বৃহস্পতিবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৮

একটি প্রশ্ন।




মূল বিষয়টি সত্যিই খুব দারুন ছিলো, এভাবে অনেকেই সব কিছু দেখে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যদি এভাবেই চিন্তা করতে পারে তাহলে আগামীর বাংলাদেশ হবে অনেক উন্নত যা প্রকাশ করে বোঝানো যাবে না। গতকাল আমিও এই ছবি গুলোর থেকেই একটা ছবি দেখেছিলাম কারো পোস্ট করা ফেসবুক স্টাটাসে, যেখানে ছবির ছেলেটির চেহারা ঢেকে দেওয়া হয়েছিলো। এই কারনে অনেকেই মন্তব্য করেছেন হয়তো নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে। আমার মনে হয়েছে সেটা করা ঠিক আছে। কারণ, প্রতীকি ছবি হোক আর কোন সন্তান গ্রাজুয়েট হবার পরে তার রিক্সাচালক বাবাকে তার গাউন পরিয়ে যদি ছবি তুলে সোস্যাল মিডিয়াতে দিয়েই থাকেন তাহলে তার চেহারা ঢেকে সেই ছবি শেয়ার করা ঠিক হয়নি। এতে করে একটা হীনমানসিকতার প্রকাশ দেখা যায়।

এখন কথা হচ্ছে, যারা না বুঝেই এটা নিয়ে নেতিবাচক স্টাটাস দিয়েছিলেন বা মন্তব্য করেছিলেন তারা মূল ঘটনা না জেনে না বুঝে করেছেন ঠিক আছে তারা সবাই বোকামী করেছেন। অতিরিক্ত আবেগ দেখাতে গিয়ে তারা বোকা হয়েছেন। আর যদি এই ছবির ব্যাক্তিটির কাছ থেকে বা ফটোগ্রাফারের কাছ থেকে আসল ছবি নিয়ে কেউ ছেলেটির মুখ ঢেকে সেই ছবি আবার নতুন করে পাবলিশড করে থাকেন তাহলে যারা ছেলেটির চেহারা ঢাকার কাজটি করেছেন সেটা চরম অন্যায় করেছেন। এই কারণেই অন্যায় হয়েছে, ছবিটিতে সকল বাবাদেরকে ছোট করে দেখানো হচ্ছে তাই। আর সর্বোপরি সেই ছবির আসল ব্যাক্তিটির (যদি হয়ে থাকে) নিচের পোস্টটি থেকে জানা যাচ্ছে সে নিজেই নাকি তার মুখটি ঢেকে সোস্যাল মিডিয়াতে তা শেয়ার করেছিলো।

এটা তার করা নিচের পোস্টে তার স্বীকারোক্তি এবং এই মুখ ঢাকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সকলের কাছে ক্ষমা চেয়ে যদি তিনি এই স্টাটাসটি দিয়েই থাকেন তাহলে তার নতুন করে আবার এই কথাটি বলা কতটা যৌক্তিক ছিলো ? "দুঃখিত আমি যে মুখ ঘোলা করার জন্য তবুও বলি, এসব মানুষের মাথা খালি বলেই আমাদের মাথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হুড! যাঁরা ভুল বুঝেছেন আমি তাঁদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি ফটোগ্রাফারের হয়ে" নতুন করে এখানে যেই মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ আবার দেখছি সেটা কি (তার কথা মতে) “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হুড” মাথায় থাকা কোন ব্যাক্তির মনোভাব হতে পারে ? পাঠকদের কাছে আমার একটি প্রশ্ন আসলে ভুলটি কার ছিলো ?


Liton Mustafiz

স্যালুট...
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তনে এ ছবির একটি বিশেষ অংশ গতকাল সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছবির ঐ অংশটি সম্ভবত বিভিন্ন গ্রুপ হয়ে ব্যক্তি থেকে আরম্ভ করে জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ফটোগ্রাফার শাহরিয়ার সোহাগ গতকাল অপরাজেয় বাংলার সামনে থেকে এ ছবিটি তোলেন। রিকশায় যিনি বসে আছেন তিনি আমাদের গর্বিত একটি অংশ। মনেই হয়নি সে মুহূর্তে তিনি অন্য একটি অংশ। পৃথিবীর আর সব বাবার মতো এ বাবার চোখেও আমি স্বপ্ন খুঁজে পাই। মোটেও মনে হয় নি তার গায়ের ঘাম লাগলে দুর্গন্ধী হয়ে উঠবে আমার গাউন। এমন ঘামের চর্মশরীরে বেড়ে ওঠা আমার। আমি বিশ্বাস করি পৃথিবীর চাকা এ 'পিতা'দের ঘামে ও দমে ঘোরে।


আমরা যখন খুব আনন্দ করছিলাম তখন তিনি আনমনা নজরে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। বিষয়টি আমি বুঝে 'পিতা'কে ডাক দেয়। তিনি সাড়া দেন। আমি আমার গাউন, হুড খুলে 'পিতা'কে পরিয়ে দেই। তারপর ছবি তোলা হয়। একজন গর্বিত গ্রাজুয়েট মনে হচ্ছিলো তখন আমার। এঁদের রক্ত ঘামানো অর্থেই আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পেরেছি। এ 'পিতা'র পোশাক দেখে স্যালুট না করে পারি নি। এ ছবি তুলে রাতেই ফেইসবুকে পোস্ট করেন ফটোগ্রাফার। ছবিটি ভাইরাল হলে দেখা যায় অনেকেই আমাকে ভুল বুঝছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছবিটি নিউজ হয়ে গেছে। দুঃখিত আমি যে মুখ ঘোলা করার জন্য তবুও বলি, এসব মানুষের মাথা খালি বলেই আমাদের মাথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হুড! যাঁরা ভুল বুঝেছেন আমি তাঁদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি ফটোগ্রাফারের হয়ে। এসব মানুষেরা আমাদের সত্যিকার বাবা-ই। কারণ আমি নিজেও কৃষকের লাঙলের ফালা বেয়ে উঠে এসেছি...

 -মৃত কালপুরুষ
  ০৪/১০/২০১৮

মঙ্গলবার, ২ অক্টোবর, ২০১৮

ঈশ্বর পুত্র “আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট” কি সত্যিই জিউসের পুত্র ছিলো ?


এই চিত্রকর্মটির নাম “এ ম্যান ইন আর্মর” ছবিটি মৃত্যুর ২ হাজার বছর পরে ১৬৫৫ সালে চিত্রকার “র‍্যামব্র্যান্ড ভ্যান রিজন” এর আকাঁ “আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট” এর একটি যুবক বয়সের ছবি। অবশ্য আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট জীবিত ছিলেন মাত্র ৩৩ বছর। ধারনা করা হয় আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট ছিলেন দেবতা জিউস এর সন্তান। এই দাবী আলেকজান্ডার এর শিক্ষক দার্শনিক “এরিস্টটাল” অস্বীকার করে বলেন আলেকজান্ডার এর মাতা অলিম্পিয়াস ছিলেন একজন উচ্চাকাঙ্খী নারী, তিনি আলেকজান্ডারের পিতা ফিলিপ’কে একটি গল্প বলে মানুষকে বোকা বানাবার জন্য এমন তথ্য প্রচার করেছিলেন।

দার্শনিক এরিস্টটাল আলেকজান্ডারের ১৩ বছর বয়সে তার শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পান। দীর্ঘ দুই বছর এরিস্টটাল তাকে বিভিন্ন শিক্ষা দিয়েছিলেন। আলেকজান্ডারের পিতা দ্বিতীয় ফিলিপ তাদের শ্রেনীকক্ষ হিসাবে ‘ম্যাসেডোনিয়া’ রাজ্যের ‘মিয়েজান’ নামক মন্দিরটি দিয়ে দেন। ১৬ বছর বয়সে যখন আলেকজান্ডার দার্শনিক এরিস্টটালের কাছে তার শিক্ষা শেষ করেন তখন পিতা দ্বিতীয় ফিলিপ তাকে রাজপ্রতিনিধি এবং উত্তরাধিকারী হিসাবে নিয়োগ করেন। এরপরে প্রথমেই আলেকজান্ডার বর্তমান তুরুষ্কের আনাতোলিয়া সালতানাত বা বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য আক্রমন করে নিজের দখলে নেন। একে একে আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট খেতাবে ভূষিত হন তার সমস্ত যুদ্ধ জয়ের নানান কৌশলের কারনে। একটা সময় সে রোমান সম্রাজ্য থেকে এশিয়া মহাদেশ এবং তৎকালীন ভারত উপমহাদেশ দখল করে সমস্ত পৃথিবীতে রাজত্ব করার ঘোষনা দেন।

আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট কোন ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন না তবে তার মাতা অলিম্পিয়াস প্রচার করেছিলেন আলেকজান্ডার দেবতা জিউসের পুত্র। অলিম্পিয়াস বলেন সে আলেকজান্ডারের পিতা রাজা দ্বিতীয় ফিলিপকে বিয়ে করার পরেই তার গর্ভে আকাশ থেকে বজ্রপাত হয়। আর এই বজ্রপাতের ফলেই নাকি অলিম্পিয়াস গর্ভবতী হন এবং দেবতা জিউসের সন্তান আলেকজান্ডারের জন্ম দেন। একটি শক্তিশালী রাজা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী একজন রাণীর পুত্র হওয়াতে  আলেকজান্ডারকে অনেকেই দেবতা পুত্র হিসেবেই মানত।

