শুক্রবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

মানব ক্লোন অবৈধ ঘোষণা করার পেছনে কি ধর্ম বিশ্বাস না নৈতিকতা ?



বিজ্ঞান যখনই নতুন কিছু আবিষ্কার করে তখনই ধর্মান্ধরা দাবী করে এটা আমাদের ঐশ্বরিক কিতাবে অনেক আগেই লেখা ছিলো এবং সেখান থেকে রিসার্চ করে বিজ্ঞানীরা এখন এটা আবিষ্কার করেছে তারমানে এই আবিষ্কারের সব ক্রেডিট সেই ধর্মীও ঈশ্বরের, মানুষের না। এরকম ধারণা এখনও যে কত কোটি কোটি মানুষ তাদের মাথায় করে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে তা কিন্তু আপনি, আমি চিন্তাও করতে পারবো না যদি বাস্তবে এরকম দুই একজনকে না দেখেন। কয়েকদিন আগে আমি আসিফ ভায়ের একটা লাইভ দেখছিলাম যেখানে এক ভদ্রলোক সৌদি আরব থেকে তার সাথে লাইভে কানেক্ট হয় এবং আলোচনা করতে থাকে। লাইভে ভিউয়ার্স মনে হয় ৬ থেকে ৭শ মতো ছিল এরকম সময়ে সেই ভদ্রলোক তার ইসলামিক কিছু জ্ঞানের ব্যাখ্যা দিলেন তিনি জীবনে অনেক ইসলামিক বই পড়েছেন বলে দাবী করলেন এবং কিছু বই তিনি উপস্থিত সবাইকে ক্যামেরা ঘুরিয়ে দেখালেন। এরকম একজন জানাবোঝা মানুষের মস্তিষ্কের অবস্থা দেখলাম শেষের দিকে তার কিছু ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা শুনে। সে দাবী করলো “মাছির এক পাখায় জীবানু আর এক পাখায় প্রতিষেধক আছে” এটা নাকি কোন বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেছে এবং একই কথা ইসলাম ধর্মের কোন এক হাদীসেও নাকি বলা আছে।

এরকম সময় আসিফ ভাই যখন তাকে প্রশ্ন করলো আপনি কি আমাকে সেই জার্নাল না রিসার্চ পেপারের নাম বলতে পারবেন যেখানে এই বিজ্ঞানী এটা প্রমান করেছে। তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো আপনি কি জানেন জার্নাল কাকে বলে সে বলেছিলো “না”। এরকম আরো অনেকেই আছে যারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে বিভিন্ন ধর্মের ঐশ্বরিক কিতাব আর মুখে মুখে প্রচলিত অনেক কথা বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত। আজ ক্লোন নিয়ে কিছু কথা বলবো, তবে জানিনা এই ক্লোন নিয়ে কোন ধর্মীয় গ্রন্থে কিছু বলা আছে নাকি। আমি শুনেছি পৃথিবীতে এমন অনেক ধর্মীয় ঐশ্বরিক কিতাব আছে যাতে এই পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টি ও সমস্ত আবিষ্কারের কথা লেখা আছে। ক্লোনিং এর মধ্যে বর্তমানে নির্দিষ্ট কিছু কারণে মানব ক্লোনিং করা নিষেধ করা আছে যা এখন অবৈধ। এখানে আগেই একটি কথা উল্লেখ করা দরকার সেটা হচ্ছে ক্লোন অর্থ হচ্ছে অনুরুপ বা প্রতিলিপি বা আমরা কপি বলতে পারি আর ক্লোনিং হচ্ছে যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ক্লোন করা হয় তাকে ক্লোনিং বলা হয়। ক্লোনিং হলো অতি অত্যাধুনিক একটি প্রযুক্তি যার মাধ্যমে একটা প্রাণীর ক্রোমোজোম বা ডিএনএ (কোষের নিউক্লিয়াসে অবস্থিত এক বিশেষ ধরনের জৈব অ্যাসিড যা একটি জীবের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রন করে জন্ম, মৃত্যু, চেহারা, আকার-আকৃতি, আচার ব্যবহার, বেড়ে উঠা ইত্যাদি) ব্যবহার করে হুবহু সেই প্রাণীর অনুরূপ আরেকটি প্রাণী করা হয়,  যা জেনেটিক এবং ফিনোটাইপিক উভয় দিক থেকেই অনুরূপ হবে।  সোজা কথায় ক্লোনিং হল কোন জিনগত ভাবে কোন কিছুর হুবহু প্রতিলিপি তৈরি করা।

পৃথিবীতে এই ক্লোনিং করার পক্ষে সর্বোপ্রথম বাধা আসে ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষের কাছ থেকে। তারা দাবী করে এটা আমাদের সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি বহিঃভুত একটি কাজ। এই থেকে ধারনা করা যায়, মনে হচ্ছে এমন কোন আবিষ্কারের কথা মনে হয় কোন ধর্মের ঈশ্বর তাদেরকে বলেনি তাই তারা এই ক্লোনিং এর বিরোধীতা করেছিলো। শুধু তাই নয় ২০১৪ সালে যখন রাশিয়ার নিউরো সাইন্টিস্ট “দিমিত্রি” তার “আভাতার ২০৪৫” প্রজেক্টের কথা বলে তখন তারাও এটার বিরোধিতা করেছিলো। বিরোধীতা করার কারণ ছিলো “দিমিত্রি” বলেছিলো আমার প্রজেক্ট সাকসেস হলে আমি ২০৪৫ সালের মধ্যে মানুষের অমরত্ব দিতে সক্ষম হবো। আর তাই যদি করে ফেলে তাহলে ধর্ম বিশ্বাসীদের ধারনা ঈশ্বর প্রদত্ত বানী “প্রতিটি প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে” কথাটা ভুল প্রামণিত হয় আর তখনই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নিয়ে মানুষের মাঝে প্রশ্ন জাগবে তাই তারা এটার বিরোধীতা করে। কিন্তু এই প্রজেক্ট খুব সুন্দর ভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে এখন। আর এই কথাটা মনে হয় ওয়াটার বিয়ার (Water bears) বা ট্রেডিগ্রেডস (tardigrades) এর জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ বিজ্ঞানীদের গবেষনায় দেখা গিয়েছে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখা এই প্রানীর মৃত্যু নেই বললেই চলে। এরা পৃথিবীর যে কোন পরিস্থিতিতেই বেচেঁ থাকতে সক্ষম হোক সেটা পারমানবিক বোমায় ধ্বংস হওয়া কোন পরিস্থিতি।

