শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

হিন্দু নামধারী সনাতনের লেবেল চেঞ্জ ধর্মকে বর্বর বলা যাবে না কেন ?


গত দুইদিন ধরে সোস্যাল মিডিয়াতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদার কোথাও ঘটে যাওয়া একটি ধর্মীয় হত্যাকান্ডের ভিডিও ঘুরে বেড়াচ্ছে যা বেশ কয়েকবার আমার চোখে পড়েছে। ধর্মের আফিমীয় মাদক ও এই জাতীয় ধর্মাবলম্বী বোকা মানুষ গুলিকে কতটুকু নির্বোধ-মানবিকতাশুণ্য বানিয়ে দেয় তার একটি চরম উদাহরণ হতে পারে এই বর্বর হিন্দু ধর্ম। হিন্দু ধর্মের বেদ, গীতা, মনুসংহিতা, উপনিষদ, রামায়ন, মহাভারত, পুরানপাচালি ইত্যাদির মধ্যে এতো জাতপাতের বৈষম্য, বর্ণভেদ, গোত্রবিভেদ, ধর্মভেদ, ধর্মান্ধতা, গোড়ামি, কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতা, নারীর প্রতি কুসংস্কার, বিরুপ ধারণা, ভয়, ঘৃণা, আর সবশেষে বর্বর ও জংলী কিছু ধর্মীয় আইন কানুন আছে যা আর অন্য কোন ধর্মে পরিলক্ষিত হয়না। হিন্দু ধর্ম একটি বর্বর ও অমানবিক ধর্ম বলাতে যারা ধুতি পরে মাথার টিকলি নাচাতে নাচাতে চলে আসেন হিন্দু ধর্ম রক্ষা করতে তাদের বলবো আগে প্রমান করুন আমি কোথায় ভুল কিছু বলেছি যা এই হিন্দু ধর্মে নেই। হিন্দু ধর্ম যে বর্বর আর অমানবিক ধর্ম না সেটার পক্ষে দুই একটা কারণ দেখান এখানে। আমি এখানে হিন্দু ধর্মের মানুষ হত্যা আর বর্বরতার কিছু নমুনা দিলাম মিলিয়ে দেখুন।

শিশুকাল থেকেই একটি হিন্দু ধর্মালম্বী বাচ্চাকে হাতে তীর ধনুক দিয়ে রাবণ মারার মাধ্যমে এই মানুষ হত্যা করা আর মানুষকে ঘৃণা করার হাতে খড়ি দেওয়া হয়ে থাকে এই ধর্মটিতে। যেসব মডারেট হিন্দুরা বলে থাকে এই ধর্মে আসলে এমন কিছুই বলা নেই যেখানে মানুষ হত্যার কথা আছে তাদের স্বদয় অবগতীর জন্য জানাচ্ছি (অথর্ববেদ ১২,০৫,৫৪) এ বলা আছে “Vedic followers should destroy infidels” অর্থঃ “বৈদিক অনুসারীদের (কাফের বা বেধর্মীদের) ধ্বংস করা উচিত” মজার বিষয় হলো এই বৈদিক সভ্যতা থেকেই আজকের সনাতন ধর্মের সৃষ্টি তবে এখানে কথা আছে। কথা হচ্ছে সনাতন ধর্মের অনেক কিছুই পরিবর্তন করে আজকের মডারেট হিন্দু ধর্ম বানানো হয়েছে যাতে এই বৈদিক দর্শনের কোন মিল নেই তাই অতীতে যারা এই বৈদিক ধর্মের অনুসারী ছিলো তাদেরকে এই হিন্দুদের দ্বারাই হত্যা করার উদ্দেশ্যে “অথর্ববেদে” এসমস্ত শ্লোক যোক করা হয়েছিলো যা এখনও আছে।

এছাড়াও হিন্দু ধর্মের (ঋগ্বেদ  ০১,১৬,০৪) এ বলা হচ্ছে “যারা তোমাকে পূজায় উপহার দেয় না, তাদের প্রত্যেককে হত্যা করো” এর মানে হচ্ছে সনাতন ধর্ম থেকে আলাদা একটি গোত্র অনেক পুর্বে ভারতবর্ষে তাদের বিভিন্ন দেব দেবতাদের মূর্তি বানিয়ে পূজা করার চল শুরু করেছিলো। বর্তমানে আমরা হিন্দু ধর্মাওবলম্বিদের যে দেব-দেবতা আর ভগবানের মূর্তি পূজা করতে দেখি তা কিন্তু এই ধর্মের সকল জাতি পালন করে না। উল্লেখ করতে হয়, হাজার হাজার বছর আগে থেকেই এই সনাতনের খোলস পাল্টিয়ে হিন্দু নাম ধারণ করা ধর্মটি বিভিন্ন দেব দেবতা আর কল্পিত ভগবানের মূর্তি বানিয়ে সেসব পূজা করে আসতো তবে কিছু কিছু গোত্র তা করতো না যেমন প্রাচীন ভারতে “কিটক্যাট” নামের একটি জাতি ছিলো যারা মূলত এসব ধর্মীয় নিয়ম কানুন মানতো না। তাদেরকেই হত্যা করার জন্য ঋগ্বেদ এ এই কথা বলা হয়েছিলো যা এখনও হিন্দু ধর্মের মধ্যেই আছে। বর্তমানে যে দুর্গা পূজা, কালী পূজা, স্বরসতী পূজা মডারেট হিন্দুরা পালন করে আসে তার জন্ম খুব বেশি হলেও ১৫০ বছর হতে পারে তার আগে এভাবে পালন হতো না। মডারেট হিন্দুরা যখন বলে তাদের ধর্ম অনেক সংস্কার হয়েছে তখন এই ধর্মের আরেকদল এইসব শ্লোক ব্যবহার করে অন্য ধর্মের মানুষ হত্যা করে চলেছে এবং হত্যা করার উষ্কানী দিয়ে চলেছে।

আরো কিছু নমূনা দেখুন এই সনাতনের লেবেল পাল্টানো হিন্দু ধর্মের সরাসরি মানুষ হত্যা করার উস্কানী মূলক ডায়ালগ। (ঋগ্বেদ  /৮৪/৮) রাজ্য প্রধান এর প্রতি বেদের নির্দেশ হচ্ছে, যে লোক ঈশ্বরের আরাধনা করে না এবং যার মনে ঈশ্বরের প্রতি অনুরাগ নেই, তাকে পা দিয়ে পাড়িয়ে হত্যা করতে হবে” যার অনুবাদ করেছেন আচার্য্য বিদ্যা মার্তন্ড, আর্য সমাজ। স্বামী দয়ানন্দের ভাষ্য হতে অনুবাদিত এর মানে যে সমস্ত সাধারণ মানুষ যারা “ঋদ্বেদে” বিশ্বাস করে না বা বেদ মানে না, হোক সে হিন্দু বা অন্য যে কোন ধর্মের বা অধার্মিক তাকেই বলা হচ্ছে পা দিয়ে মাড়িয়ে হত্যা করতে হবে। তাহলে কি এই ধর্মটিকে আমাদের বর্বর বলা ভুল হচ্ছে। গতকাল সেই বর্বরচিত হত্যাকান্ডের ভিডিও ফুটেজ দেখে যখন আমি মন্তব্য করি এই ধর্মটি একটি “বর্বর ধর্ম” তখন এক শিবসেনা আমাকে আইনের আওতায় আনবে বলে হুমকি দিয়েছে। আসলে এই হিন্দু নামধারী সনাতন ধর্মকে বর্বর প্রমানীত করার জন্য খুব বেশি উদাহরণ মনে হয় আমার দেওয়া লাগবে না। তার পরেও যদি কোন হিন্দু পন্ডিত বা ব্রাহ্মন ঠাকুর এই লেখা পড়ে থাকেন তাহলে হিন্দু ধর্ম যে বর্বর ও অমানবিক ধর্ম না তা একবার প্রমাণ করার চেষ্টা করতে পারেন।