মাত্র ২০ বছর বয়সেই আলেকজান্ডার ম্যাসেডোনেয়ার রাজা হন এবং মাত্র ১৩ বছরের রাজত্বকালেই তিনি যে কৃতিত্ব দেখান তাতে অনেকেই তাকে দেবতাপুত্র বলেই মনে করতে থাকেন। ধর্মভীরু মানুষেরা আলেকজান্ডারের জীবনীর সাথে নাকি দেবতা একিলিসের বংশধর এবং দেবতা জিউসের পুত্রের অনেক মিল খুজে পেয়েছেন যে কারণে পার্শিয়ানদের অনেকেই তাকে দেবতার আসনে বসিয়েছিলো।

ছবিঃ https://www.akg-images.de/Browse/DE_Collections

মৃত কালপুরুষ
-০২/১০/২০১৮

x

শুক্রবার, ২ মার্চ, ২০১৮

ভূমিকার বিশ্লেষণ ও সমালোচনা। বইঃ আরজ আলী সমীপে, লেখকঃ আরিফ আজাদ (৫ম পর্ব)


৪র্থ পর্বে হিন্দু ধর্ম আর ইসলাম ধর্মের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক দ্বন্দের দিক গুলো নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা হয়েছিলো। আরজ আলী মাতুব্বরের যেই উক্তিটি নিয়ে কথা হয়েছিলো তার বাকী অংশে ছিলো “হিন্দুদের নিকট গোময় (গোবর) পবিত্র, অথচ অহিন্দু মানুষ মাত্রেই অপবিত্র। পক্ষান্তরে মুসলমানদের নিকট কবুতরের বিষ্ঠাও পাক, অথচ অমুসলমান মাত্রেই নাপাক” এই কথাটির পরিপ্রেক্ষিতে লেখক বলতে চেয়েছে এখানে আরজ আলী মাতুব্বর নাকি বলেছে মুসলমানদের কাছে অমুসলিম মানেই শারিরিক ভাবে নাপাক বা অপবিত্র। যেমন লেখক আরিফ আজাদ বলেছে “অমুসলমান ছুঁইলেই ইহা অপবিত্র হয়। আসলে কিন্তু এমন কথা আরজ আলী মাতুব্বর তার বই এর কোথাও বলেনি। উপরের আরজ আলী মাতুব্বরের উক্তি আর আরিফ আজাদের উক্তিটি কিন্তু কোনভাবেই মিলেনা। তাহলে এটাও লেখকের মনগড়া কথা বলা যেতে পারে যার পক্ষে তিনি সূরা আত-তাওবা ০৯,২৮, তাফসীর মা’রেফুল কোরান, সূরা তাওবা ০৯,২৮, সূরা আল-আন আম ০৬,১৬৩, সূরা ইখলাস ১১২,৪, সূরা ফাতিহা ০১,০৪ এর বিভিন্ন রেফারেন্স দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে ইসলাম ধর্মে আসলে বেধর্মীদের সাথে খুবই বন্ধুত্বপুর্ণ আচরন করার কথা বলা আছে। তাদের শারিরিক হোক আর আত্মিক হোক (যদিও আত্মা বলে কিছুই নেই এটাও কাল্পনিক চরিত্র) অপবিত্র বলা হচ্ছে সেটা আসলে মূল কোন আলোচ্য বিষয় না।

মূল কথা হচ্ছে এখানে লেখক আরিফ আজাদ উপরোক্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে কোরান ও হাদিসের ৬টি রেফারেন্স দিয়েছে যার সুত্রগুলা উপরে আছে যা দ্বারা প্রমাণ করার ব্যার্থ চেষ্টা করা হয়েছে ইসলামে বেধর্মী সম্পর্কে এমন কিছুই বলা নাই যেমন আরজ আলী মাতুব্বর বলেছেন। তাই আমিও এখানে মাত্র ৬টি উদাহরন দিলাম (১) আল কোরানের সূরা ইমরান আয়াত ৩:১১৮ এ বলা হচ্ছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে (বেধর্মীদের) অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না” (২) আল কোরানের সুরা ইমরান আয়াত ৩:২৮ এ বলা হচ্ছে, “হে মুমিনগন যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোন কাফেরকে (বেধর্মীকে) বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না” (৩) আল কোরানের সুরা ইমরান আয়াত :৫৬ এ বলা হচ্ছে,“অতএব যারা কাফের (বেধর্মী) হয়েছে, তাদেরকে আমি কঠিন শাস্তি দেবো দুনিয়াতে এবং আখেরাতে-তাদের কোন সাহায্যকারী নেই” (৪) আল কোরানের সুরা ইমরান আয়াত ৩:৮৭ এ বলা হচ্ছে, “এমন লোকের (বেধর্মীদের) শাস্তি হলো আল্লাহ, ফেরেশতাগণ এবং মানুষ সকলেরই অভিসম্পাত” (৫) আল কোরানের সুরা নিসা আয়াত ৪:৬৩ এ বলা হচ্ছে, “এরা (বেধর্মীরা) হলো সে সমস্ত লোক, যাদের মনের গোপন বিষয় সম্পর্কেও আল্লাহ তা'আলা অবগত। অতএব, আপনি ওদেরকে উপেক্ষা করুন” (৬) আল কোরানের সুরা নিসা আয়াত ৪:১৪০ এ বলা হচ্ছে, “আর কোরআনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতি এই হুকুম জারি করে দিয়েছেন যে, যখন আল্লাহ তা' আলার আয়াতসমূহের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন ও বিদ্রুপ হতে শুনবে, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না, যতক্ষণ না তারা প্রসঙ্গান্তরে চলে যায়। তা না হলে তোমরাও তাদেরই মত হয়ে যাবে। আল্লাহ দোযখের মাঝে মুনাফেক ও কাফেরদেরকে একই জায়গায় সমবেত করবেন”।

এরপরেই লেখক আরিফ আজাদ আরেকটি উদাহরণ দিয়েছেন নবী মুহাম্মদ এর চাচা আবু তালিব কে নিয়ে। এই উদাহরনেও তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ইসলাম ধর্মে বেধর্মীদের সাথে খুব ভালো ব্যাবহার করার কথা বলা আছে। আসলে তিনি এখানে কোন হাদীস বা কোন অথেন্টিক সোর্স এর রেফারেন্স দেয়নি শুধুই বলেছেন এমনও দলিল পাওয়া যায়। নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর বেধর্মী চাচা আবু তালিব এর ঘটনাটা আসলে হবে ঠিক এরকম। আবু তালিব ছিলেন ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর আপন চাচা এবং খলিফা আলী ইবন আবী তালিব (রাঃ) এর বাবা। আবু তালিব জন্মগ্রহন করেন ৫৪৯ খ্রিটাব্দে এবং মৃত্যবরণ করেন ৬২০ খ্রিস্টাব্দে। তিনি কুরাইশ বংশের বনি হাশিম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন গোত্রের একজন প্রবীণ ও সম্মানিত নেতা| নবী মুহাম্মদ(সাঃ) এর নবুয়াতকালীন সময়ে তিনি গোত্রীয়ভাবে তাঁর সর্বাত্নক নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন| এই কুরাইশ বংশ ও বনি হাশিম বংশের সবাই প্যাগান ধর্মাবলম্বী ছিলেন এবং কাবা ঘরে রাখা ৩৬০টি মুর্তির পূজা করতেন। আমরা জানি যে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর নব্যুয়াত প্রাপ্তি হয়েছিলো তার বয়স যখন ৪০ বছর তখন। সাল হিসাবে দাঁড়ায় ৬১২ খ্রিস্টাব্দের দিকে যখন ইসলামের নাম কেউ মক্কাতে তখনও শোনেনি। আর তার চাচা আবু তালিবের মৃত্যু হয় ৬২০ খ্রিস্টাব্দে অর্থ্যাৎ মাঝখানে ব্যাবধান থাকে মাত্র ৮ বছরের আর ইসলাম ধর্ম সৃষ্টি আর প্রচারের বয়সও তখন মাত্র ৮ বছর। এখন কথা হচ্ছে লেখক আরিফ আজাদ দাবি করেছেন আবু তালিব বেধর্মী হবার পরেও নবীকে যায়গা দিয়েছিলেন তার গৃহে এখানে তাহলে ইসলাম ধর্ম আসলো কোথা থেকে ? ইসলাম ধর্মের প্রচার এবং প্রসার শুরুই হয়েছিলো নবী মুহাম্মদের নব্যুয়াত লাভের পর থেকে যার পরে আর মাত্র ৮ বছর জীবিত ছিলো চাচা আবু তালিব ইবনে আব্দুল মুত্তালিব।

