বাংলা ফেরাউন ও আরবি
ফৌরান আসলে কোন একক ব্যাক্তি বা একজন মানুষের নাম নয়। বর্তমান মিশরে প্রাচীনকালে
সকল ফারাও রাজবংশের রাজাদের এই নামেই ডাকা হতো এবং একেকজন ফারাও বা ফেরাউনদের এর
একেকটি নাম ছিলো। যেমন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন বর্তমান মুসলমান, ইহুদী ও খ্রিস্টান
ধর্মাবলম্বীদের প্রধান গ্রন্থের উল্লেখিত ফেরাউন যার আসল নাম (ইংরেজি) রামেসিস
দ্বিতীয় বা রামেসিস ২ যার জন্ম খ্রিস্টপুর্ব ১২৭৯ মৃত্যু খ্রিস্টপুর্ব ১২১৩ সাল।
বর্তমানে ইজিপ্ট বা মিশর নামে পরিচিত দেশের প্রাচীন অধিবাসী বা মিশরীয়দের কাছে
“ইউর্মার ত্রেস্তেপেনের” নামে পরিচিত ছিলো যার বাংলা অর্থ “সঠিক ভারসাম্য রক্ষার
শক্তিশালী রক্ষক” এছাড়াও তিনি ওজামন্ডিয়াস এবং গ্রেট রামেসিস নামেও অনেকের কাছে
পরিচিত ছিলেন। বর্তমান মিশরের প্রাচীন মিশরীয় রাজবংশের মধ্যে ১৯ তম রাজবংশের তৃতীয়
ফারাও রাজা ছিলেন তিনি। খ্রিস্টপুর্ব ১২৯২ সাল থেকে খ্রিস্টপুর্ব ১১৮৬ সর্বোমোট
১০৬ বছর এই ১৯তম রাজবংশ তাদের রাজত্বকালে সমস্ত মিশরের নিম্ন রাজ্য শাসন করেছিলো।
এই রাজবংশের ভেতরে একজন অন্যতম রাজা ছিলেন এই রামেসিস ২। রামেসিস কাদেশের যুদ্ধে
হিট্টয়দের সাথে জয়লাভ করে মিশরকে রক্ষা করেছিলেন সেসময়। এখানে কাদেশ প্রাচীন
মিশরের একটি শহর আর হিট্টিয় একটি জাতি। পুর্বের অনেক মিশরীয় রাজারা যাদের সাথে
যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মিশরের উচ্চ রাজ্যের বেশ কিছু স্থানের দখল হারিয়েছিলেন।
প্রকৃতপক্ষে এই যুদ্ধটিই ছিলো পৃথিবীর প্রথম যুদ্ধ যেখানে শান্তি চুক্তি হয়েছিলো
এবং যুদ্ধ ড্র হবার মতো কারনে তা সেখানেই স্থগিত করা হয়েছিলো। সেটা ছিলো
খ্রিস্টপুর্ব ১২৫৮ সালের কথা। এই সেই ব্যক্তি যিনি বর্তমান খ্রিস্টান ধর্ম ও ইসলাম
ধর্মের অনুসারীদের কাছে এক নামে পরিচিত “ফেরাউন”।
কিন্তু আশ্চর্যের
ব্যাপার কি সেটা দেখুন একবার। পৃথিবীর কোথাও এই বিষয়ে কোন ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই যে তিনিই
ইহুদী ধর্মের সেই ফেরাউন বা তার মৃত্যুর ১ হাজার ৮২৩ বছর পরে তৈরি হওয়া বা প্রচার
হওয়া ধর্ম ইসলাম ধর্মের মূল গ্রন্থ কোরানে উল্লখিত ফেরাউন আসলে তিনিই ছিলেন।
কিন্তু বর্তমানে ইহুদী, খ্রিস্টান ও মুসলিম জাতি এক মনে বিশ্বাস করে থাকেন যে, এই “ইউর্মার ত্রেস্তেপেনের” সেই ফেরাউন যার কথা কোরান ও তাওরাত শরিফ এ লেখা আছে কিন্তু তার
নাম কোথাও উল্লেখ করা নেই। বর্তমান যুগে প্রাচীন মিশরীয়দের লেখা চিত্রলিপি বা
হায়ারগ্লাফিক্স পাঠউদ্ধার করে এসবই আজ মানুষ জানতে পেরেছে এবং খুব পরিষ্কার ভাবেই