এখানে ছোট করে আরেকটি ধর্ম (ইসলাম) এর সাথে একটু তুলনা করে দেখাচ্ছি। যাকে সমস্ত পৃথিবীর মানুষ রক্তের ধর্ম বলে জানে তার থেকেও এই হিন্দু ধর্ম কত খারাপ একটি ধর্ম হতে পারে। যেমন দেখুন (যজুর্বেদ ১৭/৩৯) সেনাপ্রধান হিংস্র নির্দয়ভাবে শত্রুদের পরিবারের সদস্যদের সাথেও যুদ্ধ করবে। মানে পরিবারের সদস্য বলতে নারী, শিশু, বৃদ্ধ সকলকে হত্যা করার আদেশ দিচ্ছে এই “যযুর্বেদ”। আরো দেখুন (যজুর্বেদ ১৭/৩৮) শত্রুদের পরিবারকে হত্যা কর, তাদের জমি ধ্বংস কর” এবার বোকা মানুষগুলোকে আদেশ দেওয়া হচ্ছে হত্যার পাশাপাশি তাদের সম্পদও ধ্বংস করতে হবে। এছাড়াও (যজুর্বেদ ১৩/১৩) তে বলা হচ্ছে “শত্রুদের হত্যা কর তাদের জায়গা জমি রান্নাঘর ধ্বংস কর” অনুবাদঃ দেবী চাঁদ, আর্য সমাজ। স্বামী দয়ানন্দের ভাষ্য হতে অনুবাদিত। এবার আসুন ইসলাম ধর্মের প্রধান নবী যাকে মুসলমানরা অনুসরণ করে থাকে তার ভাষ্য এমন যে, বেশ কিছু হাদীসে উল্লেখ আছে তিনি [মুহাম্মদ (সাঃ)] মক্কা বিজয়ের সময় তার অনুসারীদের বলেছিলেন, তোমরা বিনা কারনে এমনকি গাছের একটা ডালও নষ্ট করো না। সেখানে বেদ হিন্দুদের কি অনুমতি দিচ্ছে ? একটু নিরাপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করে দেখুন।

সম্পুর্ণ হিন্দু ধর্মের এরকম শ্লোকের সংখ্যা আছে অসংখ্য যা বলে শেষ করা যাবে না। কারণ এই ধর্মটির অনেক অনেক শাখা প্রশাখা আছে। তবে ঘুরে ফিরে সেই কালকেউটা সাপ এখন খোলস পাল্টিয়ে হয়েছে গোখরা সাপ যাতে কোন প্রকার সন্ধেহ করা চলে না। আসলে সোস্যাল মিডিয়া আর অনলাইন মাধ্যমগুলিতে মুক্তমনা নামধারী কিছু হিন্দু মৌলবাদীকে দেখা যায় যারা আসলে ইসলাম ধর্ম বা অন্য কোন ধর্ম নিয়ে আমরা যখন কোন সমালোচনা মূলক লেখা লিখে থাকি তখন তারা হাতে তালি দেয় আর অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলে। তবে সেটা সেই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে যতক্ষন না আপনি এই বর্বর হিন্দু ধর্মের মুখোশ না খুলে দিচ্ছেন। যখন আপনি হিন্দু ধর্ম নিয়ে সমালোচনা করছেন তখনই তারা তাদের অনূভূতি প্রকাশ করছে ঠিক জঙ্গী আর জিহাদিদের মতো। আসলে তাদেরকেও কোন অংশে কম ভাবার কিছুই নেই কারণ মনে রাখতে হবে পৃথিবীতে সকল ধর্মই চাই তার নিজের ধর্মটিকে ভালো প্রমান করতে আর অন্য বাকি সব ধর্মকে খারাপ প্রমান করতে যার প্রমাণ হচ্ছে এসব। আমি হিন্দু ধর্মের হাস্যকর সব দেব-দেবী আর ভগবানদের মোটামুটি সংক্ষিপ্ত কিছু পরিচয় আপনাদের দিবো পরের লেখাতে।

---------- মৃত কালপুরুষ
               ০৯/১২/২০১৭  

সোমবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

প্যারাডাইস পেপার্স ও অ্যাপলবাই “ল” ফার্ম (বিশ্বনেতাদের দুর্নীতি)


গতবছর ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে “পানামা পেপার্স” কেলেঙ্কারির পরে এবার আবারও এধরনের আরেকটি ডাটাবেস প্রকাশ করেছে জার্মানীর “সুইডয়েচে জাইটং” নামের একটি নিউজ মিডিয়া যেখানে উঠে এসেছে বিশ্বের ১৮০টি দেশের সব থেকে ক্ষমতাধর ধনী ব্যাক্তি, সেলিব্রেটি, রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অর্থ কেলেঙ্কারীর নানা অজানা তথ্য। এতে আবারও প্রমান করেছে দুর্নীতি সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নিম্ন পর্যায়ের সব যায়গাতেই আছে তবে আমাদের চোখের আড়ালে। “প্যারাডাইস পেপার্স” হচ্ছে এক সেট ইলেক্ট্রনিক্স ডকুমেন্ট যেখানে আছে সর্বোমোট ১৩.৪ মিলিয়ন পৃষ্ঠার এক বিশাল গোপন নথি যাতে এসব অর্থ কেলেঙ্কারির রেকর্ড পাওয়া যাবে। বর্তমানে বিশ্বের মোট ৪৭টি দেশে ৩৮০ জন দুর্নীতি অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা এই তথ্যের সত্যতা যাচাই ও তদন্ত করছে। যারা কর থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন “ট্যাক্স হ্যাভেনে” বিনিয়োগ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন তাদের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উপর ভিত্তি করেই মূলত তৈরি করা হয়েছে এই প্যারাডাইস পেপার্স। “ট্যাক্স হ্যাভেন” হচ্ছে যেসব দেশ বা অঞ্চলে কর দিতে হয় না কিংবা খুবই নিম্ন হারে কর দেওয়া যায় এমন দেশ ও অঞ্চলকে বোঝায়।