ইসলাম ধর্মে বেধর্মীদের সম্পর্কে এমন কোন আদেশ বা কোরানের আয়াত তখনও নাজিল হয়নি যেখানে বলা আছে বেধর্মীদের সাথে কেমন আচরন করা লাগবে। আর নবী মুহাম্মদ (সাঃ) কে যদি কেউ আশ্রয় দিয়ে থাকে তার দেখাশোনা করে থাকে তাহলে সেটা করেছে প্যাগান ধর্মের মূর্তি পূজারী তার চাচা এখানে ইসলামের কোন সম্পর্কই নেই। প্রাক ইসলামিক যুগের মক্কার ইতিহাস ও নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনি পড়লে এই বিষয়ে স্বচ্ছ ধারনা পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন হতে প্রকাশিত বই “সীরাত ইবনে হিশামের” মধ্যেও এই সম্পর্কে যথেষ্ট ভালো তথ্য আছে। তাই আমি বলবো আরজ আলী সমীপে বই এর লেখক আরিফ আজাদ এখানে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এবং চাচা আবু তালিব আব্দুল বিন মুত্তালিবের যে মানবিক গল্প বলে ইসলাম ধর্মকে মানবিক করার চেষ্টা করেছেন তা শুধুই আরজ আলী মাতুব্বরের কথা ভূল প্রমান করার জন্য তাছাড়া কিছুই নয়। এরপরে তিনি আরেকটি উদাহরণ দিয়েছেন ভেড়া কেনার হাদীস দিয়ে। বেধর্মীদের কাছ থেকে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) ভেড়া কিনেছিলেন বলে তিনি বোঝাতে চাইলেন যে ইসলাম ধর্মে বেধর্মীদের সাথে ব্যবস্যা করার কথা বলা আছে তার মানে অমুসলিম মানেই সে খারাপ বা অপবিত্র তার সাথে ব্যাবসা বানিজ্য করা যাবে না এমন কথা ইসলামের কোথাও নেই। এখানে খুব বেশি কথা আমি বলতে চাইনা। বাংলাদেশের পাসপোর্টে পৃথিবীর কোন কোন দেশ ভ্রমন করা যাবে আর কোন কোন দেশ ভ্রমন করা যাবে না সেই সম্পর্কে একটি তথ্য দেওয়া আছে সেটা কেনো দেওয়া আছে তা একটু যাচাই বাছাই করলে আপনি উত্তর পেয়ে যাবেন ইসলাম ধর্মে অমুসলিমদের সাথে ব্যাবসার বর্তমান প্রেক্ষাপট।

লেখক আরিফ আজাদ তার বই এর ২০নং পৃষ্ঠার শেষভাগে আরজ আলী মাতুব্বরের এই প্রশ্নটির শেষ ব্যাখ্যা এইভাবে করেছেন “আরজ আলী সাহেব অমুসলিম ব্যক্তিমাত্রই নাপাক, তাদের কাছ থেকে কিছু কেনাও যাবে না মর্মে ইসলামের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দাঁড় করিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। বরং আমরা জানলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্তিজীবনে অমুসলিম পরিবারে বড় হয়েছেন, অমুসলিমদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন, চুক্তি করেছেন, ক্রয়-বিক্রয় করেছেন। এতৎসত্ত্বেও, ইসলামের বিরুদ্ধে এ রকম ভিত্তিহীন, বানোয়াট, মনগড়া অভিযোগ আনার হেতু কী তা কি আরজ আলী সাহেবের ভক্তকুল আমাদের জানিয়ে বাধিত করবেন?” এখানে পাঠক আপনারাই আরেকবার মিলিয়ে দেখুন আরিফ আজাদ তার ভাষ্যতে কি বলছেন আর আরজ আলী মাতুব্বর কি বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন মুসলমানদের এমন নিয়ম আছে যেখানে বলা আছে “অমুসলমান পর্ব উপলক্ষ্যে কলা, কচু, পাঠা বিক্রিও মহাপাপ” আর আরিফ আজাদ এখানে বলছেন “তাদের কাছ থেকে কিছু কেনাও যাবে না” মানে অমুসলমানদের কাছ থেকে বোঝাচ্ছেন। তিনি উল্টিয়ে দিয়েছেন কথাটা। তাহলে এখন আমরা এখানে কি মনে করতে পারি কার কথা মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন ? আরজ আলী মাতুব্বর নাকি আরিফ আজাদ ? লেখক আরিফ আজাদ আরো বলেছেন “ইসলামের বিরুদ্ধে এ রকম ভিত্তিহীন, বানোয়াট, মনগড়া অভিযোগ আনার হেতু কী” এখানে কি আরজ আলী মাতুব্বর ইসলামের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেছেন ? কেউ দেখাতে পারবেন ? তাহলে এই লেখক আরিফ আজাদ এখানে কোন ভিত্তিতে বলছে তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন ?

এরপরের প্রশ্ন হিসাবে লেখক “আরজ আলী মাতুব্বরের” যে উক্তিটি এখানে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন সেটা হচ্ছে “এই যে জ্ঞানের অগ্রগতিতে বাধা, মনের অদম্য স্পৃহায় আঘাত, আত্মার অতৃপ্তি, ইহারই প্রতিক্রিয়া মানুষের ধর্মকর্মে শৈথিল্য। এক কথায়মন যাহা চায় ধর্মের কাছে তাহা পায় না। মানুষের মনের ক্ষুধা অতৃপ্তই থাকিয়া যায়। ক্ষুধার্ত বলদ যেমনি রশি ছিড়িয়া অন্যের ক্ষেতের ফসলে উদর পূর্তি করে, মানুষের মনও তেমন ধর্ম ক্ষেত্রের সীমা অতিক্রম করিয়া ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য ছুটিয়া যায় দর্শন আর বিজ্ঞানের কাছে”। আমি আবারও এখানে বলছি এরকম একটি যুক্তিযুক্ত কথা ভুল বা মিথ্যা বা অযৌক্তিক দাবি করা সম্ভব শুধু মাত্র একজন ধর্ম বিশ্বাসীর পক্ষেই। কারণ তারা জানেই না বিশ্বাসের ভিত্তিটি কি। কোন স্তম্ভের উপর ভর দিয়ে বিশ্বাস জিনিষটি টিকে আছে। উপরোক্ত উক্তিটির ভুলভাল ব্যাখ্যা দিয়ে এই বইটির লেখক আবারও একটি ব্যার্থ চেষ্টা এখানে করেছেন আসুন দেখি তা কিভাবে। তিনি বলেছেন “আরজ আলী সাহেবের এই কথাগুলো মোটাদাগে অন্য ধর্মের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ বলতে পারি না, কিন্তু ইসলামের সাথে এর ছিটেফোঁটা সম্পর্কও নেই” আসলে তা একদম মিথ্যা কথা। লেখক আরিফ আজাদ সাহেব যদি এখানে বলতো যে অল্পস্বল্প সম্পর্ক থাকলে থাকতে পারে তাহলে আমি এই কথাটি এড়িয়ে যেতাম কিন্তু তিনি যেহেতু বলছেন ইসলাম ধর্মে জ্ঞান আহরণে বাধা দেবার কথা ছিটেফোটাও নেই বলছেন তাহলে এই বিষয়ে দুইটা কথা এখানে যদি না বলি তাহলে এই লেখার কোন অর্থই থাকেনা।

জ্ঞান আহরন বলতে আমরা সাধারনত যেটা বুঝবো তা হচ্ছে সব বিষয়েই জানা এবং বোঝা। সেই জানাটা প্রতিটি মানুষের জন্য। এখানে নারী বেশি জানতে পারবে বা পুরুষ কম জানতে হবে এমন কোন কথা বা বাধা থাকার কথা না। নারীরা পড়বে পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত আর বাড়িতে থেকে স্বামীর জন্য রান্না করবে এমন তো না তাই না। তবে ইসলামিক শরীয়া মোতাবেক এমন অনেক নিয়ম চালু আছে যা নারীদেরকে মেনে চলতে হয়। এটা কি জ্ঞান আহরনের পথে বাধা নয় ? বর্তমান যুগ হচ্ছে স্কাইমিডিয়ার যুগ। অনলাইন, ইন্টারনেট, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, সহ সকল ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস হচ্ছে জ্ঞান আহরনের প্রধান মাধ্যম গুলোর তালিকা্র শুরুতে। শেখানে ৫০ বছর আগের টেলিভিশন দেখাটাও ইসলামে হারাম বা নাযায়েজ করা আছে এটা কি ইসলামের জ্ঞানের পথে বাধা দেওয়া নয় ? ইসলামে টিভি দেখা হারাম, ছবি দেখা হারাম, গান শোনা হারাম, সংস্কৃতি মনা হওয়া হারাম, মানুষকে তার রূপ দেখানো হারাম। গান- বাজনা হারাম। অভিনয় করা হারাম। এরকম অসংখ্য বিধি- নিষেধ ইসলামে রয়েছে। এখানে একটু খেয়াল করে দেখবেন, এগুলা ছাড়া মানুষ মোটেও বিজ্ঞান মনস্ক হতে পারবেনা। বিজ্ঞানের সকল উচ্চ পর্যায়, এবং একজন মানুষ কে সামাজিক, অর্থনৈতিক সকল পর্যায়ে সঠিক ধারনা নিতে,মানবতাবোধ জাগাতে এইসব কিছুর প্রয়োজন অপরিসীম যার সবটাই ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ এটা কি জ্ঞান আহরনের পথে বাধা নয় ?

