বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭

হিন্দু ধর্মই কি সমাজের পতিতা বৃত্তির জনক ?


চুড়ান্ত অশ্লীলতা আর জাতপাতের ভিন্নতা সাথে নিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে চলমান একটি ধর্মের নাম এই সনাতন ধর্ম যাকে বর্তমানে আমরা হিন্দু ধর্ম বলেই জানি। আসলে হিন্দু ধর্ম বলেও কিছুই নেই। তারপরও অনেক না জানা হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নিজেদের হিন্দু বলেই পরিচিতি দিয়ে থাকে। হিন্দু শব্দটির উৎপত্তির কথা শুনলে আমরা দেখতে পায় হিন্দু শব্দটি হয়তো এই ধর্মের বহু জাতপাতের ভেতরে কিছু মানুষকে ছোট করার জন্য বা (গালি) দেবার জন্য অতীতে ব্যবহার করা হত। আজ সেই (গালি) হিন্দু শব্দটি তাদের ধর্মের নাম হয়ে গিয়েছে। বহু পুর্বে থেকেই হিন্দু ধর্মটি অনেক ভয়ংকর সব রীতি-নীতি আর সংস্ককৃতি ও ঐতিহ্য সাথে নিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মাধ্যমেই টিকে আছে এই ধর্মটি। যদিও যুগে যুগে তার অনেক সংস্কার হয়েছে এবং মডারেট হিন্দুরা এই ধর্মটিকে মানবিক ও বিজ্ঞানসম্মত বলে প্রচার করছে তারপরেও অনেক অমানবিক বিষয় ও নোংরামী তারা লুকাতে ব্যার্থ হচ্ছে। এই ধর্মটিতে ব্রাহ্মনবাদ ব্যাপারটি সব থেকে খারাপ একটি দিক। এরাই বেশি জাতপাত করে থাকে তাদের ধর্মের মানুষের ভেতরে। এমনকি দেখা যায় উচু জাতের হিন্দুরা নিচু জাতের হিন্দুদের দেব-দেবীর মুর্তি পর্যন্ত প্রনাম (সন্মান) দেয়না। এতে করেই প্রামণিত হয় তাদের দেব-দেবীর মুর্তি পূজা এই ধর্মেরই চালাক চতুর কিছু মানুষের তৈরি করা একটি বিষয়।

মডারেট হিন্দুদের ভাষ্য মতে এই ধর্মটি সংস্কার হচ্ছে এবং আমরাও ইতিহাসে পাচ্ছি কালের বিবর্তনে এই ধর্মের ধর্মীয় বর্বরতা তারা কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পারলেও গোড়ামী এবং অশ্লীলতা হিন্দুদের মাঝে এখনও যথেষ্ট পরিমানেই বিদ্যমান। অন্যান্য অধিক চর্চিত ধর্ম গুলোর মতো এই ধর্মটিও নারীদের করেছে নানাভাবে অপমান অপদস্থ। পুর্বে সতীদাহ প্রথার মতো বাতিল হয়ে যাওয়া কিছু জঘন্য ও বর্বর প্রথার সাথে তারা বর্তমানেও নারীদের সাথে জঘন্য আচরনের নানা দিক উন্মুক্ত করে রেখেছে। যেমন ধরুন হিন্দুদের দুর্গাপূজা বেশ্যাবৃত্তিকে সমর্থন করে। সমাজের বিভিন্ন জাত ও ধর্মের মানুষের দ্বারা নির্যাতিত আর নীপিড়িত নারীরাই বর্তমানে এশিয়া মহাদেশের তৃতীয় শ্রেনীর বিভিন্ন দেশে এই বেশ্যাবৃত্তির সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। বহিঃবিশ্বের উন্নত দেশগুলির কথা আলাদা যেখানে নারীকে আলাদা চোখে দেখা হয়না। যুক্তিবাদী সমাজ যেখানে এই নারীদের এই সব নির্যাতন আর নীপিড়ন থেকে মুক্তির জন্য মানুষকে সচেতন করে চলেছে ঠিক তেমনি এই হিন্দু ধর্মের কিছু নিয়ম আবার এটাকে জাগ্রত করে রাখছে। যেমন ধরুন হিন্দুদের বর্তমানে প্রধান ধর্মীয় উৎসব বলে পরিচিত দুর্গা পুজা সেই নির্যাতিত নারীদের (পতিতা) ঘরের দরজার সামনের মাটি ছাড়া এই পূজা যথাযথ হবে না বলে মনে করে থাকেন। অর্থাৎ বেশ্যাবৃত্তি না থাকলে এদের পূজা হবে না তাই তো বোঝা যায়।

দুর্গা পুজা নামে পরিচিত হিন্দুদের এই মহা উৎসবটি অতীতে বসন্তকালেই পালিত হতো বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। বৃটিশ আমলের পুর্বে কোথাও এই রকম জাক-জমকপুর্ণভাবে এই দুর্গা পূজা হতো বলে উল্লেখ পাওয়া যায় না। ব্রিটিশদের খুশি করার জন্যই এই পূজার সময় পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অনেকেই মনে করে থাকেন। তবে এর পেছনে আরো কিছু কারণ আছে। বৃটিশরা নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে সরানোর জন্য কিছু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সাথে একটি ষড়যন্ত্র করে যখন সফল হয় তখন হিন্দুরা বৃটিশদের খুশি করার জন্য ও বিজয় উৎযাপনের জন্য এই দুর্গা পূজাকে শরৎকালে এগিয়ে নিয়ে আসেন। এখানেও নারীকে ছোট করা হয়েছে এবং ধারনা করা হচ্ছে এই সময়েই পতিতালয়ের মাটি ছাড়া এই পুজা হবে না নিয়ম চালু করা হয়েছে। যেমন তৎকালীন বৃটিশরা ছিলো চরম নারীলোভী একটি জাতি তাই দুর্গা পূজার  মতো বড় উৎসবে পতিতা গমন ছাড়া কিভাবে এই উৎসব সফল হবে। তাই পতিতা গমনের কথা মাথায় রেখেই তারা এই নিয়ম চালু করেছিলো। কবি কালীদাসের বিভিন্ন কবিতায় এই হিন্দু ধর্মের অনেক বিষয় উঠে এসেছে যার মধ্যে উন্নতম হচ্ছে হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে বড় ঋষি “বিশ্বামিত্র” থেকে শুরু করে রাজা “বিক্রমাদিত্য” পর্যন্ত পতিতাগমন করেছিলো বলে উল্লেখ পাওয়া যায় এই কালীদাসের কবিতায়। এই সমস্ত বিষয় পর্যালোচনায় এটা মনে হবার কোন কারণ না থাকার কথা নয়, নারীকে এই পেশায় অবদ্ধ করে রাখার জনক-জননীদের মধ্যে হিন্দু ধর্মই প্রধান।

