোকামী ছাড়া আর কিছুই না। কারণ হাদীস গ্রন্থের লেখা গুলো অর্ধ সত্য বা কোন নির্ভরযোগ্য সুত্র থেকে প্রাপ্ত কিছুই যা ইসলামের ইতিহাসে নির্ভরযোগ্য অনেক গ্রন্থেই লেখা আছে এই কথাএমনকি এমন কথাও আছে যে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর সময়ে আরবের মানুষেরা ছিলো একেবারেই অশিক্ষিত ও বোকা প্রকৃতির যারা ইতিহাস কি জিনিষ তা জানতই না। ইতিহাস বলতে তারা বুঝতো বাপ দাদার মুখে শোনা কেচ্ছা কাহীনি ও তাদের মেনে চলা কিছু নিয়ম কানুন। এমনকি বেশ কিছু কারনে তাদের নবী বলেছিলেন যে এই সব হাদীস কেউ লিখে রাখবে না এতে করে কোরানের সাথে এই হাদীস মিশে যেতে পারে (সীরাতে ইবিনে হীশাম, পৃষ্ঠা ১২)

এতো এতো প্রমান থাকা শর্তেও মুসলমানরা কেন হিজরতের নামে ভুল ব্যাখ্যা শুনে কেন বিব্রিত হন তা কিন্তু সত্যিই ভাবার বিষয়। যাই হোক একটি ছোট্ট আলোচনা করি, বাংলাদেশে কিছুদিন আগে দেলোয়ার হুসাঈন সাইদী নামের একজন ইসলামী গবেষক ও রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব ছিলো যাকে পরে আমরা একজন দেশদ্রোহী অপরাধী বলে জানতে পারিতার ভক্তরা এই টেকনোলজির যুগেও একটি চরম মিথ্যাচার দিয়ে মানুষকে ভিভ্রান্ত করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে। তারা বলেছিলো এই ব্যাক্তি “দেলোয়ার হুসাঈন সাইদী” কে নাকি চাঁদ এর মধ্যে দেখা গেছে। এটা নিয়ে কিছু লেখালেখিও হয়েছে এবং অনেক গ্রামাঞ্চলে তা ব্যাপক ভাবে প্রকাশও করা হয়েছে যা অনেকেই বিশ্বাসও করেছে। যদিও এই যুগে এরকম মিথ্যাচার আসলে কেউ মেনে নেয়না। তবে এই ঘটনাটি আজ থেকে একশো দেড়শো বছর পরে সত্য ঘটনা বলে চালানো হবে না তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে ? তখন হয়তো বোকা কিছু মানুষ এই অপরাধীকে এই জাতীয় কোন বিশেষ ব্যাক্তি ভাবতে শুরু করবে অতীতের এসমস্ত লেখা পড়ে।

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিজরতের কথা উল্লেখ আছে নবীর কোরান নাজিল হওয়া শুরু হবার ৪ থেকে ৫ বছর পরে, তবে ইসলামি সাল গননা বা হিজরী তখন থেকে গননা করা শুরু হয়নি। এটা শুরু হয়েছিলো নবীর মক্কা থেকে পালায়নের পর থেকে। প্রথম ৬১৫ খ্রিস্টাব্দে হিজরতের নামে মক্কা থেকে চারটি পরিবার (স্বামী স্ত্রী) ও ৭ জন অপরাধী পালায়ন করে লোহীত সাগর পাড়ি দিয়ে “আকসূম” রাজ্য বা “আবিসিনিয়ায়” (আরবি) রাজ্যে আস্রয় নেয় যেটা ছিলো খ্রিস্টান প্রধান একটি রাজ্য যা বর্তমানে ইথিওপিয়ার মধ্যে পড়েছে। আবিসিনিয়ার খ্রিস্টান রাজা অপরাধী হওয়া শর্তেও তাদের আস্রয় দিয়েছিলো পরে তারাই আবার খ্রিস্টানদের হত্যা করেছেএই পালায়ন পর্বে প্রথম যাদের নাম পাওয়া যায় তারা হচ্ছে ১) উসমান ইবনে আফফান ও তার স্ত্রী ২) রুকাইয়া বিনতে মুহাম্মদ, ৩) আবু হুজাইফা ইবনে উতবা ও তার স্ত্রী ৪) সাহলা বিনতে সহাইল, ৫) আবু সালামা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল আসাদ ও তার স্ত্রী ৬) উম্মে সালামা, ৭) আমির আবিন রিবলাহ, ও তার স্ত্রী ৮) লায়লা বিনতে আমির আসমা, ও ৯) সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, ১০) জাহাশ ইবনে রিয়াব, ১১) আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাব, ১২) যুবাইর ইবনুল আওয়াম, ১৩) মুসয়াব ইবনে উমাইর, ১৪) আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, ১৫) উসমান বিন মাজউফ। পরবর্তিতে যখন হাদীস লেখার প্রচলন চালু করা হয় তখন এই পালায়ন পর্বকে ইসলামিকরণ করার জন্য হিজরত নাম দেওয়া হয়। আর বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের “হেফাজতে ইসলামী সংগঠন” ঢাকা ঘেরাও বা সুন্দরবন ঘেরাও বা বল্টুর কলাবাগান ঘেরাও বলে যে আন্দোলনের ডাক দিয়ে থাকে তা মূলত হিজরতের নামে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে সন্ত্রসী কর্মকান্ডে যোগ দেওয়ার ডাক ছাড়া আর কিছুই না। 

