রবিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

মহাকাশের সৃষ্টিতত্ব ও ধর্মীয় মতবাদ।


খুব সহজ একটি কথা বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন ঈশ্বর বিশ্বাসী অথবা সৃষ্টিবাদীদের আমারা বলতে শুনে থাকি। যেমন- আমাদের এই পৃথিবী যেই গ্যালাক্সির মধ্যে আছে বা এরকম বিলিয়ন বিলিয়ন, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সি যেই মহাবিশ্বের (ইউনিভার্স) এর মধ্যে আছে অথবা এরকম আরো বিলিয়ন বিলিয়ন মহাবিশ্ব (মাল্টিভার্স)যদি থেকে থাকে তাহলে এসবই যেকোন একজন বা বহুজন ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন (যার যার ধর্মের ঈশ্বর অনুযায়ী)। কিন্তু আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোন ধর্মের ঐশরিক কিতাব বা ঈশ্বরের বানীতে তার ৯৯,৯৯% বাদ দিয়ে যা থাকে তা থেকেও সব বাদ দিয়ে মাত্র ০,০১% এর মতো তথ্য কেন ঈশ্বরেরা এই পৃথিবীর সাধারন মানুষকে দিতে পারেনি আজো ? এটা একটা ছোট্ট প্রশ্ন রাখা হোক সমস্ত ঈশ্বরে বিশ্বাসী মানুষদের কাছে। এই সব গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ছায়াপথ, মহাবিশ্ব সবই যদি কোন একজন ঈশ্বর বা কয়েকজন ঈশ্বরের সৃষ্টি হয়ে থাকবে তাহলে এতো বিলিয়ন বিলিয়ন, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ছায়াপথ, মহাবিশ্ব বাদ দিয়ে সেই সৃষ্টিকর্তা কেন এই (পৃথিবীর মাপ অনুযায়ী) অনু বা পরমানু সাইজের একটা গ্রহ “পৃথিবী” নিয়ে এতো চিন্তিত হবেন এবং এতো আদেশ উপদেশ দিবেন এখানে বসবাস করা সাধারণ মানুষদের ? এটা আরেকটা প্রশ্ন রাখা যেতে পারে।

আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের এই পৃথিবী যে গ্যালাক্সির মধ্যে আছে এবং সেই গ্যালাক্সির মতো বিলিয়ন বিলিয়ন গ্যালাক্সি যেই মহাবিশ্বের মধ্যে আছে সেই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হবার কারণ “বিগ ব্যাং” বা একটি বড় বিস্ফোরন বলে থাকে। তার মানে এই মহাবিশ্বের মতো যদি আরো অনেক মহাবিশ্ব থেকে থাকে (যা বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন মাত্র) সেগুলোও নিশ্চয় একই নিয়মে তৈরি হয়ে থাকবে। কিন্তু মহাবিশ্ব সৃষ্টির কোন কথা বা এই কোটি কোটি গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সী, ছায়াপথ, মহাবিশ্ব তৈরি হবার কথা আমাদের এই পৃথিবীর একেকটি ধর্ম একেক রকমের ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। বিজ্ঞানের মতো তাদের সকলের ব্যাখ্যা আবার এক নয়। একেকজন একেক রকমের ব্যাখ্যা দেন এবং প্রতিটি ব্যাখ্যার সাথেই বিজ্ঞানের অমিল পাওয়া যাওয়ার কারণেই সৃষ্টিবাদীদের সাথে বিবর্তনবাদীদের মতের অমিল দেখা যায়। তবে এক্ষেত্রে সৃষ্টিবাদীদের শিশুকাল থেকেই ধর্মের ওপরে আস্থা তৈরি করে রাখার ফলে যুক্তিসংগত আলাপ আলোচনার একটি পর্যায়ে আচরনিক সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু অপরদিকে একজন বিবর্তনবাদী কখনই তার আচরন খারাপ করেনা সেই আলোচনার মধ্যে, বরং চেষ্টা করে যুক্তিযুক্ত আলোচনার মাধ্যমে সঠিক ও সত্য ঘটনাটা বোঝানোর।  

যেহেতু আজকের দিনে কোন সাধারন মানুষের এই বিগ ব্যাং থিউরীর কথা অজানা থাকার কথা নয় যা প্রথম ১৯২৭ সালে বেলজিয়ামের একজন বিজ্ঞানী “জর্জ লেমিটর” আমাদেরকে বলেছিলো। পরবর্তিতে “এডুইন হাবল” নামের আরেকজন বিজ্ঞানী এই মতবাদের সমর্থন করে তা পর্যবেক্ষন করে সঠিক বলে গ্রহন করেছিলো এবং ব্যাখ্যাও করেছিলো যা আজ পর্যন্ত সেখানেই আটকে আছে। যদি এই থিউরীর বাইরে অন্য কেউ নতুন কোন গ্রহনযোগ্য তত্ব দিতে পারে তাহলে সাথে সাথে এই তত্ব বাতিল হয়ে যাবে কিন্তু তা এখনও কেউ দিতে পারেনি। আমি এখানে বিগ ব্যাং তত্বটি কি এবং কেমন তার বিস্তারিত দিয়ে আর লেখটি বড় করতে চাই না। এখন দেখুন কয়েকটি ধর্ম আমাদেরকে এই বিষয়ে কি ধারনা দেয়। যেমন প্রথমেই আমরা দেখবো এই ছোট্ট পৃথিবীর সব থেকে বহুল প্রচলিত ধর্ম “খ্রিস্টান ধর্ম” আজকে যারা তাদের সব চেয়ে বড় বাৎসরিক উৎসব পালন করবে তারা এই সৃষ্টিতত্বের ব্যাখ্যা কিভাবে দিয়ে থাকেন। এই ধর্মটির প্রধান ও পবিত্র বা ঐশরিক কিতাবের নাম হচ্ছে “বাইবেল”। এই বাইবেলের আবার বর্তমানে দুইটি ভাগ করা হয়েছে যার একটি আমরা আদিপুস্তক বলে থাকি (ওল্ড স্টেটমেন্ট) এবং অপরটিকে নতুনপুস্তক (নিউ স্টেটমেন্ট) বলে থাকি। সে বাইবেলের আদিপুস্তকের প্রথম অধ্যায়ের নাম হচ্ছে “জেনেসিস”। এই জেনেসিস শুরু হয়েছে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির তত্ব দিয়েই। বাইবেল মতে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির কারণ এখানে দেখুন -

১ শুরুতে, ঈশ্বর আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। প্রথমে পৃথিবী সম্পূর্ণ শূন্য ছিল; পৃথিবীতে কিছুই ছিল না।
২ অন্ধকারে আবৃত ছিল জলরাশি আর ঈশ্বরের আত্মা সেই জলরাশির উপর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল।
৩ তারপর ঈশ্বর বললেন, “আলো ফুটুক!তখনই আলো ফুটতে শুরু করল।
৪ আলো দেখে ঈশ্বর বুঝলেন, আলো ভাল। তখন ঈশ্বর অন্ধকার থেকে আলোকে পৃথক করলেন।
৫ ঈশ্বর আলোর নাম দিলেন, “দিনএবং অন্ধকারের নাম দিলেন রাত্রি।সন্ধ্যা হল এবং সেখানে সকাল হল। এই হল প্রথম দিন।
৬ তারপর ঈশ্বর বললেন, “জলকে দুভাগ করবার জন্য আকাশমণ্ডলের ব্যবস্থা হোক।
৭ তাই ঈশ্বর আকাশমণ্ডলের সৃষ্টি করে জলকে পৃথক করলেন। এক ভাগ জল আকাশমণ্ডলের উপরে আর অন্য ভাগ জল আকাশমণ্ডলের নীচে থাকল।
৮ ঈশ্বর আকাশমণ্ডলের নাম দিলেন আকাশ।সন্ধ্যা হল আর তারপর সকাল হল। এটা হল দ্বিতীয় দিন।
৯ তারপর ঈশ্বর বললেন, “আকাশের নীচের জল এক জায়গায় জমা হোক যাতে শুকনো ডাঙা দেখা যায়।এবং তা-ই হল।
১০ ঈশ্বর শুকনো জমির নাম দিলেন, “পৃথিবীএবং এক জায়গায় জমা জলের নাম দিলেন, “মহাসাগর।ঈশ্বর দেখলেন ব্যবস্থাটা ভাল হয়েছে।