এই ধর্মটি হিন্দু সমাজের মধ্যে নারীকে ছোট করার আর সমাজচ্যুত করার বা সমাজ থেকে ছুড়ে ফেলে দেবার নানান পথ তৈরি করে রেখেছে যা এখানে বলে শেষ করা যাবে না। বর্তমানে আমরা হিন্দু লেখক সাহিত্যিকদের বিভিন্ন লেখাতে এরকম যথেষ্ট প্রমাণ পেয়ে থাকি। বিশেষ করে বিভিন্ন রম্যলেখকদের লেখার মধ্যে পাই। উদহারণ স্বরুপ একটি ভয়ানক নিয়মের কথা না জানালেই নই যেটা ছিলো এবং এখনও কিছু কিছু অঞ্চলের হিন্দু সমাজে যার প্রচলন আছে। বাংলা ভাষায় আমরা একটি প্রবাদ শুনে থাকি বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী সমাজে “মেয়েদের জীবনে লগন একবারই আসে” টাইপের প্রবাদ। “লগন” শব্দটি আরো অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাবহার হয়ে থাকে, তবে হিন্দু ধর্মের পরিভাষা অনুযায়ী এটা নারীদের বিবাহের নির্দিষ্ট সময় বা লগ্ন হিসেবেই বেশি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই লগ্ন বা সময়টাকে বিভিন্ন হিন্দু ঠাকুর (ব্রাহ্মন ঠাকুর) বাড়িতে ডেকে নিয়ে এসে নানান ভাবে (ভুল-ভাল) ভূগোল বুঝিয়ে গননা করে একটি নির্দিষ্ট সময় বা লগ্ন বের করা হয় একটি নারীর বিবাহের সঠিক সময় হিসেবে। আর এই সময়টি বা লগ্নটি যদি একবার পার হয়ে যায় কোন নারীর জীবনে বা এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোন কারণে যদি বর সেখানে না পৌছতে পারে তাহলে সেই নারীর জীবনে আর এই সময় বা লগ্ন আসবে না। অর্থাৎ সেই নারীকে তার বাকি জীবন অবিবাহিত ভাবেই পার করতে হবে এমন নিয়ম আছে এই ধর্মে যা এই ধর্মের কেউ অশ্বীকার করতে পারবে না। আর এরকম যদি কোন কারণে ঘটেই থাকে তাহলে সেই নারী তার বাকী জীবন কিভাবে পার করবে সেটা কিন্তু ঠাকুর আর পুরোহিতরা বলে দেয়না সেই পথটা নারীকে একাই খুজে নিতে হয়।

---------- মৃত কালপুরুষ
               ১১/১২/২০১৭    

রবিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৭

হিন্দু ধর্মের নিজেদের ভেতরেই কোন মিল খুজে পাওয়া যায় না।


যাদের নিজের ধর্ম আর নিজেদের ধর্ম গ্রুন্থেরই একটির সাথে আরেকটির কোন মিল নেই তাদের কিভাবে আপনি একটি রেফারেন্স সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে দেখাবেন। এই ধর্মটির আসলে শতশত শাখা প্রশাখা থাকার কারনে এক গ্রুপের সাথে আরেক গ্রুপের কোন মিল খুজে পাওয়া যায় না। তাই যদি কেউ হিন্দু ধর্মের (ব্লাক সাইড) বা খারপ দিক গুলো তুলে ধরে কোন রেফারেন্স বা সুত্র দিয়ে থাকে তাহলে মডারেট হিন্দুরা সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এই সুত্রটি ভুল আছে বা এটা আমাদের বেদে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ হচ্ছে তাদের বেদ আর পুরাণের ভার্সনের অভাব নেই। অনেক ভার্সনের মধ্যে তারা কিছু কিছু নির্ভরযোগ্য মানুষের লেখা বা অনুবাদ পড়ে এধরনের কথা বলে। আসলে এদেরও তেমন কোন দোষ নেই কারণ হিন্দু ধর্মের এই জাতীয় "ঋগ্বেদ সংহিতা" "যযুর্বেদ সংহিতা" "অথর্ববেদ সংহিতার" মতো গ্রন্থগুলি আসলে তাদের নিজেদের মধ্যেই সহজলভ্য নয়। এর কারণে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ৮০% তাদের এই মূল গ্রন্থগুলো পড়াতো দূরে থাক তারা হাতে নিয়েও কোন দিন দেখেনি। এই হিসাবটিতে আমার ভুল থাকতে পারে সংশোধন করে দেবার অনুরোধ রইলো। এই হিন্দু ধর্মের মানুষের একেক গ্রুপের মধ্যে একেক রকম মত বা একেক গ্রন্থে যে একেক রকম সুত্র দেওয়া আছে তার একটি নমুনা দেখুন এখানে।