এটা গেলো স্কাইমিডিয়া থেকে জ্ঞান আহরনের বাধার অধ্যায়। একটা সময় ছিলো যখন টিভিও খুব একটা সহজলভ্য বিষয় ছিলোনা যেটা থেকে মানুষ একটু জ্ঞান নিবে। তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা প্রিন্টমিডিয়া ও ছাপার উপরে নির্ভর করতো যেমন বই ও পত্রপত্রিকা। ৭০ এর দশকে আফগানিস্তান এ “তালেবান”নামক ইসলামিক জঙ্গীদের উথাপন শুরু হয়েছিলো। তখন আফগানিস্তানের গ্রামে গ্রামে এই বাহিনী গিয়ে প্রতিটি বাড়ি থেকে কোরান আর হাদীস বাদে যত বই আছে তা নিয়ে একত্রিত করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিতো আর বলতো একমাত্র কোরান বাদে পৃথিবীতে যত বই আছে তা সবই শতায়তানী (কাল্পনিক চরিত্র) কিতাব আর এই কিতাব ঘরে রাখাও পাপ তাই এটা পুড়িয়ে দাও। এই মনোভাব থেকেই আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের প্রধান নবীর মৃত্যর পরে এই ইসলাম নামক সঙ্গগঠনের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত হযরত আলী (রাঃ) প্রাচ্যের জ্ঞান ভান্ডার “আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরী” আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করেছিলো এই বলে যে এসব শয়তানী কিতাব। কোরান বাদে কোন কিতাব বা বই থাকবে না। সেই প্রাচ্যের জ্ঞান ভান্ডার “আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরীর” ক্ষতিপূরণ আজও জ্ঞানী গুনিরা পুষিয়ে উঠতে পারেনি।  

ইসলাম ধর্মে বই পড়া মানে জ্ঞান আহরনে বাধা সম্পর্কে আরো কিছু তথ্যভিত্তিক বিষয় হচ্ছে, ইসলামে গল্পের বই পড়া জায়েজ হবে কিনা তা নির্ভর করে এগুলোর বিষয়বস্তুর উপর । এগুলোতে যদি এমন কিছু থাকে যা বাস্তব ও ইসলামের নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক তবে তা পড়া জায়েয হবেনা।বলতে পারেন আমরা কেবল বিনোদনের জন্য, সময় কাটানোর জন্য এগুলো পড়ি । কিন্তু এমন বিনোদনের অনুমতি ইসলামে নেই যেটা হারাম। ইসলাম মতে একজন ঈমানদারের জন্য সময় অত্যন্ত মূল্যবান জিনিস কিন্তু সেটা বই পড়ে জ্ঞান আহরনের জন্য নয় । “আবু হুরাইরা (রা.) বলেন , রাসূল্লাহ ( সা.) বলেছেন , একজন ব্যক্তির ইসলামের পরিপূর্ণতার একটি লক্ষণ হল যে, তার জন্য জরুরী নয় এমন কাজ সে ত্যাগ করে। জামে তিরমিজী ২২৩৯)” আর যদি আপনি সাইন্স ফিকশান, হিস্টোরিক্যাল, মিথলোজির কোন বই পড়েন তাহলে এগুলোতে অনেক সময় কুফরি (ইসলামিক পাপ কাজ) বিষয় নিয়েও লেখা থাকে যা ইসলামের সাথে সাঘর্ষিক ।অনেক ক্ষেত্রে তা ঈমান-আকিদা নষ্টের কারণহয় এবং নাস্তিকতার প্রতি ধাবিত করে।পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,’’মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছে যে অর্থহীন ও বেহুদা গল্প কাহিনী খরিদ করে, যাতে করে সে (মানুষদের নিতান্ত) অজ্ঞতার ভিত্তিতে আল্লাহ তাআলার পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে, সে একে হাসি, বিদ্রুপ, তামাশা হিসেবেই গ্রহণ করে; তাদের জন্য অপমানকর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। আল কোরানসূরা লোকমান আয়াত ০৬। এগুলা কি সবই জ্ঞান আহরনের পথে বাধা নয় ? তাহলে লেখক আরিফ আজাদ আমাদের কি বোঝাতে চাচ্ছেন ? আসুন দেখি সেই বাকি অংশ পরের পর্বে।

বইটিতে ১৭, ১৮, ১৯ ও ২০ পৃষ্ঠা যেভাবে আছে তা দেখতে লিংক গুলা দেখুন।
পৃষ্ঠা ১৭ http://i67.tinypic.com/rk1ldw.jpg
পৃষ্ঠা ১৮ http://i64.tinypic.com/28gtumo.jpg
পৃষ্ঠা ১৯ http://i67.tinypic.com/11rvkg8.jpg
পৃষ্ঠা ২০ http://i66.tinypic.com/eskswk.jpg

মৃত কালপুরুষ

০২/০৩/২০১৮

বৃহস্পতিবার, ১ মার্চ, ২০১৮

ভূমিকার বিশ্লেষণ ও সমালোচনা। বইঃ আরজ আলী সমীপে, লেখকঃ আরিফ আজাদ (৪র্থ পর্ব)


শার’ঈ সম্পাদকের কথা শেষ হবার পরেই “আরজ আলী সমীপে” বইটির সূচিপত্র আছে ১৪ নং পৃষ্ঠায়। এই সূচিপত্রে সর্বোমোট ৯টি অধ্যায় স্থান পেয়েছে আর তা হচ্ছে প্রথম থেকে ভূমিকার বিশ্লেষণ, আত্মাবিষয়ক, ঈশ্বর সংক্রান্ত, পরকাল বিষয়ক, ধর্ম সংক্রান্ত, প্রকৃতি বিষয়ক, বিবিধ, শেষ কথা ও শেষে লেখক পরিচিতি। এরপরেই আমরা বইটির মূল লেখায় প্রবেশ করবো যেই অধ্যায়ের নাম “ভূমিকার বিশ্লেষন” এই অধ্যায়টি বইয়ের ১৫ নং পৃষ্ঠাতে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে ৩২ নাম্বার পৃষ্ঠাতে গিয়ে। এই ১৮ পৃষ্ঠার লেখার মধ্যে লেখক আরিফ আজাদ “আরজ আলী মাতুব্বরের” মাত্র ৯টি উক্তি উল্লেখ করে তা খন্ডন করার ব্যার্থ চেষ্টা করেছেন নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় মতবাদের মাধ্যমে। আসলে কিন্তু “আরজ আলী মাতুব্বরের” লেখা পড়ে আমার কখনই মনে হয়নি যে তিনি নির্দিষ্ট কোন একটি ধর্মকে উদ্দেশ্য করে তার প্রশ্ন করেছেন বা কোন নির্দিষ্ট একটি ধর্মকে তিনি ছোট করার চেষ্টা করেছেন যদিও এই বই এর লেখক তার মনগড়া মনোভাব থেকে ইতিপুর্বেই বলেছেন আরজ আলী মাতুব্বর নাকি বিশেষ একটি এঙ্গেলে শুধু ইসলাম ধর্মকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন আসলে কিন্তু তা একেবারেই না। বইটির শুরুর এই অধ্যায়টিতে আরজ আলী মাতুব্বরের যেই ৯টি যুক্তি তিনি তার ধর্মীয় মতবাদ দিয়ে বইটিতে বোঝাতে চেয়েছেন তাকে আমি কোনভাবেই আরজ আলী মাতুব্বরের করা প্রশ্নের উত্তর হিসাবে নিতে পারলাম না। যদি কেউ মনে করে থাকেন এখানে লেখক আরিফ আজাদ সঠিক ভাবে আরজ আলী মাতুব্বরের কথা গুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাহলে আমাকে জানাতে পারেন।

লেখক এই অধ্যায়টি যেভাবে শুরু করেছেন তা হচ্ছে “আরজ আলী মাতুব্বর উনার লেখা সত্যের সন্ধানে বইয়ের শুরুর দিকে বলেছেন, (জগতে এমন অনেক বিষয় আছে, যেসব বিষয়ে দর্শন, বিজ্ঞান ও ধর্ম এক কথা বলে না) প্রথমত, জগতের কোন কোন বিষয়ে দর্শন, বিজ্ঞান ও ধর্ম এক কথা বলে না তা আরজ আলী সাহেব উল্লেখ করেননি। দ্বিতীয়ত, জগতের কিছু কিছু বিষয়ে যে দর্শন, বিজ্ঞান আর ধর্ম এক কথা বলে না তা আসলে সত্য। সত্য এ কারণে যে, জগতের সকল বিষয়ে সমানভাবে দর্শন, বিজ্ঞান আর ধর্মকে কথা বলতে হয় না। আরজ আলী সাহেব যে ভুলটা শুরুতেই করে বসেছেন তা হলো, তিনি দর্শন, বিজ্ঞান আর ধর্মকে এক করে ফেলেছেন। অথচ, এ কথা স্বীকার্য যে, এই তিনটি বিষয়ের আলোচ্য বস্তু ভিন্ন ভিন্ন”। লেখকের প্রথম প্রশ্ন খন্ডনের চেহারা হচ্ছে এটা। এখানে বলতেই হয় আরজ আলী মাতুব্বর এই কথাটির আগে পরে বা “সত্যের সন্ধ্যানে” সম্পুর্ণ বইটিতে কোথাও বলেনি যে তিনি দর্শন, বিজ্ঞান আর ধর্মকে এক মনে করেছেন বা করেন। এটা লেখক নিজে নিজেই মনে করেছেন যে আরজ আলী মাতুব্বর এই তিনটি বিষয় এক করে ফেলেছেন এবং এই কথা বলেছেন। এরপরে লেখক বলেছে “পদার্থ কী কী দিয়ে গঠিত তা বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। ধর্মে পদার্থের গঠনের সরাসরি কোনো পাঠ নেই” এখন প্রশ্ন হচ্ছে ধর্মে যদি সরাসরি পদার্থের কোন পাঠ নাই থাকবে তাহলে কিভাবে একটি ধর্ম বিজ্ঞানময় হয় ? বা কিভাবে ধার্মীকেরা দাবি করে ধর্ম হচ্ছে পুর্ণাঙ্গ জীবন বিধান যদি সামান্য পদার্থের ব্যাখ্যাই তার মধ্যে না থাকবে ?
এরপরেই আবার তিনি বলেছেন “আবার, ব্যভিচার করলে কেন শাস্তি পাওয়া উচিত সে পাঠ ধর্মের, কোনো কোনো দর্শনে কিছু বলা থাকলেও, বিজ্ঞানে তার উত্তর নেই” যেটা ছিলো একটি ভুল কথা। আসলে বিজ্ঞানে এই ব্যাভিচারের শাস্তি দেবার জন্য তৈরি হয়েছে অপরাধা বিজ্ঞান। যার মাধ্যমে মনোবিজ্ঞানীরা জেলখানায় আটক অপরাধীদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা করে থাকে। তারা এটা খুজে বের করার চেষ্টা করে এই অপরাধী কেন এই অপরাধটা করেছে এবং কি করলে সে বা নতুন করে আরো অন্য কোন ব্যাক্তি এই অপরাধটা আর করবে না। তাকে যদি শাস্তি দেওয়া হয় তাহলে কি আগামীতে এই অপরাধের মাত্রা কমবে না আরো বাড়বে এধরনের নানান গবেষণা চলে। এরপরে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং পূনরায় তা যাচাই বাছাই করা হয় এবং সর্বোশেষ দাঁড়া করানো হয় নির্দিষ্ট কোন অপরাধ যেমন ব্যাভিচার প্রতিরোধ সম্পর্কে একটি থিউরী। সেটা শাস্তিও হতে পারে। আবার বিজ্ঞান এই কথা দিয়েই শেষ করে দেয়না বা সমাধান করে দেয়না। বিভিন্ন ধর্মীয় কিতাবের মতো যে, এটায় ফাইনাল কথা। তারা বলে যতক্ষন পর্যন্ত নতুন কোন থিউরী কেউ তৈরি করে এটা ভুল না প্রমান করতে পারছে ততক্ষন পর্যন্ত বিজ্ঞান এই শাস্তি দেওয়ার কথা বলছে তার বেশিনা। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে এখানে লেখক কিভাবে বলে যে ধর্মে ব্যাভিচারের শাস্তি আছে দর্শনে অল্পস্বল্প থাকলেও বিজ্ঞানে কিছুই নেই ? আমার মনে হয় সেটা বোঝার জন্য বিজ্ঞানটাকে একটু ভালোভাবে বুঝতে হবে।

