বুধবার, ১ নভেম্বর, ২০১৭

সৃষ্টিকর্তা মহাবিশ্বকে সৃষ্টি করেননি, সৃষ্টিকর্তা বলে কেউ নেই (স্টিফেন হকিং)


“কারন মহাবিশ্বের একটি নিয়ম আছে যার নাম “মাধ্যাকর্ষণ, সেই নিয়মের বাইরে মহাবিশ্ব নিজে থেকে কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারেনা। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সৃষ্টি হবার কোন কারন নেই। মহাবিশ্ব এবং আমাদের অস্তিত্ব আপন আপন গতিতেই বিদ্যমান”



স্টিফেন হকিং আমাদেরকে এই মহাবিশ্ব তৈরির পেছনে বিগ ব্যাং বা একটি বিপর্যয়ের কথা বলেন। অনেকেই স্টিফেন হকিং এর বলা বিগ ব্যাং থিওরী ও গল্পকে মানব সভ্যতার জন্য একটি বিপর্যয় বলে মনে করেন। কারন স্টিফেন হকিং কোন অলৌকিক ঘটনাবলীতে বিশ্বাস করেন না। তাই তিনি শক্তভাবেই বলেন আমাদের এই মহাবিশ্ব তৈরিতে কোন সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বরের কোন প্রয়োজন নেই। তবে সৃষ্টি সম্পর্কে মানুষের বহু পুরাতন দাবী “আমাদেরকে ও আমাদের এই মহাবিশ্বকে একজন সৃষ্টিকর্তা বা একজন ঈশ্বর (ধর্ম অনুযায়ী) তৈরি করেছে” যা আজ হঠাৎ করে কেউ ভুল বলার কারনে ঈশ্বরবাদীরা মানতে পারছে না। যুগ যুগ ধরে বিশ্বাস করে আসা একটি জিনিস ভুল বলাতে অনেকের অনুভুতিতে আঘাত লাগছে।


বিজ্ঞান আজ আমাদের দেখিয়েছে বিগ ব্যাং তত্বকে আরো বিস্তৃতভাবে। মহাবিশ্ব সৃষ্টির পেছনে যে বৃহৎ বিস্ফোরনের কথা বলা হয়ে থাকে সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে যেখানে কোন ভুল নেয় যা সম্পুর্ণ প্রমানিত। বিগ ব্যাং থিউরী দিয়ে যে সময়ের শেষ প্রান্তে গিয়ে চিন্তা করা হয়েছে আজ তাও আবার খতিয়ে দেখা হচ্ছে নতুন কিছু আবিষ্কার করা সম্ভব কিনা। মহাবিশ্ব শুরুর একদম প্রথম সময়ের যে মাইক্রোসেকেন্ড আছে তারপুর্বে কি ছিলো বা কোন সময় ছিলো কিনা তাও পর্যবেক্ষন করে চলেছে বিজ্ঞানীরা। আমাদের মহাবিশ্বের ছায়াপথ আর গ্রহ, নক্ষত্র তৈরির পুর্বে এমন কোন মহাবিশ্ব আগেও ছিলো কিনা তাও কল্পনা করে দেখা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে বিগ ব্যাং এর পুর্বে কি ছিলো তার কি কোন নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যাবে ? বা বিগ ব্যাং এর পুর্বে কি বিদ্যমান ছিলো ?


যুগ যুগ ধরে শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ এই প্রশ্নের জবাব খুজে গিয়েছে, আমাদের মহাবিশ্ব কিভাবে বা কে সৃষ্টি করেছে। বিজ্ঞানী ও দার্শনিকেরা এই জটিল প্রশ্নেরগুলির সমাধান করতে চেষ্টা করেছে। বহু পুর্বে একটি সহজ সমাধান ছিলো, যা কিছুটা ভূতের গল্পের মতো, কোন একজন এসব তৈরি করেছেন। বর্তমানে পৃথিবীর স্বল্পশিক্ষিত বা উন্নত নয় বা ধর্মান্ধ দেশ গুলিতে এখনও এই জাতীয় মনোভাব বিদ্যমান মানুষের ভেতরে। যাদের অনেকেই মহাবিশ্বতত্ববিদ স্টিফেন উইলিয়াম হকিং কে ভালো করে চিনে না। যেমন বাংলাদেশের কথা ধরা যাক। বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিবর্তন নিয়ে ছাত্র, ছাত্রীদের কোন শিক্ষায় দেওয়া হয় না, বরং আস্তে আস্তে চুপিচুপি সকল পাঠ্যবই থেকে বিবর্তনবাদ নিয়ে জানা বোঝার যায়গা একেবারেই কমিয়ে ফেলা হয়েছে। এই দেশের পাঠ্যপুস্তুক বই অনুমোদনকারী সংস্থা হচ্ছে “ন্যাশনাল ক্যারিকুলাম এন্ড টেক্সটবুক বোর্ড” (এনসিটিবি)যারা ইন্টারমিডিয়েট শিক্ষার্থীদের জন্য প্রকাশ করা পদার্থবিদ্যার বই এর ৬৩৪ পৃষ্ঠায় স্টিফেন উইলিয়াম হকিং এর পরিচয় দিচ্ছে ব্রিটিষ তারকা ও অভিনেতা এডি রেডমাইন এর ছবি দিয়ে। তাহলে সেই দেশের শিক্ষার্থীরা আর কতটুকু চিনবে স্টিফেন হকিং কে।


সম্প্রতি গত সোমবার ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এর ১৯৬৬ সালের একটি  পিএইচডি থিসিস অনলাইনে প্রকাশ করার পর মাত্র কয়েক দিনে তা দেখেছেন ২০ লক্ষেরও বেশি লোকবলা হচ্ছে, কোন গবেষণাপত্র নিয়ে এত লোকের আগ্রহী হয়ে ওঠা এর আগে আর কখনোই দেখা যায়নি  প্রথম দিনেই এত লোক এটা পড়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটটি ক্র্যাশ করে ক্যামব্রিজের একজন অধ্যাপক . আর্থার স্মিথ বলেন, ‘এটা এক বিরাট ব্যাপার আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় যত গবেষণাপত্র আছে তার কোনটিই এত লোক দেখেন নি হয়তো পৃথিবীর কোথাও এমন ঘটনা ঘটেনিকর্তৃপক্ষ বলছে, পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লোকেরা এটি দেখেছেন অন্তত লক্ষ লোক এটি ডাউনলোড করার চেষ্টা করেছেনসম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের বৈশিষ্ট্যনামের ১৩৪ পাতার এই থিসিসটি লেখার সময় স্টিফেন হকিং ছিলেন ক্যামব্রিজ ট্রিনিটি হলের পোস্ট গ্রাজুয়েটের ছাত্র