বিভিন্ন একেশ্বরবাদী ধর্মের মতো হিন্দু ধর্মেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে একজন ইশ্বর বা স্রষ্টার কথা বলা আছে তা অনেক হিন্দু বা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জানেই না। তারা মনে করে থাকে তাদের শত শত আর হাজার হাজার দেব-দেবতায় হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা। যে কারোনে ১০০ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের যদি জিজ্ঞাসা করা যায় আপনি কত জন দেবতা বা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন ? তাহলে নানা উত্তর আসে তাদের কাছে থেকে। সে যাই হোক প্রতিটি ধর্মই আসলে মানুষে তৈরি ঠিক যেমন প্রতিটি ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তাও মানুষের তৈরি। এই মতে বর্তমান যুগের মানুষের আর কোন সন্ধেহ থাকার কথা না। যারা এখনও অন্যান্য (পৃথিবীর সকল) ধর্মের মতো হিন্দু ধর্মকে সত্য বা মানবিক ধর্ম বলে দাবী করে আসছেন তাদের আরো ভালো করে আপনাদের এই ধর্মের সত্যতা যাচাই করার অনুরোধ করবো আগে। কারণ আমরা হিন্দু ধর্মের যে সকল গ্রন্থ গুলো সহজে হাতে পেয়ে পড়ে থাকি তা পড়ার পড়ে এটুকুই জানতে পা্রি অন্যান্য সকল বর্বর আর আমানবিক ধর্মের মতো এই ধর্মটিও কোন অংশে বর্বরতার আর অমানবিকতার থেকে পিছিয়ে নেই বরং প্রথম সারিতেই আছে। আর যদি এই ধর্মটি মানবিক আর বর্বর না হয়ে থাকবে থাহলে কেন তাদের মূল ধর্মীয় গ্রুন্থ গুলো মানুষের মধ্যে সহজলভ্য করে রাখে নাই বা এখনও করছে না। সমস্যা কি ?

এবার আসুন আমরা হিন্দু ধর্মের ঈশ্বর ধারণা সম্পর্কে জানি। যদি কোনো সাধারন হিন্দুকে প্রশ্ন করেন আপনি কতজন ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন কেউ হইতো বলবে ১০ জনকেউ ৫০ জন, কেউ ১০০ বা ২০০ জন,  কেউ ১০০০ জন আবার কেউ হয়তো বলবেন ৩৩ কোটি জন। কিন্তু আমরা যদি কোনো জ্ঞানী হিন্দু পন্ডিত যিনি হিন্দু ধর্মের পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ গুলো  যেমন, বেদপূরান, ইত্যাদি পড়েছেন তার কাছে যাই তাহলে তিনি বলবেন হিন্দুদের কেবল মাত্র একজন ঈশ্বরের ইবাদাত করা উচিত। এ সম্পর্কে বেদ বা হিন্দু ধর্মের বহু কিতাব থেকে বহু উদ্ধৃতি উপস্থাপন করা যায়। যেমনচারটি বেদেই এই শ্লোক (মন্ত্রটি) আছে। একে বেদের ব্রহ্মসুত্রও বলা হয়ে থাকে-একম ব্রহ্মা দ্বৈত্য নাস্তি নহিনা নাস্তি কিঞ্চান" অর্থাৎ ঈশ্বর একজন তার মতো কেউ নেইকেউ নেই সামান্য নেই। আরও আছে  ”তিনি একজন তারই উপাসনা করো (ঋকবেদ ২/৪৫/১৬)। আরো দেখুন  "এক্‌ম এবম অদ্বৈতম ” অর্থাৎ তিনি একজন তার মত আর দ্বিতীয় কেউ নেই (ঋকবেদ ১/২/৩)। ”একজনই বিশ্বের প্রভূ (ঋকবেদ ১০/১২১/৩)।

এছাড়াও অনেক জোর দিয়ে বলা হয়েছে ন্ দ্বিতীয় ন্‌ তৃতীয় চতূর্থ না পুচ্যতে। ন্‌ পঞ্চম ন্‌ ষস্ট সপ্তম না পুচ্যতে।। ন্‌ অস্টম ন্‌ নবম দশমো না পুচ্যতে। য এতং দেব মেক বৃত্যং বেদ।।” (অথর্ব বেদ সুক্ত ১৪/৪/২) অর্থাৎ পরমাত্মা এক। তিনি ছাড়া কেহই দ্বিতীয়তৃতীয় বা চতুর্থপঞ্চম,ষস্ট,সপ্তম,অস্টম,নবম বা দশম বলিয়া অবিহিত আর কেহই নাই। যিনি তাহাকে এক বলিয়া জানেন তিনিই তাহাকে প্রাপ্ত হোন। উপরের এ সকল স্লোক থেকে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যেহিন্দু ধর্মেও একেশ্বরবাদ স্বীকৃত। তাই অন্যান্য একেশ্বরবাদী ধর্মের মতো হিন্দু ধর্মের মধ্যে প্রথম সাদৃশ্য হল একেশ্বরবাদ ব্যাতীত দ্বিতীয় কোন ঈশ্বর নেই। তাহলে প্রশ্ন থাকলো হিন্দুদের এতো শত শত, হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি দেব দেবোতা আর ঈশ্বর যাদের সকলের নাম মনে হয় একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পক্ষে একজীবনে জানায় সম্ভব না তারা কোথায় গেলো। তাহলে কি হিন্দু ধর্মের নিজেদের ভেতরেই কোন মিল থাকলো ? যারা রেফারেন্স দেওয়া সুত্রের মিল নেই বলে দাবী করেন বা মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের মতো প্যাচাতে থাকেন তাদের এই বিষয়টি পরিষ্কার করে দেবার অনুরোধ রইলো।

---------- মৃত কালপুরুষ
                ১০/১২/২০১৭


শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

হিন্দু নামধারী সনাতনের লেবেল চেঞ্জ ধর্মকে বর্বর বলা যাবে না কেন ?