এই ডাটাবেসের সর্বোমোট ১৩.৪ মিলিয়ন গোপন নথির মধ্যে ৬.৮ মিলিয়ন এর মতো তৈরি করেছে অফশোর আইনি সেবা সংস্থা “অ্যাপলবাই” নামের একটি “ল” ফার্ম ও কর্পোরেট সেবা সংস্থা “এস্টেরা” নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান। তবে বর্তমানে “এস্টেরা” নামের কর্পোরেট সেবা সংস্থাটি এখন আর “অ্যাপলবাই” নামের “ল” ফার্মের সাথে নেই। ২০১৬ সালে এই প্রতিষ্ঠান দুইটি আলাদা হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত একসাথেই “অ্যাপলবাই” নামে এই তথ্য সংগ্রহের কাজ করে এসেছে। বর্তমানে অ্যাপলবাই “ল” ফার্ম ও এস্টেরা দুইটি আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান। এস্টেরা আলাদা হয়ে যাবার পরে তাদের নতুন করে পরিচিতি খুব বেশি না থাকায় এখনও তাদের সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তবে আমেরিকা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটনে অবস্থিত (আইসিআইজে) বা “ইন্টারল্যাশনাল কনসর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট” এর ওয়েবসাইটে “দ্যা প্যারাডাইস পেপার” নামের তদন্ত রিপোর্টে এই প্রতিষ্ঠানের একটি সংক্ষিপ্ত রিভিউ বা পরিচিতি সহ আরো অনেক তথ্য পাওয়া যাবে এই ----লিংক---- এ  দেখতে পারেন।

(আইসিআইজে) বা “ইন্টারল্যাশনাল কনসর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট” হচ্ছে বিশ্বের ৬৫ টি দেশের মোট ১৯০ জন তথ্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের দ্বারা পরিচালিত ও প্রতিষ্ঠিত একটি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক যার মূল কাজ হচ্ছে এই ধরনের তথ্য অনুসন্ধান করে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা। অ্যাপলবাই “ল” ফার্মের তৈরি করা এই প্যারাডাইস পেপার্স যা জার্মানীর “সুইডয়েচে জাইটং” নিউজ মিডিয়া কিছুদিন আগে প্রকাশ করার পর থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি তার তদন্তে বিভিন্ন সংস্থাকে সাহায্য করে আসছে। অ্যাপলবাই “ল” ফার্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৮৯৮ সালে যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন “রিজাইনাল্ড অ্যাপলবাই” প্রথমে “অ্যাপলবাই” এর নাম ছিলো “ডুডলি স্পার্লিং অ্যাপলবাই” পরবর্তিতে “অ্যাপলবাই স্পার্লিং এন্ড কেম্প” এবং তারপরে “অ্যাপলবাই” হয় বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অফিস বারমুডার হ্যামিলটনে অবস্থিত। বর্তমানে পৃথিবীর ১০ টি দেশে তাদের দপ্তর আছে যেখান থেকে তারা বারমুডা, বৃটিষ ভার্জিন আইসল্যান্ড, সাইম্যান আইসল্যান্ড, হংকং, আইসলি অব ম্যান, জার্সি, জার্নেসিয়া, মরিসাস, স্যাইসলিস ও সাংহাইতে অফশোর ও আইন বিষয়ক সেবা দিয়ে থাকে। 

স্যার “রিজাইনাল্ড অ্যাপলবাই” ১৮৮৭ সালে ইংল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পরীক্ষায় চুড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হন এবং বার্মুডাতে এসে ১৮৯৭ ও ১৮৯৮ সালে এটর্নি জেনারেল “ডুডলি স্পার্লিং” এর সাথে “ডুডলি স্পার্লিং অ্যাপলবাই” নামের একটি “ল” ফার্ম প্রতিষ্ঠিত করে যার মূল উদ্দেশ্য ছিলো আইন বিষয়ক সেবা দেওয়া। পরবর্তিতে আরেকজন আইনজীবি “উইলিয়াম কেম্পে”র সাথে “অ্যাপলবাই স্পার্লিং এন্ড কেম্প” প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর ১৯৪৯ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি “স্পার্লিং এন্ড কেম্প থেকে আলাদা হয়ে “অ্যাপলবাই” আলাদা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে থাকে। আস্তে আস্তে অ্যাপলবাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করে। সর্বশেষ অ্যাপলবাই ২০০৮ সালের ১৫ জুন ঘোষনা দেয় তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোট ৭৩ জন আইনজীবির সাথে আইসলি অফ ম্যান ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান “ডিকিনসন ক্রুইচশঙ্ক” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হয়েছে এবং তারা বিশ্বের একটি বৃহত্তম সমবায় আইন সংস্থা হিসেবে আত্তপ্রকাশ করছে। বর্তমানে অ্যাপলবাই বিশ্বের প্রধান ১০টি আইন বিষয়ক সেবা দাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্য অন্যতম। পরবর্তিতে অ্যাপলবাই ২০১০ সালে জার্নেসিয়া ও ২০১২ সালে সাংহাইতে তাদের সর্বোশেষ অফিস দুইটি উদ্বোধন করে এবং এই অঞ্চলের অফশোর বিষয়ক আইনি সেবা দিতে থাকে। এই লিঙ্ক  https://www.applebyglobal.com/  থেকে আরো তথ্য পেতে পারেনচলতি বছরের ২৪ শে অক্টোবর তারা প্যারাডাইস পেপার্স প্রকাশ করার ঘোষনা দেয়।

এই অ্যাপলবাই বিশ্বনেতাদের দুর্নীতির অজানা কথাগুলো প্যারাডাইস পেপার্স নামে ইলেকট্রনিক্স ডকুমেন্টের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সামনে এনেছে যার ১৩.৪ মিলিয়ন পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে ১২০ জন রাজনীতিবিদের নাম। ট্যাক্স ফাকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশে বেনামে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন তারা। এতে আছে মার্কিন বানিজ্য সচিব “উইলবার রসের” নাম। “নেভিগেটর” নামক শিপিং কোম্পানীতে তার বিনিয়োগ আছে যার প্রধান গ্রাহক রাশিয়ার “ভ্লাদিমির পুতিনের” ঘনিষ্ট বন্ধুর প্রতিষ্ঠান “সিলবার”। ট্রাম্প সরকার আসার পরে মেরিকার নৌ বাহিনীর জন্য বেশ কিছু যুদ্ধ জাহাজ এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যে ক্রয় করার সিদ্ধান্ত হয়। তালিকায় আছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা “জ্যারেড কুশনার” তিনি রাশিয়ান ব্যবসায়ী “উইরি মিলনারের” সাথে বেশ কিছু ব্যবসায় জড়িত। “উইরি মিলনারের” বিনিয়োগ রয়েছে ফেসবুক ও টুইটারের মতো প্রতিষ্ঠানে। ইংল্যান্ডের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথও আছেন এই নথিতে। তার ১৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছিলো বাইরে। আছেন কানাডার প্রধান মন্ত্রী “জাস্টিন ট্রুডোর” প্রধান অর্থায়নকারী ও সিনিয়র উপদেষ্টা “স্টিফেন ব্রোনফম্যান”।