এই লেখক আসলে এখানে ব্যাপারটি এরকম করে ফেলেছে যে সেই পানি তিনি খাবেন কিন্তু একটু ঘোলা করে খেলেন। যেমন আরজ আলী মাতুব্বরের কথাটা ছিলো “জগতে এমন অনেক বিষয় আছে, যেসব বিষয়ে দর্শন, বিজ্ঞান ও ধর্ম এক কথা বলে না” এরপর লেখক তার লেখার মধ্যে বলেছেন “জগতের কিছু কিছু বিষয়ে যে দর্শন, বিজ্ঞান আর ধর্ম এক কথা বলে না তা আসলে সত্য” অর্থ্যাৎ তিনি এখানেই কথাটা স্বীকার করে নিচ্ছেন ঠিক আছে কিন্তু একটু বাড়তি কথা বলতে গিয়েই স্ববিরোধী ভাবটা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন এখানে যা ধর্মবিশ্বাসীদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। তাদের যে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয় তার মধ্যেই এধরনের স্ববিরোধীতা আছে তাই এদের মস্তিষ্কের গঠন এভাবেই হয়ে থাকে। এরপরেই এই অধ্যায়টিতে আরজ আলী মাতুব্বরের যে দ্বিতীয় প্রশ্নটি লেখক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আবারও গুলিয়ে ফেলেছেন তা হচ্ছে “সাধারণত আমরা যাহাকে ধর্ম বলি তাহা হইলো মানুষের কল্পিত ধর্ম , যুগে মহাজ্ঞানীগণ এই বিশ্বসংসারের স্রষ্টা ঈশ্বরের প্রতি মানুষের কর্তব্য কী তাহা নির্ধারণ করিবার প্রয়াস পাইয়াছেন। স্রষ্টার প্রতি মানুষের কী কোন কর্তব্য নাই, নিশ্চয়ই আছে’–এইরূপ চিন্তা করিয়া তাহারা ঈশ্বরের প্রতি মানুষের কর্তব্য তাহা নির্ধারণ করিয়া দিলেন। অধিকন্তু, মানুষের সমাজ ও কর্মজীবনের গতিপথও দেখাইয়া দিলেন সেই মহাজ্ঞানীগণ। এইরূপে হইলো কল্পিত ধর্মের আবির্ভাব”। আরজ আলী মাতুব্বর মানব সভ্যতায় এই ধর্ম নামক বস্তুটি কিভাবে এসেছে তা খুব সহজ এবং সাবলীল ভাষায় এখানে ব্যাক্ত করেছেন এবার দেখুন এই কথাটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আরজ আলী সমীপে বই এর লেখক আরিফ আজাদ সাহেব কি বলছেন।
তিনি বলেছেন “আরজ আলী সাহেব উনার পু্রো বইটি জুড়ে দর্শন, বিজ্ঞান আর যুক্তিবোধের জয়গান গাইলেও, বইয়ের শুরুতে কোনরকম তথ্য, উপাত্ত, পরীক্ষালব্ধ প্রমাণাদি ছাড়াই দাবি করে বসলেন যে, ধর্মগু্লো কথিত ধর্মগুরুদের বানানো। মূল আলাচোনায় যাওয়ার পূর্বেই যিনি নিজ বিশ্বাসের ওপর রায় দিয়ে ফলাফল জানিয়ে বসেন, তিনি আমাদের ঠিক কতটুকু “সত্যের সন্ধান দিতে পারেন? ব্যাপারটা অনেকটা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের মতো, যে প্রশাসন, মিডিয়া সবকিছু নিজের আয়ত্তে রেখে জনগণের উদ্দেশে ঘাষোণা দেয়—“আসসা, আজ আমি তামাদের শেখাব সুষ্ঠু নির্বাচন কাকে বলে।” আরজ আলী সাহেবের অবস্থাও ঠিক দুর্নীতিগ্রস্ত সেই সরকারের মতো নয় কি?” অর্থ্যাৎ আরজ আলী মাতুব্বরকে তিনি দুর্নীতি গ্রস্থ সরকার বানালেন এখানে আর আগের উক্তি খন্ডন করতে গিয়ে বানিয়েছেন বোকা। এখানে মূল কথা হচ্ছে তিনি চাইছেন একটি প্রমাণ যেখানে বলা হচ্ছে প্রচলিত ধর্মগুলি সবই কথিত ধর্মগুরুদের বানানো। এখানে প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে এই ধর্মটি লেখক তার নিজ ধর্ম হিসাবে কোথায় পেয়েছে ? নিশ্চয় তার পৈত্রিক সম্পত্তির মতো পিতামহের কাছ থেকে পাওয়া একটি মতবাদ তিনি ধর্ম বলে বুকে ধারন করে প্রমাণ চাচ্ছেন যে কে এটা বানালো। আসলে তিনি বর্তমানে যে ধর্মের পরিবারের জন্মগ্রহন করে আজকে সেই ধর্মের পরিচয় দিচ্ছেন আজ অন্য ধর্মের কোন পরিবারে তার জন্ম হলে তিনি কি এই বর্তমান ধর্মের পরিচয়ে নিজেকে পরিচিত করতেন কিনা সেটা আসলে জানা দরকার।