গত দুইদিন ধরে সোস্যাল মিডিয়াতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদার কোথাও ঘটে যাওয়া একটি ধর্মীয় হত্যাকান্ডের ভিডিও ঘুরে বেড়াচ্ছে যা বেশ কয়েকবার আমার চোখে পড়েছে। ধর্মের আফিমীয় মাদক ও এই জাতীয় ধর্মাবলম্বী বোকা মানুষ গুলিকে কতটুকু নির্বোধ-মানবিকতাশুণ্য বানিয়ে দেয় তার একটি চরম উদাহরণ হতে পারে এই বর্বর হিন্দু ধর্ম। হিন্দু ধর্মের বেদ, গীতা, মনুসংহিতা, উপনিষদ, রামায়ন, মহাভারত, পুরানপাচালি ইত্যাদির মধ্যে এতো জাতপাতের বৈষম্য, বর্ণভেদ, গোত্রবিভেদ, ধর্মভেদ, ধর্মান্ধতা, গোড়ামি, কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতা, নারীর প্রতি কুসংস্কার, বিরুপ ধারণা, ভয়, ঘৃণা, আর সবশেষে বর্বর ও জংলী কিছু ধর্মীয় আইন কানুন আছে যা আর অন্য কোন ধর্মে পরিলক্ষিত হয়না। হিন্দু ধর্ম একটি বর্বর ও অমানবিক ধর্ম বলাতে যারা ধুতি পরে মাথার টিকলি নাচাতে নাচাতে চলে আসেন হিন্দু ধর্ম রক্ষা করতে তাদের বলবো আগে প্রমান করুন আমি কোথায় ভুল কিছু বলেছি যা এই হিন্দু ধর্মে নেই। হিন্দু ধর্ম যে বর্বর আর অমানবিক ধর্ম না সেটার পক্ষে দুই একটা কারণ দেখান এখানে। আমি এখানে হিন্দু ধর্মের মানুষ হত্যা আর বর্বরতার কিছু নমুনা দিলাম মিলিয়ে দেখুন।

শিশুকাল থেকেই একটি হিন্দু ধর্মালম্বী বাচ্চাকে হাতে তীর ধনুক দিয়ে রাবণ মারার মাধ্যমে এই মানুষ হত্যা করা আর মানুষকে ঘৃণা করার হাতে খড়ি দেওয়া হয়ে থাকে এই ধর্মটিতে। যেসব মডারেট হিন্দুরা বলে থাকে এই ধর্মে আসলে এমন কিছুই বলা নেই যেখানে মানুষ হত্যার কথা আছে তাদের স্বদয় অবগতীর জন্য জানাচ্ছি (অথর্ববেদ ১২,০৫,৫৪) এ বলা আছে “Vedic followers should destroy infidels” অর্থঃ “বৈদিক অনুসারীদের (কাফের বা বেধর্মীদের) ধ্বংস করা উচিত” মজার বিষয় হলো এই বৈদিক সভ্যতা থেকেই আজকের সনাতন ধর্মের সৃষ্টি তবে এখানে কথা আছে। কথা হচ্ছে সনাতন ধর্মের অনেক কিছুই পরিবর্তন করে আজকের মডারেট হিন্দু ধর্ম বানানো হয়েছে যাতে এই বৈদিক দর্শনের কোন মিল নেই তাই অতীতে যারা এই বৈদিক ধর্মের অনুসারী ছিলো তাদেরকে এই হিন্দুদের দ্বারাই হত্যা করার উদ্দেশ্যে “অথর্ববেদে” এসমস্ত শ্লোক যোক করা হয়েছিলো যা এখনও আছে।

এছাড়াও হিন্দু ধর্মের (ঋগ্বেদ  ০১,১৬,০৪) এ বলা হচ্ছে “যারা তোমাকে পূজায় উপহার দেয় না, তাদের প্রত্যেককে হত্যা করো” এর মানে হচ্ছে সনাতন ধর্ম থেকে আলাদা একটি গোত্র অনেক পুর্বে ভারতবর্ষে তাদের বিভিন্ন দেব দেবতাদের মূর্তি বানিয়ে পূজা করার চল শুরু করেছিলো। বর্তমানে আমরা হিন্দু ধর্মাওবলম্বিদের যে দেব-দেবতা আর ভগবানের মূর্তি পূজা করতে দেখি তা কিন্তু এই ধর্মের সকল জাতি পালন করে না। উল্লেখ করতে হয়, হাজার হাজার বছর আগে থেকেই এই সনাতনের খোলস পাল্টিয়ে হিন্দু নাম ধারণ করা ধর্মটি বিভিন্ন দেব দেবতা আর কল্পিত ভগবানের মূর্তি বানিয়ে সেসব পূজা করে আসতো তবে কিছু কিছু গোত্র তা করতো না যেমন প্রাচীন ভারতে “কিটক্যাট” নামের একটি জাতি ছিলো যারা মূলত এসব ধর্মীয় নিয়ম কানুন মানতো না। তাদেরকেই হত্যা করার জন্য ঋগ্বেদ এ এই কথা বলা হয়েছিলো যা এখনও হিন্দু ধর্মের মধ্যেই আছে। বর্তমানে যে দুর্গা পূজা, কালী পূজা, স্বরসতী পূজা মডারেট হিন্দুরা পালন করে আসে তার জন্ম খুব বেশি হলেও ১৫০ বছর হতে পারে তার আগে এভাবে পালন হতো না। মডারেট হিন্দুরা যখন বলে তাদের ধর্ম অনেক সংস্কার হয়েছে তখন এই ধর্মের আরেকদল এইসব শ্লোক ব্যবহার করে অন্য ধর্মের মানুষ হত্যা করে চলেছে এবং হত্যা করার উষ্কানী দিয়ে চলেছে।