১৯৬৬ সালে স্টিফেন হকিং এটি লেখেন। তার বয়স তখন ছিল ২৪ বছর এই সময়ে ও তার পরবর্তি সময়ে স্টিফেন হকিং এর জীবনী কেমন ছিলো তা নিয়ে পরবর্তীতে ২০১৪ সালে পরিচালক “জেমস মার্স” একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেন যার নাম “The Theory of Everything” যেখানে অভিমেতা “এডি রেডমাইন” অভিনয় করেছেন স্টিফেন হকিং এর চরিত্রে। ১৯৬০ সালে স্টিফেন হকিং ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় “জেন ওয়াইল্ড” (তার স্ত্রী) এর প্রেমে পড়ে। ২১ বছর বয়সে স্টিফেন হকিং জানতে পারে তার “মোটর নিউরন” রোগ আছে। জেন ওয়াইল্ড তা জানার পরেও স্টিফেন হকিং এর পাশে একজন ডাক্তারের মতো থাকেন। এইসব নিয়েই তৈরি হয়েছে “দ্যা থিউরী অফ এভরিথিং” নামের অসাধারন চলচ্চিত্রটি।


---------- মৃত কালপুরুষ
               ০১/১১/২০১৭


মঙ্গলবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৭

ব্যাবিলনের কিংবদন্তী রানী সেমিরাস (সাম্মু-রামত)এর সত্য গল্প।


সভ্যতার শুরু থেকে আমরা অনেক নারীর অবদানের কথা শুনে আসছি ইতিহাসের পাতায়। আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির দার্শনিক হাইপেশিয়াকে আমরা অনেকেই চিনি। তাকে নির্মম ভাবে ধর্মের দোহায় দিয়ে হত্যার কথা আজো আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। প্রায় ১৬০০ বছর আগে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হওয়া সুন্দরি নারী হাইপেশিয়া। শিল্পির তুলিতে হাইপেশিয়ার কাল্পনিক রুপের সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে এখনও অনেকেই। আজ হাইপেশিয়া নয়, আজকে হাইপেশিয়া থেকেও প্রায় ১৩০০ বছর পুর্বের প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার আরেক সুন্দরী নারীর কথা বলবো। যে সেসময় সমস্ত ব্যাবিলনের রাজ্যভার হাতে তুলে নিয়েছিলেন।


আজ থেকে প্রায় ৪ হাজার বছর আগের প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় মহিলা শাসক ছিলেন একজনই যার নাম ছিলো সেমিরাস বা সাম্মু-রামত। তিনি ছিলেন একমাত্র নারী যে শক্তিশালী অশূরীয় সাম্রাজ্য শাসন করেছে, সেমিরাস রোমান যুগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত লেখক এবং চিত্রশিল্পীদেরকে অনেক ভাবিয়েছে তার রুপের কারনে। বর্তমান যুগেও ইতিহাসবীদদের চিন্তার মধ্যমনি হয়ে আছেন এই রানী। এর কারন হচ্ছে সেই সময়ে প্রাচীন মেসোপটেমিয়াতে মহিলা শাসক খুবই বিরিল ছিলো। কিন্তু এই রানী সেসময়ে রাজত্ব করে ইতিহাসে এক বিরাট চিহ্ন রেখে গিয়েছেন। আধুনিক কালের ইরাক , সিরিয়া, তুরস্ক,ইরান সহ আরো কয়েকটা দেশের কিছু কিছু দেশগুলোর অংশ নিয়ে গঠিত ইউফ্রেটিস এবং টাইগ্রীস নদীর অববাহিকা স্থল হল প্রাচীন কালের মেসোপটেমিয়া। যার প্রধান কেন্দ্র ছিলো ব্যাবিলন। আর এই ব্যাবিলনের শুন্যু উদ্দ্যান বা ঝুলন্ত বাগান আজ পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষের কাছে একটি আশ্চর্যের বিষয় হয়ে আছে। আর ইতিহাসবিদদের ধারনা এই ব্যাবিলনের শুন্য উদ্দ্যান এই রানী সেমিরাস অথবা সম্রাট নেবুচাদনেজার এর যে কোন একজন বানিয়েছিলেন। তবে সম্রাট নেবুচাদনেজার বেশি গ্রহন যোগ্য এখন পর্যন্ত। ধারনা করা হয় খৃষ্টপুর্বাব্দ ৯০০ সালের দিকে বর্তমান এশিয়া মাইনর থেকে আজকের সমগ্র ইরান পর্যন্ত পর্যন্ত এই নারী শাসন করেছিলো একসময়।


গ্রীক লেখক এবং ইতিহাসবিদদের মতে রানী সেমিরাস এর রাজত্বকাল খুবই সংক্ষিপ্ত হলেও তিনি এই অল্প সময়ে অনেক অবদান রেখেছিলেন প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়। তার রাজত্ব পাওয়া নিয়ে অনেক ইতিহাস প্রচলিত আছে, তবে এর মধ্যে সব থেকে বেশি গ্রহনযোগ্য ইতিহাস হচ্ছে ফরাসি আলোকিত লেখক ভলতেয়ার এর লেখা কিছু ইতিহাস। পরবর্তিতে ভলতেয়ারের একটি নাটক ১৮২৩ সালে রসিনির অপেরাতে স্থান পায় যার ফলে এই রানী সেমিরাসের সম্পর্কে মানুষ আরো জানতে আগ্রহী হয়। সেমিরাসের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে আরো অনেক কবি ও সাহিত্যিক লিখছেন সেই সময়ে। এর মধ্যে ইটালীর কবি দান্তেকে তাকে নিয়ে লিখে এবং রানী সেমিরিসের কাল্পনিক ছবি একে সাজাপ্রাপ্ত হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে সে “কামুক বিদ্বেষ” মুলক ছবি একেছেন এই শিল্পি। সেই ছবি বর্তমানে বৃটিষ মিউজিয়ামে স্থান পেয়েছে। কবি দান্তেকে সেমিরিসকে কল্পনা করে তার অর্ধ নগ্ন বা নগ্ন ছবি একেছিলেন যা ছিলো অসাধারন একটি শিল্প এবং পরবর্তিতে তার মুল্যায়ন করা হয়েছিলো।