এরকম সর্বোমোট ২৫টি পয়েন্ট আছে এই জেনেসিস অধ্যায়ে যা আমি আর এখানে দিয়ে আপনাদের মুল্যবান সময় অপচয় করাতে চাচ্ছিনা। আপনারা কেউ চাইলে বাইবেলের প্রথম অধ্যায়টি পড়ে দেখতে পারেন। এবার একটু দেখবো এশিয়া মহাদেশের আরেকটি বহুল প্রচলিত ধর্ম “হিন্দু ধর্ম” আসলে হিন্দু ধর্ম বলে কোন ধর্ম নেই, আছে “সনাতন ধর্ম” সেই সনাতন ধর্ম এই সৃষ্টি তত্ব নিয়ে কি বলে দেখুন। এই ধর্মটিতে আসলে নির্দিষ্ট কোন ঈশ্বর প্রদত্ত বা ঐশরিক কিতাবের সন্ধান পাওয়া যায়না। এই ধর্মে যে সমস্ত কিতাব বা গ্রন্থ প্রচলিত আছে তা সবই এই ধর্মের প্রাচীন ঋষিদের রচিত বেশ কিছু গ্রন্থ। আর এই সমস্ত গ্রন্থের সাথে প্রচলিত আছে আরো কিছু পৌরানিক উপাখ্যান। এই হিন্দু ধর্মে যে এক এবং অদ্বিতীয় সত্তা আছে তার নাম হচ্ছে ব্রহ্ম। আর এই ব্রহ্ম সম্পর্কে তাদের ঈশ উপনিষদে বলা আছে – (“ঈশা ব্যসমিদং সর্বং যতকিঞ্চ জগত্যাং জগত্‍। তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্যস্বিদ্‌ ধনম্”) জগতে যে কিছু পদার্থ আছে, তৎসমস্তই আত্মরূপী পরমেশ্বর দ্বারা আচ্ছাদন করিবে, অর্থাৎ একমাত্র পরমেশ্বরই সত্য, জগৎ তাহাতে কল্পিতমিথ্যা, এই জ্ঞানের দ্বারা জগতের সত্যতা-বুদ্ধি বিলুপ্ত করিবে। (তাহাতেই তোমার হৃদয়ে আসক্তি-ত্যাগরূপ সন্ন্যাস আসিবে) সেই ত্যাগ বা সন্ন্যাস দ্বারা আত্মার অদ্বৈত নির্ব্বিকার ভাব রক্ষা কর কাহারো ধনে আকাঙ্ক্ষা করিও না। এছাড়াও এটি হিন্দু ধর্মের একেশ্বরবাদী রূপ। “যার ভিত্তি এক ও অদ্বিতীয় সত্তা ব্রহ্ম। তিনি সবকিছুর উৎস। বেদের শেষ ও দার্শনিক অংশ উপনিষদে বলা হয়েছে তিনি অদ্বিতীয় সত্তা। তিনি সূক্ষ্ম ও স্থূল সব কিছুরই উৎস। এর থেকে জগতের বিভিন্ন উপকরণের সৃষ্টি হয়েছে” তারমানে এখানেই আমরা সৃষ্টির রহস্য পেয়ে যাচ্ছি।   

এছাড়াও হিন্দু ধর্মের মার্কেণ্ডয় পুরাণ মতে- যা অব্যক্ত এবং ঋষিরা যাকে প্রকৃতি বলে থাকেন, যা ক্ষয় বা জীর্ণ হয় না, রূপ রস গন্ধ শব্দ ও স্পর্শহীন, যার আদি অন্ত নেই, যেখান থেকে জগতের উদ্ভব হয়েছে, যা চিরকাল আছে এবং যার বিনাশ নেই, যার স্বরূপ জানা যায় না, সেই ব্রহ্ম সবার আগে বিরাজমান থাকেন। আরো দেখুন - সৃষ্টি প্রক্রিয়া বিভিন্ন স্তরে সম্পন্ন হয়। এখানে তিনটি গুণ রয়েছে। এই তিনটি গুণ হলো সত্ত্ব, রজ ও তম। সত্ত্ব হলো প্রকৃতি। রজের প্রভাবে অহংকারসহ অন্যান্য খারাপগুণের জন্ম এবং তম হলো অন্ধকার। শ্রী সুবোধকুমার চক্রবর্তৗ অনূদিত মার্কেণ্ডয় পুরাণে বলা হয়েছে- এই তিন গুণ তাঁর মধ্যে পরস্পরের অনুকূলে ও অব্যাঘাতে অধিষ্ঠিত আছে। সৃষ্টির সময়ে তিনি (ব্রহ্ম) এই গুণের সাহায্যে সৃষ্টিক্রিয়ায় প্রবৃত্ত হলে প্রধান তত্ত্ব প্রাদুর্ভূত হয়ে মহত্তত্ত্বকে (মহৎ নামক তত্ত্ব) আবৃত করে। এই মহত্তত্ত্ব তিনগুণের ভেদে তিন প্রকার। এর থেকে তিন প্রকার ত্রিবিধ অহংকার প্রাদুর্ভূত হয়। এই অহংকারও মহত্তত্ত্বে আবৃত ও তার প্রভাবে বিকৃত হয়ে শব্দতন্মাত্রের সৃষ্টি করে। তা থেকেই শব্দ লক্ষণ আকাশের জন্ম। অহংকার শব্দমাত্র আকাশকে আবৃত করে এবং তাতেই স্পর্শতন্মাত্রের জন্ম। এতে বলবান বায়ু প্রাদুর্ভূত হয়। স্পর্শই বায়ুর গুণ। শব্দমাত্র আকাশ যখন স্পর্শমাত্রকে আবৃত করে, তখন বায়ু বিকৃত হয়ে রূপমাত্রের সৃষ্টি করে। বায়ু থেকে জ্যোতির উদ্ভব, রূপ ঐ জ্যোতির গুণ। স্পর্শমাত্র বায়ু যখন রূপমাত্রকে আবৃত করে, তখন জ্যোতি বিকৃত হয়ে রসমাত্রের সৃষ্টি করে। তাতেই রসাত্মক জলের উদ্ভব। সেই রসাত্মক জল যখন রূপমাত্রকে আবৃত করে তখন জল বিকৃত হয়ে গন্ধমাত্রের সৃষ্টি করে। তাতেই পৃথিবীর জন্ম হয়।

আবারও মুল্যবান সময় অপচয় না করার স্বার্থে আমি এর বেশি হিন্দু ধর্মের তত্ব এখানে দিলাম না। তবে সবশেষে মধ্যপ্রাচ্যের একটি বহুল প্রচলিত ধর্ম যার অবস্থান এই পৃথিবীতে এখনও দ্বিতীয় বলা চলে সেই “ইসলাম” ধর্ম মতে তাদের বিশ্বাস করা সৃষ্টিতত্ব এখানে না দিলে অন্যায় হয়ে যাবে। দেখুন ইসলাম ধর্ম এই সৃষ্টিতত্ব সম্পর্কে কি বলে। ইসলাম ধর্মের প্রধান ও ঐশরিক কিতাব হচ্ছে একটি যার নাম “আল-কোরান”। এই গ্রন্থে যা যা লেখা আছে তা এই ধর্মের অনুসারীরা একমনে কোনকিছু যাচাই বাছাই না করে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে থাকে। তাদের ধারনা এই গ্রন্থে যা কিছু লেখা আছে তা এই পৃথিবীর বিজ্ঞানের সকল শাখার ব্যাখ্যা একত্র করে একটি বই আকারেই প্রকাশ করা হয়েছে যার নাম এই আল-কোরান। এই ধর্মের অনুসারীদের অনেকের দাবী এই কিতাবে সব বিষয়েই সংক্ষিপ্ত ভাবে এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা করা আছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা যখন মহাকাশ তত্বের আথে তার মিল খুজে দেখতে যায় তখন বাধে তার সাথে বড় ধরনের দ্বন্দ। এই কোরানে প্রাচীন গ্রিক, প্রাচীন মিশরীয় বা ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মের মতো শুরুতেই সৃষ্টিতত্ব দিয়ে শুরু করা হয়নি। এই কোরানের মাঝে মাঝে (৬ থেকে সাড়ে ৬ হাজার আয়াতের) বিভিন্ন সময় বিভিন্ন যায়গায় এই সৃষ্টি তত্বের কথা বলা আছে। যেমন –

সূরা আরাফ (আয়াত-৫৪)
إِنَّ رَبَّكُمُ اللّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتٍ بِأَمْرِهِ أَلاَ لَهُ الْخَلْقُ وَالأَمْرُ تَبَارَكَ اللّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
54
অর্থঃ নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশের উপর অধিষ্টিত হয়েছেন। তিনি পরিয়ে দেন রাতের উপর দিনকে এমতাবস্থায় যে, দিন দৌড়ে রাতের পিছনে আসে। তিনি সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র দৌড় স্বীয় আদেশের অনুগামী। শুনে রেখ, তাঁরই কাজ সৃষ্টি করা এবং আদেশ দান করা। আল্লাহ, বরকতময় যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।
সূরা হা-মীম সেজদা (আয়াত-৯)
قُلْ أَئِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ وَتَجْعَلُونَ لَهُ أَندَادًا ذَلِكَ رَبُّ الْعَالَمِينَ
অর্থঃ বলুন, তোমরা কি সে সত্তাকে অস্বীকার কর যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দুদিনে এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ স্থীর কর? তিনি তো সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা।

 সূরা হা-মীম সেজদা (আয়াত-১০)
وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِن فَوْقِهَا وَبَارَكَ فِيهَا وَقَدَّرَ فِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ سَوَاء لِّلسَّائِلِينَ
অর্থঃ তিনি পৃথিবীতে উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, তাতে কল্যাণ নিহিত রেখেছেন এবং চার দিনের মধ্যে তাতে তার খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন-পূর্ণ হল জিজ্ঞাসুদের জন্যে।