আরো কিছু নমূনা দেখুন এই সনাতনের লেবেল পাল্টানো হিন্দু ধর্মের সরাসরি মানুষ হত্যা করার উস্কানী মূলক ডায়ালগ। (ঋগ্বেদ  /৮৪/৮) রাজ্য প্রধান এর প্রতি বেদের নির্দেশ হচ্ছে, যে লোক ঈশ্বরের আরাধনা করে না এবং যার মনে ঈশ্বরের প্রতি অনুরাগ নেই, তাকে পা দিয়ে পাড়িয়ে হত্যা করতে হবে” যার অনুবাদ করেছেন আচার্য্য বিদ্যা মার্তন্ড, আর্য সমাজ। স্বামী দয়ানন্দের ভাষ্য হতে অনুবাদিত এর মানে যে সমস্ত সাধারণ মানুষ যারা “ঋদ্বেদে” বিশ্বাস করে না বা বেদ মানে না, হোক সে হিন্দু বা অন্য যে কোন ধর্মের বা অধার্মিক তাকেই বলা হচ্ছে পা দিয়ে মাড়িয়ে হত্যা করতে হবে। তাহলে কি এই ধর্মটিকে আমাদের বর্বর বলা ভুল হচ্ছে। গতকাল সেই বর্বরচিত হত্যাকান্ডের ভিডিও ফুটেজ দেখে যখন আমি মন্তব্য করি এই ধর্মটি একটি “বর্বর ধর্ম” তখন এক শিবসেনা আমাকে আইনের আওতায় আনবে বলে হুমকি দিয়েছে। আসলে এই হিন্দু নামধারী সনাতন ধর্মকে বর্বর প্রমানীত করার জন্য খুব বেশি উদাহরণ মনে হয় আমার দেওয়া লাগবে না। তার পরেও যদি কোন হিন্দু পন্ডিত বা ব্রাহ্মন ঠাকুর এই লেখা পড়ে থাকেন তাহলে হিন্দু ধর্ম যে বর্বর ও অমানবিক ধর্ম না তা একবার প্রমাণ করার চেষ্টা করতে পারেন।

এখানে ছোট করে আরেকটি ধর্ম (ইসলাম) এর সাথে একটু তুলনা করে দেখাচ্ছি। যাকে সমস্ত পৃথিবীর মানুষ রক্তের ধর্ম বলে জানে তার থেকেও এই হিন্দু ধর্ম কত খারাপ একটি ধর্ম হতে পারে। যেমন দেখুন (যজুর্বেদ ১৭/৩৯) সেনাপ্রধান হিংস্র নির্দয়ভাবে শত্রুদের পরিবারের সদস্যদের সাথেও যুদ্ধ করবে। মানে পরিবারের সদস্য বলতে নারী, শিশু, বৃদ্ধ সকলকে হত্যা করার আদেশ দিচ্ছে এই “যযুর্বেদ”। আরো দেখুন (যজুর্বেদ ১৭/৩৮) শত্রুদের পরিবারকে হত্যা কর, তাদের জমি ধ্বংস কর” এবার বোকা মানুষগুলোকে আদেশ দেওয়া হচ্ছে হত্যার পাশাপাশি তাদের সম্পদও ধ্বংস করতে হবে। এছাড়াও (যজুর্বেদ ১৩/১৩) তে বলা হচ্ছে “শত্রুদের হত্যা কর তাদের জায়গা জমি রান্নাঘর ধ্বংস কর” অনুবাদঃ দেবী চাঁদ, আর্য সমাজ। স্বামী দয়ানন্দের ভাষ্য হতে অনুবাদিত। এবার আসুন ইসলাম ধর্মের প্রধান নবী যাকে মুসলমানরা অনুসরণ করে থাকে তার ভাষ্য এমন যে, বেশ কিছু হাদীসে উল্লেখ আছে তিনি [মুহাম্মদ (সাঃ)] মক্কা বিজয়ের সময় তার অনুসারীদের বলেছিলেন, তোমরা বিনা কারনে এমনকি গাছের একটা ডালও নষ্ট করো না। সেখানে বেদ হিন্দুদের কি অনুমতি দিচ্ছে ? একটু নিরাপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করে দেখুন।

সম্পুর্ণ হিন্দু ধর্মের এরকম শ্লোকের সংখ্যা আছে অসংখ্য যা বলে শেষ করা যাবে না। কারণ এই ধর্মটির অনেক অনেক শাখা প্রশাখা আছে। তবে ঘুরে ফিরে সেই কালকেউটা সাপ এখন খোলস পাল্টিয়ে হয়েছে গোখরা সাপ যাতে কোন প্রকার সন্ধেহ করা চলে না। আসলে সোস্যাল মিডিয়া আর অনলাইন মাধ্যমগুলিতে মুক্তমনা নামধারী কিছু হিন্দু মৌলবাদীকে দেখা যায় যারা আসলে ইসলাম ধর্ম বা অন্য কোন ধর্ম নিয়ে আমরা যখন কোন সমালোচনা মূলক লেখা লিখে থাকি তখন তারা হাতে তালি দেয় আর অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলে। তবে সেটা সেই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে যতক্ষন না আপনি এই বর্বর হিন্দু ধর্মের মুখোশ না খুলে দিচ্ছেন। যখন আপনি হিন্দু ধর্ম নিয়ে সমালোচনা করছেন তখনই তারা তাদের অনূভূতি প্রকাশ করছে ঠিক জঙ্গী আর জিহাদিদের মতো। আসলে তাদেরকেও কোন অংশে কম ভাবার কিছুই নেই কারণ মনে রাখতে হবে পৃথিবীতে সকল ধর্মই চাই তার নিজের ধর্মটিকে ভালো প্রমান করতে আর অন্য বাকি সব ধর্মকে খারাপ প্রমান করতে যার প্রমাণ হচ্ছে এসব। আমি হিন্দু ধর্মের হাস্যকর সব দেব-দেবী আর ভগবানদের মোটামুটি সংক্ষিপ্ত কিছু পরিচয় আপনাদের দিবো পরের লেখাতে।