রানী সিমিরিসের রাজ্য পাওয়া নিয়ে বেশি প্রচলিত আছে, সে তার বিশ্বস্ত সেনা প্রধানদের দিয়ে রাজাকে হত্যা করে রাজ্য দখল করেছিলেন এবং তার সন্তান শিশু থাকায় সে রাজ্যের ভার হাতে তুলে নিয়েছিলেন। গ্রীক দার্শনিক হেরোডোটাস এর লেখা থেকে জানা যায় সম্রাট নেবুচাদজার ও চেলদেনাজের রাজত্যের পরে বা এই দুইজনের রাজত্বের মাঝামাঝি সময়ে রানী সেমিরাস রাজত্ব করেন ব্যাবিলনে। কিন্তু দার্শনিক হেরোডোটাস কোথাও ব্যাবিলনের সেই বর্তমানের সপ্তম আশ্চর্য শুন্য উদ্দ্যানের কথা উল্লেখ করে নাই। যা এই তিন জনের ভেতরে কেউ বানিয়েছিলো। এখানে অনেকে ইতিহাসবিদদের মতামত হচ্ছে সেসময়ে দেবতাদের মন্দির গুলা ছিলো অনেক বড় বড় কথিত আছে যে অনেক মন্দিরের চূড়া নাকি চলে গিয়েছে আকাশের ভেতরে যেখানে দেবতারা থাকতেন আর সেই মন্দিরগুলির ধাপে ধাপে করা ছিলো এই বাগান গুলা তাই হেরোডোটাসের লেখাতে তা পাওয়া যায় না। রানী সেমিরিসের সাফল্য শুধু ব্যাবিলনের শুন্য উদ্দ্যানই নয় সমস্ত ব্যাবিলন ও তৎকালীন টাইগ্রীস ও ইউফ্রেতাস নদীর তীরে যে অসাধারন সুন্দর দুটি জমজ নগরী গড়ে উঠেছিলো তা এই রানীর রাজত্বকালেই প্রান ফিরে পেয়েছিলো।


রানী সেমিরাস তার প্রজাদের মধ্যে বিতর্কিত ছিলো কারন অনেকেই তাকে দোষী মনে করতো রাজার মৃত্যর জন্য। আবার অনেকেই তার রুপ আর সৌন্দর্যের কারনে দেবতা সমতুল্য একজন শাসক মনে করতো। রানী সেমিরাস ছিলেন তৎকালীন সিরিজ প্রদেশের কোন উচ্চবংশের একজন সুন্দরী যুবতী নারী। সে সময় সিরিজ প্রদেশে তার রুপের কারনে অসাধারন সুন্দরী এক যুবতী নারী হিসেবে অনেকেই তার কথা জানত। ঠিক সে সময় সিরিজ প্রদেশের রাজ পরিবারের গভর্ণর ছিলেন ওনেস। পরবর্তিতে ওনেস এর পিতা (দত্বক পিতা) তাকে টাইগ্রিস নদীর তীরে নিনেভে নামের রাজ্যের রাজত্ব দেয়। এসময় ওনেস পার্শবর্তি প্রদেশের সুন্দরী এক যুবতী নারীর কথা শোনে যে ছিলো রানী সেমিরিস। ওনেস সেমিরিসকে দেখার পর তার প্রেমে পড়ে যায় এবং তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। ওনেসের দত্বক পিতা তাকে বিয়ের অনুমতি দিলে ওনেস সেমিরিসকে বিয়ে করে এবং নিনেভে নিয়ে আসে। ঠিক এসময় নিনেভের সাথে তার পার্শ্ববর্তী রাজ্য নিনাস এর রাজার যুদ্ধ শুরু হয়। নিনাসের রাজা ছিলেন নীনবিকে। যুদ্ধের সময় এই রাজা নীনবিকে যেকোন ভাবে তার কন্যার বয়সী ওনেসের স্ত্রী এই রানী সেমিরিসকে দেখতে পায় এবং তার প্রেমে পড়ে যায়। এতে করে সে আর যুদ্ধ না করে ওনেসকে প্রস্তাব দেয় সেমিরিসকে তার হাতে তুলে দেবার জন্য এবং বিভিন্ন ভয়ভীতি প্রদান করে। কিন্তু ইতিমধ্যেই সেমিরিস ওনেসকে ভালোবেসে ফেলে তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয় প্রান চলে গেলেও তারা আলাদা হবে না প্রয়োজনে রাজ্য ছেড়ে পালায়ণ করবে।


এসময় রাজা ওনেস বুঝতে পারে তারা আর পালাতে পারবে না আর রাজা নীনবিকে এর বিশাল যুদ্ধবাহিনীকে যুদ্ধে পরাজিত করার ক্ষমতাও তার নেয় তাই নানান চাপে পড়ে সে রানী সেমিরিসকে জীবিত রাখার জন্য নিজে আত্মহত্যা করে। রাজার মৃত্যুর পর নীনবিকে বিনা যুদ্ধেই নিনেভের রাজত্ব ও রানী সেমিরিসের দখল পায়। রাজা নীনবিকে ছিলো রানী সেমিরিসের থেকে বয়সে অনেক বড়। রানী সেমিরিসের মতো বেশ কয়েকটি কন্যা ছিলো এই রাজা নীনবিকের। গ্রীক দার্শনিক ডায়োডর সিকুলাসের মতে রানী সেমিরিস রাজা ওনেসের মৃত্যুর বদলা নিতে রাজা নীনবিকে বিয়ের জন্য রাজী হয় এবং পরবর্তিতে তার বিশ্বাস অর্জন করে তার সৈন্য বাহিনীতে কিছু ক্ষমতা তৈরি করে। নীনবিকে রানী সেমিরিসকে বিয়ে করে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেতাস নদীর দুই পাড়ের সম্রাজ্য শাসন করতে থাকে। এসময় কোন একটি যুদ্ধে রানী সেমিরিস বায়না ধরে রাজা নীনবিকের সাথে যুদ্ধে যাবে। রানী সেমিরিসের আবদার নীনবিকে অগ্রাহ্য করতে না পেরে তাকে যুদ্ধে নিয়ে যাবার জন্য রাজী হয়। ততদিনে সেমিরিস নীনবিকের সৈন্যবাহিনীর মধ্যেকার কয়েকজন সেনা প্রধানের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তলে যাদের সাথে মিলে সেমিরিস রাজা নীনবিকে যুদ্ধের ময়দানে বা কোন এক দখল করা শহরে হত্যার পরিকল্পনা করে বলে অনেকের ধারনা।


যেকোন একটি যুদ্ধে রাজা নীনবিকের মৃত্যু হবার পর তার প্রধান স্ত্রীর মর্যাদা হিসেবে রানী সেমিরিসের পুত্র সিংহাসনে বসার মর্যাদা পায়। কিন্তু তখন সেমিরিসের পুত্র রাজকুমার ছিলো শিশু যার কারনে রাজ্যের সমস্ত দায়ভার রানী সেমিরিসের হাতে চলে আসে। শুরু হয় রানী সেমিরিসের রাজত্ব। প্রাচীন মেসপোটেমিয়ার যত ইতিহাস আছে তার অনেক কিছুই তৈরি হয়েছিলো এই রানী সেমিরিসের সময় যার মধ্যে অন্যতম ছিলো ব্যাবিলনের শুন্য উদ্দ্যান। শুধু তাই নয় রানী সেমিরিস তখন বিজ্ঞানেও অনেক ভুমিকা রেখেছেন প্রাচীন সভ্যতার জন্য। ধারনা করা হয় প্রাচীন গ্রিকে মিশরীয়দের পুর্বে যে ক্যালেন্ডার বা দিনপুঞ্জি ছিল তা সেমিরিসের সময় তৈরি করা হয়েছিলো। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়নের দিকেও সেমিরিসের নজর ছিলো যাতে অনেক অবদান আছে এই রানীর। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার চিকিৎসা বিদ্যার বেশ কিছু সংস্কার করে সে। জ্যোতির্বিদ্যার উন্নয়নেও রানী সেমিরিসের দৃষ্টি ছিলো। প্রাচীন মেসোপটেমিয় সভ্যতায় যত বিখ্যাত বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন তাদের সবাইকে একত্রিত করে সব ধরনের সহোযোগিতা করেন। সেসময় ব্যাবিলনে দুইটি ভাষার প্রচলন ছিলো বলে ধারনা করা হয়। একটি আরশীয়, অন্যটি প্রাচীন পারসীয় বলে পরিচিত। সেমিরাস এই ভাষারও অনেক সংস্কার করেন বলে জানা যায়। এছাড়াও শিল্পকলা, ধর্ম ও অন্যান্য অনেক বিষয়ে এই রানীর অবদানের ইতিহাস প্রচলিত আছে আজো।

সুত্রঃ সিক্রেট কুইন ও রোমান সভ্যতা, আইজ্যাক আসিমভ। ছবিঃ ORONOZ/ALBUM  
    
---------- মৃত কালপুরুষ

               ৩০/১০/২০১৭

রবিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০১৭

সৌদি আরবের নতুন নাগরিক সোফিয়ার পরিচয়।


সোফিয়া নামটির সাথে কমবেশি সবাই পরিচিত হয়ে গিয়েছেন এতোদিনে নিশ্চয়। সম্প্রতি সৌদিআরব এই সোফিয়াকে সেই দেশের নাগরিকত্ব দিয়ে আরো অনেকের কাছে বেশি পরিচিত হয়েছে এই রোবটিক চরিত্রটি। সোফিয়াকে নিয়ে বেশ কয়েকজন এর আগেও রিভিউ করেছেন তারপরেও এই রোবট সম্পর্কে যারা এখনও জানতে পারেননি তাদের উদ্দেশ্য আমি আবার একটা সংক্ষিপ্ত রিভিউ করার চেষ্টা করলাম। সোফিয়া হচ্ছে হংকং ভিত্তিক রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান “হ্যানসন রোবোটিক্স” এর তৈরি সম্পুর্ন মানুষের আদলে একটি নারী রোবট। যে দেখতে একেবারেই একজন নারীর মতো স্বাভাবিক মানুষ। হংকং ভিত্তিক এই রোবোটিক্স প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের মতো রোবট তৈরি করার চেষ্টা করে আসছিলো। তাদের আবিষ্কৃত বিখ্যাত রোবটের মধ্যে আছে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের অনুকরণে তৈরি ছোট আকারের বিনোদনমূলক রোবট, যা বিভিন্ন গণিত এবং বিজ্ঞান বিষয়ক প্রতিযোগিতামূলক গেম খেলতে পারে, মানুষের বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন প্রশ্নের দিতে পারে, এমনকি মজার মজার অঙ্গভঙ্গি করে শিশুদেরকে বিনোদনের মাধ্যমে শিক্ষাও দিতে পারে। তাছাড়াও আরো কয়েকটি চরিত্রের রোবট আছে এই প্রতিষ্ঠানের।


সোফিয়া হচ্ছে হ্যানসন রোবটিক্স এর সব চেয়ে বড় বিশ্ময়। আমরা এর আগেও বিশ্বে আরো অনেককেই দেখেছি মানুষের আদলে রোবট তৈরি করতে। কিন্তু সফিয়া তাদের সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। সোফিয়াকে তৈরি করা হয়েছে হলিউড অভিনেত্রি “অড্রে হেপবার্ন” এর আদলে। হ্যানসন রোবটিক্স সোফিয়াকে প্রথম বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন ২০১৫ সালের ১৯শে এপ্রিল। তবে আরো পরে তাকে সক্রিয় করা হয় যে কারনে সোফিয়া বিভিন্ন সাক্ষাতকারে বলেছেন আমার বয়স দেড় বছরের কাছাকাছি। সোফিয়ার চামড়া সিলিকনের তৈরি। তার চোখের পেছনে বসানো অত্যাধুনিক ক্যামেরা ও বিভিন্ন সেন্সরের সাহায্যে সে দেখতে, বুঝতে এবং বিশ্লেষণ করতে পারে। ফেসিয়াল রিকগনিশন বা চেহারা চেনার ক্ষমতা সম্পন্ন এই রোবটটি মানুষের চেহারা চিনতে পারে এবং মনে রাখতে পারে। শুধু তাই নয় সোফিয়া তার চেহারাতে শতাধিক অভিব্যাক্তি ফুটিয়ে তুলতে পারে প্রয়োজন বুঝে। সে কারোর সাথে কথা বলার সময় যখন যেমন প্রয়োজন সেই অনুযায়ী চেহারাতে হাসি বা গাম্ভির্য তুলে ধরতে পারে। তার চোখের মনির আকার আলো এবং মুখের অভিব্যক্তির সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। তার গলার স্বরও একেবারেই স্বাভাবিক মানুষের মতো। সে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে মানুষের সাথে অত্যন্ত সাবলীলভাবে কথা বলতে পার তবে আস্তে আস্তে আরো অনেক বিষয় এবং পরবর্তিতে সীমাহীন জ্ঞান ও আলোচনাও করতে পারবে বলে তার উদ্ভাবক “ডেভিড হ্যানসন” জানিয়েছে।


সোফিয়াকে দেখে মনে হবে এতোদিন চলচ্চিত্র পরিচালকেরা আমাদের যেই আশা দিয়ে আসছিলো আর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহীনি লেখকেরা আমাদের যেসব গল্প শুনিয়ে আসছিলো তার অবসান হতে যাচ্ছে। আর তা খুব দূরে না একদম আমাদের কাছাকাছি। আমরা অচিরেই সেই রোবটের দুনিয়ায় প্রবেশ করতে যাচ্ছি। রাশিয়ার বিজ্ঞানী “দিমিত্রি ইটস্কভ” বোরট ও মানুষের সংমিশ্রনে আমাদের যে অমরত্বের প্রজেক্টের কথা বলেছিলেন তা একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলেও এই সোফিয়ার আত্মপ্রকাশে তা আবার সকলের ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এতদিন কল্পনার জগতে সীমাবদ্ধ থাকলেও গত ২৫শে অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে রোবটদের মানুষের সমান মর্যাদা দেওয়ার ব্যাপারে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়, যখন সৌদি আরব প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে সোফিয়া নামক একটি নারী রোবটকে নাগরিকত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। তাই মানুষের সেই সায়েন্সফিকশন মুভি আর গল্প উপন্যাসের মতো বাস্তব জগত আর বেশি দূরে বলা যাবে না। এইতো কয়েক বছর আগেও মানুষ ভাবতো এমন এক সময় আসবে, যখন রোবটরা দেখতে হবে হুবহু মানুষের মতো। তারা কথাবার্তাও বলবে মানুষের মতো করে এবং মানুষের বেশ ধারণ করে তারা মানুষের আশেপাশেই স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করবে আজ তা বাস্তব প্রা্মান হয়ে যাচ্ছে।


ইতিমধ্যেই সোফিয়া আমাদের মাঝে বেশ কিছু সাড়া জাগিয়েছে। সোফিয়া এ পর্যন্ত বেশ কিছু টিভি চ্যানেলের সাথে সাক্ষাৎকারও দিয়েছে খুব স্বাভাবিক ভাবেই। সেসব সাক্ষাৎকারে সে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, সেসব উত্তরের মধ্যে মজা করতে গিয়ে হাসির মুখভঙ্গিও করেছে যা একেবারেই মানুষের মতো। সে মানুষের সাথে মজা করে কৌতুক বলেছে। সে এমনকি একটি কনসার্টে গানও গেয়ে শুনিয়েছে। আকর্ষণীয় চেহারা এবং সাবলীলভাবে কথাবার্তা বলতে পারার কারণে সোফিয়া ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এখন পর্যন্ত তার সাক্ষাৎকারের ভিডিওগুলো ইউটিউবে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে আছে। ফ্যাশন বিষয়ক একটি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদেও তার ছবি স্থান পেয়েছিল। আজ থেকে ৪ দিন আগে সৌদি আরবে সেদেশের আয়োজন করা ভিশন ২০৩০ উপলক্ষ্যে আয়োজিত ইনভেস্ট ইনিশিয়েটিভ কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার জন্য সোফিয়া সৌদি আরবে যায় এবং সেখানে তাকে সৌদি আরব নাগরিকত্ব দেওয়ার ঘোষনা দেয় যা অনেকের কাছে সমালোচিত হয়।


সম্প্রতি সৌদি আরব ভিশন ২০৩০ কে সামনে রেখে তাদের তেল নির্ভর আর হজ্ব নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যা নিঃসন্ধেহে একটি আধুনিক ও সময়পোযোগি সিদ্ধান্ত বলতে হবে সৌদি সরকারের জন্য। কারন এপর্যন্ত আমরা জানতাম এই সৌদি আরব হচ্ছে গোড়া ধার্মিক আর বর্বর জাতি যারা আধুনিক সভ্যতার সাথে তাল রেখে চলার যোগ্য নয়। ইসলাম ধর্মের নামে তারা নারীকে সব থেকে ছোট করে রেখেছিলো এতোকাল। আর তা অন্যান্য স্বল্পশিক্ষিত ও গরীব দেশগুলো অনুসরন করে আসছিলো। তারা ধর্ম আর জিহাদের নামে মানুষ হত্যা করার জন্য অর্থায়ন করতো বিভিন্ন জিহাদী সংগঠনে এবং কিছু কিছু গরীব দেশে। তবে সম্প্রতি তারা এটাও সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের প্রধান প্রধান কিছু ওয়েবসাইট থেকে সকল জিহাদী হাদিস আর জিহাদী আয়াত মুছে ফেলবে। এককথায় তারা এই সোফিয়াকে হিজাব আর বোরকা ছাড়া সেই দেশে চলার অনুমতি ও নাগরিকত্ব দিয়ে এটাই প্রমান করছে তারা আসলে ধর্মীও কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। কারন তেল শেষ হলেই তারা আর পৃথিবীর কোথাও আশ্রয় পাবে না এটা এখন পরিষ্কার হয়েছে তারা। এর কিছুটা হাওয়া আমাদের বাংলাদেশেও লেগেছে বলতে হবে। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম গুলা প্রকাশ করেছে মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড তাদের সকল বই থেকে জিহাদী হাদিস ও আয়াত তুলে নিবে এতে করে বাংলাদেশের মাদ্রাসার জিহাদী শিক্ষক গুলার কি হবে সেটা এখনও জানায় নাই। 


আসুন একটু সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ কে সামনে রেখে তারা কি কি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সে সম্পর্কে কিছু জানি। সৌদি আরব তাদের তেল নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যার ধারাবাহিকতায় গত ২৪শে অক্টোবর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ঘোষণা দেন, সৌদি আরব ২৬,৫০০ বর্গ কিলোমিটারের বিশাল এলাকা জুড়ে ৫০ হাজার কোটি ডলার ব্যায়ে একটি মেগা সিটি নির্মাণ করবে, যেই শহরটি পরিচালিত হবে সৌর এবং বায়ুশক্তির মাধ্যমে এবং যেখানে মানুষের চেয়ে রোবটের সংখ্যা থাকবে বেশি। যুবরাজ এই ঘোষণাটি দেন সৌদি আরবের রিয়াদে চলমান ফিউচার ইনভেস্ট ইনিশিয়েটিভ কনফারেন্সে। তার এই ঘোষণার একদিন পরে সেই কনফারেন্সে বিভিন্ন প্রদর্শনীর এক পর্যায়ে যখন এই সোফিয়া নামের রোবট মঞ্চে উঠে এবং তার মানুষের মতোই আচার-আচরণ এবং কথাবার্তা দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে, তখনই ঘোষণা আসে যে, তাকে সৌদি আরবের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও এই নাগরিকত্ব প্রদানের আইনী ভিত্তি কী হবে এবং রোবটটি কী কী সুবিধা লাভ করবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি, কিন্তু কোনো রোবটকে নাগরিত্বের মর্যাদা দেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। তবে প্রবাসী শ্রমিকরা যেখানে বছরের পর বছর সৌদি আরবে চাকরি করেও নাগরিকত্ব লাভ করতে পারে না, সেখানে একটি রোবটকে নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যাপারটিও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে খুব জোরালোভাবে।

---------- মৃত কালপুরুষ
               ২৯/১০/২০১৭

সতীদাহ প্রথা কেন হিন্দু ধর্মের প্রথা হবে না ?


সতীদাহ প্রথা একটি জঘন্য, অমানবিক ও বর্বর প্রথা হিসেবে অনেক আগেই স্বীকৃতি পেয়েছে এবং এটা শুধু মাত্র হিন্দু ধর্মের একটি প্রথা বলেই পরিচিত যা হিন্দু ধর্মা্বলম্বীদের কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। তারপরেও আমি জানতাম বর্তমান সময়ের মডারেট হিন্দুদের দেখা যাবে এর অস্বীকার ও প্রতিবাদ করতে সবার আগে চলে আসছেন, যার কারন তাদের এই বিষয়ে সীমিত ধারনা, যার বেশিরভাগ তাদের পরিবার আর মন্দিরের পুরোহিত ও পন্ডিতদের কাছ থেকে পাওয়া। আমি আগেই বলে রাখছি, অন্যন্যা ধর্ম থেকে থেকে হিন্দু ধর্ম যুগে যুগে অনেক সংস্কার হয়েছে এবং হচ্ছে আগামীতে হয়তো এখন যেটুকু যেভাবে টিকে আছে তাও আর থাকবে না। কিন্তু কেউ যদি অস্বীকার করতে চাই তাহলে ভুল করবে যে এটা কোন একসময়ের সেই বর্বর আর অমানবিক ধর্ম ছিলো না। এমন কোন ধর্ম পৃথিবীতে নাই যা মানব সভ্যতার জন্য হুমকি স্বরুপ ছিলোনা। হিন্দু ধর্ম ছিলো তাদের মধ্যে অন্যতম। আজকের এই লেখাটি তাদের জন্য যারা অন্যান্য ধর্মের সমালোচনাতে হাতে তালি দেয় আর সতীদাহ প্রথার মতো একটি জঘন্য ও বর্বর প্রথাকে তাদের ভগবানের আদেশ বলতে অস্বীকার করে এবং বলে বেদ বা হিন্দু শাস্ত্রের সাথে এর কোন মিল নেই তাদের জন্য।


আমি কিছু সুত্র দিচ্ছি যেখানে ঋগবেদ, যজুর্বেদ, পুরান, ও অথর্ববেদের মাধ্যমে ভগবান হিন্দুদেরকে সতীদাহের কথা বলেছেন মিলিয়ে দেখবেন। এখানে দেখুন ঋগবেদ বলছে, “Let these women, whose hasbands are worthy and are living, enter the house with ghee (applied) as collyrium (to their eyes). Let these wives first step into the pyre, tearless without any affliction and well aborned.” এটা লেখা আছে "ঋগবেদের ১৮ নং সূক্তের ৭ নং শ্লোক (১০/১৮/০৭)” আরো দেখুন “আমরা মৃতের বধু হবার জন্য জীবিত নারীকে নীত হতে দেখেছি। (অথর্ববেদ (১৮/৩/১,৩)” আরো দেখুন  “পরাশয় সংহিতায় পাই, “মানুষের শরীরে সাড়ে তিন কোটি লোম থাকে, যে নারী মৃত্যুতেও তার স্বামীকে অনুগমন করে, সে স্বামীর সঙ্গে ৩৩ বছরই স্বর্গবাস করে” (৪;২৮)” আরো দেখুন “দক্ষ সংহিতার ৪;১৮ নং শ্লোকে বলা হয়েছে, “A sati who dies on the funeral pyre of her husband enjoys an eternal bliss in haven.” ( যে সতী নারী স্বামীর মৃত্যুর পর অগ্নিতে প্রবেশ করে সে স্বর্গে পূজা পায়)। এই দক্ষ সংহিতার পরবর্তি শ্লোকে (৫;১০৬) বলা হয়েছে, “যে নারী স্বামীর চিতায় আত্মোৎসর্গ করে সে তার পিতৃকুল, স্বামীকুল উভয়কেই পবিত্র করে”। যেমন করে সাপুড়ে সাপকে তার গর্ত থেকে টেনে বের করে, তেমন করে সতী নারী তার স্বামীকে নরক থেকে বের করে আর সুখে থাকে। ব্রহ্ম পুরান বলে, “যদি স্বামীর প্রবাসে মৃত্যু হয়ে থাকে তবে স্ত্রীর কর্তব্য স্বামীর পাদুকা বুকে ধরে অগ্নিপ্রবেশ করা” এছাড়াও হিন্দু ধর্মের আরো অনেক যায়গাতে এই “সতীদাহ” প্রথার কথা বলা আছে যা কখনই তারা অস্বীকার করতে পারবে না।