যাইহোক ধর্ম হচ্ছে পূর্বপুরুষ হতে প্রাপ্ত ঐতিহ্য , জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা , রীতি-নী‌তি ও প্রথা কে মানা এবং সে অনুসা‌রে মানবজীবন প‌রিচালনাকে বলা হয় ধর্ম। আর এই সাধারণ বিষয়গুলোই প্রমাণ করে যে বর্তমান পৃথিবীতে প্রচলিত সবকয়টি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মই আসলে মনুষ্য সৃষ্ট যার পেছনে আছেন সব কথিত ধর্মগুরা যেই কথাটি খুব সহজ ভাষায় আরজ আলী মাতুব্বর আমাদের অনেক আগেই বলে গিয়েছিলেন। এরপরে লেখক আরজ আলী মাতুব্বরের যে তিন নাম্বার উক্তিটি খন্ডন করতে গিয়েছেন তা হচ্ছে “মাতুব্বর সাহেব বলেছেন, “হিন্দুদের নিকট গোময় (গোবর) পবিত্র, অথচ অহিন্দু মানুষ মাত্রেই অপবিত্র। পক্ষান্তরে মুসলমানদের নিকট কবুতরের বিষ্ঠাও পাক, অথচ অমুসলমান মাত্রেই নাপাক। পুকুরে সাপ, ব্যাঙ মরিয়া পচিলেও উহার জল নষ্ট হয় না, কিন্তু বিধর্মী মানুষ ছুইলেই উহা হয় অপবিত্র। কেহ কেহ একথা বলেন যে, অমুসলমান পর্ব উপলক্ষ্যে কলা, কচু, পাঠা বিক্রিও মহাপাপ। এমনকি মুসলমানের দোকান থাকিতে হিন্দুর দোকানে কোনকিছু ক্রয় করাও পাপ। এই কী মানুষের ধর্ম? না ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা?” আমার মনে হয়না এই প্রশ্নের উত্তর দেবার মতো ক্ষমতা কোন বিশ্বাসী ধার্মীক ব্যাক্তির আছে। তারপরেও যেহেতু ফাকা মাঠে গোল দেবার উদ্দেশ্যে লেখক আরিফ আজাদ আমাদের তাও ব্যাখ্যা করে দেখাচ্ছেন তাহলেতো আমাদের একটু দেখতেই হয় তিনি কি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তিনি এই প্রশ্নের জবাবে প্রথমেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কিছু কালো অধ্যায় এখানে তুলেছেন এভাবে “আরজ আলী সাহেব শুরুতেই হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে যে অভিযোগটি টেনেছেন তা কতটুকু সত্য আমি জানি না। তবে হিন্দুধর্মের বর্ণপ্রথা সম্পর্কে কিছু ধারণা আছে বৈকি। সে মতে উচ্চবর্ণের কোনো হিন্দু নিম্নবর্ণের কোনো হিন্দুর পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাকেও পাপ মনে করে। এমনকি একটা সময়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পড়া দূরে থাক, ছোঁয়াটাও নিষিদ্ধ ছিল পুরোহিত কর্তৃক। পুরোহিততন্ত্রের এই বিধান এখনো হিন্দুধর্মে বলবৎ আছে কি না জানি না, তবে ভারতের অনেক জায়গায় এই রীতির এখনো চর্চা হতে পারে” এখনে তিনি প্রথমেই বলেছেন হিন্ধু ধর্মের এই বিষয়গুলির সত্যতা তার জানা নেই। এরপর বলেছেন তার যা জানা আছে তা হচ্ছে হিন্দু ধর্মের বর্ণবাদ প্রথা। কিন্তু আরিফ আজাদ এখানে হিন্দু ধর্মের বর্ণবাদ প্রথার যে ধারণা দিয়েছেন আসলে হিন্ধু ধর্মের বর্ণবাদ প্রথা ছিলো এর থেকে ভয়াবহ যেমন, আরিফ আজাদ বলেছেন “উচ্চবর্ণের কোনো হিন্দু নিম্নবর্ণের কোনো হিন্দুর পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাকেও পাপ মনে করে” আসলে শুধু তাই না উচ্চবর্ণের কোনো হিন্দু নিম্নবর্ণের কোনো হিন্দুর পাশ কাটানো বা না কাটানো তো অনেক পরের কথা যদি কোন উচ্চবর্ণের হিন্দুর ছায়া কোন নিম্নবর্ণের হিন্দু ভুল করে মাড়িয়েছে তাহলেও তাকে হত্যার নির্দেষ ছিলো।
আসল কথা সেটা না তিনি কেন এখানে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের কথার মধ্যে আরেকটি ধর্মের খারাপ দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তা হয়তো পাঠকদের বুঝতে বাকি থাকার কথানা। এখানে লেখক আরিফ আজাদ চাচ্ছে অন্য ধর্মটিকে একটু বেশি খারাপভাবে উপস্থপন করতে পারলে আলোচিত ধর্মটিকে একটু মানবিক করে তোলা যাবে কিন্তু আসলে কি সেই আলোচিত ধর্মটি মানবিক ? বা অসাম্রদায়িক ? না একেবারেই তা নয়। এই ইসলাম ধর্মের মধ্যে যে পরিমানের সাম্প্রদায়িকতা বিদ্যমান তা অন্যান্য ধর্ম গুলি থেকে কোন অংশেই কম নয়। বর্তমানে চলমান সিরিয়ার অবস্থা এখানে না তুলে পারলাম না। এরপরেও ইসলামের ইতিহাস পড়লে আমরা দেখতে পায় নিজ ধর্মের মধ্যেই তাদের সাম্রদায়িকতার তান্ডব। নবী মুহাম্মদের জন্মের পূর্বে ইয়েমেনের এক রাজা কাবা ধ্বংস করে কাবার অর্থনৈতিক স্রোত ইয়েমেনের দিকে নিতে চেয়েছিলেন। যেই ক্ষোভ থেকে বর্তমানের সৌদি রাজপরিবার ইয়েমেনের সাথে এখন কেমন আচরন করছে তাও একটু মিলিয়ে নিতে হবে। যদিও সেই রাজা তখন ব্যর্থ হোন।
কাবাকে কেন্দ্র করে মক্কায় নগরায়ন ঘটেছে, মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসেছে। ফলে মুহাম্মদ যখন হানিফদের মতন এক ঈশ্বরবাদ প্রচারে নামলেন প্রথমে কিছু না বললেও পরবর্তীতে কুরাইশরা এর বিরোধিতা করলেন। এর মূল কারণ ছিল কাবার অর্থনৈতিক সেক্টরের পতনের আশঙ্কা। প্রতিবছর আরবের আশ-পাশ থেকে হাজারো মানুষ কাবা প্রদক্ষিণ করতে আসতেন। ফলে ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালিত হতো। আর এই কারনে যত যুদ্ধ তখন হয়েছিলো তার সবটায় মুসলমান মুসলমানের মধ্যে হয়েছিলো। তাছাড়াও কিরতাসের ঘটনা, ক্ষমতার লড়াই, ইসলামের প্রথম উগ্রবাদী দল খারিজি, কারবালার হত্যাকাণ্ড, সৌদি ওহাবীবাদের উত্থান, কাবা ধ্বংসের ইতিহাস, প্রথম মক্কা অবরোধ (৬৮৩) ও কাবায় আগুন, দ্বিতীয় মক্কা অবরোধ ৬৯২ ও কাবা ক্ষতিগ্রস্ত, কারামাতিয়দের হামলা (৯৩০), ১৬২৯ সালের মক্কা শহরের ক্ষতিসাধন, ১৯৭৯ সালে মসজিদ আল-হারাম অবরোধ, ১৯৮৭ সালের সংঘর্ষ যার সবই সংগঠিত হয়েছিলো এই মুসলমান দারা এখানে অন্য কোন ধর্মের মানুষ ছিলোনা। যাই হোক এই পর্বটি অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবার কারনে এখানেই শেষ করলাম পরের পর্বটিতে বাকি অংশ থাকবে।
বইটিতে সূচিপত্র ও ভূমিকার বিশ্লেষণ যেভাবে আছে এখানে দেখুন।
পৃষ্ঠা ১৪ http://i67.tinypic.com/5x4ad3.jpg
পৃষ্ঠা ১৫ http://i63.tinypic.com/13ydq3l.jpg
পৃষ্ঠা ১৬ http://i67.tinypic.com/k3pq36.jpg

মৃত কালপুরুষ
০১/০৩/২০১৮

বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

শার’ঈ সম্পাদকের কথা ও সমালোচনা। বইঃ আরজ আলী সমীপে, লেখকঃ আরিফ আজাদ (৩য় পর্ব)



আগের পর্বটির সাথে এই ১১ আর ১২ নাম্বার পৃষ্ঠার শার’ঈ সম্পাদকের কথার আলোচনাটি শেষ করার কথা ছিলো কিন্তু লেখকের কথার পর্বটি একটু দীর্ঘ হয়ে যাবার কারনে শেখানে আর এই অংশটি যোগ করা হয়নি। এখানে বই “আরজ আলী সমীপের” শার’ঈ সম্পাদকের কথা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পুর্বেই জানিয়েছিলাম এই বইটির প্রকাশক তার কথার মধ্যে বলেছিলেন বইটিতে যেনো কোন প্রকারের ভুল ত্রুটি না থাকে তাই একজন আলেমের সাহায্যে তা যাচাই বাছাই করা হয়েছে। এখানে যেই অধ্যাপক ভদ্রলোক এই বইটির শার’ঈ সম্পাদনা করেছেন তার নাম হচ্ছে “ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া” তিনি অধ্যাপক, আল-ফিকহ এন্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগ, আইন ও শরী’আহ অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া। “আরজ আলী সমীপে” বই এর লেখক ও প্রকাশক এই ভদ্রলোককে এই বইটির শার’ঈ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন এবং তিনিই এই বইটির সম্পাদনা করেছেন বলে এখানে দাবি করেছেন। আমি জানিনা তিনি কি “আরজ আলী মাতুব্বর” এর কোন বই পড়েছেন কিনা বা তার সম্পর্কে কতটুকু জ্ঞান রেখে এই বইটির সম্পাদনা করেছেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক সম্পর্কে আমার মনে এমন প্রশ্ন উদয় হবার কারণ তার এই কথাগুলি। তিনি তার কথার শেষভাগে বলেছেন “আমার বিশ্বাস রয়েছে যে, এ গ্রন্থটি বাংলা ভাষাভাষী সবার হাতে থাকা দরকার, যাতে করে আর কোন আরজ আলী আমাদের সন্দেহের ধুম্রজাল সৃষ্টি করে ধোকা দিতে না পারে” তারমানে তিনি চাচ্ছে এমন একটি বাংলাদেশ যেখানে কোন জ্ঞানের চর্চা হবে না। কেউ কোন প্রশ্ন করতে পারবে না। যেদিকেই তাকানো যাবে দেখা যাবে নারীরা বোরখা পরে মাথা ঝুকিয়ে কোরান পড়ছে আর ছেলেরা মাথায় টুপি দিয়ে মাথা ঝুকিয়ে কায়দা পড়ছে এরকম একটা অন্ধকার দেশ।