 সূরা হা-মীম সেজদা (আয়াত-১১)
ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاء وَهِيَ دُخَانٌ فَقَالَ لَهَا وَلِلْأَرْضِ اِئْتِيَا طَوْعًا أَوْ كَرْهًا قَالَتَا أَتَيْنَا طَائِعِينَ
অর্থঃ অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধুম্রকুঞ্জ, অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।




এছাড়াও ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরানের আরো বেশ কিছু আয়াতে এই সৃষ্টিতত্ব সম্পর্কে আরো কিছু কথা বলা আছে যেমন – সূরা আন-নাযিয়াত (আয়াত-২৭ থেকে ৩০) এ বলা আছে। তারপর সূরা আম্বিয়া (আয়াত-৩০) এ বলা আছে এই জাতীয় একই কথা যা বর্তমান মহাকাশ বিজ্ঞান বা সৌরবিজ্ঞানের সাথে কোন মিল খুজে পাওয়া যায়না। এই সমস্ত ধর্মীয় বানীকে এই ধর্মের বর্তমান যুগের মডারেট কিছু ধর্ম বিশ্বাসী বিজ্ঞানের সাথে মিল আছে দেখিয়ে “জল পড়ে পাতা নড়ে” টাইপের কিছু ব্যাখ্যাও করে থাকেন তারা। কিন্তু তাতেও যে খুব একটা সফল হচ্ছেন তারা তাও কিন্তু না। নিচের ভিডিওটি একটু ভালো করে দেখলে আপনার কিছুটা ধারনা হতে পারে আমাদের এই পৃথিবীর অবস্থান আসলে কোথায় যা নিয়ে আমাদের এতো রহস্য।

---------- মৃত কালপুরুষ

               ২৪/১২/২০১৭

শনিবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৭

যীশু খ্রিস্ট এর জীবনি ও ধর্মীয় মতবাদ কতটুকু সত্য ?


চারিদিকেই ক্রিসমাস এর আমেজ। এশিয়া মহাদেশের দেশগুলিতে যদিও পশ্চিমা ও ইউরোপীয়দের মতো জাঁকজমক পূর্নভাবে ক্রিসমাসের আয়োজন করা হয়না তারপরও কেউই এই উৎসবের বাইরে থাকেনা। বছরের পর বছর ধরে যীশুর জন্মদিন ২৫ ডিসেম্বর, যা ক্রিসমাস হিসেবে উদযাপন করা হয়। দেশ ভেদে ও চার্চ ভেদে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা জানুয়ারী মাসের বিভিন্ন সময়েও এই জন্মদিন পালন করে থাকে। যদিও যীশুর জন্মদিন সম্পর্কে বিশেষ তথ্য জানা যায় না তবে খ্রিস্টান পণ্ডিতদের দাবি তিনি বসন্ত বা শীতের প্রারম্ভে জন্মগ্রহণ করেন। আর সেই মতে ডিসেম্বর থেকে শুরু করে জানুয়ারীর বিভিন্ন সময়ে সেটা পালিত হয়ে থাকে। যদিও এই যীশু চরিত্রটি নিয়ে ইসলাম ধর্ম ও খ্রিস্টান ধর্ম নানা হাস্যকর ও অযৌক্তিক কেচ্ছা কাহীনি প্রচলিত আছে তারপরেও যীশুর জীবনি নিয়ে দর্শন শাস্ত্রে ও ইতিহাসে বেশ কিছু মতবাদ প্রচলিত আছে।

খ্রিস্টান ধর্মের যীশু খ্রিস্ট বা ইসলাম ধর্মের ঈসা নবী সম্পর্কে অনেক মতবাদের মধ্যে একটি মতবাদ হচ্ছে সে একটা সময় এশিয়া মহাদেশে এসেছিলেন। শুধু তাই নয় সে ভারতবর্ষে এসেছিলো এবং একবার নয় সে ভারতবর্ষে দুইবার এসেছিলো বলে ধারনা করা হয়। এমনকি কিছু খ্রিস্টান পন্ডিতের দাবী যীশুর সমাধি ভারতের কাশ্মীরে অবস্থিত। আনুমানিক ১০০ থেকে ২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ফরাসি সাধু “আইরেনিয়াস” দাবী করেছিলেন ৩৩ বছর বয়সে যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হলেও সে তখন মারা যায়নি বরং জীবিত ছিলো এবং ৫০ বছরেরও বেশি সময় জীবিত ছিলো। ভালো যে সাধু “আইরেনিয়াস” এই কথা ইসলাম ধর্মের কোরান রচনা হবার ৩০০ বছর আগে বলেছিলেন তা না হলে তার এই কথা কোরানের সাথে সম্পুর্ণ সাংঘর্ষিক হবার কারনে হয়তো ইসলাম ধর্ম অনুসারীরা তাকে হত্যা করতো। কারণ ইসলাম ধর্ম মতে যীশুকে হত্যার আগ মুহুর্তে আল্লাহ জীবিত অবস্থায় তাকে বেহেশতে নিয়ে যান। যা ইসলাম ধর্মের ঐশরিক কিতাব আল-কোরানের সূরা নিসার ১৫৭ ও ১৫৮ নাম্বার আয়াতে পরিষ্কার বলা আছে। এখন এই ফরাসি সাধু যদি এই কথা বলে তাহলে কোরানের বানী মিথ্যা ও ভুল প্রমানীত হয়। এই বিষয়ে ১৯৮১ সালে একজন জার্মান লেখক যার নাম “হলগার ক্রেস্টেন” একটি বই লিখেছিলো “যীসুস লিভড ইন ইন্ডিয়া” নামের বই যেখানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এই কথার সত্যতা যাচাই করে অনেক ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক একসময় তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন এবং হলগার ক্রিস্টেনের লেখা বইয়ের সাধুবাদ জানিয়েছিলেন। এই সময়ে সমস্ত ইউরোপে এই লেখা কিছুটা সাড়া ফেলেছিলো। এছাড়াও খ্রিস্টান ধর্মের ঐশরিক কিতাব বাইবেল পর্যালোচনা করে পাওয়া যায় যীশুর ১৩ থেকে ৩০ বছর বয়সের কোন কথায় বাইবেলে নেই তাহলে এই ১৭ বছর সে কি করেছিলো এমন প্রশ্নের উত্তরে লেখক “নটোভিচ” ১৯ শতকের শেষ দিকে একটি বই লিখেছিলেন যার নাম “দ্যা আননোন লাইফ অব যীসুস ক্রিস্ট”। লেখক নটোভিচ ছিলেন একজন তথ্যনুসন্ধানী রাশিয়ার সাংবাদিক। তিনি তার এই বইতে যীশুর জীবনের এই ১৭ বছরকে “মিসিং লাইফ অব যীসুস” বলে আখ্যায়িত করেন যেখানে তিনি বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন এই হারানো ১৭ বছরের মধ্যে যীশু রোমান সাম্রাজ্যের বাইরে দুইবার ভারতবর্ষে এসেছিলেন যার একবার তার ক্রুশবিদ্ধ হবার আগে এবং একবার ক্রুশবিদ্ধ হবার পরে। এটা একটি দীর্ঘ আলোচনা হবার কারণে এখানে আর সে বিষয়ে কিছুই লিখবো না তবে পরবর্তিতে জানানোর চেষ্টা করবো।

ঐতিহাসিকভাবে আমরা যীশুর অস্তিত্বের সন্ধান করলে তার সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত যে মতবাদ গুলা দেখে থাকি তা হচ্ছে এই যীশুর জীবন শুরু হয়েছিলো বর্তমানে যা উওর ও মধ্য ফিলিস্তিন নামে পরিচিত যায়গাটিতে। উত্তর ও মধ্য ফিলিস্তিন এবং পূর্বে মৃত সাগর (ডেড সী) এবং জর্দান নদী এবং পশ্চিমে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের মাঝখানের একটি অঞ্চলেই এই যীশুর জীবন শুরু হয়েছিলো। বিভিন্ন ধর্মীয় ঐশরিক কিতাব মতেও সেই একই কথা পাওয়া যায়। খ্রিস্টের শুরুতে প্রথম শতাব্দীর সময়ে বা প্রথম শতাব্দীর শুরু থেকে এই অঞ্চলটি রোমানদের নিয়ন্ত্রনাধীন একটি অঞ্চল ছিলো। যদিও রোমান সাম্রাজ্যের শাসনাধীন অঞ্চলসমূহ ভূমধ্যসাগরের চারিদিকে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তারও আগে থেকেই তাই এই অঞ্চলটিকে রোমানরা প্রাথমিকভাবে একটি উপজাতীয় রাজ্য বা অঞ্চল হিসেবেই বিবেচনা করতো যে কারনেই যীশুর জন্য তার প্রচার করা কথা মানুষকে বিশ্বাস করাতে সুবিধা হয়েছিলো যদিও পরবর্তিতে তাকে এই কারনেই ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিলো। একটা সময় রোমান সভ্যতায় বিভিন্ন অভ্যন্তরীন সমস্যা দেখা দেয় যার কারনে বিভিন্ন অভিযানের সুত্রপাত করা হয়। এসময় রোমান সভ্যতার অনেক অঞ্চলের মানুষই অভ্যন্তরীন বিদ্রোহের সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং সেই সাথে পার্শিয়ানদের আক্রমনও ঘটে। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৩৭ সালের দিকে এই অঞ্চলটিতে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় যখন রোমান সাম্রাজ্যের রাজা ছিলেন “হেরোদ দ্যা গ্রেট”। তার সময় থেকে “জুলিয়াস সিজারের” সময় পর্যন্ত সময়ে এই অঞ্চলটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা লাভ করে ও সমৃদ্ধি লাভ করে।