ক্লোনিং এর প্রথম বাধার পরেই মানুষ এই ক্লোনিং এর বেশ কিছু পদ্ধতির আবিষ্কার করে যাতে করে নির্দিষ্ট কিছু জটিলতা যাতে না থাকে একটা নতুন প্রান সৃষ্টির ক্ষেত্রে সেদিকে খেয়াল রাখা হয়। এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা যেসমস্ত ক্লোনিং পদ্ধতি নিয়ে গবেষনা করছেন সেগুলা হচ্ছে সোমাটিক সেল নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার পদ্ধতি, রস্লিন পদ্ধতি, হনলুলু পদ্ধতি, মলিকিউলার ক্লোনিং, রিপ্রোডাক্টিভ ক্লোনিং, থেরাপিউটিক ক্লোনিং এবং আরো অনেক পদ্ধতি। আমরা হয়তো সবাই একটি ক্লোন মেষ শাবক (ভেড়ার) কথা কমবেশি জানি যার নাম ছিলো “ডলি” এই ডলি ছিলো রিপ্রোডাক্টিভ ক্লোনিং করা একটি ক্লোন মেষ শাবক। ডলিকে বলা হয় প্রথম ক্লোন কিন্তু এটা মোটেই ঠিক নয়, এর আগেও ক্লোন করা হয়েছে বরং সঠিকভাবে বললে ডলি ছিল পূর্ণবয়স্ক দেহকোষ থেকে তৈরি করা প্রথম ক্লোন। আসলে ক্লোনিং বা ক্লোন নিয়ে এখনও কিছু জটিলতা রয়ে গিয়েছে যার কারনে ক্লোনিং পদ্ধতির মাধ্যমে মানব ক্লোন এর অনুমতি এখনও বিজ্ঞানীদের মেলেনি। এর মধ্যে প্রধান জটিলতা হিসাবে বলা যায় জেনেটিক কিছু অমিল থেকে যায় ক্লোনিং এর ক্ষেত্রে কারণ তৈরি করা প্রাণটি যে গর্ভে বেড়ে উঠছে সেই গর্ভের পরিবেশের উপরেও এই জেনেটিক বিষয় গুলা নির্ভর করে। সেক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ভাবে জন্ম নেওয়া (জমজ) ক্লোন এর ক্ষেত্রে এই সমস্যা থাকেনা।

এই সমস্ত নানা কারনে সর্বশেষ ২০১৫ সালে পৃথিবীর প্রায় ৭০ টি দেশ মানব ক্লোনিং কে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। তাহলে কি মানব ক্লোন এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে হয়নি ? এখন পর্যন্ত বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান দাবী করেছে তারা সফল ভাবেই মানব ক্লোনিং করেছে। তবে সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য যেটা সেটা হচ্ছে ২০০২ সালের ২৭ ডিসেম্বরে ক্লোনাইড নামের একটি প্রতিষ্ঠান দাবী করে তারা প্রথম মানব ক্লোনিং করেছে এবং সেই ক্লোন মানব কন্যার নাম “ইভ”। শুধু তাই নয় এই একই প্রতিষ্ঠান আবার ২০০৩ সালের ২৩ জানুয়ারী দাবী করেন তারা আবারও আরেকটি মানব ক্লোন সফল ভাবেই করেছে। প্রথম ক্লো্নটি করে তারা ৩১ বছর বয়সী একজন নারীর কোষ থেকে এবং পরের ক্লোনটি করে তারা ২ বছর বয়সী এক শিশুর কোষ থেকে যে ২০০১ সালে জাপানে একটি রোড এক্সিডেন্ট এ মারা যায়। এছাড়াও এর আগে আরো অনেকেই দাবী করে তারাও মানব ক্লোন করেছে। সর্বোপ্রথম এমন দাবী করা হয় ১৯৯৮ সালে যা ৫ দিনের মাথায় নষ্ট করে ফেলা হয়। সর্বোশেষ ২০০৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত স্টিমাজেন কর্পোরেশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা স্যামুয়েল উড এবং অ্যান্ড্রিউ ফ্রেঞ্চ ঘোষণা দেন তারা থেরাপিউটিক ক্লোনিং এর লক্ষ্যে ৫ টি মানব ভ্রূণ তৈরি করেছে কিন্তু পরবর্তীতে তারা নৈতিকতার দিক বিবেচনা করে ভ্রুন ৫ টি নষ্ট করে ফেলে।

তথ্যসুত্রঃ https://en.wikipedia.org/wiki/Human_cloning

---------- মৃত কালপুরুষ
               ০২/০২/২০১৮



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন