লেখাটা একটি আলোচনায়
কমেন্টস হিসেবে দিতে গিয়ে দেখলাম আলোচনাটা একটু দীর্ঘ হচ্ছে তাই এটাকেই একটি
আর্টিকেল আকারে লেখা হলো। যদিও বিবর্তনবাদ নিয়ে এসব বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন
“বন্যা আহমেদ” তার “বিবর্তনের পথ ধরে” বইতে বা এরকম অনেক আলোচনা অতীতে মুক্তমনাতে
সহ আরো অনেক ব্লগ সাইটে করা হয়েছে তার পরেও আবার সেই বিষয়ে কিছু আলোচনা করার
প্রয়োজনীয়তা পড়ায় এটা লেখা। সংশয়বাদ এবং আজ্ঞেয়বাদ প্রসঙ্গে একটি লেখার কিছু বিষয়
বিবর্তনবাদ থেকে উদাহরন হিসেবে দেওয়ার কারনে আবার নতুন করে এই বিবর্তনবাদ প্রসঙ্গে কিছু কথা আলোচনার প্রয়োজন পড়লো। কারণ
বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসী সচেতন সমাজের দাবী ডারউইনের তত্ব বা বিবর্তনাবাদ নিয়ে অনেক
মিসিং লিংক আছে ইউটিউবে (যদিও ইউটিউব কোন অথেন্টিক সোর্স নয়) তবে আমি সে বিতর্কে
না গিয়ে একটু বিশ্লেষন করার চেষ্টা করেছি, জানিনা কতটুকু বোঝাতে পারবো।
ধর্মবিশ্বাসী বা
সৃষ্টিবাদীদের দাবী তারা সরাসরি না বললেও বারবার একই কথা বোঝাতে চাই বিবর্তনবাদ
একটি ভুল তত্ব যার কোন ভিত্তি নাই এবং পক্ষান্তরে তারা এটা প্রতিষ্ঠিত করতে চাই যে
বিবর্তনের থেকে আদম হাওয়া টাইপের কেচ্ছা বেশি গ্রহনযোগ্য। তাদের জ্ঞাতার্থেয় মূলত বলা যে, বিবর্তনবাদ বর্তমানে এমন একটি প্রতিষ্ঠিত
তত্ব যা নিয়ে বর্তমানে বিশ্বের কোন উন্নত ও অথেন্টিক ম্যাগাজিন বা জার্নাল এখন আর
কোন বিতর্ক প্রকাশ করেনা। এর একটিই কারণ আর তা হচ্ছে এই তত্বটি নিয়ে আর কারো কোন
সন্ধেহ নেই। বর্তমান যুগ হচ্ছে স্কাই মিডিয়ার যুগ, হাতে হাতে ইণ্টারনেট এবং তথ্য
প্রযুক্তির ছোয়া তাই এই বিবর্তনবাদ তত্ব নিয়ে কারো আর অজানাও কিছু নেই। উন্নত
বিশ্বের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকেই এই বিবর্তনবাদ নিয়ে বেসিক ধারনা দেওয়া
শুরু হয়ে থাকে। প্রতিটি উন্নত বিশ্বের শিক্ষার্থীদের রেগুলার পাঠ্য বইতেও বিবর্তনবাদ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে যার ছিটেফোটাও
আমাদের দেশের মতো দক্ষিন এশিয়ার আরো অনেক নিম্ন শ্রেনীর দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায়
নেই। যে কারনেই আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে বিবর্তনবাদ নিয়ে ধারণা একটু কম এবং
তারা বিবর্তনবাদের সত্যতা যাচাই করার থেকে এই তত্বের মিসিং লিংক খুজে বের করতে
বেশি আগ্রহ দেখিয়ে থাকে।
এমনকি কিছু মানুষের
ধারনা যারা এই বিবর্তনবাদ নিয়ে বিশ্লেষনধর্মী লেখালেখি করে থাকে তাদের লেখার মধ্যে
মানুষকে বিভ্রান্ত করার কোন কৌশল আছে এবং তা নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিন্তু আসল
কথা হচ্ছে এই বিবর্তনবাদ নিয়ে বর্তমানে যে একেবারেই বিতর্ক হয়না তা কিন্তু না। তবে
যে ধরনের বিতর্ক হয়ে থাকে তা আসলে এই তত্বের মধ্যে থেকেই করা হয় যেমন কোন কোন
প্রজাতি থেকে কোন কোন প্রজাতির বিবর্তন হয়েছে আর কোন কোন প্রাজাতি থেকে এই বিবর্তন
কি কারণে হয়েছে এবং কেন হয়েছে তা নিয়ে নানা বিশ্লেষনধর্মী আলোচনা, বিতর্ক ও
ন্যাশনাল জিওগ্রাফীর মতো কিছু টিভি চ্যানেলের বিভিন্ন ডিকুমেন্টারিতেই আমরা দেখতে
পায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যদি এই বিবর্তন তত্ব ভুল বা ভিত্তিহীনই হবে তাহলে এধরনের
স্বাভাবিক আর সর্বাধিক গ্রহনযোগ্য আলোচনা কেন হয়ে থাকে ? এছাড়াও আমার মনে হয় আরো
একটি বিষয় এই সৃষ্টিবাদীরা ভুলে যায় যে বিজ্ঞান আসলে কখনই কোন একটি যায়গাতে এসে
আটকে থাকেনা। যেমনটা আছে বিভিন্ন ধর্মের কথিত ঐশরিক গ্রন্থে। বিজ্ঞানের নতুন নতুন
তত্ব প্রতিদিন পুরাতন ধারণা ভেঙে নতুন নতুন ধারনা দিয়েই চলেছে যেটা বিজ্ঞানের সব
থেকে শক্তিশালী দিক যা এতো সহজে কোন ধর্মীয় মতবাদ দারা ভুল প্রমাণ করা সম্ভব না। আর যারা বিবর্তনবাদের বিপক্ষে কথা বলে তারাই বা তাদের
প্রচেষ্টাই আসলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে। হোক তার কারণ স্বর্গ বা বেহেশতে যাবার টিকেট বা অন্য কিছু।
এখানে ছোট্ট একটি
উদাহরন দিয়ে শেষ করবো। কিছু কিছু সৃষ্টিবাদীরা আসলে বুঝতে পারেন এই বিবর্তন তত্বটি
তাদের ধর্মের জন্য হুমকি স্বরুপ একটি তত্ব যা একাই তাদের সকল ধর্মীয় মতবাদ ভুল
প্রমাণ করে দিতে সক্ষম তাই তারা এটার বিরোধিতা করে। আর যারা তাদের আদর্শের মধ্যে
থাকতে চায় যখন তারা দেখতে পারে এই বিবর্তন তত্ব সত্য ও মানব সভ্যতার অগ্রগতির কথা
বলছে তখন তারা ধর্মীও মতবাদ থেকে বেরিয়ে আসে। পৃথিবীতে হাতে গোনা কয়েকজন দার্শনিক
আর বিজ্ঞানীকে পাওয়া যাবে যারা সৃষ্টিকর্তা বলে কেউ আছে এমন মতবাদে বিশ্বাস করতেন।
তবে তারা কেন তা করেছিলেন সে বিষয়ে আজকের এই দিনে আমাদের আর কারো জানতে বাকি থাকার
কথা না। “নিকোলাস কোপার্নিকাস” আজ থেকে দু হাজার বছর আগে একটি তত্ব দিয়েছিলেন যে ‘পৃথিবী
সুর্যের চারদিকে ঘোরে’ যেই কথা্টি তখন ছিলো সম্পুর্ণ খ্রিস্টান ধর্মের ঐশরিক
গ্রন্থ বাইবেল বিরোধী তত্ব। কারণ বাইবেলে তখন বলা ছিলো ঠিক “নিকোলাস কোপার্নি্কাসের”
বলা কথার উল্টোটা। বর্তমানে আমরা সবাই জানি সেসময় পৃথিবী আর সুর্যের এই তত্ব দিয়ে নিকালোস
কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও আর ব্রুনোর উপরে কি পরিমানের নির্যাতন হয়েছিলো বেধর্মী আর
ঈশ্বরের শত্রু বলে। এর কারনে ঈশ্বরের মুমিন বান্দারা তখন ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে
হত্যা করেছিলো ভুল মতবাদ প্রচার করার জন্য। কিন্তু দেখুন তারা কি সুর্যকে পৃথিবীর
চারদিকে ঘোরাতে পারলো ? সুর্য কিন্তু ঠিকই আছে তার যাওগায় এবং এই পৃথিবী সেই
সুর্যের চারপাশেই ঘুরে চলেছে মাঝখানে সত্য বলার জন্য, মানুষকে জ্ঞানের পথে আনার
জন্য প্রাণ দিতে হলো ব্রুনোকে।
শুধু তাই নয়, এরকম
অনেক অনেক প্রামাণ দেওয়া যাবে যাদের তত্ব ধর্মীয় মতবাদের বিপক্ষে যাবার কারণে