রাজা “হেরোদ” ছিলেন ইহুদী ধর্মের অনুসারী তবে অনেকের দাবী তিনি সাম্রাজ্যের স্বার্থে এই ধর্মের বানী মানুষের মাঝে প্রচার করতেন। যীশুকে খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারীরা “যীশু খ্রিস্ট” নামেই জানেন তবে সব থেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে “খ্রিস্ট” কিন্তু যীশুর আসল নাম না। তখনকার সময়ে সন্তানের নামের সাথে তার জন্মদাতা পিতা বা পালক পিতার নাম যোগ করে দেওয়ার নিয়ম চালু ছিলো। যেহেতু যীশুর কোন বায়োলজিক্যাল পিতা ছিলো না বা পৃথিবীর কোন মানুষ তার পিতা না তাই দেবতাদের নামের একটি অংশ যোগ করে তার নামের সাথে “খ্রিস্ট” শব্দটি যোগ করা হয়েছে। এই বিষয়ে খ্রিস্টান ধর্মের ঐশরিক কিতাব বাইবেলের (লূক-Luck ৪,২২)  এ বলা আছে “সকলেই তাঁর খুব প্রশংসা করল, তাঁর মুখে অপূর্ব সব কথা শুনে তারা আশ্চর্য হয়ে গেল। তারা বলল, ‘এ কি য়োষেফের ছেলে নয়?” এছাড়াও এই বিষয়ে আরো উল্লেখ আছে বাইবেলের (যোহন-John ১,৪৫ ৬,৪২) তারপরে (বিধান-Act ১০,৩৮) সহ আরও অনেক যায়গাতে। যীশু খিস্ট নামের খ্রিস্ট শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ “ক্রিশোসের” থেকে যা গ্রিকরা তাদের যেকোন শিরোনামে ব্যবহার করে থাকে। এই খ্রিস্ট শব্দের বাংলা অর্থের কিছুটা মিল হচ্ছে “অভিষিক্ত এক” বা “নির্বাচন করা হয়েছে” এমন কিছু যা ইসলাম ধর্মেও প্রচলিত আছে এই যীশুর নামে যেমন “ঈশা মসীহ”। এই মশীহ মানে হচ্ছে ইসলামে আল্লাহ তাকে নির্বাচন করেছেন যা এই খ্রিস্ট শব্দেরই রুপান্তর বলা চলে।

---------- মৃত কালপুরুষ
              ২৩/১২/২০১৭  


শুক্রবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৭

ইসলাম ধর্মের ঈসা নবী বা খ্রিস্টান ধর্মের যীশুর কিছু ক্ষমতা।


ঐতিহাসিকভাবে খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের ঐশরিক কিতাব বলে পরিচিত গ্রন্থ গুলির বাইরে যীশু বা ঈসা নামের একজন ব্যাক্তির সন্ধান পাওয়া যায়। খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের বাইরে যীশুর অস্তিত্বের সবচেয়ে প্রাচীন রেফারেন্স হচ্ছে ইহুদিদের পুরাতাত্ত্বিক ঐতিহ্য গুলি। “জোসেফাস” নামের একজন জিউস স্কোলারের লেখাতে উল্লেখ পাওয়া যায় এই যীশু চরিত্রটির যা (খ্রিস্টপূর্ব 37 খ্রিস্টাব্দের) বলে ধারনা করা হয়। সেই হিসাবে খ্রিস্টান ধর্মের বাইবেল আর ইসলাম ধর্মের কোরান মতে এই যীশুর জন্ম খৃস্টপুর্বাব্দ ৫-৭ এর সাথে মিল পাওয়া যায়। ইসলাম ধর্মে এই ব্যাক্তির নামে যা রচিত আছে সেটা থেকেও খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারিদের মধ্যে আরো বেশি অলৌকিক ও রুপকথার ন্যায় গল্প পাওয়া যায়। যেমন, এই ব্যাক্তি মৃত মানুষ জীবিত করতে পারতো, অন্ধকে দৃষ্টি শক্তি দিতে পারতো, বধির এর শোনার ক্ষমতা দিতে পারতো এবং পঙ্গু ব্যাক্তি যে হাটাচলা করতে পারে না তাকে হাটাচলার ক্ষমতা দিতে পারতো বলে বিশ্বাস করে থাকে। যেহেতু সেই সময় এই যীশু খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে একজন ঈশ্বরের পুত্র হিসেবে বিবেচিত হতো এবং যীশুর অনেক সম্মান ছিলো তাই ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের পরে তাকে ইসলাম ধর্মের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন।

ইসলাম ধর্মে ঈশ্বরপুত্র যীশুকে ভালো সম্মান দেওয়া হয়েছে তবে খ্রিস্টান ধর্মে তাকে ঈশ্বরের পুত্র মানা হলেও ইসলাম ধর্মে তা মানা হয় না। তবে একজন নবী হিসেবে ইসলাম ধর্ম অনুসারিরা তাকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরান মতে ঈসা নবী বা যীশু এখনও জীবিত আছে স্বর্গে বা বেহেশত নামক স্থানে। সে একটা সময় আবার এই পৃথিবীতে আসবে এবং সমস্ত পৃথিবী সে রাজত্ব করবে। ইসলাম ধর্মে ঈসাকে যীশু নামে ডাকা হয়না তার নাম “ঈসা মশীহ” বা “ঈসা ইবনে মারিয়াম” যিনি খ্রিস্টান ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ বাইবেলে যীশু নামেই পরিচিত। ঈসা ইবনে মারিয়াম এর অর্থ “মারিয়ামের পুত্র ঈসা”। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী তিনিও ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা নবী মুহাম্মদ এর মতো একজন আল্লাহর দূত বা পয়গম্বর। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তিনি নবী মুহাম্মদ এর জন্মের প্রায় ৫০০ বছর আগে জন্ম নিয়েছিলো এবং ইসলাম ধর্ম প্রচার না করে সে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার করেছিলো এবং বর্তমানে এই একই চরিত্র দুই নামে দুইটি ধর্মের প্রবর্তক হিসেবে পরিচিত থাকায় অনেকের মাঝেই বিভ্রান্তির কারণ হয়ে যায় আসলে কে এই যীশু আর কে এই ঈসা। আবার এই চরিত্রটি নিয়ে দুইটি ধর্মে দুইটি গল্প প্রচলিত আছে যেমন খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারিরা বিশ্বাস করেন এই যীশু বা ঈসাকে ক্রুশে বিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছিলো আর ইসলাম ধর্মের অনুসারিরা বিশ্বাস করেন যাকে ক্রুশে বিদ্ধ করা হয়েছিলো সে ঈসা বা যীশু কেউই ছিলো না।

ইসলাম ধর্ম মতে বলা হয় যে, ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য যখন বাহক যীশু বা ঈসা নবীকে নিতে তার ঘরে প্রবেশ করে তখনই আল্লাহ তাকে উপরে তুলে নেন এবং বাহকের চেহারাকে ঈসা-এর চেহারার অনুরুপ করে দেন। ফলে ঈসা মনে করে ঐ বাহককে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়| এবং ইসলাম ধর্ম মতে ঈসা নবী বর্তমানে জীবিত অবস্থায় জান্নাতে অবস্থান করছেন| ইসলামিক ধারনা অনুযায়ী কেয়ামতের পূর্বে মসীহ দাজ্জালের আবির্ভাবের পর ঈসা নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর একজন উম্মত বা অনুসারী হিসেবে পুনরায় পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং দাজ্জালকে হত্যা করবেন| এরপর সমস্ত পৃথিবীর শাসনভার গ্রহণ করবেন এবং পৃথিবীতে শান্তি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবেন| সবশেষে তিনি একজন রাজা হিসেবে মৃত্যূবরণ করবেন এবং মুহাম্মদ-এর কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হবে। যে কারণে মদীনায় নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর কবরের পাশে তাকে কবর দেয়ার জায়গা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল যা এখনও বহাল আছে| ইসলামে যীশুকে মশিহ বলেও মনে করা হয়। মশিহ অর্থ আল্লাহ তাকে নির্বাচন করেছে যে শেষ কালে তিনি দুনিয়ায় মানে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এবং পৃথিবীতে তিনি সর্ব শান্তি আনবেন ও সব ধর্ম একান্ত করে ইসলামের মধ্যে আনবে।