এবার আসুন যে প্রচলিত কিছু ইতিহাস আর তৈমুর লং ও তার ছেলে শাহ রুখ মির্জাকে আকড়ে ধরে মডারেট হিন্দুরা লাফালাফি করে আর বলে এই প্রথা চালু হয়েছিলো হিন্দু ধর্মে অন্য কিছু কারনে। আমি তাদের সেই গল্পও বলবো কিন্তু তার আগে আরেকটু জানুন সেই সময়ের মানে তৈমুর লং এর কাহীনি তো এখনও টাটকা বলা যায় যা মাত্র ১৪০০ শতাব্দীর ঘটনা ছিলো, তারও হাজার বছর আগেও মানে ৪০০ খৃষ্টাব্দতে কিন্তু এই সতীদাহ প্রথা হিন্দুরা পালন করেছে তার প্রমান আছে। আবার তাও যদি কেউ মানতে নারাজ হন তাহলে আরো হাজার খানেক বছর আগের কিছু ইতিহাসও কিন্তু আমাদের হাতে আছে যা প্রমান করে হিন্দুদের ভগবানের আদেশেই এই সতীদাহ প্রথা প্রচলিত হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় রীতিতে এটি প্রচলিত ছিলো বলে অনেক অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। গুপ্ত সম্রাজ্যের (খৃষ্টাব্দ ৪০০) আগে থেকেই ভারতবর্ষে সতীদাহ প্রথার প্রচলন ছিল। প্রচীন সতীদাহ প্রথার উদাহারণ পাওয়া যায় অন্তর্লিখিত স্মারক পাথরগুলিতে। সব চেয়ে প্রাচীন স্মারক পাথর পাওয়া যায় মধ্য প্রদেশে,  কিন্তু সব থেকে বড় আকারের সংগ্রহ পাওয়া যায় রাজস্থানে। এই স্মারক পাথরগুলিকে সতী স্মারক পাথর বলা হতো যেগুলো পূজা করার বস্তু ছিল [Shakuntala Rao Shastri, Women in the Sacred Laws – The later law books (1960)]। ডাইয়োডরাস সিকুলাস (Diodorus Siculus) নামক গ্রীক ঐতিহাসিকের খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকের পাঞ্জাব বিষয়ক লেখায়ও সতীদাহ প্রথার বিবরণ পাওয়া যায় [Doniger, Wendy (2009). The Hindus: An Alternative History. Penguin Books. p. 611]। তাছাড়া, আলেক্সান্ডারের সাথে ভারতে বেড়াতে আসা ক্যাসান্ড্রিয়ার ইতিহাসবিদ এরিস্টোবুলুসও সতীদাহ প্রথার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। খৃষ্ট পূর্বাব্দ ৩১৬ সালের দিকে একজন ভারতীয় সেনার মৃত্যুতে তার দুই স্ত্রীই স্বপ্রণোদিত হয়ে সহমরণে যায় [Strabo 15.1.30, 62; Diodorus Siculus 19.33; “Sati Was Started For Preserving Caste” Dr. K. Jamanadas]। এসবই আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এই বর্বর আর অমানবিক প্রথা হিন্দু ধর্মের একক মালিকানা প্রথা ছিলো যা পরবর্তিতে তাদের পিটিয়ে মানুষ করে শেষমেষ আইন করে ব্রিটিষরা বন্ধ করেছিলো।


এই সতীদাহ নিয়ে হিন্দুদের মহাভারতেও লেখা আছে, যেমন মহাভারতের মৌসল পর্বে আমরা দেখতে পায়, মহাত্মা বসুদেবের মৃত্যুর পর তার চার স্ত্রী দেবকী, রোহীনী, ভদ্রা এবং মদিরা তার চিতায় সহমৃতা হয়েছিলেন। আর যেহেতু ঋগবেদের পরবর্তি চারটি সংস্করন তৈরি হবার পুর্বেও আমরা এর প্রচলন দেখতে পায় তাই এই বিষয়ে আর কোন সন্দেহ থাকতে পারে না আর কোন হিন্দু ধর্মাবলম্বী যদি অস্বীকার করে যে এটি আসলে হিন্দু ধর্মের কোন প্রথা না তাহলে আমাকে বলতেই হচ্ছে সে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে মনে হয় আসলেই কম জানে। এই বিষয়টিকে হিন্দু ধর্মের বাইরে দেবার জন্য যুগে যুগে ধর্মব্যবসায়ীরা অনেক চেষ্টা করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। এটা ছিলো তাদের এমন একটি চেষ্টা যেখানে তারা প্রমান করতে চাইছিলেন যে হিন্দু ধর্ম জঘন্য, বর্বর বা অমানবিক ধর্ম না। এই নিয়ে তারা অনেকেই ইতিহাস বিকৃত করেছেন যুগে যুগে। সেই সাথে বানিয়েছেন নানান গল্প কিছুটা “সহমরনের” মতো। তাই আসুন একটি প্রকৃত ইতিহাস জানি যেটাকে জড়িয়ে হিন্দুরা তাদের ধর্মকে একটু বাচাবার চেষ্টা করে থাকেন বা যে সমস্ত কারনে মডারেট হিন্দুদের মথ্যে তালগোল পাকিয়ে যায়।