বড় ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ট্যাক্স ফাকি দেওয়ার প্রচেষ্টায় নাম এসেছে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান “নাইকি” এবং “অ্যাপল” এর। এছাড়াও এই পেপার্সে এশিয়ার মধ্যে ৭১৪ টি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাক্তির উপরে আছে ৬৬ হাজার ফাইল। নাম আছে ভারতীয় মন্ত্রি “জয়ন্ত সিনহা” এবং এমপি “আর কে সিনহার” মতো রাজনৈতিক নেত্রিবৃন্দের। অ্যাপলবাই ১৯৫০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তথ্যের উপরে এই প্যারাডাইস পেপার্স তৈরি করেছে।

---------- মৃত কালপুরুষ
               ০৪/১২/২০১৭
   



ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের কিংবদন্তি ক্ষুদিরামের জন্মদিন আজ।


ক্ষুদিরাম বসু ডিসেম্বর ১৮৮৯ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত মেদিনীপুর জেলা শহরের কাছাকাছি কেশপুর থানার অন্তর্গত মোহবনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ত্রৈলকানাথ বসু ছিলেন নাড়াজোল প্রদেশের শহরে আয় এজেন্ট। তার মা লক্ষীপ্রিয় দেবী। তিন কন্যার পর তিনি তার মায়ের চতুর্থ সন্তান। তার দুই পুত্র আগেই মৃত্যুবরণ করেন। অপর পূত্রের মৃত্যুর আশঙ্কায় তিনি তখনকার সমাজের নিয়ম অনুযায়ী তার পুত্রকে তার বড় বোনের কাছে তিন মুঠি খুদের (শস্যের খুদ) বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। খুদের বিনিময়ে ক্রয়কৃত শিশুটির নাম পরবর্তীকালে ক্ষুদিরাম রাখা হয়। ক্ষুদিরাম বসু পরবর্তিতে তার বড় বোনের কাছেই বড় হন। ক্ষুদিরাম বসু (৩রা ডিসেম্বর ১৮৮৯ ১১ আগস্ট ১৯০৮) ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরুর দিকের সর্বকনিষ্ঠ এক বিপ্লবী। ফাঁসি মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর ৮ মাস ৮ দিন।

ক্ষুদিরাম বসু তার প্রাপ্তবয়সে পৌঁছানোর অনেক আগেই একজন ডানপিটে, বাউণ্ডুলে, রোমাঞ্চপ্রিয় হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। ১৯০২-০৩ খ্রিস্টাব্দ কালে যখন বিপ্লবী নেতা শ্রী অরবিন্দ এবং সিস্টার-নিবেদিতা মেদিনীপুর ভ্রমণ করে জনসম্মুখে বক্তব্য রাখেন এবং বিপ্লবী দলগুলোর সাথে গোপন পরিকল্পনা করেন, তখন তরুণ ছাত্র ক্ষুদিরাম বিপ্লবে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত হন। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ক্ষুদিরাম তার বোন অপরূপার স্বামী অম্রিতার সাথে তমলুক শহর থেকে মেদিনীপুরে চলে আসেন। ক্ষুদিরাম বসু তমলুকের হ্যামিল্টন স্কুল এবং মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষালাভ করেন। মেদিনীপুরে তাঁর বিপ্লবী জীবনের অভিষেক। তিনি বিপ্লবীদের একটি নবগঠিত আখড়ায় যোগ দেন। ১৯০২ সালে জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু এবং রাজনারায়ণ বসুর প্রভাবে মেদিনীপুরে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন গড়ে উঠেছিল। সেই সংগঠনের নেতা ছিলেন হেমচন্দ্র দাস কানুনগো এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন হেমচন্দ্র দাসের সহকারী। এটি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্রিটিশবিরোধীদের দ্বারা পরিচালিত হতো। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ক্ষুদিরাম তার গুণাবলীর জন্য সবার চোখে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন। ক্ষুদিরাম সত্যেন্দ্রনাথের সাহায্যে বিপ্লবী দলভুক্ত হয়ে এখানে আশ্রয় পান। ক্ষুদিরাম তাঁরই নির্দেশে "সোনার বাংলা" শীর্ষক বিপ্লবাত্মক ইশতেহার বিলি করে গ্রেপ্তার হন। ১৯০৬ সালে কাঁসাই নদীর বন্যার সময়ে রণপার সাহায্যে ত্রাণকাজ চালান।

ক্ষুদিরাম বসু তার শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বোস এর নিকট হতে এবং শ্রীমদভগবদগীতা পড়ে ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে বিপ্লব করতে অনুপ্রাণিত হন। তিনি বিপ্লবী রাজনৈতিক দল যুগান্তরে যোগ দেন। ১৬ বছর বয়সে ক্ষুদিরাম পুলিশ স্টেশনের কাছে বোমা পুঁতে রাখেন এবং ইংরেজ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করেন। একের পর এক বোমা হামলার দায়ে ৩ বছর পর তাকে আটক করা হয়। ৩০ এপ্রিল ১৯০৮-এ মুজাফফরপুর, বিহারে রাত সাড়ে আটটায় ইওরোপিয়ান ক্লাবের সামনে বোমা ছুড়ে তিনজনকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ক্ষুদিরামের বিচার শুরু হয় ২১ মে ১৯০৮ তারিখে যা আলিপুর বোমা মামলা নামে পরিচিত হয়। বিচারক ছিলেন জনৈক বৃটিশ মি. কর্নডফ এবং দুইজন ভারতীয়, লাথুনিপ্রসাদ ও জানকিপ্রসাদ। রায় শোনার পরে ক্ষুদিরামের মুখে হাসি দেখা যায়। তার বয়স খুব কম ছিল। বিচারক কর্নডফ তাকে প্রশ্ন করেন, তাকে যে ফাসিতে মরতে হবে সেটা সে বুঝেছে কিনা?  ক্ষুদিরাম আবার মুচকে হাসলে বিচারক আবার প্রশ্নটি করেন। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ভোর ছয় টায়। ফাসির মঞ্চ ওঠার সময়ে তিনি হাসিখুশি ছিলেন। ক্ষুদিরামকে নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম কবিতা লিখেছিলেন এবং অনেক গানও তখন রচিত হয়েছিল। যেমন, একবার বিদায় দে মা। তার মৃত্যুর পর বৃটিশদের খুন করার জন্য তরুণরা উদ্বুদ্ধ হয়েছিল।

ক্ষুদিরাম বসু সম্পর্কে হেমচন্দ্র কানুনগো লিখেছেন যে ক্ষুদিরামের সহজ প্রবৃত্তি ছিলো প্রাণনাশের সম্ভাবনাকে তুচ্ছ করে দুঃসাধ্য কাজ করবার।তাঁর স্বভাবে নেশার মতো অত্যন্ত প্রবল ছিলো সৎসাহস। আর তাঁর ছিলো অন্যায় অত্যাচারের তীব্র অনুভূতি। সেই অনুভূতির পরিণতি বক্তৃতায় ছিলো না বৃথা আস্ফালনেও ছিলো না; অসহ্য দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, এমনকি মৃত্যুকে বরণ করে, প্রতিকার অসম্ভব জেনেও শুধু সেই অনুভূতির জ্বালা নিবারণের জন্য, নিজ হাতে অন্যায়ের প্রতিবিধানের উদ্দেশ্যে প্রতিবিধানের চেষ্টা করবার ঐকান্তিক প্রবৃত্তি ও সৎসাহস ক্ষুদিরাম চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

সুত্রঃ উইকিপিডিয়া। ছবিঃ কলুর বলদ।

---------- মৃত কালপুরুষ

               ০৩/১২/২০১৭

ফেসবুকের কভার ফটো পরিবর্তন করে বলির পাঠা কেন হবেন ?