এই সম্পর্কে ইসলাম ধর্মের আল-কোরানে বলা আছে (সূরা নিসার ১৫৭ ও ১৫৮ নাম্বার আয়াতে) যেমন, وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَـكِن شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُواْ فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِّنْهُ مَا لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلاَّ اتِّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا” যার অর্থঃ “আর তাদের একথা বলার কারণে যে, আমরা মরিয়ম পুত্র ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি যিনি ছিলেন আল্লাহর রসূল অথচ তারা না তাঁকে হত্যা করেছে, আর না শুলীতে চড়িয়েছে, বরং তারা এরূপ ধাঁধায় পতিত হয়েছিল বস্তুতঃ তারা ব্যাপারে নানা রকম কথা বলে, তারা এক্ষেত্রে সন্দেহের মাঝে পড়ে আছে, শুধুমাত্র অনুমান করা ছাড়া তারা বিষয়ে কোন খবরই রাখে না আর নিশ্চয়ই তাঁকে তারা হত্যা করেনি” (সূরা নিসা, আয়াত-১৫৭) এর পর “بَل رَّفَعَهُ اللّهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا” অর্থঃ “বরং তাঁকে উঠিয়ে নিয়েছেন আল্লাহ তাআলা নিজের কাছে আর আল্লাহ হচ্ছেন মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (সূরা নিসা, আয়াত-১৫৮)


এবার দেখুন খ্রিস্টান ধর্ম মতে এই একই ব্যাক্তি বা চরিত্রটির সম্মন্ধে আমরা কি জানতে পারি। খ্রিস্টান ধর্মের বেশ কিছু শাখার মধ্যে তাদের অধিকাংশ শাখার খ্রিস্টান ধর্ম অনুসারীরা মনে করে এবং বিশ্বাস করে এই যীশু বা ঈসা হচ্ছে ঈশ্বরের পুত্র এবং সেও সয়ং একজন ঈশ্বর। এই খ্রিস্টান ধর্ম অনুসারিরা ইসলাম ধর্ম সৃষ্টি হবার আগে থেকেই বিশ্বাস করতো এই যীশু বা ঈসা মশীহের পুনরুথানকে। তারা এটাও বিশ্বাস করে এই যীশু যখন আবার এই পৃথিবীতে আসবেন তখন মানব জাতির জন্য হবে অত্যান্ত গুরুত্বপুর্ণ একটি বিষয়। তারা আরো বিশ্বাস করেন এই যীশুর বলিদানের ভেতরে অনন্ত জীবনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। খৃস্টান ধর্ম মতে এই যীশু বা ঈসার গর্ভধারিনী মা যিনি ছিলেন মরিয়ম তিনি কোন প্রকারের যৌন ক্রিয়া ছাড়াই যীশু বা ঈসার জন্ম দিয়েছিলেন। এই ধর্মের অনুসারিদের মতে মরিয়মের গর্ভাবস্থার জন্য পবিত্র আত্মা (খ্রিস্টীয় পবিত্র ত্রিত্বের তিনজনের একজন) দায়ী ছিলেন যে কারনেই তাকে ঈশ্বরের পুত্র মনে করা হয় এবং তাকেও তারা ঈশ্বরের কাছাকাছি মনে করে থাকেন। ঈসা বা যীশুর মাতা মরিয়ম বা মেরীর কুমারী অবস্থা খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারিরা বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্য ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করে থাকে।


খ্রিস্টান ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ বাইবেল এর ওল্ড টেস্টামেন্ট বা পুরাতন সংস্করন অনুযায়ী আমরা এই ঈসা বা যীশুর অনেক ঐশরিক ক্ষমতা দেখতে পায় যা একেবারেই অলৌকিক বা ঐশরিক যার কোন ভালো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়না এটা তখনকার সময়ে কিভাবে সম্ভব হয়েছিলো। তবে খ্রিস্টান ধর্ম অনুসারিরা এই সব অলৌকিক ঘটনাগুলিকে অন্যান্য ধর্মের অনুসারিদের মতোই গভীর ভাবে বিশ্বাস করে থাকে। যেমন বাইবেলের “লূক” (Luck) এর (৭,১৮-২৩) এ যীশু সম্পর্কে বলা আছে অর্থঃ “(১৮) বাপ্তিস্মদাতা য়োহনের অনুগামীরা এই সব ঘটনার কথা য়োহনকে জানাল তখন য়োহন তাঁর দুজন অনুগামীকে ডেকে।(১৯) প্রভুর কাছে জিজ্ঞেস করে পাঠালেন য়ে, ‘য়াঁর আগমণের কথা আছে আপনিই কি সেই, না আমরা অন্য কারোর জন্য অপেক্ষা করব?’ (২০) সেই লোকেরা যীশুর কাছে এসে বলল, ‘বাপ্তিস্মদাতা য়োহন আপনার কাছে আমাদের জিজ্ঞেস করতে পাঠিয়েছেনয়াঁর আসবার কথা আপনিই কি সেই ব্যক্তি, না আমরা অন্য কারো অপেক্ষায় থাকব?” (২১) সেই সময় যীশু অনেক লোককে বিভিন্ন রোগ ব্যাধি থেকে সুস্থ করছিলেন, অশুচি আত্মায় পাওযা লোকদের ভাল করছিলেন, আর অনেক অন্ধ লোককে দৃষ্টি শক্তি দান করছিলেন (২২) তখন তিনি তাদের প্রশ্নের জবাবে বললেন, ‘তোমরা যা দেখলে শুনলে তা গিয়ে য়োহনকে বল অন্ধেরা দেখতে পাচ্ছে, খোঁড়ারা হাঁটছে, কুষ্ঠ রোগীরা সুস্থ হচ্ছে, বধিরেরা শুনছে, মরা মানুষ বেঁচে উঠছে;আর দরিদ্ররা সুসমাচার শুনতে পাচ্ছে (২৩) ধন্য সেই লোক, য়ে আমাকে গ্রহণ করার জন্য মনে কোন দ্বিধা বোধ করে না। এর মানে এরকম দাঁড়ায় যীশু অনেক ক্ষমতার অধিকারী একজন মানুষ ছিলো যে অন্ধ, বোবা, বধির, এবং পঙ্গু মানুষদের সুস্থ করে দিতে পারতো।


এই যীশু বা ঈসার আরো কিছু অলৌকিক বা অবিশ্বাস ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় এই খ্রিস্টান ধর্মে। তার মধ্যে আবারও বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টের “ঈসা” (Isha) (২৯,১৮-১৯) এ এই যীশু বা ইসা নবী সম্পর্কে বলা আছে অর্থঃ (১৮) বধির শুনতে পাবে, বই থেকে পড়ে শোনানো কথাগুলি, অন্ধ কুযাশা অন্ধকারের মধ্যেও দেখতে পাবে (১৯) প্রভু গরীব মানুষদের সুখী করবেন ইস্রায়েলে গরীব লোকরা ইস্রায়েলের সেই পবিত্র এক জনের নামে আনন্দ করবে” এবং “ঈসা” (Isha) (৩৫,৫-৬) এ বলা আছে “(৫) তখন অন্ধ মানুষরা চোখে দেখতে পারবে তাদের চোখ খুলে যাবে তখন বধিররা শুনতে পাবে তাদের কান খুলে যাবে (৬) পঙ্গু মানুষরা হরিণের মতো নেচে উঠবে এবং যারা এখন কথা বলতে পারে না তারা গেযে উঠবে সুখের সঙ্গীত বসন্তের জল যখন মরুভূমিতে প্রবাহিত হবে তখনই এসব ঘটবে বসন্ত নেমে আসবে শুষ্ক জমিতে” আরো দেখুন বাইবেলের “ঈসা” (Isha) (৬১,১) এখানেও বলা আছে, যীশু বলছেন “(১) প্রভুর দাস বলেন, “প্রভু, আমার সদাপ্রভু, তাঁর আত্মা আমার মধ্যে দিয়েছেনগরীবদের সঙ্গে কথা বলবার জন্য, তাদের ভগ্নহৃদয়ের ক্ষতে বন্ধনী জড়াবার জন্য এবং দুঃখীকে আরাম দেবার জন্য প্রভু আমাকে মনোনীত করেছেন ঈশ্বর আমাকে পাঠিয়েছেন নির্য়াতিতদের বন্দীদের জানাতে যে, তারা মুক্ত হচ্ছে” এই কথার মাধ্যমে যীশু তৎকালীন সাধারণ মানুষদের বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন সে ঈশ্বরের প্রেরিত একজন দূত। শুধু এসবই নই আরো অনেক কিছুই বলা আছে খ্রিস্টান ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ বাইবেলে যীশু বা ইসলাম ধর্মের নবী ঈসা সম্পর্কে যার সবই আজ পর্যন্ত এই ধর্মের অনুসারিরা খুব ভক্তির সাথে বিশ্বাস করে থাকে।

---------- মৃত কালপুরুষ
               ২২/১২/২০১৭



বুধবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৭

VPN ব্যবহার করে ব্লক করা ওয়য়েবসাইট কিভাবে ব্যবহার করবেন।



বাংলাদেশ থেকে নানা কারণে বিভিন্ন সময়ে অনেকেই অনেক গুরুত্বপুর্ণ ওয়েবসাইট ও অনেক নিউজ পোর্টাল ব্রাউজ করতে পারেন না বা সেটা ভিসিট করতে পারেন না। অনেক সময় দেখা যায় খুব জনপ্রিয় কিছু সোস্যাল মিডিয়া নির্দিষ্ট কিছু দেশের সরকার কর্তৃক বন্ধ করে রাখা হয় যার কারণে অনেকেই তা স্বাভাবিক বা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারেনা। ২০১৫ সালে এরকম একটি ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটেছিলো আমার মনে আছে। কয়েকদিনের জন্য বাংলাদেশ সরকার জনপ্রিয় সোস্যাল মিডিয়া ফেসবুক ব্যবহার করা বন্ধ করে রেখেছিলো। তার কিছুদিন আগে ইউটিউব বন্ধ করে রাখা হয়েছিলো। বর্তমানেও এরকম অনেক নিউজ পোর্টাল ও কিছু ওয়েবসাইট মাঝে মধ্যেই আমরা বন্ধ পেয়ে থাকি। যাদের মধ্যে অন্যতম এবং বর্তমানে বাংলাভাষী জ্ঞান-পিপাশু সাধারণ পাঠকদের কাছে সব থেকে জনপ্রিয় ওয়েবসাইট “ইস্টিশন” আছে সবার প্রথমে। এছাড়াও জনপ্রিয়তার তালিকায় থাকা বাংলা ব্লগ সাইট “সামহয়্যার ইন ব্লগ” (সামু), সচলায়তন, আমার ব্লগ, এর মতো কয়েকটি সাইটে মাঝে মধ্যে ব্রাউজ ভিত্তিক সমস্যা দেখা গেলেও তা ক্ষনস্থায়ী। তবে ইস্টিশন ব্লগ সাইট ব্যবহার করতে গিয়ে আমি নিজেও এই সমস্যায় পড়ে থাকি যা আমার ধারণা অনেকেই একই সমস্যায় পড়েন। প্রায় এই ব্লগ সাইটটির ফেসবুক পেজে দেখা যায় পাঠকদের মতামত তারা এই সাইট ব্রাউজ করতে পারছেন না।

একটি ওয়য়েবসাইট কি কি কারনে সাধারণ ভিউয়ার্সরা ব্যবহার করতে পারেনা বা ভিসিট করতে পারেনা তার অনেক ব্যাখ্যা আছে। তবে এর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু দেশের সরকার কর্তৃক সেই সাইটের পাবলিসিটি বন্ধ করে রাখা। যেহেতু বাংলাদেশ থেকে (বিটিআরসি) এই বিষয় সমূহ নিয়ন্ত্রিন করে থাকে তাই হতে পারে (বিটিআরসি) থেকেই এটা বন্ধ করে রাখার কারণে আমরা অনেক সময় এই জাতীয় সাইট গুলি আর ১০টা ওয়েবসাইটের মতো স্বাভাবিক ভাবে ব্রাউজ করতে পারিনা। তাহলে কি আমরা সরকার কর্তৃক বন্ধ করে রাখা সাইট গুলো স্বাভাবিক ভাবে ভিসিট করতে পারবো না ? অবশ্যয় আমরা এগুলা ভিসিট করতে পারবো, তবে স্বাভাবিক নিয়মে নয়। এর জন্য আমাদেরকে কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। আমি সেই পদ্ধতি কি এবং কিভাবে সেটা ব্যবহার করা যায় সেই উদ্দেশ্যেই এই লেখাটি লিখছি। এই সমস্যার সম্মুক্ষিন হলে আমাদেরকে VPN  (ভিপিএন) ব্যবহার করতে হবে। আমার মনে হয় যারা মোটামুটি একটু পুরাতন ও মধ্যম মানের ইন্টারনেট ইউসার তারা এই বিষয়টি সম্পর্কে সবাই অবগত। তবে যারা এখনও জানেন না এই VPN (ভিপিএন) কি এবং এটা কিভাবে ব্যবহার করতে হয় আর এটা ব্যবহার করে আমরা কিভাবে এই বন্ধ করে রাখা “ইস্টিশন ব্লগের মতো সাইট গুলো ভিসিট করতে পারবো তাদের জন্য কিছু তথ্য রইলো।

প্রথমত VPN শব্দটার সাথে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। তবে অনেকেই শুধু নামের সাথেই পরিচিত, কিন্তু এটা যে কি জিনিস তা অধিকাংশ মানুষই জানে না তাই এসমস্ত বিষয় সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করবো। VPN এর পূর্ণ রূপ হল- Virtual Private Network. (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) এটাকে আমরা একটি সুড়ঙ্গের সাথে তুলনা করবো। সোজা বাংলায় এর সংজ্ঞা দাড়ায়, VPN হল একটা কাল্পনিক ‘Tunnel’ যার মাধ্যমে নিরাপদে তথ্য আদান প্রদান করা যায়। এই ‘Tunnel’ বা সুড়ঙ্গের বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই, কারণ এটা ভার্চুয়াল জগতে কেউ খুজে বের করতে পারবে না। এটি দিয়ে মূলত কাল্পনিক একটা প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বোঝানো হচ্ছে যেটি দিয়ে ইন্টারনেটে নিরাপদে তথ্য আদান প্রদান করা যায়। আমরা এখন নিরাপদ’ keyword টির উপর ফোকাস করবো। ইন্টারনেট মূলত উন্মুক্ত তথ্য আদান প্রদানের জায়গা। যেহেতু এটি পাবলিক নেটওয়ার্ক অর্থাৎ, পৃথিবীর সবাই সংযুক্ত তাই এখানে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে তথ্যের গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যাবার একটা ঝুঁকি আছে। এই ঝুঁকি এড়ানোর জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করে নিজের ব্যক্তিগত বা প্রাইভেট নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হওয়ার নিরাপদ পদ্ধতিই হল VPNএই পদ্ধতিতে ব্যবহারকারী এবং প্রাইভেট নেটওয়ার্ককে সংযুক্ত করার জন্য ইন্টারনেটে একটি কাল্পনিক সুড়ঙ্গ তৈরী হয়। যেমন ধরুন আমি বর্তমানে বাংলাদেশের ঢাকাতে অবস্থান করছি কিন্তু একটি VPN (ভিপিএন) সার্ভিস ইউস করে আমি বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ইউরোপের “ফ্রান্স” এর একটি ইন্টারনেট সার্ভিস প্রভাইডার এর আইপি এড্রেস ব্যবহার করে ইন্টারনেট ব্যবহার করছি বা বিভিন্ন ওয়েবসাইট ব্রাউজ করছি। তার মানে আমি বাংলাদেশে আছি কিন্তু ভিপিএন ব্যবহার করার কারণে ফ্রন্সের একটি আইপি এড্রেসের সাথে আমার কানেকশন এর একটি সুড়ংঙ্গ তৈরি করা হয়েছে তাই এখন আমি যা করছি তা ফ্রান্স থেকেই করছি।

তার মানে বাংলাদেশ থেকে যদি (বিটিআরসি) কোন সাইট ভিসিট করা বন্ধ করে রাখে বাংলাদশি ইন্টারনেট ইউসারদের জন্য তারা এই সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে বিশ্বের যে কোন দেশের যে কোন আইপি এড্রেস ব্যবহার করে সেই সাইট বাংলাদেশে বসেই ভিসিট করতে পারবে। এহাড়াও VPN ব্যবহার করার আরো কিছু সুবিধা আছে তা হচ্ছে -
১। VPN ব্যবহার করার অর্থ হল আপনি ডাটা নিরাপদে আদান প্রদান করতে পারছেন।
২। VPN ব্যবহার করলে আপনার অবস্থান কেউ ট্র্যাক করতে পারবে না।
৩। IP address (Internet Protocol address) হাইড করে রাখে। অর্থাৎ, হ্যাকারদের কবলে পড়ার সম্ভাবনা নাই।
৪। আপনার ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী আইপিএস থেকে নেটের ফুল স্পিড পাবেন।
৫। VPN দিয়ে আপনি আইএসপি তে ব্লক করা সাইট ভিজিট করতে পারবেন। যেমন ধরেন, যদি ইউটিউব বা ফেসবুক আমাদের দেশে বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলেও আপনি VPN ব্যবহার করে এগুলাতে ঢুকতে পারবেন।
৬। এটি নিরাপদ যোগাযোগ এবং ডাটা encrypt করার একটি পদ্ধতি হিসেবে কাজে লাগে। মানে VPN আপনার মেশিনকে একটি ভার্চুয়াল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারে এবং আপনার পাঠানো সব data দ্রুততার সঙ্গে encrypt করে ফেলে অর্থাৎ public domain থেকে লুকিয়ে রাখে এবং এটা আপনার browsing history-র কোনো ট্র্যাক রাখে না। কাজেই আপনি অনলাইনে পুরোপুরি নিরাপদ।