---------- মৃত কালপুরুষ
              ০৮/১২/২০১৭



বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭

১৪ই ডিসেম্বরে হত্যা করা বুদ্ধিজীবীদের লাশজুড়ে ছিল আঘাতের চিহ্ন।


আজ ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস যা বাংলাদেশে পালিত একটি বিশেষ দিবস। প্রতিবছর বাংলাদেশে ১৪ ডিসেম্বর দিনটিকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৭১ সালের ১০ থেকে ১৪ই ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর সকল বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে। এ কাজে বাংলাদেশীদের মধ্যে রাজাকারআল বদরআল শামস বাহিনীর লোকেরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিল। ১৯৭১ এর এই দিনটি ছিল মঙ্গলবার। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংসতম ঘটনাটি ঘটে আজকের এই দিনে। আমাদের জাতীয় জীবনের আরেক শোকাবহ দিন এটি। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের শেষ সময়ে আমাদের বিজয় যখন চুড়ান্ত তখন পরাজয় নিশ্চিত ভেবে পাক হানাদার বাহীনি দ্বারা বিজয়ের চূড়ান্তক্ষণে বাংলাদেশ হারিয়েছিল তার শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও শিল্পীদের। আজ পুরো জাতি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করবে সেসব সূর্যসন্তানদেরকে। যাদের আত্মত্যাগে অর্জিত হয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ, আমরা পেয়েছি স্বাধীন মানচিত্র। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার ঠিক দুই দিন পর ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজির নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানী বর্বর বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং স্বাধীন দেশ হিসাবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। 

পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে নির্মিত হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। এটি ঢাকার মীরপুরে অবস্থিত। স্মৃতিসৌধটির স্থপতি মোস্তফা হালি কুদ্দুস। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর সহায়তায় বাংলাদেশের বহুসংখ্যক বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে তাদেরকে মিরপুর এলাকায় ফেলে রাখে। সেই সকল বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে সেই স্থানে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়। এ সকল বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে ঢাকার রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নাম জানা ও অজানা বুদ্ধিজীবীদের সম্মানে নির্মাণ করা হয়েছে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ’। স্থপতি মো. জামী-আল সাফী ও ফরিদউদ্দিন আহমেদের নকশায় নির্মিত স্মৃতিসৌধ ১৯৯৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া বাংলাদেশ ডাকবিভাগ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে একটি স্মারক ডাকটিকিটের সিরিজ বের করেছিলো।

১৯৭১ সালের এই দিনে মহান মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বরেণ্য হাজার হাজার শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকদের চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে তাদের ওপর চালায় নির্মম-নিষ্ঠুর নির্যাতন তারপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র বুঝতে পেরেছিল, তাদের পরাজয় অনিবার্য। তারা আরো মনে করেছিল যে, বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা বেঁচে থাকলে এ মাটিতে বসবাস করতে পারবে না। তাই পরিকল্পিতভাবে জাতিকে মেধাহীন ও পঙ্গুত্ব করতে দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের বাসা এবং কর্মস্থল থেকে রাতের অন্ধকারে পৈশাচিক কায়দায় চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে হত্যা করে ১৭ এর আজকের এই দিনে।

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের হত্যাকাণ্ড ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম বর্বর ঘটনা, যা বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষকে স্তম্ভিত করেছিল। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পর ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে বুদ্ধিজীবীদের লাশ ফেলে রেখে যায়। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পরপরই নিকট আত্মীয়রা মিরপুর ও রাজারবাগ বধ্যভূমিতে স্বজনের লাশ খুঁজে পায়। বর্বর পাক বাহিনী ও রাজাকাররা এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করেছিল। বুদ্ধিজীবীদের লাশজুড়ে ছিল আঘাতের চিহ্ন, চোখ, হাত-পা বাঁধা, কারো কারো শরীরে একাধিক গুলি, অনেককে হত্যা করা হয়েছিল ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে। লাশের ক্ষত চিহ্নের কারণে অনেকেই তাঁদের প্রিয়জনের মৃতদেহ শনাক্ত করতে পারেননি। ১৯৭২ সালে জাতীয়ভাবে প্রকাশিত বুদ্ধিজীবী দিবসের সঙ্কলন, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন ‘নিউজ উইক’-এর সাংবাদিক নিকোলাস টমালিনের লেখা থেকে জানা যায়, শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা মোট ১ হাজার ৭০ জন।

২৫ শে মার্চের কালোরাত্রি থেকেই ঘাতক-দালালদের বুদ্ধিজীবী নিধন-যজ্ঞ শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা,ফজলুর রহমান খান,গোবিন্দ চন্দ্র দেব সহ আরো অনেকেই এই কালোরাত্রিতেই শহীদ হন।শুধু ঢাকা কেন সমস্ত বাংলাদেশ(ত্ৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান)জুড়েই চলছিল এই হত্যা প্রক্রিয়া।সিলেটে চিকিৎসারত অবস্থায় হত্যা করা হয় ডাক্তার শামসুদ্দিন আহমদকে।শিক্ষাবিদ,চিকিৎসক,প্রকৌশলী,সাহিত্যিক,সাংবাদিক,ব্যবসায়ী,রাজনীতিক,ছাত্র কেউই এই ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পাননি।প্রতিদিনই কারো না কারো বাসায় ঢুকে বিশেষ কোন ব্যক্তিকে ধরে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হতো অজ্ঞাত কোন স্থানে।যাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো নারকীয় নির্যাতনের পরে তাদের সবাইকেই মেরে ফেলা হতো।ওরা কেউ আর ঘরে ফিরে আসেনি।দু,একটা ব্যতিক্রম হয়তবা ছিল।কিন্তু সেইসব ভাগ্যবানের সংখ্যা উল্লেখ করার মতো ছিলনা। আসুন আজকের এইদিনে সকল শহীদদের আবারও শ্রদ্ধার সাথে আরেকটিবার স্মরন করি।

ছবিঃ ইস্টিশন।

---------- মৃত কালপুরুষ
               ১৩/১২/২০১৭