মুঘলদের সময় যেমন দেখা যায় এই বর্বর প্রথা বন্ধ করার জন্য তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন ঠিক তেমনই দেখা যায় খিলজী বংশের দ্বিতীয় সুলতান আলাউদ্দীন খিলজী অত্যাচারে এরকম কিছু ঘটার নমুনা। আর এসবই বর্তমান মডারেট হিন্দুদের মাথা গুলিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। ১৩০৩ সালে দিল্লীর মসনদ দখল করেন তূর্কি বংশোদ্ভূত খিলজী বংশের দ্বিতীয় সুলতান আলাউদ্দিন খিলজী। ১২৯০ সালে তিনি আপন চাচা এবং শ্বশুর সুলতান জালালুদ্দিন খিলজীকে হত্যা করে এবং রাজন্যদের ঘুষ প্রদান করে হাত করে সিংহাসনে আসীন হন। দক্ষিনের গুজরাট এবং মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের সীমানায় রাজস্থানের মেওয়ার রাজ্যের রাজা তখন রাজপূত বংশের রাওয়াল রতন সিং। আর তাঁর রাণী পদ্মাবতী ছিলেন অতুলনীয় সৌন্দর্যের অধিকারিণী রূপে, গুণে অনন্যা এক রাজবধু। তাঁর রূপ গুণের কাহিনী এতটাই বিস্তৃত হয় যে, তা দিল্লীর সুলতান আলাউদ্দিন খিলজীর কানেও পৌঁছে যায়। ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত লম্পট, মদ্যপ আর ব্যভিচারী ছিলেন এই সুলতান। নিজের সহস্র উপপত্নী থাকা স্বত্বেও মন ভরতোনা তার। যেখানে কোন সুন্দরী রমণীর সন্ধান পেতেন, ছলে বলে কলে কৌশলে তাকে অধিকার না করা পর্যন্ত শান্তি পেতেননা তিনি।


এই রানী পদ্মাবতীর আত্মহত্যাকে হিন্দুরা সতীদাহ বলে প্রচার করতে থাকে। সেটা জানতে হলে একটু গভীরে গিয়ে ইতিহাসটা জানতে হবে। এই রাণীর রূপের বর্ণনা শুনে লম্পট খিলজী নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেননি। বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন মেওয়ারের রাজধানী চিতোর অভিমুখে। ৭ম শতকে চিতোরগড়ের কেল্লা এক দূর্ভেদ্য দূর্গ,  সেটা বাইরে থেকে আক্রমন করে ধ্বংস করা যে সহজ নয় বুঝতে পেরে সুলতান আশ্রয় নিলেন এক কৌশলের। দূত মারফত রতন সিং এর কাছে খবর পাঠালেন। তার দূর্গ দখল কিংবা রাজ্যহরনের কোন মতলব নেই তিনি কেবল রানী পদ্মিনী্কে বোনের মত দেখেন, তাকে এক পলক দেখেই চলে যাবেন। অকারণে নিজের সন্তানতূল্য প্রজাদের রক্তক্ষয় এড়াতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজী হন রতন সিং। তবে রানী শর্ত দিলেন যে রাণী সরাসরি সুলতানকে দেখা দেবেন না, সুলতান আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি দেখবেন।


কিন্তু সেই আয়নার প্রতিচ্ছবি দেখেই আরো উন্মত্ত হয়ে পড়ে লম্পট আলাউদ্দিন খিলজী। শুধু তাই না এর পর সে বিভিন্ন নোংরা কৌশলের আস্রয় নিয়েছিলো কেল্লার বাইরে। ক্রুদ্ধ আলাউদ্দিন এরপর সর্বাত্মক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেল্লার ওপর। কিন্তু দূর্ভেদ্য কেল্লাটির কিছুই করতে না পেরে কৌশল নেন চারপাশ থেকে অবরোধ করে রাখার। সুলতানের কৌশল কাজ দেয় ভালোমতোই। কিছুদিনের মধ্যেই খাদ্যের অভাবে হাহাকার ওঠে চিতোরে। এই অবস্থায় মহিলারা শত্রুর হাতে বেইজ্জত হবার চাইতে আত্মহনন করা শ্রেয় মনে করে বেছে নেন জওহরের বা সতীদাহের পথ ।দূর্গের ভেতর তৈরী এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডে রাজপরিবারের সব মহিলারা রানী পদ্মিনীর নের্তৃত্বে তাদের বিয়ের পোষাক গয়না পরে সেই অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপিয়ে আত্মহুতি দিলেন। সতীহয়েই নিলেন চিরবিদায় স্বেচ্ছায়।


আর স্বজনহারা রাজপূত সৈনিকরা বেছে নিলেন সাকাবা সংশপ্তকপ্রথা (যুদ্ধ করতে করতে জীবন দেয়া), রণসাজে সজ্জিত হয়ে তারা দূর্গ থেকে বের হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন আকারে তাঁদের প্রায় ১০ গুণ বিশাল সুলতানের বাহিনীর উপরে হর হর মহাদেবশংখনিনাদে। বীরের মতো জীবন দিলেন রণক্ষেত্রে। সুলতান বাহিনী কেল্লার ভেতর প্রবেশের পর তখনো জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে মহিলাদের পোড়া হাড়গোড় দেখতে পায়। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে কেল্লায় আশ্রয় নেওয়া ৩০ হাজার রাজপূতকে হত্যা করেন সুলতান। এটা ছিলো রানী পদ্মিনীর সেই আত্মহত্যার ইতিহাস। এই জাতীয় আরো কিছু ইতিহাস আছে যেগুলাকে ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করে হিন্দু পন্ডিত ও পুরোহিতেরা এই বর্বর প্রথাকে একটু শালীন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইতিহাস তারা মুছে ফেলতে পারেন না, যা বারবার প্রমান করে হিন্দু ধর্ম অতীতে ছিলো বর্বর ও অমানবিক একটি ধর্ম।

----------- মৃত কালপুরুষ
                ২৯/১০/২০১৭