VPN ব্যবহার করার সুবিধা আছে পাশাপাশি ব্যবহার করতে গেলে কিছু অসুবিধাও আছে, আর তা হচ্ছে বর্তমানে মোবাইল আর পিসির জন্য অনেক VPN সার্ভিস প্রভাইডার আছে যারা এটা বিনামূল্যে ব্যবহার করতে দেয়। তবে যারা এখনও এই সার্ভিসটি বিনামূল্যে ব্যবহার করতে দেয় তাদের মধ্যে ৭০% আছে যাদের সার্ভিস ব্যবহার করলে আপনার ইন্টারনেটের স্পীড একটু কমে যাবে বা প্রথমবার কানেক্ট হতে বেশ কিছু সময় নেবে। তবে এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন এর জন্য খুব সহজ পদ্ধতির কিছু VPN এপ আছে গুগল প্লে স্টোরে যা ব্যবহার করলে স্পীড খুব একটা কমে না এবং এগুলো একদম ফ্রী। এই এপস গুলো শুধু গুগল প্লে স্টোর থেকে ইন্সটল করে নিলেই হবে আর কিছুই করা লাগবে না। ইন্সটল করার পরে সেই এপস গুলা ওপেন করলেই একটি কানেক্ট অপশন পাবেন সেটাতে টাস করে কানেক্ট করে দিলেই আপনার কানেকশন একটি VPN সার্ভিসের মাধ্যমে কানেক্ট হয়ে যাবে এর পরে আপনি খুব সহজেই ব্লক করে রাখা সাইট গুলো ভিসিট করতে পারবেন আপনার ব্রাউসার দিয়ে বা যে কোন এপস দিয়ে। এতে আপনার আইপি এড্রেস প্রকাশ পাবেনা আপনি কোথা থেকে ব্রাউজ করছেন। যেহেতু যারা এন্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার করেন তাদের জন্য আমি এখানে কোন লিঙ্ক দিচ্ছি না। কারণ সবাই গুগল প্লে স্টোর এর সাথে অবশ্যয় পরিচিত আছেন। আপনাদের শুধু গুগল প্লে স্টোরে গিয়ে নাম সার্চ করলেই হবে তাই আমি এখানে কিছু ভালো VPN এপস এর নাম দিয়ে দিচ্ছি, যেমন প্রথম সারিতে থাকা এপস এর মধ্যে আছে Turbo VPN, Hola Free VPN, VPN Proxy Master-Free, Super VPN Free, VPN Master Free, Super VPN Free VPN Client, Flash VPN Free VPN Proxy, Yoga VPN Free Unlimited, Secure VPN Free, Tunnel Bear VPN আপাতত এই ১০টি সহজ VPN এপস এর যেকোন একটি ব্যবহার করে আপনি আপনার এন্ড্রয়েড মোবাইল থেকে VPN সার্ভিস খুব সহজেই ইউস করে ব্লক করে রাখা “ইস্টিশন” এর মতো সকল সাইট ভিসিট করতে পারেন।

এবার আসি যারা পিসি (ডেস্কটপ ও ল্যাপটপ) ব্যবহার করে ইন্টারনেট ইউস করেন কিন্তু এই জাতীয় ব্লক করা সাইট ব্যবহার করতে পারছেন না বা ভিসিট করতে পারছেন না। পিসির জন্য উইন্ডোস ৭ থেকে শুরু করে বর্তমানে উইন্ডোজ ১০ অপারেটিং সিস্টেমে সাপোর্ট করে এরকম বেশ কিছু সফটও্য়ার আছে কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তার প্রায় সবই পেইড সফটয়ার যা ফ্রী বা বিনামুল্যে ব্যবহার করা যায় না। তবে কিছু ফ্রি সফটওয়ার আছে যা ব্যবহার করে VPN নেটওয়ার্কের সাথে কানেক্ট হওয়া যায়। এই লিঙ্কে গেলে https://en.softonic.com/downloads/free-vpn:windows/windows-7 আপনি ১০টি এরকম সফটওয়ার পাবেন। আর এখানে Hide Me নামের একটি সফটওয়ার পাবেন সেটাও ডাউনলোড করে ইন্সটল করতে পারেন লিংক https://hide.me/en/software/windows এছাড়াও আপনি যদি আপনার পিসি দিয়ে Mozilla Firefox ব্রাউসার ব্যবহার করে থাকেন তাহলে এই লিংক https://addons.mozilla.org/en-US/firefox/addon/hoxx-vpn-proxy/ থেকে আপনার ব্রাউসারের জন্য এই এক্সটেনশন বা এডঅন টি ডাউনলোড করে ইন্সটল করে নিতে পারেন। আর যদি আপনি ক্রোম ব্রাউসার ব্যবহার করে থাকেন তাহলে এই লিংক থেকে https://zenmate.com/products/vpn-extension-for-chrome/ আপনার ক্রোম ব্রাউসারের জন্য এড অন বা এক্সটেনশন ডাউনলোড করে VPN এর সাথে কানেক্ট হতে পারেন। আর আপনি যদি অপেরা ব্রাউসার ব্যবহার করে থাকেন তাহলে আপনাকে এসব কিছুই করা লাগবে না। কারণ অপেরা ব্রাউসার এর সাথেই একটি এক্সটেনশন থাকে যা শুধু অন করে নিলেই হবে আমি আপনাদের সেই সিস্টেমটাও বলে দিচ্ছি।


প্রথমে আপনার অপেরা ব্রাউসার ওপেন করলে একদম উপরে বাম পাশের ঠিক কর্নারে যে অপেরার লোগো দেখতে পারবেন সেটাতে ক্লিক করলে অপেরা ব্রাউসার এর সেটিংস অপশন এর পেজ ওপেন হবে। তখন আপনি সেই পেজের ড্রপ ডাউন মেনু থেকে Privacy & Security মেন্যুতে ক্লিক করলে যে পেজটি ওপেন হবে শেখানে দেখতে পারবেন VPN বলে একটি অপশন আছে। সেই VPN লেখা অপশনটিতে আপনাকে Enable VPN লেখা  যায়গাতে বাম পাশের ছোট্ট বক্সে টিক চিহ্ন দিয়ে দিতে হবে তাহলেই আপনার অপেরা ব্রাউসারের VPN অন হয়ে যাবে এবং আপনি সেই ব্রাউসার দিয়ে সব ব্লক সাইড ব্রাউস করতে পারবেন অনায়াশে। এছাড়াও আরো কিছু সহজ মাধ্যমে আপনি VPN সার্ভিস আপনার যেকোন ব্রাউসার দিয়ে ব্যবহার করতে পারেন যেমন Kproxy নামের এই VPN সার্ভিসটি ব্যবহার করতে আপনাকে কোন সফটওয়ার ডাউনলোডও করা লাগবে না বা ইন্সটলও করা লাগবে না। আপনাকে যেটা করতে হবে শুধু এই লিংকে গিয়ে https://kproxy.com/ যে পেজটি আসবে সেটাতে যে এড্রেসবার আছে শেখানে আপনি যেই সাইটটি ব্রাউজ করতে চাচ্ছেন বা ভিসিট করতে চাচ্ছেন সেটার এড্রেস লিখে ডান পাশের সার্ফ (Surf ) বাটনে ক্লিক করলেই আপনি VPN এর মাধ্যমে সেই নির্দিষ্ট সাইট ভিসিট করে দেখতে পারবেন। 

যেমন আপনি যদি “ইস্টিশন” ব্লগের ওয়েবসাইট এই Kproxoy দিয়ে ব্রাউজ করতে চান তাহলে আপনাকে সেই এড্রেসবারে লিখতে হবে www.istishon.com এবং Surf বাটনে ক্লিক করতে হবে তাহলে আপনি আপনার দেশ থেকে যদি “ইস্টিশন” ব্লগ বন্ধ করা থাকে বা ব্লক করে রাখা থাকে তারপরও আপনি এই সাইট ব্যবহার করতে পারবেন। অন্যান্য সাইটের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। আর যদি কোন জিজ্ঞাসা থাকে তাহলে তো আমি আছিই কমেন্টস করে জানাতে পারেন আপনার সমস্যা। আমি না হলেও যারা এই বিষয়ে আমার থেকে বেশি এক্সপার্ট আছে তারা নিশ্চয় আপনার উওর দিবে।

---------- মৃত কালপুরুষ

                ২০/১২/২০১৭

শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭

মডারেট হিন্দুদের ভাষ্য, স্বামী বিবেকানন্দের হিন্দু ধর্ম সংস্কার।


বিবেকানন্দ কি হিন্ধু ধর্মের বিধবা বিবাহ, সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, পুরুষের বহুবিবাহ সহ এরকম আরো অনেক কুৎসিত প্রথাকে সমর্থন করেছেন না তার বিরোধিতা করেছেন তাই এখনও অনেক হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা জানে না। অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী মনে করে থাকেন বিবেকানন্দ একজন প্রথা বিরোধী মানুষ ছিলেন আসলে কিন্তু তাদের ধারণা ভুল। বিবেকানন্দকে মিডিয়া সাধারণ মানুষের সামনে সেভাবেই উপস্থাপন করেছিলেন তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এই ধারণা। প্রায় ৫০০০ বছর ধরে শত শত অমানবিক আর বর্বর প্রথা সাথে নিয়ে এই হিন্দু ধর্ম এই ধর্মে বিশ্বাসী মানুষকে নানা ভাবে জাতাকলের মধ্যে ফেলে পিষে আসছিলো। এমন সময় যদি কেউ সংস্কার এর নামে কিছু পরিবর্তন করে দেখায় তাহলে অন্ধের মতো বিশ্বাস করা ধর্ম বিশ্বাসী মানুষের এটা ভেবে ভুল না করার কোন কারণ নেই যে সেই ব্যাক্তি একজন প্রথাবিরোধী বা সমাজ সংস্কারক। আর এই স্বামী বিবেকানন্দের বেলায়ও ঘটেছে তাই। আসলে তিনি সমাজ সংস্কারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রথার অচলায়তনে বন্দী একজন মানুষ আজ আমরা সেটা নিয়ে একটু আলোচনা করবো।