তা জানা গিয়েছে। এই ফেরাউন বা ফারাও রাজা রামেসিস দ্বিতীয় যার নাম “ইউর্মার ত্রেস্তেপেনের” তার মৃত দেহ কোনদিন পচবে
না বা নষ্ট হবে না এমন কথা এসব ধর্ম গ্রন্থ গুলিতে বলা আছে কিন্তু এই রাজার থেকে
আরো ২ হাজার বছর পুরাতন মৃত দেহ এখন পর্যন্ত মিশর সহ পৃথিবীর আরো অনেক দেশ থেকেই
উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে যা এই মিথ বা ভুলধারনা ভেঙ্গে দেবার জন্য যথেষ্ট। শুধু তাই
নয় মুসলমানরা এটাও বিশ্বাস করে থাকেন যে এই মৃত দেহটি ৬২ ফুট লম্বা কিন্তু প্রকৃত
পক্ষে তা মাত্র ৬ ফুটের কাছাকাছি একটি স্বাভাবিক মানুষের মৃত দেহের মতো।
রাজা রামেসিস ২ এর প্রাথমিক জীবন যাপন সম্পর্কে এপর্যন্ত
যা কিছু জানা সম্ভব হয়েছে তা চুড়ান্ত বলেই গ্রহন করা হয়। রামেসিস ২ ছিলেন “সেটি আই” (Seti I) এবং রানী “তুয়ায়” (Tuya) এর পুত্র। যে তার পিতার সাথে ১৪ বছর বয়স থেকেই
বর্তমান লিবিয়া ও প্যালেস্টাইনের বিভিন্ন সামরিক অভিযানের সাথে ছিলেন। পরবর্তিতে রামেসিস
২ এর বয়স যখন ২২ বছর হয় তখন সে তার ছেলে খাইময়েসেট ও আমুনুরওয়ারেমফের সাথে
বর্তমান মিশরের নুবিয়াতে নিজের
প্রচারাভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এবং সেই সময়েই রামেসিস ২ কে তার পিতা সেটি আই এর সহ-শাসক হিসেবে
গ্রহন করা হয়। রামেসিস ২ তার পিতা সেটি আই এর অধীনে থেকে প্রাচীন মিশরের আভারিসে
নামক স্থানে একটি প্রাসাদ ও একটি বিশাল বিশ্রামাগার বানানোর প্রকল্প হাতে
নিয়েছিলো। খ্রিস্টপুর্বাব্দ ১৩৪৪ থেকে ১৩২২ সাল পর্যন্ত হিট্টিয় রাজা Suppiluliuma 1 (উচ্চারন জানা নেই) বর্তমান মিশরের প্রাচীন মিশর, বর্তমান সিরিয়া এবং
কনানে সহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান তার অধীনে ছিলো যা রামেসিস ২ ও তার পিতা
সেটি আই দখল করেছিলো। এরপর রামেসিস ২ এর পিতা সেটি আই এর মৃত্যুর পরে রামেসিস ২ সিংহাসনে
বসেন এবং রাজ্যভার হাতে নেন। তখন আরেক হিট্টি রাজা “মুওয়াতি দ্বিতীয়” এর কাছ থেকে একযোগে মিশরীয় সীমান্ত পুনরুদ্ধার করেন রামেসিস ২। এসময়
এই রাজা বর্তমান মিশর, সিরিয়া ও কোনানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বানিজ্য কেন্দ্র গড়ে
তোলেন।
এই
রাজা রামেসিস ২ এর রাজত্বের শেষ শতাব্দীতে এসে কিছুটা বিতির্কিত হয়ে উঠেন তার
রাজ্যেরই কিছু পন্ডিত ও মন্দিরের পুরোহিত দ্বারা। অনেকেই বিভিন্ন কারনে দাবী
করেছিলেন যে রামেসিস ২ একজন প্রপাগান্ডিস্ট তার তেমন কোন শক্তি নেই যে তাকে দেবতা
মনে করতে হবে। কিন্তু তার রাজত্বকালের নিদর্ষন ও অতীত রেকর্ড, মন্দির, স্মৃতিসৌধের