তাদেরকে হত্যা করা হয়েছিলো আর সেই হত্যা আর নির্যাতন থেকে রক্ষা পাবার জন্য অনেকেই
হয়তো বলেছিলো “স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে বুঝতে জ্ঞানের প্রয়োজন হয়, কিন্তু স্রষ্টার
অস্তিত্ব নাই বুঝতে জ্ঞানের প্রয়োজন নাই” –ফ্রান্সিস বেকনের মতো এই ধরনের কথা যা
আজকের দিনে ফেসবুকের যুগে ধর্ম বিশ্বাসীদের প্রধান হাতিয়ার তাদের ধর্মীও মতবাদকে
যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করার। তবে সচেতন মানুষেরা নিশ্চয় বুঝতে পারবে “ফ্রান্সিস
বেকন” এর এই কথাটা কতটা যুক্তিযুক্ত। বিবর্তনবাদ নিয়ে “হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে”
একসময় একটি তত্ব প্রকাশ করা হয়েছিলো যার নাম ‘পাংচুয়েটেড ইকুইলিব্রিয়াম’ (Punctuated
Equilibrium) যে মডেলটি
প্রথম উপস্থাপন করেন হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক “স্টিফেন জ্যে গুল্ড”। তিনি
এমন ভাবে তার এই মতবাদটি তখন উপস্থাপন করেছিলেন যাতে করে অনেকে মনে করে “স্টিফেন
জ্যে গুল্ড” আসলে বিবর্তনবাদ একটি ভুল তত্ব প্রামাণ করতে চেয়েছিলেন। আর তার এই
মডেলটি নিয়ে তখন সৃষ্টিবাদীরা বিভিন্ন জার্নালে লেখা শুরু করেন এই ভেবে যে ডারউনের
বিবর্তন তত্ব মনে হয় এবার ভুল প্রমাণিত হলো।
সৃষ্টিবাদীদের অনেকেই তখন জানতো না “স্টিফেন জ্যে গুল্ড” তার
সারা জীবনে বিবর্তনবাদের পক্ষেই প্রচার প্রচারনা চালিয়েছিলেন। একটা সময় তিনি মনে
করলেন এখন সময় এসেছে এই তত্বকে আরেকটু কষ্টি পাথরে ঘষে দেখার তাই ‘পাংচুয়েটেড
ইকুইলিব্রিয়াম’ (Punctuated
Equilibrium) মডেলটি
তিনি প্রকাশ করেছিলেন। এই সময় যারা বিভিন্ন ধর্মীও মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য
বিবর্তন তত্বের ভুল খুজে বের করতে ব্যস্ত ছিলেন তারা কিছু লেখালেখি ও কিছু মতবাদ
রেখেছিলেন যাকে আজকের দিনের ফেসবুকার্স সৃষ্টিবাদীরা ডারউনের বিবর্তন তত্বের মিসিং
লিংক বলে থাকে। এর কারণ হচ্ছে হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক “স্টিফেন জ্যে
গুল্ড” তার সেই মডেলে বিবর্তনের সঠিকতা নিয়ে কোন প্রশ্ন না তুলে তিনি কিছু প্রশ্ন
করেছিলেন এবং বলেছিলেন বিবর্তন শুধুই যে একটি ধীর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে তা নই
বর্ং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিবর্তনের কোন কোন পর্যায়ে ব্যাতিক্রমও ঘটতে পারে। আর এমন
বিষয়কে পুজি করে অনেক সৃষ্টিবাদীরা যুক্তি দিতে থাকে ডারইনের মিসিং লিংক দেখুন
ইউটিউবে তাহলে বুঝতে পারবেন বিবর্তনবাদ সত্য না মিথ্যা। আমার ধারণা তারা যে আসলে
এই বিবর্তনবাদ নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন তা কিন্তু নয়, তারা এই তত্বের বিরোধীতা করে
যার শুধুই একটি মাত্র কারণ এই তত্বটি তাদের ধর্মের জন্য হুমকি স্বরুপ।
---------- মৃত কালপুরুষ
১২/০১/২০১৮