হিন্দু ধর্মের একটি বর্বর ও অমানবিক প্রথা হচ্ছে একজন নারীর স্বামী মারা গেলে তাকে বিধবা আখ্যা দিয়ে এমন কিছু অমানবিক নিয়ম-কাননের মধ্যে সেই নারীকে বেধে রাখা হয় ও সমাজচ্যুত করা হয় যা হিন্দু সমাজের নারীরা খুব ভালো করেই জানে। অল্প কিছুদিন আগেও এদেরকে সেই মৃত স্বামীর চিতায় জোর করে তুলে আগুনে পুড়িয়া মেরে স্বতী বানাবার নিয়মও প্রচলিত ছিলো। এই প্রথার পরিবর্তনে নারীদের এগিয়ে আসতে অনেক দেরি হবার একটা মুল কারণ হচ্ছে হিন্দু সহ অন্যান্য আরো কয়েকটি ধর্মে নারীদের শিক্ষা বিষয়ক অনেক বাধা প্রচলিত ছিলো ধর্মীয় কিছু বাধা ধরা নিয়মের কাছে। এরকম সময় স্বামী বিবেকান্দ নামের একজন সচেতন ব্যাক্তি সমাজ সংস্কার এর নামে সেই সব বিধবাদের পুনরায় বিয়ে করার বা বিয়ে দেবার জন্য বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে প্রচার করা শুরু করেন এবং হয়তো কিছু কিছু ক্ষেত্রে তখন সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু যেহেতু এই জাতীয় অনেক বিষয় হিন্দু ধর্মের প্রধান প্রধান কিছু ধর্মীয় গ্রন্থে অনেক আগে থেকেই আদেশ-উপদেশ দেওয়া ছিলো তাই হিন্দু সমাজ থেকে এই বিষয় গুলি (কুসংস্কার গোড়ামী) সম্পুর্ণরুপে বিলুপ্ত করা সম্ভব হয়নি। যেমনটা সম্ভব হয়নি হিন্দু ধর্মের কয়েকডজন জাতপাতের বৈষম্য এই ধর্মটি থেকে দূর করা যা আজ অবধি বিভিন্ন হিন্দু সমাজে বিদ্যমান।

এই বিধবা নারীদের পূণঃ বিবাহের চল চালু করে তখন বিবেকানন্দ সাধারণ হিন্দু ধর্মের মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে। বিভিন্ন মিডিয়াও তাকে নিয়ে অনেক প্রচার প্রচারণা চালায়। কিন্তু আসলেই কি বিবেকানন্দ একজন সমাজ সংস্কার ছিলেন ? তার বিভিন্ন ভাষ্য মতে আমরা তার কিছুই দেখতে পায় না যেমন ধরুন, তিনি আসলে বিধবা বিবাহের বিরোধিতা করেছিলেন, শুধু তাই নয় সেই সাথে তিনি সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, পুরুষের বহুবিবাহ সহ আরো অনেক প্রথাকে একাধারে তিনি সমর্থন করে গিয়েছেন এই অমানবিক আর বর্বর হিন্দু ধর্মের সাফাই গেয়ে। তার ইসলামী জিহাদী সন্ত্রাসীদের মতো অনেক ডায়ালগ এর মধ্যে একটি ডায়ালগ হচ্ছে “এ দেশে সেই বুড়ো শিব ডমরু বাজাবেন, মা কালী পাঁঠা খাবেন আর কৃষ্ণ বাঁশি বাজাবেন চিরকাল। যদি না পছন্দ হয় সরে পড় না কেন ?” এই জাতীয় ভাষ্যর মধ্যে সেই মোল্লাদের প্রথমে মুখে বলো, তারপর হাতে বলো টাইপের একটি হুমকি দেওয়া হচ্ছে ভারতবর্ষের হিন্দু ধর্ম বাদে অন্য ধর্মের অনুসারীদের যাদের মধ্যে পড়ছে যারা আসলে কোন ধর্মই বিশ্বাস করেনা তারাও। আরো দেখুন, মডারেট হিন্দুরা যতই বলে আমরা আমাদের ধর্মের অনেক সংস্কার করেছি আর এখনও করছি তাদের এই কথার উলটা বলেছেন এই স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি বলেছেন “যতোই বায়োবৃদ্ধি হইতেছে, ততই এই প্রাচীন প্রথাগুলো আমার ভালো বলিয়া মনে হইতেছে” এই কথাই কি তার স্বতীদাহ প্রথা, বিধবা বিবাহের বিরোধিতা, কৃষ্ণের ন্যায় পুরুষের বহু বিবাহ প্রথা, রুক্মীনির মতো বাল্য বিবাহ প্রথা, সব একসাথে সমর্থন করা হয় না ?

শুধু তাই নয় হিন্দু ধর্মের সব থেকে মূল যে সমস্যা সেটা হচ্ছে বিভিন্ন জাতপাতের সমস্যা যা মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তৈরি করে আসছে আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে থেকেই। সেই প্রথাকে বর্তমান সময়ের মডারেট হিন্দুরা যতই বলুক আমরা আর এখন এই নিয়ম মানি না বা আমাদের কোন ধর্মীয় কিতাবে এই জাতীয় কোন আদেশ উপদেশ নেই। তার পরেও এই হিন্দু ধর্মের সাধারণ মানুষেরা খুব ভালো বলতে পারবেন তাদের সমাজের মধ্যে এখনও কি চলে। যদিও আমাদের মতো সাধারণ পাঠকদের এই বিষয়ে কোন প্র্যকটিক্যাল ধারনা নেই তার পরেও এই ধর্মটি থেকে বেরিয়ে আসা অনেক সচেতন মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারা জ্ঞানী মানুষের কাছে শুনেছি তাদের ধর্মের মধ্যে এই জাতপাত নিয়ে এখনও কি ভাবে সাধারণ মানুষকে ছোট করা হয়ে থাকে সেসব কথা না হয় এখানে নাই তুলছি। এখন দেখুন এই স্বামী বিবেকানন্দ কিভাবে এই জাতপাত বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন মানুষে মানুষে এই বিভেদ সৃষ্টি করে রাখার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন “তুই বামুন, অপর জাতের অন্ন নাই খেলি” এই কথার মাধ্যমে সে এই অমানবিক হিন্দু ধর্মের নিম্নবর্ণ আর উচ্চবর্ণ বা ব্রাহ্মন আর তার নিচের অন্যান্য সকল জাতের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে রাখতে বলেছেন। সে জাতিভেদ সমর্থন করে আরো বলেছেন “জাতি ভেদ আছে বলেই ৩০ কোটি মানুষ এখনও খাবার জন্য এক টুকরো রুটি পাচ্ছে” এখন আমার সেই সব ফেসবুকার্সদের কাছে খুব জানতে ইচ্ছে করছে তারা যে মোল্লাদের মতো গলার জোর বাড়িয়ে হাতের মুষ্টি শক্ত করে আমার হিন্দু ধর্মের সমালোচনা দেখে না্না ভাবে প্রমাণ করতে চলে আসে আমার ধর্ম ভালো আমার ধর্ম ভালো তাদের মতামত।

আসলে একটি কথা মনে রাখতে হবে শিক্ষিত আর অশিক্ষিত সকল অন্ধবিশ্বাসী ধর্মান্ধদের। আসলে ধর্মান্ধ নামটি খারাপ শোনালেও এর ব্যাতিক্রম কিছু আপাতত হাতের কাছে পেলাম না, তবে পশ্চিমা দেশ গুলা সহ বহিঃবিশ্বের সকল দেশে এদেরকে সুন্দর একটি নামে ডাকা হয়, আর তা হচ্ছে “ফ্যানাটিক”। যেহেতু এই ফ্যানাটিকদের মধ্যে শিক্ষিত আর অশিক্ষিতদের কোন পার্থক্য নেই, তাই তাদের উদ্দেশ্যেই বলা, ধরুন হিন্দু ধর্ম একটি কালকেউটা সাপ যেটা বর্তমান যুগে তার খোলশ পালটিয়ে এখন গোখরা সাপে পরিনত হয়েছে কিন্তু এই দুইটা সাপই বিষধর এবং যা কামড় দিলে মানুষের মৃত্য পর্যন্ত হতে পারে। শুধু তাই নয়, যদি এই সাপ যাকে কামড় দিচ্ছে সে একাই অসুস্থ হয়ে মারা যেত তাহলে এই ধর্মের বর্বরতা আর অমানবিকতা তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার প্রয়োজন খুব একটা ছিলোনা। কিন্তু এই সাপে কামড় দিলে সে তো নিজে অসুস্থ হয়ে ধীরে ধীরে মারা পড়ছেই সাথে যখন বেশি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে তখন অন্যান্য ধর্মের বা সাধারণ মানুষকেও কামড় দিচ্ছে যাতে করে সেই মানুষটিও আবার মারা যাচ্ছে। যেমন কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের মালদাতে ঘটে যাওয়া লাভ জিহাদের নামে একজন মানুষকে আরেকজন মানুষের হত্যা করার নৃশংস ঘটনা তারই একটি কারণ। এরা যে ধর্মের অনুসারী হবার আগে একেকজন একেকটা মানুষ তা তারা এই সাপের কামড়ের বিষের কারনেই ভুলে যাচ্ছে।

---------- মৃত কালপুরুষ
               ১৬/১২/২০১৭