শুরুতেই এই অধ্যাপক সাহেবের মস্তিষ্ক সম্পর্কে আপনাদের একটি ধারনা দিতে চাই। যদিও একজন অধ্যাপক সম্পর্কে আমার এমন কিছু বলার ইচ্ছা ছিলোনা তারপরেও উনি যেহেতু এরকম একটি জঙ্গী ও সন্ত্রাসীমনা ধর্মীয় ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন বই এর সাথে নিজেকে জড়িয়ে জোর গলায় এখানে কিছু বলেছেন তাই জবাব এর খাতিরে এগুলো চলে আসবেই। “আরজ আলী সমীপে” গ্রন্থের প্রকাশক এবং লেখকের মস্তিষ্ক যে একটি নির্দিষ্ট প্রকারের বিশ্বাসের ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত সেটার প্রমাণ নিশ্চয় আমরা আগেই পেয়েছে। পূর্বের দুই পর্বের লেখার পরিপ্রেক্ষিতে লেখক আরিফ আজাদের গুনি ফলোয়ারদের মতামত দেখেও আমরা কিছুটা আঁচ করতে পেরেছি তারাও কোন মানুষিকতার। এখন সেই বই এর শার’ঈ সম্পাদনা জিনি করবেন তার মস্তিষ্ক যে এই ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকবে এটা কিন্তু আমরা প্রত্যাশা করতে পারিনা তাই এখানে অপ্রত্যাশিত কিছুই ঘটেনি সেটা নিশ্চিত থাকবেন। এই অধ্যাপক সাহেব দাবি করেছেন যে আরজ আলী মাতুব্বরের মতো লোকের প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বিজ্ঞানের কলা কৌশল ও জ্ঞান নিয়ে তারপরে তার উওর দিতে হবে। কিন্তু শুরুতেই তিনি কোন বিজ্ঞানমনষ্কের পরিচয় দিয়েছেন আসুন একটু দেখি। তিনি বইটির ১২ নং পৃষ্ঠার শার’ঈ সম্পাদকের কথার শুরুতেই বলেছেন “মহান আল্লাহ আমাদের জ্বীন ও মানুষ দু-ধরনের শয়তান থেকে একান্তভাবে তার কাছে আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। শয়তানরা পথভ্রস্ট করার জন্য দুইটি অস্ত্র ব্যাবহার করে থাকে” আর বাকিটা না হয় পরেই বলি।

এখানে আমাদের খেয়াল করে দেখার বিষয় হচ্ছে তিনি আমাদের এই লেখার মধ্যেই বলেছেন বিজ্ঞানমনষ্ক ও যথেষ্ট যুক্তি প্রামণ ছাড়া বর্তমানে এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে না। তাহলে এখানে তিনি যে চারটি কাল্পনিক চরিত্রের কথা বলেছেন তার যদি যৌক্তিক ব্যাখ্যা চাওয়া হয় তাহলে তিনি কিভাবে প্রমাণ করে দেখাবেন আমার জানা নেই। আমরা ছোটবেলায় ঠাকুরমার ঝুলি গল্পের বই পড়েছি যেখানে বিভিন্ন ধরনের রাক্ষশ আর ক্ষোক্কোশ ও নানান কাল্পনিক চরিত্রের সন্ধান পেয়েছিলাম। এই অধ্যাপক ভদ্রলোক এখানে যে চারটি চরিত্রের কথা বলেছেন তার সবগুলোই কি সেই একই রকম চরিত্র নয় ? আর যদি তা না হয়ে থাকে তাহলে আমি অনুরোধ করবো আমাকে একটু যৌক্তিক ও প্রমাণ সহ এই চারটি চরিত্রের ব্যাখ্যা তিনি দিবেন। এরপরের লাইনে তিনি সেই কাল্পনিক চরিত্রের কাজ সম্পর্কে বলেছেন তারা দুইভাবে মানে দুইটি অস্ত্র ব্যাবহার করে থাকে। আসলে যে চরিত্রের কোন অস্তিত্বই নেই যার অবস্থান শুধুই মানুষের মস্তিষ্কের অবচেতন মনের মধ্যে তার আবার কাজ কি ? আর কাজ করার অস্ত্রই বা কি ? কথা তো এখানেই শেষ হয়ে যাবার কথা। কিন্তু যেহেতু তারা বিশ্বাসের ভাইরাসে আক্রান্ত তাই তাদেরকে সেইভাবেই জবাব দিতে হবে বলে মনে করি, আর তাই নিচের বাড়তি কথা গুলো লেখা।

অধ্যাপক সাহেব তার পরেই বলেছেন (শয়তানের দুইটি অস্ত্র সম্পর্কে) “একটি হচ্ছে প্রবৃত্তির বাধাহীন চাহিদাপূরণের প্রতি উৎসাহপ্রদান, আরেকটি হচ্ছে মনের কন্দরে সন্দেহের বীজ বপন করা। আরজ আলী মাতুব্বর সাহেবদের কর্মকান্ডে প্রথমটির চেয়ে দ্বিতীয়টিই বেশি দেখা যায়। তারা আল্লাহ, তার রাসূল, আখেরাত, তাকদীর ইত্যাদি নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করে ঈমান ও আমল বিনষ্ট করতে সচেষ্ট থাকে। তারা নিজেরা তাদের সন্দেহের ঔষধ গ্রহন করে তা নিরাময় না করে অপরের দিকে সেই সন্দেহ পাচার করে শান্তি পায়। আর এটাই চিরাচরিত নিয়ম যে রোগীরা সাধারণত সুস্থ মানুষকে ঈর্ষা করে তারা যদি নিজেদের রোগ নিরাময় করতে পারতো তবে নিজেরা যেমন শান্তি পেতো অনুরূপভাবে অপর লোকদেরও শান্তি দিতো” তিনি বলেছেন “প্রবৃত্তির বাধাহীন চাহিদাপূরণের প্রতি উৎসাহপ্রদান” তাহলে এখানে একটি উদাহরন দিতেই হয়। মানব সভ্যতায় ধর্ম নামের প্রথাটি এসেছে অনেক পরে। সভ্যতার শুরুতে মানুষের জ্ঞান যেপর্যন্ত জানতে পেরেছিলো আর যেগুলো সম্পর্কে মানুষ জানতে পারেনি, সে সময়ের জ্ঞান যে পর্যন্ত পৌছেনি, সেগুলো সম্পর্কে মানুষ ধারনা করেছে, কল্পনা করেছে অজ্ঞানতা, জানতে না পারার হতাশা, অজ্ঞতা একধরনে হীনমন্যতায় রুপ নিয়েছে এবং ধীরে ধীরে অজ্ঞানতার অন্ধকার একপর্যায়ে ঈশ্বর নামক একটা কল্পনা দিয়ে তারা ভরাট করে দিয়েছে শুনতে খুব কঠিন এবং খারাপ শুনালেও এটাই সত্য যে অজ্ঞানতার অন্ধকারের অপর নাম ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা যে মানুষকে সৃষ্টি করেনি বরং মানুষই সেই কাল্পনিক সৃষ্টিকর্তাকে সৃষ্টি করেছে। আর যখন মানুষের মধ্যে এই ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার ধারনা এসেছে তখন তারা নিজেরাই মনেমনে তৈরি করেছে কিছু ধর্মীয় নিয়ম যাকে এই অধ্যাপক ভদ্রলোক “প্রবৃত্তি” বলছেন। আসলে মানুষের প্রবৃত্তি সেই শুরু থেকেই বাধাহীনভাবেই ছিলো মাঝে মানুষকে শাসন আর শোষন করার জন্য তৈরি হওয়া কিছু ধর্মীয় রীতিনীতি আজও টিকে আছে মানুষের মস্তিষ্কে।

এরপরেই তিনি কাল্পনিক চরিত্র শয়তানের দ্বিতীয় অস্ত্র হিসাবে যেটা উল্লেখ করেছেন সেটা হচ্ছে “মনের কন্দরে সন্দেহের বীজ বপন করা” এর মানে হচ্ছে হুজুর, কোন প্রশ্ন করা যাবেনা প্রশ্ন করলেই সন্দেহ ঢুকবে আর তাতে করে ঈমান নষ্ট হবে এমন একটা কিছু বোঝানো হচ্ছে। আমি সাধারন একজন পাঠক আমি চাই যতক্ষন পর্যন্ত না আমার জ্ঞানের ক্ষোরাক মিটছে ততক্ষন পর্যন্ত জানতে চাইবো যেমন, “নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর” কবিতা পড়লে এখনও মনে হয় জ্ঞান পিপাসু তরুন সমাজের ব্লাড সার্কুলেশন বৃদ্ধি পায়। তার কবিতা “মিলিত মৃত্যু” বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখ দ্বিতীয় বিদ্যায়, বরং বিক্ষত হও প্রশ্নের পাথরে, বরং বুদ্ধির নখে শান দাও, প্রতিবাদ করো, অন্তত আর যাই করো, সমস্ত কথায় অনায়াসে সম্মতি দিও না এই কবিতার সাথে কি এই ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভদ্রলোকের কথার কোন মিল আছে ? আমি আর কথা বাড়াবো না এরপরের কথায় চলে যাচ্ছি। তিনি এরপরে বলেছেন “অসুস্থ মানুষ নাকি সুস্থ মানুষদের ঈর্ষা করে” সেটা যিনি অসুস্থ তিনিই ভালো বলতে পারবেন তিনি সুস্থ মানুষদের ঈর্ষা করেন কিনা তবে যারা মুক্তমনা ও মুক্তভাবে চিন্তা করতে পছন্দ করে তারা কিন্তু বিশ্বাসের ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষদের ভালোর জন্যই কথা বলে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত অসুস্থ মানুষরা আসলে বুঝতে পারেনা তারা আসলে মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। সম্প্রতি সিরিয়ার ঘটনা দেখুন। ইসরায়েলের প্রতি সৌদিয়ারবের আচরন দেখুন। সমস্ত পৃথিবীতে সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী হামলা গুলো কাদের দ্বারা সংগঠিত হয়েছে তা একটু যাচাই করে দেখুন। আল-কায়েদা, বোকো হারাম, আইএস, তালেবান, এসব সংগঠনের সাথে কারা জড়িত তা একটু ক্ষতিয়ে দেখুন।