আমরা সবাই কমবেশি জানি বাংলাদেশ, ভারত সহ সারা বিশ্বের বাংলাভাষী মুক্তমনাদের প্রানের টানে একটি আয়োজন করা হয়েছে। আজ থেকে আমরা সকল মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী মুক্তমনারা তাদের ফেসবুক প্রফাইল পিকচার ও কভার ফটো একই রেখে ৯ দিনের জন্য বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে যারা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার প্রচার ও প্রসারের কথা বলে একশ্রেনীর মানুষের হাতে নিজেদের প্রান দিয়েছেন, বাংলাদেশের বিজয়ের এই মাসে তাদেরকে স্মরন করে এই ছবি পরিবর্তনের মাধ্যমে এই আয়োজনে সবাই অংশগ্রহন করছে। এখানে বাংলাভাষী সকল মুক্তমনাদের অংশগ্রহন থাকলেও গুটি কয়েক মুক্তমনার দ্বিমত দেখা যাচ্ছে। আর এই দ্বিমতের কারনেই অনেকেই সেই গুটিকয়েক মুক্তমনাকে একটি আলাদা দলের বা সংগঠনের বলে একেবারেই মুক্তচিন্তা বা মুক্তবুদ্ধির চর্চা থেকে আলাদা করে দিচ্ছে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে এটা সম্পর্কে কিছু বলা দরকার।

আমি এখানে বাংলাভাষী সকল মুক্তমনা ও মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসীদের প্রতি আমার অন্তরের অন্তরস্থল থেকে অনেক অনেক শ্রদ্ধা রেখে এটুকুই বলতে চাই, আসলে এমনিতেই আমাদের নামে অনেক দুর্নাম আছে। একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন দেশের সমাজে মুক্তমনাদের কোন চোখে দেখা হয় তা নিশ্চয় সবাই অবগত। এরপরেও যদি আমাদের ভেতর থেকে আমরা নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে তাদের দ্বিমত পোষন করার কারনে “মুক্তমনা” না বলে “বদ্ধমনা” বলে আলাদা করতে থাকি তাহলে সেটাকে কিভাবে মুক্তবুদ্ধির চর্চা বলা যায় ? হ্যাঁ, আমি মানছি, অনেকেই তাদের ইচ্ছা থাকা শর্তেও নির্দিষ্ট কোন সংগঠনের সাথে জড়িত থাকার কারনে বাংলাভাষী মুক্তমনাদের প্রানের এই মিলন মেলায় অংশগ্রহন করতে পারছে না বা ইচ্ছা থাকা শর্তেও তারা তাদের প্র-পিক আর কভার ফটো পরিবর্তন করছে না এটার কারণ এই জাতীয় সংগঠনের সকলেই একই চিন্তা চেতনায় বাধা হয়ে থাকেএখানেই কিন্তু মূল সমস্যা। অনেকেই মুক্তভাবে চিন্তা না করে তার সংগঠনের বাধাধরা নিয়মের ভেতরে থেকে বদ্ধ একটি চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছে। তাই আমরা যদি সে সমস্ত মুক্তমনাদের আলাদা করে ফে্লি তাহলে তাদের সাথে আমাদের অন্যায় করা হবে। এর কারণ তারা হয়তো মুক্তভাবে বা বদ্ধভাবে চিন্তা করার আসল সংজ্ঞাটাই এখনও জানে না।

আসলে আমাদের একটি বিষয় সব সময় খেয়াল রাখতে হবে, তা হচ্ছে মুক্তমনারা কিন্তু সবাইকে দ্বিমত পোষন করতেই বলে। যেমন দেখুন, যেই কভার ফটো পরিবর্তনের কথা নিয়ে এই আলোচনা সেই কভার ফটোতে কিন্তু “নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর” কবিতা “মিলিত মৃত্যু” এর প্রথম যে দুই লাইন এখানে উল্লেখ করা হয়েছে তার ভেতরেই আছে “বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখ দ্বিতীয় বিদ্যায়” এই লাইনটি। তারমানে আমরা সবাইকে দ্বিমত হতেই বলি। আমরা “সংশয়” বলে একটি শব্দের সাথেও সবাই পরিচিত আছি নিশ্চয়। এই সংশয় বিষয়টি হচ্ছে সকল জ্ঞানের উৎস বলা যায়। কারন দেখুন, যুগে যুগে মানুষ যদি সংশয় প্রকাশ না করে সেই একই মতবাদ আর একই চিন্তা মোতাবেক চলতো তাহলে কিন্তু আজকের এই সভ্যতার উন্নয়ন আমরা দেখতাম না। তাই আমাদের সব ক্ষেত্রেই দ্বিমত হতে হবে আর সব কিছুতেই সংশয় প্রকাশ করতে হবে যদি আমরা মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী হয়ে থাকি। তবে, এই সংশয় বা দ্বিমত পোষন করার আগে আমাদের জানতে হবে ভালো, মন্দ ও নৈতিকতা বা অনৈতিকতার পার্থক্য।

ভালো এবং খারাপ এর মধ্যে পার্থক্য বোঝার জন্য প্রয়োজন জ্ঞানের। আর সেই জ্ঞান অর্জনের খোলা পথকেই আমরা মুকচিন্তার চর্চা বলে থাকি। আমরা যদি মুক্তভাবে চিন্তা করতে নাই পারি তাহলে আমাদের জ্ঞানের পথে বাধা দেওয়া হচ্ছে। একজন মুক্তমনা তার পার্সে কার ছবি রাখবে আর কার ছবি রাখবে না এটা বলার অধিকার কারো থাকার কথা না এটাই হচ্ছে মুক্তচিন্তাকে উৎসাহ দেওয়া। খেয়াল রাখতে হবে কোথাও আমি মুক্তভাবে আমার মত প্রকাশে বাধাগ্রস্থ হচ্ছি কিনাআবার একদিকে স্রোত বইছে দেখে সেই দিকেই আমাকে বয়ে চলতে হবে এমনও কিন্তু না। এই জন্যই থাকতে হবে ভুল এবং সঠিক পদ্ধতি চিহ্নিত করার ক্ষমতা। আমি যদি সার্বিক পরিস্থিতি নিরাপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করে দেখি একটি যায়গায় ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সঠিক বিষয়টি এড়িয়ে যাবার কথা বলা হচ্ছে এবং সেটা করার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে তাহলে আমাদের বুঝতে হবে সেখানে কোন উদ্দেশ্য আছে। আমার উদ্দেশ্য যদি মুক্তচিন্তার চর্চাকে প্রাসারিত করাই হবে তাহলে আমি এমন মতবাদের সাথে থাকবো যেখানে আমার চিন্তা থাকবে মুক্ত।