---------- মৃত কালপুরুষ
               ০৯/১২/২০১৭  

সোমবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

প্যারাডাইস পেপার্স ও অ্যাপলবাই “ল” ফার্ম (বিশ্বনেতাদের দুর্নীতি)


গতবছর ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে “পানামা পেপার্স” কেলেঙ্কারির পরে এবার আবারও এধরনের আরেকটি ডাটাবেস প্রকাশ করেছে জার্মানীর “সুইডয়েচে জাইটং” নামের একটি নিউজ মিডিয়া যেখানে উঠে এসেছে বিশ্বের ১৮০টি দেশের সব থেকে ক্ষমতাধর ধনী ব্যাক্তি, সেলিব্রেটি, রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অর্থ কেলেঙ্কারীর নানা অজানা তথ্য। এতে আবারও প্রমান করেছে দুর্নীতি সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নিম্ন পর্যায়ের সব যায়গাতেই আছে তবে আমাদের চোখের আড়ালে। “প্যারাডাইস পেপার্স” হচ্ছে এক সেট ইলেক্ট্রনিক্স ডকুমেন্ট যেখানে আছে সর্বোমোট ১৩.৪ মিলিয়ন পৃষ্ঠার এক বিশাল গোপন নথি যাতে এসব অর্থ কেলেঙ্কারির রেকর্ড পাওয়া যাবে। বর্তমানে বিশ্বের মোট ৪৭টি দেশে ৩৮০ জন দুর্নীতি অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা এই তথ্যের সত্যতা যাচাই ও তদন্ত করছে। যারা কর থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন “ট্যাক্স হ্যাভেনে” বিনিয়োগ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন তাদের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উপর ভিত্তি করেই মূলত তৈরি করা হয়েছে এই প্যারাডাইস পেপার্স। “ট্যাক্স হ্যাভেন” হচ্ছে যেসব দেশ বা অঞ্চলে কর দিতে হয় না কিংবা খুবই নিম্ন হারে কর দেওয়া যায় এমন দেশ ও অঞ্চলকে বোঝায়।

এই ডাটাবেসের সর্বোমোট ১৩.৪ মিলিয়ন গোপন নথির মধ্যে ৬.৮ মিলিয়ন এর মতো তৈরি করেছে অফশোর আইনি সেবা সংস্থা “অ্যাপলবাই” নামের একটি “ল” ফার্ম ও কর্পোরেট সেবা সংস্থা “এস্টেরা” নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান। তবে বর্তমানে “এস্টেরা” নামের কর্পোরেট সেবা সংস্থাটি এখন আর “অ্যাপলবাই” নামের “ল” ফার্মের সাথে নেই। ২০১৬ সালে এই প্রতিষ্ঠান দুইটি আলাদা হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত একসাথেই “অ্যাপলবাই” নামে এই তথ্য সংগ্রহের কাজ করে এসেছে। বর্তমানে অ্যাপলবাই “ল” ফার্ম ও এস্টেরা দুইটি আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান। এস্টেরা আলাদা হয়ে যাবার পরে তাদের নতুন করে পরিচিতি খুব বেশি না থাকায় এখনও তাদের সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তবে আমেরিকা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটনে অবস্থিত (আইসিআইজে) বা “ইন্টারল্যাশনাল কনসর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট” এর ওয়েবসাইটে “দ্যা প্যারাডাইস পেপার” নামের তদন্ত রিপোর্টে এই প্রতিষ্ঠানের একটি সংক্ষিপ্ত রিভিউ বা পরিচিতি সহ আরো অনেক তথ্য পাওয়া যাবে এই ----লিংক---- এ  দেখতে পারেন।

(আইসিআইজে) বা “ইন্টারল্যাশনাল কনসর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট” হচ্ছে বিশ্বের ৬৫ টি দেশের মোট ১৯০ জন তথ্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের দ্বারা পরিচালিত ও প্রতিষ্ঠিত একটি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক যার মূল কাজ হচ্ছে এই ধরনের তথ্য অনুসন্ধান করে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা। অ্যাপলবাই “ল” ফার্মের তৈরি করা এই প্যারাডাইস পেপার্স যা জার্মানীর “সুইডয়েচে জাইটং” নিউজ মিডিয়া কিছুদিন আগে প্রকাশ করার পর থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি তার তদন্তে বিভিন্ন সংস্থাকে সাহায্য করে আসছে। অ্যাপলবাই “ল” ফার্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৮৯৮ সালে যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন “রিজাইনাল্ড অ্যাপলবাই” প্রথমে “অ্যাপলবাই” এর নাম ছিলো “ডুডলি স্পার্লিং অ্যাপলবাই” পরবর্তিতে “অ্যাপলবাই স্পার্লিং এন্ড কেম্প” এবং তারপরে “অ্যাপলবাই” হয় বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অফিস বারমুডার হ্যামিলটনে অবস্থিত। বর্তমানে পৃথিবীর ১০ টি দেশে তাদের দপ্তর আছে যেখান থেকে তারা বারমুডা, বৃটিষ ভার্জিন আইসল্যান্ড, সাইম্যান আইসল্যান্ড, হংকং, আইসলি অব ম্যান, জার্সি, জার্নেসিয়া, মরিসাস, স্যাইসলিস ও সাংহাইতে অফশোর ও আইন বিষয়ক সেবা দিয়ে থাকে। 