এখন কথা হচ্ছে একটি কোম্পানীর পন্য খেয়ে যদি নির্দিষ্ট কিছু মানুষ অসুস্থ হয়ে যায় তাহলে কিন্তু সবাই তাদের সুস্থতা কামনা করলেও তা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাবে না যদি জানতে পারে এই লোক বা এই অসুস্থ মানুষগুলো যেনে বুঝেই এই কোম্পানীর পন্য খাচ্ছে। এখন যদি দেখা যায় যে সেই অসুস্থ মানুষগুলো যে শুধু নিজেরাই অসুস্থ হচ্ছে তা না তার পাশাপাশি তারা সুস্থ সবল মানুষদের কামড় দিয়ে তাদেরও অসুস্থ করে ফেলছে। যেমন আইএস দ্বারা সাধারন মানুষ হত্যা, বোকো হারাম দ্বারা সাধারন মানুষ হত্যা, আফগানিস্তানে তালেবানের হামলায় সাধারন মানুষ নিহত, আল-কায়েদার হামলায় সাধারন মানুষের মৃত্যু, গাড়িবোমা, আত্মঘাতি বোমা এসবই হচ্ছে অসুস্থ মানুষ দ্বারা সুস্থ মানুষের আক্রান্ত হবার জলজ্যান্ত প্রমাণ। আরো চাইলে অনেক তথ্যসুত্র দেওয়া যাবে। এসব বিচার বিশ্লেষন করলেই পরিষ্কার বোঝা যায় আসলে কারা অসুস্থ আর কারা সুস্থ। কাদের চিকিৎসার দরকার আছে আর কে কাকে ঈর্ষা করে। এখানে আমার মনে হয়েছে অধ্যাপক সাহেব মনে হয় সুস্থ আর অসুস্থ মানুষের ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন এই বই এর পাঠকদের কাছে। আমি বলছি না তিনি লেখকের মতো মিথ্যাচার করেছেন।

এই সম্পাদনার কাজে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া অধ্যাপক সাহেব তার শেষ কথা যা বলেছেন তা হচ্ছে “আরজ আলী মাতুব্বরকে” তো তিনি অসুস্থ বলেছেনই সাথে বলেছেন “কিন্তু তারা বাকা পথটিই বেছে নিয়েছে। এদের এসব সন্দেহের উত্তরে সত্যিকারের দ্বীনী জ্ঞান থাকা যেমন জরুরি তেমনি দরকার আধুনিক কলা-কৌশল ও বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত প্রমাণাদি” এই ভদ্রলোক একবার বলছেন দীনী জ্ঞান দিয়ে এসব সন্দেহের উওর দিবেন আবার বলছেন “আধুনিক কলা-কৌশল ও বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত প্রমাণাদি” নাকি থাকতে হবে এর উত্তর দিতে হলে। তাহলে কথা হচ্ছে দীনী জ্ঞান মতে তাদের যে শিক্ষা দেয় সেটা হচ্ছে গাধার পিঠে মহাকাশ ভ্রমন করা যায় এমন ধারনা বা এই পৃথিবী থেকেই হাত দিয়ে চাঁদ ফাটিয়ে ফেলা যায় এমন ধারনা। যদিও এই লেখক দাবী করেছে এমন কিছুই নাকি কোথাও বলা নেই তবে আমার পরিচিত ৯৯% মুসলমান বন্ধুরা এটাই জেনে এসেছে তাদের ছোটবেলা থেকে কিন্তু এই বই এর লেখক দাবী করেছে এটা নাকি সঠিক ইসলাম না। যাক সে কথা মহাকাশ যাত্রা সম্পর্কে এরকম ধারনা যেটাকে আমরা দীনী জ্ঞান বলতে পারি আর তার সাথে আধুনিক কলা-কৌশল ও বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত প্রমাণাদি বলতে তিনি কি বোঝাতে চেয়েছেন নাকি এই বই এর প্রচার এবং প্রসার স্বরুপ এমন একটা কথা বলে দিলে ভালো হবে এই বইটিকে একটু বিজ্ঞানসম্মত ও আধুনিক বই বলে চালোনা যাবে তা বুঝতে পারলাম না।

এরপরের কথা হচ্ছে সেই আধুনিক কলা-কৌশল ও বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত প্রমাণাদি ও দীনী জ্ঞান এই “দুটির সমন্বয়ে তা হয়ে উঠবে সোনায় সোহাগা। আরজ আলী সমীপে গ্রন্থটির শার’ঈ দিকটি আমি দেখেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে তাতে দুটি দিকই যথার্থভাবে স্থান পেয়েছে। যদি কোরান ও সুন্নাহর সত্যিকারের অনুসরনের মাধ্যমে কোন সন্দেহের উত্তর দেওয়া হয় তবে তা হয় যথার্থ। সুতরাং এ বইটির উত্তরসমূহ শার’ঈ ভিত্তির উপর নির্ভর করে প্রদত্ত হয়েছে বলে আমি মনে করছি। আমার বিশ্বাস রয়েছে যে, এ গ্রন্থটি বাংলা ভাষাভাষী সবার হাতে থাকা দরকার, যাতে করে আর কোন আরজ আলী আমাদের সন্দেহের ধুম্রজাল সৃষ্টি করে ধোকা দিতে না পারে” এটা বলে ভদ্রলোক তার বক্তব্য শেষ করেছেন। তিনি বলেছে এই দুইটি বিষয় দিয়ে “আরজ আলী মাতুব্বরের” প্রশ্নের উত্তর দিলে তা হবে সোনায় সোহাগা কিন্তু আসলেই কি সেই বই এর ভেতরে তা আছে কোথাও ? সেটা নিয়ে পরের পর্বগুলিতে দেখা হবে নিশ্চয়। তবে এই বই এর শার’ঈ সম্পাদক এই অধ্যাপক ভদ্রলোক দাবি করেছে তিনি নাকি এটা দেখেছেন এবং তার কাছে মনে হয়েছে এই বইতে এই দুইটি দিকই ফলো করা হয়েছে। তিনি আসলে কি দেখে এই কথা বলেছেন আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। সম্পুর্ণ বইটি পড়ে আমি বিজ্ঞানের কিছু অপব্যাখ্যা ও মিথ্যাচার (যা ধর্মীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন কিতাবের সাথে মিল রেখেই লেখা) ছাড়া আর কিছুই পেলাম না আপনারাও দেখবেন সেগুলা পরের পর্বগুলিতে।

অধ্যাপক ভদ্রলোকের সর্বশেষ কথা ছিলো “আমার বিশ্বাস রয়েছে যে, এ গ্রন্থটি বাংলা ভাষাভাষী সবার হাতে থাকা দরকার, যাতে করে আর কোন আরজ আলী আমাদের সন্দেহের ধুম্রজাল সৃষ্টি করে ধোকা দিতে না পারে”। এই কথার মাধ্যমে তিনি যা দাবি করলেন তাতে কিন্তু একটি বিষয় এখানে আমাদের মতো সাধারন পাঠকদের মনে দাগ কেটে গেলো। আর সেটা হচ্ছে এই ধর্মটি আর ধর্মের ধর্মগ্রন্থগুলি কি মনুষ্য  রচিত কোন গ্রন্থ কিনা। কারণ তাই যদি না হবে তাহলে সাধারন একটা মানুষ এই আরজ আলী মাতুব্বর কবে না কবে কিছু কথা বলে গিয়েছেন কয়েকটা প্রশ্ন রেখে গিয়েছেন তাই দেখে নাকি মানুষ ধুম্রজালে আটকা পড়ে এ কেমন কথা ? এখানেও কিন্তু এই ভদ্রলোক আবার বলেছেন সেই বিশ্বাসের কথা কারণ তার মাথায় আছে বিশ্বাসের ভাইরাস। অভিজিৎ রায়ের লেখা সেই “ল্যাংসেট ফ্লুক নামের প্যারাসাইটের কথা আবার মনে পড়ে গেলো যেটা তিনি তার বিশ্বাসের ভাইরাসে লিখেছিলেন। “ল্যাংসেট ফ্লুক নামের প্যারাসাইটের কারণে পিপড়ের মস্তিস্ক আক্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন পিপড়ে কেবল চোখ বন্ধ করে পাথরের গা বেয়ে উঠা নামা করে। যেমনটি ধর্ম বিশ্বাসে আক্রান্ত মানুষেরা করে থাকে। বারবার বিশ্বাস বিশ্বাস করে তারা হৈ চৈ করে। কিন্তু একটিবারও ভেবে দেখে না বিশ্বাস জিনিষটি আসলে কি। এখানে ফ্রুটার রেভুসের একটি বানী দিয়ে শেষ করছি, তিনি বলেছিলেন “বিশ্বাস তোমাকে উত্তর দেয়না বরং প্রশ্ন করা বন্ধ করে”।

বইটিতে শার’ঈ সম্পাদকের কথা যেভাবে আছে এখানে দেখুন
পৃষ্ঠা ১২ http://i63.tinypic.com/2mxlxg2.jpg
পৃষ্ঠা ১৩ http://i63.tinypic.com/1zny5pz.jpg

মৃত কালপুরুষ
২৮/০২/২০১৮