আমার মূল উদ্দ্যেশ্য এটা বলা যে, মুক্তমনাদের ভেতরে নির্দিষ্ট বা গুটি কয়েক মুক্তমনাকে আলাদা করে দলাদলি বা কাঁদা ছোড়াছুড়ি করা ঠিক হবে না। এটা না করে আমরা তাদের এটা বোঝাবার চেষ্টা করি যে আসলে মুক্তচিন্তা কাকে বলে সেটা একটু ভেবে দেখবেন। আপনি যে প্রথাবিরোধী আন্দোলনের সাথে আছেন সেই আন্দোলনের মূলে কি আছে মুক্তচিন্তা কিন্তু আবেগ দ্বারা পরিচালিত কোন বিষয় নয় যে আমি কারো কথা না রাখলে সে মন খারাপ করবে বা অখুশি হবে বলে কথা রাখতে হবে। মুক্তচিন্তা হচ্ছে বিবেক দিয়ে করার জিনিষ যেখানে আবেগের কোন স্থান নেই। তাই আবেগ নয় বিবেক দিয়ে চিন্তা করতে শিখুন। সবাইকে একত্রে নিয়ে ভাবতে শিখুন। কেউ ভুল ব্যাখ্যা দিলে তাকে সঠিকটা ধরিয়ে দিন। নিশ্চুপ থেকে বা মন রক্ষার্থে না কে হ্যাঁ বলার চেষ্টা পরিহার করুন। ২০১৫ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারী অভিজিৎ রায় হত্যা হবার পরে ব্লগার “ওয়াশিকুর রহমান বাবু” তার ফেসবুক কভারে লিখেছিলো “ওয়ার্ড কেন নট বি কিলড” আর সে কারনেই ৩৪ দিনের মাথায় তাকেও হত্যা করা হয়েছিলো। আজ সেই “ওয়াশিকুর রহমান বাবুর”র স্মরনে না হয় নিজের মন থেকেই একটু শ্রদ্ধা জানান আপনাকে কভার ফটো পরিবর্তন করতে বলছি না। আর যদি করেও থাকেন তাহলে আপনাকে বলির পাঠা বানানো হচ্ছে এটা ভাবার কোন কারন নেই। এটা ভেবে করুন যাতে আর কোন “ওয়াশিকুর রহমান বাবু” বলির পাঠা না হয় এটা ভেবে।

ছবিঃ ইস্টিশন।

---------- মৃত কালপুরুষ
              ৩০/১১/২০১৭    

   

ফেসবুকের কভার ও প্রফাইল পিকচার পরিবর্তন প্রসঙ্গে।


সম্প্রতি ফেসবুকে একটি প্রচারনা নিশ্চয় সকলের নজরে এসেছে। সেখানে বলা হচ্ছে আসুন আমরা আগামী ৩০ নভেম্বর রাত ১১ টা ৫০ মিনিট থেকে আগামী কয়েকদিনের জন্য (সর্বোচ্চ ৯ দিন) মানে ডিসেম্বর মাসের ৯ তারিখ পর্যন্ত আমাদের ফেসবুক প্রফাইলের কভার ও প্রফাইল পিকচার পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট দুইটি ছবি দিয়ে আমাদের একাত্বতা প্রকাশ করবো সেই সাথে এটা করার মাধ্যমে আমরা তাদের স্মরন করবো যারা মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও মুক্তচিন্তার প্রচার ও প্রসারের জন্য রক্ত দিয়েছেন এবং নিজের প্রান দিয়েছেন এক শ্রেনীর মানুষের হাতে। ছবি দুইটিতে খুব সামান্য কিছু বিষয়ের মাধ্যমে অনেক কিছু তুলে ধরা হয়েছে বলে আমার মনে হয়। এখন পর্যন্ত আমি কোন মুক্তমনা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চায় বিশ্বাসী কাউকে দেখি নাই তারা এটার দ্বিমত করেছে বা এই কাজটি করা যাবে না এমন কথা বলে যুক্তি দিয়েছে। আমার কাছেও আসলে মনে হয়েছে এইরকম কোন বিষয় যেহেতু আমাদের বাংলাদেশ, ভারত সহ বিশ্বের সমস্ত বাংলাভাষী মুক্তমনাদের মধ্যে এর আগে কখনই করা হয়নি তাই এটার সাথে থেকে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত।
   
যে কভার ফটো আর প্রফাইল পিকচার এর কথা বলা হচ্ছে সেখানে আমি কোন উগ্রতা বা মেনে নেওয়া যাবে না বা কাউকে অনুভূতিতে আঘাত করা হচ্ছে এমন কিছুই আমার নজরে আসেনি। কভার ফটোতে শুধু লেখা আছে “নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী”র লেখা “মিলিত মৃত্যু”র প্রথম দুইটি লাইন “বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখ দ্বিতীয় বিদ্যায়। বরং বিক্ষত হও প্রশ্নের পাথরে” এই লাইন দুইটি পড়লে আমার মনে হয় এতো সহজ করে এতো সংক্ষেপে মানুষের চিন্তার বন্ধ দরজায় আঘাত করার কথা উপস্থাপন করা হয়েছে যা অন্য কোথাও আমি খুব কমই দেখেছি। আর তার নিচে লেখা আছে “বিজয়ের মাসে তোমাদের স্মরনে”। তার নিচেই দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে হত্যার শিকার হওয়া বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও মুক্তচিন্তার চর্চায় যারা নিজেদের প্রান দিয়েছিলেন তাদের ছবি। যেমন প্রথম থেকে (১)হুমায়ুন আজাদ, (২)আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন, (৩) অভিজিৎ রায়, (৪)ওয়াশিকুর রহমান বাবু, (৫)অনন্ত বিজয় দাস, (৬)নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় (নিলয় নীল), (৭)ফয়সাল আরেফিন দীপন, (৮)মাহাবুব রাব্বী তনয়, ও (৯)জুলহাজ মান্নান। বাম পাশে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আন্দোলনের ও বিজয়ের একটি প্রতিকৃতি যা লাল রঙের বৃত্তের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। এবং ঠিক সেই লাল রঙের বৃত্তের উপরেই আছে বিশ্ব বিখ্যাত ভাস্কর “অগাস্ত রোদিন” এর বিখ্যাত একটি ভাষ্কর্য “দ্যা থিংকার্স” এর প্রতিকৃতি যা মুক্তমনা বা ফ্রিথিংকার্সরা তাদের প্রতিক হিসেবে ব্যাবহার করে থাকে। এবং বাম পাশে কর্নারে দেখা যাচ্ছে কয়েকফোটা তাজা রক্ত যার অনেক অর্থ দাড় করানো যায়।