স্যার “রিজাইনাল্ড অ্যাপলবাই” ১৮৮৭ সালে ইংল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পরীক্ষায় চুড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হন এবং বার্মুডাতে এসে ১৮৯৭ ও ১৮৯৮ সালে এটর্নি জেনারেল “ডুডলি স্পার্লিং” এর সাথে “ডুডলি স্পার্লিং অ্যাপলবাই” নামের একটি “ল” ফার্ম প্রতিষ্ঠিত করে যার মূল উদ্দেশ্য ছিলো আইন বিষয়ক সেবা দেওয়া। পরবর্তিতে আরেকজন আইনজীবি “উইলিয়াম কেম্পে”র সাথে “অ্যাপলবাই স্পার্লিং এন্ড কেম্প” প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর ১৯৪৯ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি “স্পার্লিং এন্ড কেম্প থেকে আলাদা হয়ে “অ্যাপলবাই” আলাদা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে থাকে। আস্তে আস্তে অ্যাপলবাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করে। সর্বশেষ অ্যাপলবাই ২০০৮ সালের ১৫ জুন ঘোষনা দেয় তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোট ৭৩ জন আইনজীবির সাথে আইসলি অফ ম্যান ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান “ডিকিনসন ক্রুইচশঙ্ক” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হয়েছে এবং তারা বিশ্বের একটি বৃহত্তম সমবায় আইন সংস্থা হিসেবে আত্তপ্রকাশ করছে। বর্তমানে অ্যাপলবাই বিশ্বের প্রধান ১০টি আইন বিষয়ক সেবা দাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্য অন্যতম। পরবর্তিতে অ্যাপলবাই ২০১০ সালে জার্নেসিয়া ও ২০১২ সালে সাংহাইতে তাদের সর্বোশেষ অফিস দুইটি উদ্বোধন করে এবং এই অঞ্চলের অফশোর বিষয়ক আইনি সেবা দিতে থাকে। এই লিঙ্ক  https://www.applebyglobal.com/  থেকে আরো তথ্য পেতে পারেনচলতি বছরের ২৪ শে অক্টোবর তারা প্যারাডাইস পেপার্স প্রকাশ করার ঘোষনা দেয়।

এই অ্যাপলবাই বিশ্বনেতাদের দুর্নীতির অজানা কথাগুলো প্যারাডাইস পেপার্স নামে ইলেকট্রনিক্স ডকুমেন্টের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সামনে এনেছে যার ১৩.৪ মিলিয়ন পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে ১২০ জন রাজনীতিবিদের নাম। ট্যাক্স ফাকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশে বেনামে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন তারা। এতে আছে মার্কিন বানিজ্য সচিব “উইলবার রসের” নাম। “নেভিগেটর” নামক শিপিং কোম্পানীতে তার বিনিয়োগ আছে যার প্রধান গ্রাহক রাশিয়ার “ভ্লাদিমির পুতিনের” ঘনিষ্ট বন্ধুর প্রতিষ্ঠান “সিলবার”। ট্রাম্প সরকার আসার পরে মেরিকার নৌ বাহিনীর জন্য বেশ কিছু যুদ্ধ জাহাজ এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যে ক্রয় করার সিদ্ধান্ত হয়। তালিকায় আছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা “জ্যারেড কুশনার” তিনি রাশিয়ান ব্যবসায়ী “উইরি মিলনারের” সাথে বেশ কিছু ব্যবসায় জড়িত। “উইরি মিলনারের” বিনিয়োগ রয়েছে ফেসবুক ও টুইটারের মতো প্রতিষ্ঠানে। ইংল্যান্ডের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথও আছেন এই নথিতে। তার ১৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছিলো বাইরে। আছেন কানাডার প্রধান মন্ত্রী “জাস্টিন ট্রুডোর” প্রধান অর্থায়নকারী ও সিনিয়র উপদেষ্টা “স্টিফেন ব্রোনফম্যান”।

বড় ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ট্যাক্স ফাকি দেওয়ার প্রচেষ্টায় নাম এসেছে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান “নাইকি” এবং “অ্যাপল” এর। এছাড়াও এই পেপার্সে এশিয়ার মধ্যে ৭১৪ টি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাক্তির উপরে আছে ৬৬ হাজার ফাইল। নাম আছে ভারতীয় মন্ত্রি “জয়ন্ত সিনহা” এবং এমপি “আর কে সিনহার” মতো রাজনৈতিক নেত্রিবৃন্দের। অ্যাপলবাই ১৯৫০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তথ্যের উপরে এই প্যারাডাইস পেপার্স তৈরি করেছে।

---------- মৃত কালপুরুষ
               ০৪/১২/২০১৭
   



ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের কিংবদন্তি ক্ষুদিরামের জন্মদিন আজ।


ক্ষুদিরাম বসু ডিসেম্বর ১৮৮৯ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত মেদিনীপুর জেলা শহরের কাছাকাছি কেশপুর থানার অন্তর্গত মোহবনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ত্রৈলকানাথ বসু ছিলেন নাড়াজোল প্রদেশের শহরে আয় এজেন্ট। তার মা লক্ষীপ্রিয় দেবী। তিন কন্যার পর তিনি তার মায়ের চতুর্থ সন্তান। তার দুই পুত্র আগেই মৃত্যুবরণ করেন। অপর পূত্রের মৃত্যুর আশঙ্কায় তিনি তখনকার সমাজের নিয়ম অনুযায়ী তার পুত্রকে তার বড় বোনের কাছে তিন মুঠি খুদের (শস্যের খুদ) বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। খুদের বিনিময়ে ক্রয়কৃত শিশুটির নাম পরবর্তীকালে ক্ষুদিরাম রাখা হয়। ক্ষুদিরাম বসু পরবর্তিতে তার বড় বোনের কাছেই বড় হন। ক্ষুদিরাম বসু (৩রা ডিসেম্বর ১৮৮৯ ১১ আগস্ট ১৯০৮) ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরুর দিকের সর্বকনিষ্ঠ এক বিপ্লবী। ফাঁসি মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর ৮ মাস ৮ দিন।