লিখিত ও ভৌত প্রমান আমাদের এটা দেখায় তার রাজত্ব ছিলো একটি স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধ
রাজ্যের পক্ষে যুক্তিযুক্ত। তিনি মিশরের কয়েকজন শাসকদের মধ্যে একজন ছিলেন এবং দীর্ঘকালীন
শাসন করার জন্য যোগ্য ছিলেন। তিনি বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় উৎসব পালন করতেন যা ফেরাউন
বা রামেসিস ২ কে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য তার মৃত্যুর পরেও আরো ৩০ বছর ধরে অনুষ্ঠিত
হয়েছিলো। তিনি দেশের সীমানা সুরক্ষিত করেছিলেন, তার সম্পদ বৃদ্ধি করেছিলেন এবং তার ব্যবসার সুযোগ বৃদ্ধি করেছিলেন। যদিও তিনি বিভিন্ন শিলালিপি ও
স্মৃতিসৌধে তাঁর কৃতকর্মের প্রশংসা করছিলেন, তার পরেও তিনি মিশরবাসীর গর্বিত হওয়ার উপযুক্ত একজন
রাজা ছিলেন।
রামেসিস ২ বা রামেসিস দ্যা গ্রেট এর মমিকৃত মৃত
দেহটি ১৮১৮ সালে আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে উদ্ধার করা হয় যা বর্তমানে ইজিপ্ট
মিউজিয়ামে সংরক্ষন করা আছে। তার মমিকৃত মৃত দেহটি দেখে বোঝা যায় তিনি ছিলেন খুবই
শক্তিশালী এবং সুদর্ষন একজন সুপুরুষ। আজ থেকে ৩ হাজার ২৩০ বছর আগে তার বাস্তব
চেহারা কেমন ছিলো তাও থ্রিডি প্রিন্টার দিয়ে তৈরি করে দেখানো হচ্ছে নতুন
প্রজন্মকে। অত্যাধুনিক পদ্ধতি ব্যাবহার করে তার মৃত দেহ থেকে আরো অনেক অজানা তথ্য
আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে যেমন তার ছিলো একটি শক্ত চোয়াল, পাতলা নাক এবং পরু ঠোট।
জীবিত অবস্থায় তার প্রকৃত উচ্চতা ছিলো ৬ ফুট +- ১ ইঞ্চি। জীবিত অবস্থায় তিনি দাতের
সমস্যায় ভুগছিলেন এবং অধিকাংশ পরিক্ষা করেই দেখা যায় তিনি বার্ধক্য বা হৃদযন্ত্রের
ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যবরন করেন। তিনি পরবর্তীকালে মিশরীয়দের 'মহান পূর্বপুরুষ' হিসাবে পরিচিত ছিলেন এবং অনেক ফারাও
রাজা তাঁকে তাঁর নিজের নামে যুক্ত করে সম্মান দিয়েছিলেন। তাদের কিছু, যেমন (Ramessess III) রামেসিস তৃতীয় যাকে অনেক ফারাওদের চেয়েও ভাল শাসক হিসেবে বিবেচনা করা
হয়। তবে তাদের কেউই প্রাচীন মিশরীয়দের মন
ও অন্তরে রামিসেস দ্য গ্রেটের এর মতো মহৎ কৃতিত্ব এবং মহিমা দেখিয়ে রামেসিস
দ্বিতীয়কে অতিক্রম করতে পারেনি। রামেসিস ২ এর জীবনী সম্পর্কে আরো অনেক কিছু জানা সম্ভব হয়েছে যার ১০% আমি তুলে
ধরতে পারিনি লেখা সংক্ষেপ করার কারনে। এই লেখাটি Joshua J. Mark এর মিশর বিষয়ক গবেষনা থেকে রুপান্তর করে লিখেছি, তিনি নিউ ইয়র্ক এর ম্যারিস্ট কলেজ এর দর্শন এর
প্রফেসর।
----------
মৃত কালপুরুষ
২৩/১০/২০১৭
x