আর প্রফাইল পিকচার এর কথা যেটা বলা হচ্ছে শেখানেও বোঝা যাচ্ছে সেই কয়েকফোটা তাজা রক্তকেই মূল বিষয় করা হয়েছে। তবে শুধুই রক্ত যে আছে শেখানে তা নয়। রক্তের নিচে দেখা যাচ্ছে কুয়াশাচ্ছন্ন একটি বাংলাদেশের মানচিত্র যার ঠিক উপরেই আছে একটি মুষ্টিবদ্ধ হাত। আর সেই হাতে ধরা আছে একটি কলম আর এই বিষয়টি অস্পষ্ট হয়ে আছে সাদা রঙের কুয়াশা টাইপের কিছু দিয়ে যা মূলত আমাদের এই হাত ও বাংলাদেশের মানচিত্রটি ঠিক মতো দেখতে দিচ্ছে না এমন কিছু বোঝানো হয়েছে। বোঝানো হচ্ছে এই কুয়াশার মতো কোন একটি শক্তি আমাদের দেশের জ্ঞান বুদ্ধি আর মুক্তভাবে চিন্তা করার পথকে বাধাগ্রস্থ করছে। যাই হোক, সব মিলিয়ে আমার কাছে এই ছোট্ট একটি ছবির মধ্যে অনেক কিছু তুলে ধরা হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। আর সেই সাথে মনে হয়েছে এখানে এমন কিছুই নেই যা আমাদের সোস্যাল মিডিয়ার বা ফেসবুক প্রফাইলের কভার ফটো আর প্রফাইল পিকচার করে মাত্র ৯ টা দিন আমরা রাখতে পারবো না। আমার মতে এটা অবশ্যয় করা দরকার। বিশেষ করে আমি তাদের অনুরোধ করবো যারা সিনিয়র লেখক আছেন এবং বাংলাভাষী মুক্তমনাদের মধ্যে পরিচিত মুখআমি চাই তারাও এটা করে আমাদের সবাইকে একত্রে থাকার জন্য উৎসাহ দিবেন।

আমার কাছে মনে হয়েছে এতোদিন সবাই যার যার মতো করে নিজ নিজ অবস্থান থেকে লিখে, কেউ অডিও ভয়েস দিয়ে এবং অনেকেই ভিডিও ব্লগিং এর মাধ্যমে তাদের মনের কথা প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন মাধ্যমে। তবে এরকম কোন উদ্যোগ নিতে দেখিনি যাতে করে প্রকাশ পাবে এই মুক্তমনাদের মধ্যেও যে একতা আছে সেই বিষয়টি। বাংলাদেশ ভারত সহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই বাংলাভাষী মুক্তমনারা আছেন যারা সমাজের গোড়ামী আর কুসংস্কার এর বিপক্ষে নানা ভাবে কথা বলে থাকেন। তবে অনেকেই আছে যারা মুক্তচিন্তায় বিশ্বাস করেও নানা কারনে চুপচাপ থাকেন। তাদের জন্য এটা হবে সহমত প্রকাশ করার একটি বড় মাধ্যম। এমনও হতে পারে, এবার যদি এই ৯ দিনের জন্য সারা বিশ্বের বাংলাভাষী মুক্তমনারা এই বিষয়টিকে পালন করে সবার কাছে পৌছে দিতে পারে তাহলে আগামীতে প্রতি বছরই ডিসেম্বর মাসের প্রথম ৯ দিন এটা নিয়মিত ভাবে পালন করা হবে। তবে সেটা নির্ভর করছে সবাই কি পরিমান সাপোর্ট করে এই বিষয়টি তা দেখার উপরে। আর একটি বিষয় হচ্ছে এটি কিন্তু কোন ব্যানারে করা হচ্ছে না। কোন সংগঠন বা কোন অর্গানাইজেশন এর সাথে জড়িত না। আমার জানামতে এর নেই কোন স্পন্সর। অর্থাৎ এটা সম্পুর্ণ একটি প্রানের আয়োজন বলা চলে যা প্রকৃত স্বার্থহীন একটি কাজ হবে বলে মনে করি।

এবার আসুন যেই কভার ফটো নিয়ে আজকের আলোচনা সেই কভার ফটোতে যে বিষয়গুলা আছে তা একটু সংক্ষেপে জানার চেষ্টা করি। প্রথমেই ফ্রান্সের বিখ্যাত ভাষ্কর “অগাস্ত রোদিন” এর বিখ্যাত শিল্প “দ্যা থিংকার্স” নামের ভাষ্কর্যটি নিয়ে কিছু জানি। এটি একটি ব্রোঞ্জ ভাষ্কর্য যা একটি পাথরের উপরে অবস্থিত। এই ভাষ্কর্যটিতে দেখা যায় একটি পাথরের উপরে শক্ত দেহের একজন নগ্ন পুরুষ তার চিবুকটি ডান হাতের উপরে রেখে খুব গভীরভাবে চিন্তা করছেন। এই ভাষ্কর্যটি অধিকাংশ সময়েই দর্শনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিক হিসেবে ব্যাবহার করা হয়। এটার নাম “দ্যা থিংকার্স” হবার কারনে এটি মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসীদের প্রতিক হিসেবেও সব যায়গায় ব্যাবহার করা হয়। মূল ভাষ্কর্যটি ফ্রান্সের প্যারিসে একটি জাদুঘরে বর্তমানে সংরক্ষিত আছে তবে এই ভাষ্কর্যের ২৮ টি কপি সমস্ত পৃথিবীতে আছে বর্তমানে। যার মধ্যে সব থেকে বড়টির উচ্চতা ১৮৬ সেন্টিমিটার বা ৭৩ ইঞ্চি। এবার আসুন এখানে যাদের ছবি দেওয়া আছে তাদের সম্পর্কে সংক্ষেপে জানার চেষ্টা করি।

এখানে দেখা যাচ্ছে ৯ জন মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী ও মুক্তমনা সমাজে পরিচিত মুখের প্রতিকৃতি বা ছবি। যেমন প্রথমে আছেন “হুমায়ুন আজাদ” জন্ম ২৮ এপ্রিল ১৯৪৭ - মৃত্যু ১১ আগস্ট ২০০৪ যিনি ছিলেন একজন বাংলাদেশি কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সমালোচক, গবেষকভাষাবিজ্ঞানী, কিশোর সাহিত্যিক এবং রাজনীতিক ভাষ্যকার। তিনি বাংলাদেশের প্রধান প্রথাবিরোধী এবং বহুমাত্রিক লেখক যিনি ধর্মমৌলবাদ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্কারবিরোধিতা, নিরাবরণ যৌনতানারীবাদ, রাজনৈতিক এবং নির্মম সমালোচনামূলক বক্তব্যের জন্য ১৯৮০'র দশক থেকে ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং লেখার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তীব্র আক্রমণের কারণে ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি হত্যা প্রচেষ্টার শিকার হন। তার পরে আছেন ‘আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন” ওরফে থাবা বাবা। আহমেদ রাজীব হায়দার এর  মৃত্যু হয় ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ সালে। যিনি  বাংলাদেশের একজন নাস্তিক ব্লগার ছিলেন। পেশায় স্থপতি হায়দারের ব্লগের লেখাগুলি ২০১৩ শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হয়ে থাকে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিবাদীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানপন্থীদের দ্বারা সংগঠিত গণহত্যার বিচারের দাবী জানায়। ২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি অজ্ঞাত পরিচয়ধারী একদল দুর্বৃত্ত হায়দারকে হত্যা করেন। ২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি ঢাকার মিরপুর অঞ্চলে নিজস্ব বাসস্থান থেকে বের হওয়ার সময় আহমেদ রাজীব হায়দারকে আক্রমণ করে হত্যা করা হয়। তাঁর দেহ এতটাই ক্ষতবিক্ষত করে দেওয়া হয়, যে তাঁর পরিবার ও আত্মীয়রা তাঁর দেহ শনাক্ত করতে অক্ষম হন। পরের দিন তাঁর মরদেহ শাহবাগ স্কোয়ারে লক্ষাধিক মানুষের প্রতিবাদস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়।