ক্ষুদিরাম বসু তার প্রাপ্তবয়সে পৌঁছানোর অনেক আগেই একজন ডানপিটে, বাউণ্ডুলে, রোমাঞ্চপ্রিয় হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। ১৯০২-০৩ খ্রিস্টাব্দ কালে যখন বিপ্লবী নেতা শ্রী অরবিন্দ এবং সিস্টার-নিবেদিতা মেদিনীপুর ভ্রমণ করে জনসম্মুখে বক্তব্য রাখেন এবং বিপ্লবী দলগুলোর সাথে গোপন পরিকল্পনা করেন, তখন তরুণ ছাত্র ক্ষুদিরাম বিপ্লবে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত হন। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ক্ষুদিরাম তার বোন অপরূপার স্বামী অম্রিতার সাথে তমলুক শহর থেকে মেদিনীপুরে চলে আসেন। ক্ষুদিরাম বসু তমলুকের হ্যামিল্টন স্কুল এবং মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষালাভ করেন। মেদিনীপুরে তাঁর বিপ্লবী জীবনের অভিষেক। তিনি বিপ্লবীদের একটি নবগঠিত আখড়ায় যোগ দেন। ১৯০২ সালে জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু এবং রাজনারায়ণ বসুর প্রভাবে মেদিনীপুরে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন গড়ে উঠেছিল। সেই সংগঠনের নেতা ছিলেন হেমচন্দ্র দাস কানুনগো এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন হেমচন্দ্র দাসের সহকারী। এটি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্রিটিশবিরোধীদের দ্বারা পরিচালিত হতো। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ক্ষুদিরাম তার গুণাবলীর জন্য সবার চোখে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন। ক্ষুদিরাম সত্যেন্দ্রনাথের সাহায্যে বিপ্লবী দলভুক্ত হয়ে এখানে আশ্রয় পান। ক্ষুদিরাম তাঁরই নির্দেশে "সোনার বাংলা" শীর্ষক বিপ্লবাত্মক ইশতেহার বিলি করে গ্রেপ্তার হন। ১৯০৬ সালে কাঁসাই নদীর বন্যার সময়ে রণপার সাহায্যে ত্রাণকাজ চালান।

ক্ষুদিরাম বসু তার শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বোস এর নিকট হতে এবং শ্রীমদভগবদগীতা পড়ে ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে বিপ্লব করতে অনুপ্রাণিত হন। তিনি বিপ্লবী রাজনৈতিক দল যুগান্তরে যোগ দেন। ১৬ বছর বয়সে ক্ষুদিরাম পুলিশ স্টেশনের কাছে বোমা পুঁতে রাখেন এবং ইংরেজ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করেন। একের পর এক বোমা হামলার দায়ে ৩ বছর পর তাকে আটক করা হয়। ৩০ এপ্রিল ১৯০৮-এ মুজাফফরপুর, বিহারে রাত সাড়ে আটটায় ইওরোপিয়ান ক্লাবের সামনে বোমা ছুড়ে তিনজনকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ক্ষুদিরামের বিচার শুরু হয় ২১ মে ১৯০৮ তারিখে যা আলিপুর বোমা মামলা নামে পরিচিত হয়। বিচারক ছিলেন জনৈক বৃটিশ মি. কর্নডফ এবং দুইজন ভারতীয়, লাথুনিপ্রসাদ ও জানকিপ্রসাদ। রায় শোনার পরে ক্ষুদিরামের মুখে হাসি দেখা যায়। তার বয়স খুব কম ছিল। বিচারক কর্নডফ তাকে প্রশ্ন করেন, তাকে যে ফাসিতে মরতে হবে সেটা সে বুঝেছে কিনা?  ক্ষুদিরাম আবার মুচকে হাসলে বিচারক আবার প্রশ্নটি করেন। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ভোর ছয় টায়। ফাসির মঞ্চ ওঠার সময়ে তিনি হাসিখুশি ছিলেন। ক্ষুদিরামকে নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম কবিতা লিখেছিলেন এবং অনেক গানও তখন রচিত হয়েছিল। যেমন, একবার বিদায় দে মা। তার মৃত্যুর পর বৃটিশদের খুন করার জন্য তরুণরা উদ্বুদ্ধ হয়েছিল।

ক্ষুদিরাম বসু সম্পর্কে হেমচন্দ্র কানুনগো লিখেছেন যে ক্ষুদিরামের সহজ প্রবৃত্তি ছিলো প্রাণনাশের সম্ভাবনাকে তুচ্ছ করে দুঃসাধ্য কাজ করবার।তাঁর স্বভাবে নেশার মতো অত্যন্ত প্রবল ছিলো সৎসাহস। আর তাঁর ছিলো অন্যায় অত্যাচারের তীব্র অনুভূতি। সেই অনুভূতির পরিণতি বক্তৃতায় ছিলো না বৃথা আস্ফালনেও ছিলো না; অসহ্য দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, এমনকি মৃত্যুকে বরণ করে, প্রতিকার অসম্ভব জেনেও শুধু সেই অনুভূতির জ্বালা নিবারণের জন্য, নিজ হাতে অন্যায়ের প্রতিবিধানের উদ্দেশ্যে প্রতিবিধানের চেষ্টা করবার ঐকান্তিক প্রবৃত্তি ও সৎসাহস ক্ষুদিরাম চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

সুত্রঃ উইকিপিডিয়া। ছবিঃ কলুর বলদ।

---------- মৃত কালপুরুষ

               ০৩/১২/২০১৭