এর পরের ছবিটা সকলের পরিচিত মুখ “অভিজিৎ রায়” এর। জন্ম ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ - মৃত্যু ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তিনি ছিলেন একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বাংলাদেশী-মার্কিন প্রকৌশলী, লেখক ও ব্লগার। তিনি বাংলাদেশের মুক্ত চিন্তার আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশে সরকারের সেন্সরশিপ এবং ব্লগারদের কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদের সমন্বয়কারক ছিলেন। তিনি পেশায় একজন প্রকৌশলী হলেও তার স্ব-প্রতিষ্ঠিত সাইট মুক্তমনায় লেখালেখির জন্য অধিক পরিচিত ছিলেন। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একুশে বইমেলা থেকে বের হওয়ার সময় অজ্ঞাত সন্ত্রাসীরা তাকে কুপিয়ে হত্যা ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা কে আহত করে। ২০১৫ সালে অভিজিৎ একুশে বইমেলা চলাকালীন বাংলাদেশে আসেন  ২৬শে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যাবেলায় তিনি ও তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা একটি রিকশায় করে একুশে বইমেলা থেকে বাড়ি ফেরার সময় সাড়ে আটটা নাগাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের নিকটে অপরিচিত দুস্কৃতিকারীদের আক্রমনের শিকার হয়ে মৃত্যবরন করেন। এরপরে আছেন “ওয়াশিকুর রহমান বাবু” এই সেই বাবু যে অভিজিৎ রায়ের হত্যার পরে তার ফেসবুকের কভার ফটোতে লেখেন “আই এম অভিজিৎ” ও “ওয়ার্ডস কেন নট বি কিলড” ২৭ বছর বয়সী এই যুবক বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে লেখালেখি করতেন। তবে সব চেয়ে এক্টিভ ছিলেন ফেসবুকে। ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ ঢাকার তেজগাঁওয়ে নিজের বাসা থেকে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লেখালেখি করার কারনে দুর্বৃত্তদের চাপাতির আঘাতে খুন হন ওয়াশিকুর

তারপরের ছবিটি “অনন্ত বিজয় দাস” এর লেখক অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের আড়াই মাসের মাথায় এবং ব্লগার বাবু হত্যার ১ মাসের মাথায় সিলেটে অনন্ত বিজয় দাস নামে আরেক ব্লগারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, যিনি নিজেও মুক্তমনা ব্লগে লিখতেন এবং গণজাগরণ মঞ্চে যুক্ত ছিলেন। তার লেখা বেশ কিছু বই আছে বর্তমানে। তারপরে আছেন “নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় (নিলয় নীল)” এর ছবি যাকে আগস্ট ২০১৫ তে খিলগাঁও এর পূর্ব গোড়ানের একটি ফ্ল্যাটে পরিবারের সবাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিলয় গণজাগরণ মঞ্চের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ থেকে অনার্স শেষ করে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। তিনি নিলয় নীলনামে বিভিন্ন ব্লগে লেখালেখি করতেন। তার ফেসবুক প্রফাইলও ছিল ওই একই নামে তার পরের ছবিটি জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক “ফয়সাল আরেফিন দীপন” এর। তাকেও ২০১৫ সালের অক্টোবরে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। রাজধানীর শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটে তাঁর কার্যালয়ে ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাঁকে কুপিয়ে ভেতরে ফেলে রেখে দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে যায়। সে মুক্তমনা লেখকদের বই প্রকাশ করতো।

এবং সর্বশেষে আছেন “মাহাবুব রাব্বী তনয় ও জুলহাস মান্নান”২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে একটি 'বিপ্লবী' কাজ করে ফেলেন বাংলাদেশের কিছু তরুন যাদের মধ্যে তারা দুইজন ছিলো অন্যতমতারা এই কুসংস্কারাছন্ন দেশটিতে প্রথমবারের মতো এমন একটি পত্রিকা প্রকাশ করে বসেন যেটির উদ্দেশ্য সমকামীদের পক্ষে কথা বলা। বাংলা ভাষার এই পত্রিকাটির নাম ছিলো “রূপবান” এর আগে বাংলাদেশের সমকামীরা কখনো এমনভাবে প্রকাশ্য হয়নি নিজেদের অধিকারের কথা তাদেরকে কখনো বলতেও শোনা যায়নি। এই রূপবানের সম্পাদকীয় বোর্ডের একজন সদস্য ছিলেন “জুলহাজ মান্নান” এবং তার বন্ধু “মাহাবুব রাব্বী তনয়”২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে তারা কলাবাগানে দুর্বৃত্তদের চাপাতির আঘাতে নিহত

আপাতত এগুলিই ছিলো এই কভার ফটোর সাথে সম্পৃক্ত সকলের সংক্ষিপ্ত পরিচয়ের পালা। আমার মনে হয়েছে আমাদের দেশে বর্তমানে আগের থেকেও বেশি এবং হঠাৎ করে মুক্ত চিন্তার অনেক প্রসার ঘটেছে যা আমরা অনেকেই প্রত্যাক্ষ করছি। অনেকেই আজ আওয়াজ তুলছেন যারা এইভাবে মৃত্যুবরণ করেছে তাদের পক্ষে। অনেকেই মনে করছে বিখ্যাত লেখক, লেখিকা সহ আজ যারা এই দেশ ছেড়ে অন্য দেশে অবস্থান করছেন তাদের জন্য কথা বলার সময় এসেছে। আর তাই আর লুকিয়ে লুকিয়ে নয় সবাই চাইছে যে কোন ভাবেই জ্ঞান-বিজ্ঞান আর মুক্তচিন্তার প্রচার আর প্রসার করে নিজেদের মধ্যে এর চর্চার পরিধি বাড়াতে। আর তারই একটু ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা মনে হয়েছে এই উদ্দ্যোগকে আমার কাছে। আর যে কারনেই আমি অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো এটির পক্ষে কথা বলতে চাই এবং সাথে থাকতে চাই।

---------- মৃত কালপুরুষ
               ২৯/১১/২০১৭